Logo
 বর্ষ ২ সংখ্যা ৪১ ১৩ই ফাল্গুণ, ১৪১৬ ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১০ 
আপনি এখন পুরোনো সংখ্যায় আছেন ! তারিখ : ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১০
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
 
iforning
[আদিবাসী] মণিপুরী ভাষা : আছে ঐতিহ্য নেই স্বীকৃতি  

দেবাশীষ দেবু

রাস্তার মাঝখানেই ব্যানারটা টানানো। ‘কোরিয়ান ভাষা শিখতে চাইলে আজই চলে আসুন।’ পাশেই আরেকটি সাইনবোর্ড। ‘এখানে ফরাসি ভাষা শেখানো হয়।’ রাস্তা পেরোনোর সময় এসব বিজ্ঞাপন দেখিয়ে মণিপুরী তরুণ স্বপন সিনহা বললেনÑ ‘এ দেশে এখন ইংরেজি ছাড়া আরো অনেক বিদেশি ভাষা শেখানো হয়। কিন্তু দেশের ভেতরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষাগুলোতে শিক্ষালাভের কোনো সুযোগ নেই। ...ব্যবহারিক চর্চা না থাকায় মণিপুরী ভাষাটা বোধহয় বাংলাদেশ থেকে হারিয়েই যাবে।’
স্বপনের এই আশঙ্কার সঙ্গে সহমত পোষণ করলেন বাংলাদেশ মণিপুরী সাহিত্য সংসদের সভাপতি কবি এ কে শেরাম। তিনি বলেন, আমাদের তো সাংবিধানিক স্বীকৃতিই নেই। আমাদের যে নিজস্ব ভাষা আছে, ঋদ্ধ সংস্কৃতি আছে তা বাংলাদেশের সংবিধান স্বীকার করেনি। সংবিধানের মতে, আমরা উপজাতি। এ ছাড়া অর্থনৈতিক উপযোগিতা না থাকায় মণিপুরী তরুণ প্রজন্ম এখন এই ভাষাটা শিখতেও আগ্রহী নয়।
তিনি বলেন, মায়ানমারে ২ থেকে ৩ লাখ মণিপুরী আছে। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের অসহযোগিতার কারণে বার্মাতে মণিপুরী ভাষাভাষি নেই বললেই চলে। বাংলাদেশে সে তুলনায় কম মণিপুরীর বাস। ফলে এই দেশ থেকেও মণিপুরী ভাষা বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্র“য়ারিকে ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণাকালে উল্লেখ করা হয়Ñ সকল ভাষাকে পৃষ্ঠপোষকতা, সংরক্ষণ ও সমানাধিকার প্রদানই এই দিবসের উদ্দেশ্য। একুশে ফেব্র“য়ারির বিশ্বস্বীকৃতি তো বস্তুত এই চেতনারই বৈশ্বিক রূপায়ণ। বাংলাদেশের সংবিধানেও উল্লেখ করা হয় ‘সকল শিশুকে তার মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রদান করা হবে।’ অথচ এই সংবিধানেই বাঙালি ছাড়া আর কোনো জাতির অস্তিত্বকে স্বীকার করা হয়নি। বাংলা ছাড়া আর কোনো ভাষাকে স্বীকার করা হয়নি। দেশে অবস্থানরত অন্যান্য জাতিসত্তাকে আখ্যা দেয়া হয় ‘উপজাতি’ হিসেবে।
রাষ্ট্রীয় এই অবজ্ঞার প্রতিবাদ শুরু থেকেই করে আসছে বাংলাদেশে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলো। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৪৫টি জাতিসত্তা রয়েছে। এদের অনেকের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, লিপি, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য। রাষ্ট্রব্যবস্থাপনার গলদের ফলে শিল্প সম্ভাবনাময় সংস্কৃতিবান অনেক জাতিকেও মাথা গুনে গুনে উপজাতি হিসেবে পরিহাস করা হয়েছে। 
এমন ক্ষোভ সব মণিপুরীরই। আরেকটু বড় ক্যাম্পাসে বললে দেশের সব আদিবাসীরই। তবে এই প্রতিবেদনে মণিপুরীদের ওপরই স্পটলাইট ফেলা হয়েছে। বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলেই মণিপুরীদের বসবাস। মণিপুরীদের মধ্যে রয়েছে বিভাজন। মৈতৈ ও বিষ্ণুপ্রিয়া। সাংস্কৃতিক অনেক সামঞ্জস্য থাকলেও এদের ভাষা কিন্তু আলাদা। মৈতৈরাই নিজেদের মূল মণিপুরী দাবি করে থাকেন। নৃতাত্ত্বিক উৎসের বিচারে মঙ্গোলীয় মহাজাতির অন্তর্গত বলে সাধারণভাবে পরিচিত মণিপুরী জাতির ভাষাও ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, মঙ্গোলীয় মহাপরিবারের তিব্বত-ব্রাহ্ম শাখার কুকি চীন গোষ্ঠীর অন্তর্গত। পণ্ডিতরাজ অতোম্বাপু শর্মা’র মতে, ‘মণিপুরী ভাষার বয়স অন্যূন সাড়ে তিন হাজার বছর। প্রাচীনের দিক থেকে মণিপুরী সাহিত্যের স্থান ভারতের প্রাচীনতম সাহিত্য কৃষ্ণ যজুর্বেদের পরেই।’
