চলতি ঘটনা বিষয়ে দৈনিক সংবাদপত্রগুলোর বেশ কয়েকটিতে প্রতিদিন একটি করে প্রশ্ন করে অনলাইনে জনমত জরিপ করা হয়। এটা পুরো জনগোষ্ঠীর মতামতের প্রতিফলন নয়। আবার শিক্ষিত সচেতন জনগোষ্ঠীর মতামত হিসেবে একে উড়িয়ে দেয়াও খুব বিবেচনার কাজ নয়। ২১-২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১০ এ ছয়দিনে বেশ কটি দৈনিক সংবাদপত্রের অনলাইন জরিপের বিষয়ভিত্তিক নির্বাচিত কিছু প্রশ্নের ফলাফল নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন শুভ কিবরিয়া
নাম বদল
১. প্রশ্ন : ‘শিক্ষা’ দিতেই নাম বদল করা হয়েছে। ‘জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম বদল প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন মন্তব্য সঠিক মনে করেন কি? উত্তর : হ্যাঁÑ৩৮.৭১%, নাÑ৬১.২৯% (কালের কণ্ঠ, ২১-০২-২০১০)
২. প্রশ্ন : তাদের শিক্ষা দিতেই এই নাম পরিবর্তন প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি? উত্তর : হ্যাঁÑ৩৬.৩২%, নাÑ৬৩.১৭% (প্রথম আলো, ২২-০২-২০১০)
৩. প্রশ্ন : প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যারা নাম বদলের সংস্কৃতি চালু করেছে তাদের শিক্ষা পাওয়া উচিত। আপনি কি তাই মনে করেন? উত্তর : হ্যাঁÑ৩৫.৪৫%, নাÑ৬৩.২৩% (যুগান্তর, ২২-০২-২০১০)
৪. প্রশ্ন : ক্ষমতায় গেলে প্রধানমন্ত্রীর ‘শিক্ষা’ কাজে লাগবে বিএনপিÑ প্রধান বিরোধী দলের এ মনোভাব সমর্থন করেন কি? উত্তর : হ্যাঁÑ ৫৭.৬৯%, নাÑ ৪০.২৩% (প্রথম আলো, ২৩-০২-২০১০)
৫. প্রশ্ন : ক্ষমতায় গেলে মুজিবের নামে স্থাপনার নাম পাল্টে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপি নেতৃবৃন্দ। আপনি কি এটা সমর্থন করেন? উত্তর : হ্যাঁÑ৫৭%, নাÑ৪০% (ইত্তেফাক, ২৩-০২-২০১০)
৬. প্রশ্ন : প্রতিহিংসামূলকভাবে জিয়া বিমানবন্দরের নাম বদলের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সংবিধানে প্রদত্ত শপথ ভঙ্গ করেছেন বলে বিএনপির অভিযোগ সমর্থন করেন কি? উত্তর : হ্যাঁÑ৫২.২৬%, নাÑ৪৭.৭৪% (কালের কণ্ঠ, ২৫-০২-২০১০)
৭. প্রশ্ন : ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকা বলেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে বিমানবন্দরে জিয়ার নাম পুনর্বহাল করা হবে। আপনি কি এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করেন। উত্তর : হ্যাঁÑ৭১.৮৮%, নাÑ২৭.৪০% (যুগান্তর, ২৭-০২-২০১০)
পার্বত্য চট্টগ্রামে সহিংসতা
১. প্রশ্ন : পার্বত্য চট্টগ্রামে সহিংসতা বন্ধে সেখানে সেনা অবস্থান বহাল রাখার জন্য বিএনপির দাবি সমর্থন করেন কি? উত্তর : হ্যাঁÑ ৫১.৩৭%, নাÑ৪৮.৬৩% (কালের কণ্ঠ, ২৩-০২-২০১০)
২. প্রশ্ন : সেনা প্রত্যাহার হওয়াতেই বাঘাইছড়িতে পাহাড়ি-বাঙালি সংঘর্ষ ঘটেছে। বিএনপির এ মন্তব্য কি সমর্থনযোগ্য। উত্তর : হ্যাঁÑ৭৭%, নাÑ২১% (ইত্তেফাক, ২৪-০২-২০১০)
৩. প্রশ্ন : বাঘাইহাটের ঘটনার তদন্তে বিচার বিভাগীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব সমর্থন করেন কি? উত্তর : হ্যাঁÑ৭৯.৭৮%, নাÑ১৬.৮৫% (প্রথম আলো, ২৫-০২-২০১০)
৪. প্রশ্ন : রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়িতে সহিংস ঘটনায় জঙ্গি মদদ থাকতে পারে বলে মনে করেন কি? উত্তর : হ্যাঁÑ২৬%, নাÑ৭১% (ইত্তেফাক, ২৫-০২-২০১০) ৫. প্রশ্ন : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, প্রয়োজনে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা মোতায়েন করা হতে পারে। আপনি কি এ পদক্ষেপ সমর্থন করেন? উত্তর : হ্যাঁÑ ৮২.৫৬%, নাÑ১৫.৯৫% (যুগান্তর, ২৬-০২-২০১০)
খনিজ সম্পদ রপ্তানি প্রসঙ্গে ১. প্রশ্ন : আগামী ৫০ বছরের জন্য খনিজ সামগ্রী রফতানি নিষিদ্ধ করতে সংসদে বিল উত্থাপন করা হয়েছে। আপনি কি এটা সমর্থন করেন? উত্তর : হ্যাঁÑ ৬৮.৮৮%, নাÑ৩১.৩৮% (যুগান্তর, ২১-০২-২০১০)
১. ‘নাম বদল’ করাটা আমাদের রাজনীতিবিদদের পুরনো অভ্যেস। ব্রিটিশ থেকে পাকিস্তান, সেখান থেকে ‘বাংলাদেশ’ পুরো এক শতাব্দীর রাজনীতিতে আমরা নাম বদলেই মেতেছি। হিন্দু থেকে মুসলমান হওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা চলেছে ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগের পর। রাষ্ট্রযন্ত্রের সেই মুসলমানি ভূত ‘নাম’ বদলে যারপরনাই ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ হবার পর সেই ‘ভূত’ মাথা থেকে নামেনি বরং আঁকড়ে বসেছে। জয় বা পরাজয় দিয়ে আমরা ইতিহাসকে মুছেছি। কোনো সুস্থিরতা, সুবুদ্ধি, সুচিন্তা, সুকর্মের বিবেচনায় নয়, কেবল জয়ের জোশে ইতিহাসের সব পাতায় নাম বদল করেছি, রাষ্ট্রযন্ত্রের কল্যাণে। অন্যের নাক কেটেছি নিজের যাত্রার সুবিধার কথা মাথায় রেখে। বাংলাদেশ জমানায় শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মুশতাক, জিয়াউর রহমান, হু মু এরশাদ, শেখ হাসিনা, বেগম জিয়া থেকে ঘুরে আবার শেখ হাসিনার শাসন জমানায় এসে সেই রোগ বিকৃতির আকার ধারণ করেছে। এতদিন নাম বদলেই চুপচাপ থাকত রাষ্ট্রযন্ত্র। এখন ধমকায়। গত ক’মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চোখে, কথায় ধমকের সুর। নাম বদল শুধু নয়, ‘শিক্ষা’ দিতে চান প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলকে। ক্ষমতার এই মত্ততা বঙ্গবন্ধু, জিয়া, এরশাদ, বেগম জিয়া, তারেক জিয়ার মাথাতেও ভূত চাপিয়েছিল। সেই উন্মত্ততার পরিণাম দেখেছে দেশ। শেখ হাসিনা ওই শিক্ষাকেও বদলে