|
সা’দাত সোবহান, কো-চেয়ারম্যান, বসুন্ধরা গ্রুপ
দেশের আবাসন খাতের নানা দিক নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন দেশের বৃহত্তম শিল্পগোষ্ঠীর আবাসন খাতের পথিকৃৎ বসুন্ধরা গ্রুপের কো-চেয়ারম্যান সা’দাত সোবহান
বসুন্ধরা গ্রুপের কো-চেয়ারম্যান সা’দাত সোবহান বলেছেন, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে আবাসন খাতে বিনিয়োগই সর্বোৎকৃষ্ট এবং সবচেয়ে নিরাপদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ৫৫ হাজার বর্গমাইল এলাকায় বাস করে ১৫ কোটি মানুষ। এর মধ্যে রাজাউক জোনে ৫৯০ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় সোয়া ২ লাখ বাড়িঘরে বাস করছে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ। মহানগরীতে বসবাসকারী শতকরা ৫০ ভাগ মানুষেরই নিজের বাড়ি নেই। ২০১৫ সাল নাগাদ ঢাকা হবে বিশ্বের চতুর্থ জনবহুল নগরী। তখন লোক সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ। এ সময় দেশে ১ কোটি বাসস্থানের চাহিদা সৃষ্টি হবে। প্রতিবছর শুধু ঢাকাতেই ৪ লাখ মানুষ তথা ১ লাখ পরিবারের জন্য নতুন করে বাসস্থানের প্রয়োজন। সা’দাত সোবহান বলেন, রিয়েল এস্টেট দেশের তৃতীয় বৃহত্তম আয়ের খাত। এ খাতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ রয়েছে (লিংকেজ শিল্পসহ) প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা। বেসরকারি এ খাত থেকে বছরে সরকারের রাজস্ব আয় হয় প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা। তবে অনেক সম্ভাবনাময় আবাসন শিল্প আজ নানা সমস্যায় জর্জরিত হচ্ছে। এতে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলো আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। একদিকে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সরাসরি ভূমি উন্নয়ন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত থেকে আইন সুবিধা নিচ্ছে, অন্যদিকে বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোতে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ ও আইনানুগ আচরণ করা হচ্ছে না। আইন প্রয়োগে রাজউকের দ্বৈতনীতি পরিহার করা হলে আবাসন খাতের সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। রিয়েল এস্টেট খাতের উন্নয়নে এ মুহূর্তে করণীয় কি জানতে চাইলে সা’দাত বলেন, আবাসন শিল্পের উন্নয়নের সঙ্গে দেশের শতাধিক উপশিল্প তথা সহায়ক শিল্পের (ইট, কাঠ, বালু, রড, সিমেন্ট, টাইলস, স্যানিটারি, ফিটিং, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, থাই গ্লাস ইত্যাদি) অস্তিত্ব জড়িত। আর সহায়ক এসব শিল্প থেকেই সরকার বছরে আরো আড়াই হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় করছে। তিনি বলেন মানুষের আবাসন চাহিদা এবং এ শিল্পের বিকাশে সরকারি এবং বেসরকারি উভয় খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নগরবাসীর আবাসন সঙ্কট নিরসনের সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগ প্রশংসনীয় বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন এ খাতকে আরো কার্যকর ও সেবাধর্মী করতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাসমূহের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সুসম্পর্ক প্রয়োজন। তাঁর মতে, প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের দীর্ঘসূত্রতা ও নানা হয়রানির ফলে আবাসন প্রকল্প শুরু করতে যেমন দীর্ঘ সময় লাগছে, তেমনি প্রকল্প বাস্তবায়ন খরচও কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে। ফলে পর্যাপ্ত ফ্ল্যাট নির্মাণ না হওয়ায় বছরে অন্তত ৪ লাখ মানুষ নতুন করে বাসস্থান সঙ্কটে পড়ছে। সা’দাত সোবহান আরো বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে, বর্তমানে এ শিল্পে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান এবং পরোক্ষভাবে ১ কোটি ২৫ লাখ মানুষের জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে। এ বেসরকারি উদ্যোক্তারা যথাযথভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারলে তবেই ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে শ্রমিক, কুলিÑমজুর, কাঠমিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রি, ইন্টেরিয়র ডিজাইনার, পেইন্টারসহ নির্মাণ পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সোয়া কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা বজায় থাকবে। তিনি আরো বলেন, ঢাকা মহানগরে বর্তমানে অবকাঠামোগত উন্নয়নে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অবদান ৮০ শতাংশের বেশি। ১৯৫৩ সালে ডিআইটি (ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট) প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ৫৫ বছরে রাজউক ২০ হাজারের বেশি প্লট বরাদ্দ দিতে পারেনি। অথচ গত দু’দশকে বেসরকারি হাউজিং ও রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো লক্ষাধিক প্লট হস্তান্তর করেছে। আগামী তিন বছরের মধ্যে আরো প্রায় ৫০ হাজার প্লট