মণিপুরীদের রয়েছে নিজস্ব লিপি। খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে মণিপুররাজ পাখংবা এই লিপির উদ্ভাবন করেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ মেলে। তখন এর সংখ্যা ছিল ১৮। পরবর্তীতে শপ্তদশ শতাব্দীতে মহারাজ খাগেম্বা উচ্চারণকে অধিকতর প্রমিত করার লক্ষ্যে গুরু উচ্চারণের আরো ৭টি বর্ণ সংযোজন করেন। এ ছাড়া রয়েছে ৮টি হসন্ত বর্ণ এবং ৮টি অক্ষর বা কার চিহ্ন।
মণিপুরী লিপির অনুপম বৈশিষ্ট্য হচ্ছেÑ এর প্রতিটি বর্ণমালার নামকরণ করা হয়েছে দেহের এক একটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গের নামে। যেমনÑ বাংলা ‘ক’-এর মণিপুরী প্রবির্ণের নাম ‘কোক’Ñ যার বাংলা অর্থ মাথা। বাংলা ‘স’-এর মণিপুরী প্রতিবর্ণ ‘সম’Ñ যার বাংলা অর্থ চুল। ম-এর প্রতিবর্ণ ‘মিৎ’Ñ যার বাংলা প্রতিশব্দ চোখ। সব বর্ণই এ রকম। দেহের নানা অঙ্গের নামে।
ভাষার মতো মণিপুরী সাহিত্যের রয়েছে সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। ৩৩ খ্রিস্টাব্দে ‘ঔগী হংগেল’ নামের মণিপুরী ভাষার একটি গীতিকবিতার সন্ধান পাওয়া যায়। মণিপুরীরা যার রচনারীতি, আঙ্গিক বৈশিষ্ট্য এবং প্রায়োগিক দিক বিবেচনায় বৈদিক স্তোত্রের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। আর সংস্কৃতি? সে কী আর বলতে! স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও ছিলেন যার গুণমুগ্ধ। শান্তি নিকেতনেও চালু করেছিলেন মণিপুরী নৃত্য। ১৯৯২ সালে ভারতের সংবিধানেও মণিপুরী ভাষাকে ভারতের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
নিভু নিভু প্রদীপটা তবু জ্বালিয়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। ১৯৭৫ সালে গঠন করা হয় কেন্দ্রীয় মণিপুরী সাহিত্য সংসদ। এই সংসদ থেকে এখন প্রতিবছর মণিপুরী শিশুদের মধ্যে ভাষা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। মণিপুরী ভাষায় রচনা প্রতিযোগিতা করা হয়। এতে শিশুদের পুরস্কার দিয়ে মাতৃভাষার প্রতি উৎসাহিত করা হয়। বর্ণাঢ্য কলেবরে প্রতিবছর করা হয় মণিপুরী সাহিত্যের ওপর আন্তর্জাতিক কনফারেন্স। মাতৃভাষায় ছোট কাগজ, বইও বের করেন কেউ কেউ। নিজেরা উদ্যোগী হয়ে একটা প্রি প্রাইমারি স্কুল করারও চেষ্টা চালাচ্ছেন। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচারণের বিরুদ্ধে মায়ের ভাষাকে টিকিয়ে রাখার কী প্রাণান্তকর চেষ্টা! তবু শিশুরা মায়ের ভাষাটা শিখুক। এই দেশে টিকে থাক মাতৃভাষাটা।
মণিপুরী ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে অন্তত প্রাথমিক পর্যন্ত এই ভাষায় শিক্ষা লাভের সুযোগ ও মণিপুরী সংস্কৃতি চর্চার জন্য সরকারি উদ্যোগে কিছু কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ জানান সংস্কৃতিকর্মী স্বপন সিনহা।
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উদাহরণ দিয়ে এ কে শেরাম বলেন, ত্রিপুরায় ২১ ফেব্র“য়ারি আয়োজন করা হয় ‘ভাষা দিবস’ নামে অনুষ্ঠানমালার। ত্রিপুরার রাজ্য ভাষা বাংলা। কিন্তু তার পরও ভাষা দিবসের সকল অনুষ্ঠানে সম্পৃক্ত করা হয় রাজ্যের সকল ভাষাভাষি জনগোষ্ঠীকে। সরকারি অনুষ্ঠানমালায় ও প্রকাশনায় সকল ভাষাভাষি জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সাহিত্য স্থান পায়। তিনি বাংলাদেশেও এমন উদ্যোগের দাবি জানান।

Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
নিয়মিত বিভাগ
  • [সম্পাদকীয়] দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য বাড়ছে
  • আগামী ৭ দিনের ঢাকার আবহাওয়া
  • [ডাকবন্ধু] মাতৃভূমি এবং মাতৃভাষা
  • নেত্রকোনা : ৪র্থ পর্ব - রাজনীতি, ইতিহাস, প্রতœতত্ত্ব...
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :
    বর্তমান সংথ্যা
    পুরানো সংথ্যা
    Click to see Archive
     
     
     
    Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive