বেনাপোল সাজেদ রহমান বেনাপোল স্থল বন্দরের পণ্য ডেলিভারি শাখা ঘুষ আর দুর্নীতির আঁখড়ায় পরিণত হয়েছে। বন্দরের বেনাপোল এবং ঢাকার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা আদায় করছে ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে। কোনো কোনো কর্মকর্তার নামে প্রতি মাসে কুরিয়ার সার্ভিসে পাঠানো হচ্ছে টাকা। যা অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে। কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের সহযোগিতায় প্রতিনিয়ত বন্দর থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার মালামাল চুরির ঘটনা ঘটছে। তাদের পরোক্ষ সহযোগিতায় শুল্ক করাদি পরিশোধ করা ছাড়াই কোটি কোটি টাকার আমদানিকৃত পণ্য বন্দর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি এ রকম একটি বড় ধরনের ঘটনা ঘটেছে। যাতে প্রায় ১০ লাখ টাকার শুল্ক ফাঁকি দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সিএন্ডএফ এজেন্ট ব্যবসায়ী ও তাদের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ২০০২ সালের ১ ফেব্র“য়ারি বাংলাদেশ স্থল বন্দর কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়। এর প্রধান অফিস করা হয় ঢাকায়। বেনাপোলসহ দেশের অন্যান্য ছোট ছোট শুল্ক স্টেশনকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ। আর এ সময় সকল নিয়মনীতি ভঙ্গ করে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে বিভিন্ন পদে চাকরি দেয়া হয় বেনাপোল বন্দরে। তৎকালীন নৌ-পরিবহন মন্ত্রীর এলাকাসহ হাওয়া ভবনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সুপারিশে নিয়োগ দেয়া হয় তাদের। যাদের বন্দরে সংশ্লিষ্ট কাজের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। ফলে দক্ষ জনবলের অভাবে বন্দরের কাজ যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে না। অদক্ষ এই কর্মচারীরা ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ করেন না। বন্দরের ম্যানুফেস্ট শাখায় দায়িত্বে রয়েছেন আলমগীর নামে এক কর্মকর্তা। সিএন্ডএফ এজেন্টের কর্মচারী ও প্রতিনিধিরা আমদানিকৃত পণ্যের ম্যানুফেস্ট তুলতে তার কাছে গেলে তিনি ম্যানুফেস্ট প্রতি ২০/৩০ টাকা ঘুষ আদায় করেন। আর বিকাল ৪টার পরে গেলে তাকে ১০০ থেকে ২০০ টাকা ঘুষ দিতে হয়। পণ্য ডেলিভারির কাগজপত্রের চেকিংয়ের দায়িত্ব রয়েছেন বকুল কুমার ও হামিদুর রহমান শাহীন নামে দুই কর্মকর্তা। এই দুই কর্মকর্তা এই সেকশনের দুর্নীতির গডফাদার। কাগজপত্রে নানা রকম ভুলত্র“টি দেখিয়ে প্রতিদিন মোটা অঙ্কের ঘুষ আদায় করছেন তারা। এই দু’জনের চাহিদা অনুযায়ী ঘুষের টাকা না দেয়া হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফাইল আটকে রাখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এদের মধ্যে বকুল কুমারের বাবা একজন সচিব বলে শোনা যায়। যে কারণে তার দাপট অন্য সবার চেয়ে অনেক বেশি। তাই তিনি যা ইচ্ছা তাই করেন। আর সে কারণে তার ভয়ে অনেককই ঘুষের টাকা দিতে বাধ্য হয়। এর আগে ঘুষের টাকা আদায়কে কেন্দ্র করে এ ব্যক্তির সঙ্গে এখানকার সিএন্ডএফ এজেন্টের কর্মচারীদের হাতাহাতিও হয়েছে। এছাড়া রয়েছে বন্দরের এ্যাসেসমেন্ট শাখায় রুহুল আমিন, মেহেদী হাসান