হস্তান্তরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অথচ বেসরকারি উদ্যোক্তাদের প্রতিপক্ষ মনে করে পাঁচ বছর ধরে প্রকল্প অনুমোদন বন্ধ রেখেছে রাজউক। এ ছাড়া ১১টি প্রতিষ্ঠান থেকে ছাড়পত্র সংগ্রহ করতে ঘাটে ঘাটে মোটা অঙ্কের উৎকোচ দিতে এ চরম হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। এতে শুরুতেই (আবেদন করতেই) সময় লাগছে এক থেকে দেড় বছর পর্যন্ত। মানুষের অন্যতম একটি মৌলিক চাহিদা পূরণের এই মাধ্যম আবাসন খাতের উন্নয়নে এসব জটিলতা দূর করতে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে, আন্তরিক হতে হবে বলে তিনি মনে করেন। বসুন্ধরা গ্রুপের কো-চেয়ারম্যান সা’দাত সোবহান আরো বলেন, আবাসন খাতের বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে এবং আইনের মারপ্যাঁচে না ফেলে সউদ্যোক্তাদের মতো টিআই এ্যাক্টের আওতায় নিয়ে হলেও প্রাইভেট সেক্টরের প্রকল্প ও নকশা অনুমোদনের মাধ্যমে বাড়ি নির্মাণের সুযোগ দেয়া উচিত। জিডিপিতে আবাসন খাতের অবদান বাড়াতে বিভিন্ন করণীয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জিডিপিতে আবাসন খাতের অবদান বছরে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার ঊর্ধ্বে যা দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৯ শতাংশ। লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রিজসহ সব মিলিয়ে জিডিপিতে এ খাতের অবদান অন্তত ১২ শতাংশ (৩৩ হাজার কোটি টাকা)। আবাসন শিল্পের উন্নয়নের কারণে সৃষ্ট দেশের আরো শতাধিক উপশিল্প তথ্য সহায়ক শিল্পের অস্তিত্ব নির্ভরশীল। আর এসব খাত থেকেই বছরে আরো আড়াই হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় করছে সরকার। এ ছাড়া আবাসন খাতে বৈদেশিক বিনিয়োগও ক্রমেই বাড়ছে। বিদেশি রেমিটেন্সের ৪০ শতাংশই বিনিয়োগ হচ্ছে আবাসন চাহিদা পূরণে। এ ছাড়া বিপুল পরিমাণ রাজস্ব দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। গৃহায়ন ও নির্মাণ শিল্পের বিনিয়োগকৃত প্রতি ১ টাকা জিডিপিতে ৭৮ পয়সা করে যোগ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সা’দাত সোবহান আরো বলেন, আবাসন খাতের সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে জিডিপিতে এর অবদান আরো বাড়বে। ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা আয়, দক্ষ জনসম্পদ তৈরি ও সর্বোপরি মানুষের আবাসন চাহিদা পূরণে এ শিল্প মাধ্যমটি আরো সহায়ক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। এমনকি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সহযোগিতার ভিত্তিতে আইনের বাস্তবসম্মত প্রয়োগের মাধ্যমে আবাসন শিল্প দ্রুত পাল্টে দিতে পারে ঢাকা মেগাসিটির বর্তমান রূপ। বসুন্ধরা গ্রুপের কো-চেয়ারম্যান আশা করেন, ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত জনবসতি গড়ে ওঠা ৪০০ বছরের প্রাচীন ঢাকা মহানগরীকে মানবিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে এবং দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আবাসন সমস্যার সমাধানে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোক্তারা সচেষ্ট হবেন এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। প্রসঙ্গক্রমে, বসুন্ধরা গ্রুপের কো-চেয়ারম্যান সা’দাত সোবহান বলেন, বিগত দিনে দেশে জরুরি আইন জারি থাকা অবস্থায় তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা কোনো বিধি বিধানের তোয়াক্কা না করে সম্পূর্ণ একতরফাভাবে দুই বছর মেয়াদের মধ্যে শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে কোম্পানিসমূহের অনুমোদন বাতিল বলে গণ্য হবে মর্মে এক নির্দেশ জারি করেন। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তিনি আরো বলেন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে আবেদনের মাধ্যমে গত বছরের শুরুতেই কয়েকটি কোম্পানি পুনরায় তাদের অনুমোদন বহাল রেখে ও সময়সীমা বাড়াতে এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছেন, যা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দফতরে প্রক্রিয়াধীন আছে। তিনি বলেন, উক্ত প্রকল্পসমূহের প্লটের মধ্যে কমÑবেশি শতকরা নব্বই ভাগ প্লট ইতোমধ্যেই সমাজের বিভিন্ন স্তরের জনগণ ও প্রবাসী বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারীদের মধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। কিন্তু তারা কেউ প্রকল্পের অনুমোদন পাচ্ছেন না। ফলে জনগণের দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে। বিদ্যমান এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি প্রবাসীদের বিনিয়োগকে নিশ্চয়তা দিতে ও সমাজের অস্থিরতারোধে, গৃহায়ন ও পূর্ত মন্ত্রণালয় কর্তৃক পূর্বের বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে বাস্তবতার নিরিখে জরুরিভাবে প্রকল্পগুলোর অনুমোদন ও বিধি মোতাবেক সময় দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী এ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান খানসহ সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন। |