দিতে চান। আবার বিমানবন্দরে জিয়াউর রহমানের নাম বদলে মুসলমানের ঈমান, আকিদার পরীক্ষা করতে চান। হযরত শাহজালাল (র:) এর নাম সংক্ষিপ্ত আকারে বসেছে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম-ফলকে। মুসলমান পয়গম্বরের নামে বিমানবন্দরের নাম করলে বিএনপি ভোটের ভয়ে তা বদলাতে সাহস পাবে না। আওয়ামী লীগের এই কৌশল কাজে লাগলে জিয়ার নাম আর উঠছে না, ওই বিমানবন্দরে। হাসিনার এই রাজনৈতিক খেলায় জনগণ কি ভাবছে? গণতন্ত্রের এই এক দোষ। জনগণের ভাবাভাবি বোঝানোর জন্য অপেক্ষা করতে হবে ‘ভোট’ পর্যন্ত। তবে সচেতন জনগণ পত্রিকা আর প্রযুক্তির কল্যাণে কখনো কখনো ক্ষুব্ধ হয়, মত দেয়, প্রতিবাদ জানায়।
২. ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি তিন দিনে তিন দৈনিক সংবাদপত্র কালের কণ্ঠ, যুগান্তর, প্রথম আলো’র অন লাইন জরিপে অধিকাংশ পাঠকদের অভিমত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নাম বদল করে ঠিক কাজ করেন নাই। ৩৫Ñ৩৮ শতাংশ জরিপের উত্তর দানকারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম বদল এবং প্রতিপক্ষকে শিক্ষা দেবার উদ্যোগকে সমর্থন করলেও ৬১Ñ৬৩ শতাংশ মনে করেন কাজটি ঠিক হয় নাই। পক্ষান্তরে বিএনপি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর এই শিক্ষা কাজে লাগাবে এ মনোভাবের প্রতিও সমর্থন দিয়েছে মানুষ। বোঝা যায় এও ক্ষুব্ধতার বহির্প্রকাশ। ৫২Ñ৫৭ শতাংশ মানুষ মনে করে বিএনপি এর পাল্টা কাজ করলে তা তারা সমর্থন করবেন। ২৩Ñ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলো, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, যুগান্তর চার পত্রিকার অন লাইন জরিপে এই ক্ষুব্ধতা প্রকাশ পেয়েছে। এখন প্রশ্ন বর্তমান সরকার কি এ জনমতকে মূল্য দেবেন? ইতিহাস বলে, ইতিহাস থেকে ক্ষমতাবানরা শিক্ষা নেন না।
৩. পার্বত্য চট্টগ্রামে যে মর্মান্তিক পাহাড়ি বাঙালি সংঘাত ঘটেছে সেটিকে নিয়ে নানা বিতর্ক চলছে। সরকারি দায়িত্বশীল মন্ত্রী একে জঙ্গি মদদের ঘটনা বললেও অনলাইন জনমত জরিপের উত্তরদাতাদের বড় অংশ এর সঙ্গে দ্বিমত করছেন। এই ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের সপক্ষেও মত রেখেছে মতামতকারীরা। সেনা প্রত্যাহার নিয়েও রয়েছে শক্তিশালী ভিন্ন মত। খনিজ সম্পদ রপ্তানি বিষয়ে একটি বিল উঠেছে সংসদে। এ বিষয়ে জরিপে অংশগ্রহণকারী ৬৮ শতাংশ এই বিলের পক্ষে মত রেখেছে।
৪. সরকারের বিভিন্ন কাজের বিষয়ে অনলাইন জনমত যে বার্তা দিচ্ছে তার প্রতি সরকার মনোযোগী হলে সে ক্ষেত্রে সবাই এর সুফল পাবেন। ‘গণতন্ত্র’ শক্তিশালী করতে জনমতকে গুরুত্ব দেবার বিকল্প নেই। এখন দেখা যাক, সরকার কি করে। |