ও মুনির হোসেন নামে তিন ব্যক্তি। এরা আমদানিকৃত পণ্যের বন্দর ভাড়া বাড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা ঘুষ আদায় করেন। অনেক সময় ঘুষের পরিমাণ বাড়িয়ে দিলে সরকারের গুদাম ভাড়া কমিয়ে দেয়া হয়। এ রকম অবৈধ কাজ তারা চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। এ ছাড়া বিল চেকিংয়ের দায়িত্বে রয়েছে সাইফুল নামের আরেক কর্মকর্তা। তিনি এ্যাসেসমেন্ট নোটিসের বিভিন্ন ভুল ধরে ফাইল আটকিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার টাকা আদায় করেন। জানা গেছে, লোডিং-অর্ডার শাখার দায়িত্বে রয়েছেন আশরাফ হোসেন, জাহিদ হোসেন ও সালমা বেগম নামের আরো ৩ ব্যক্তি। দ্রুত লোডিং-অর্ডার করিয়ে দেয়ার কথা বলে সিএন্ডএফ কর্মচারীদের কাছ থেকে ১০০ টাকা থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করেন তারা। বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলো গেটপাস। এ শাখার দায়িত্বে রয়েছেন আসাদুজ্জামান চৌধুরী রানা, ফারুক হোসেন ও জিল্লুর রহমান। এই শাখার মাধ্যমে আমদানিকৃত পণ্য বন্দর থেকে খালাসের কাগজপত্র ইস্যু করা হয়। এখানে প্রতিটি পণ্যের চালানের বিপরীতে গেটপাস ইস্যু বাবদ ১০০ টাকা করে নেয়া হয়। ‘ভালোভাবে লেখা হয়নি, লেখা পড়া যাচ্ছে না, এত কাটাকাটি হলো কেন, এসব নানা কথা বলে গেট পাস থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। যৌথ বাহিনীর মনিটরিং শুরুর সঙ্গে সঙ্গে এই ঘুষ নেয়া বন্ধ ছিল। কিন্তু এখন প্রকাশ্যেই তারা এভাবেই নানা কৌশলে সিএন্ডএফ এজেন্টদের কাছ ঘুষ আদায় করছে। একটি সূত্র জানায়, প্রতিদিন এই বন্দর থেকে কমপক্ষে ৩০০ চালান খালাস হয়। প্রতিটি চালানের বিপরীতে ১০০ টাকা হিসাবে ৩০ হাজার টাকা ঘুষ নেয়া হয়। শুধু গেটপাস থেকে নয়, অভার টাইমের কথা বলে আদায় করা হয় হাজার হাজার টাকা। বিকাল ৪টার পরে গেলে প্রতিটি চালান থেকে নেয়া হয় ৫০০ টাকা করে। এসব ঘুষ আর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতার পেছনে রয়েছে বন্দরের কর্মকর্তারা। তারা নিয়মিত এখান থেকে অর্থ পান। যার ফলে ঘুষ বন্ধ হচ্ছে না। দিন দিন আরো বাড়ছে। ঘুষের টাকা বেনাপোল বন্দরের কর্মকর্তারা ছাড়াও বাংলাদেশ স্থল বন্দরের কর্মকর্তারাও পেয়ে থাকেন। অনুসন্ধান করে জানা গেছে, বাংলাদেশ স্থল বন্দর কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তার বেনাপোল থেকে প্রতি সপ্তাহেই ঘুষের টাকা পাঠানো হয় কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে। গত ১৫ জুলাই (রসিদ নম্বর-০০০৩১৯৬) ৫ হাজার, ২০ জুলাই (রসিদ নম্বর ০০০৩৩৫৬) ৫ হাজার, ২৭ আগস্ট (রসিদ নম্বর-৭৯৮৯৬৯৩) ৫ হাজার টাকা, ৫ অক্টোবর (রসিদ নম্বর-০০০৫৬৪৭) ৩ হাজার টাকা এবং ২১ অক্টোবর (রসিদ নম্বর-০০০৬০৯১) ১০ হাজার টাকা পাঠানো হয় বেনাপোলের সুন্দর বন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে। প্রতি মাসেই বেনাপোল বন্দরের ঘুষখোর কর্মচারীরা তাদের টাকা পাঠান তার নামে। ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ২০০৫ সালে ২২০ কর্মচারীর অভার টাইমের ২৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা আত্মসাত করার অভিযোগ রয়েছে। তখন তিনি বাংলাদেশ স্থল বন্দরের একজন পরিচালক ছিলেন।