|
১০ বছর পর আবারো হাত দেয়া হলো নির্বাচকদের নির্বাচনে। তবে এবার লাঠিও ভাঙেনি সাপও মরেনি। সদ্য ইনজুরি থেকে ফেরা মাশরাফিসহ ঘোষিত হয়েছে মাত্র ১৩ সদস্যের স্কোয়াড। বিশ্রামের পর্দায় বাদ দেয়া হয়েছে আশরাফুকে। আর রকিবুলকে নির্বাচকরা নির্বাচিত করলেও বোর্ড সভাপতি কামালের হস্তক্ষেপে বাদ পড়েছেন তিনি। চলতি ইংল্যান্ড সিরিজকে ঘিরে দর্শকের প্রত্যাশা, খেলোয়াড়দের সামর্থ্য এবং বাস্তবতা নিয়ে মেরাজ মেভিজের এবারের ক্রিকেট প্রতিবেদন
ঘোষিত হলো ১৩ সদস্যের স্কোয়াড। বাদ পড়লেন আশরাফুল এবং দলে যোগ দিলেন মাশরাফি। সম্ভবত এই দুটি বড় সংবাদের কারণেই স্কোয়াড ঘোষণার দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন ক্রিকেট ভক্তরা। বড় বড় দলগুলোর বিপক্ষে এই দু’জনেরই অনেক কীর্তি। একজন ব্যাট হাতে এনে দিয়েছেন স্কোর আর অন্যজন বল হাতে পদে পদে বাধাগ্রস্ত করেছেন বিপক্ষ দলীয়দের। আশরাফুল-মাশরাফি জুটি তাই বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম বড় বিজ্ঞাপন। কিন্তু মাশরাফির ইনজুরি তাকে ছেঁটে ফেলেছিল দল থেকে। অনেক দিন পর দলে ফিরে দেখতে হলো প্রিয় বন্ধুর চলে যাওয়া। ক্রিকেট ভক্তদের তাই অপেক্ষা করা ছাড়া কিছুই করার নেই। সঙ্গে সঙ্গে প্রার্থনা করতে পারেন মাঠে আবারো মাশরাফুল (আশরাফুল ও মাশরাফি) জুটিকে দেখতে পাবার জন্য।
মাশরাফির ফেরা অনেক দিন পর দলে ফিরে কেমন লাগছে? কি মনে হয় ইনজুরির অবস্থা কি? আপনি এলেন কিন্তু আশরাফুলকে দলে পেলেন না? সিরিজকে ঘিরে প্রত্যাশা কি? মাশরাফিকে এ প্রশ্নগুলো করেছিলেন এই প্রতিবেদক। প্রশ্নগুলোর উত্তর এক ছত্রে তুলে ধরা হলো সাপ্তাহিক-এর পাঠকদের জন্য। “দলের সঙ্গে থাকা সব সময়ই আনন্দের। ইনজুরি সমস্যা প্রায় কেটে গেছে। ল্যান্ডিংয়ের সময় যে সমস্যাটা ছিল তা আর নেই। অস্ট্রেলিয়া থেকে ফেরার পর মনোবলও ফিরে পেয়েছি। খারাপ লাগছে আশরাফুলের কথা ভেবে। তবে ধারাবাহিকভাবে খারাপ নৈপুণ্যের জন্য তিনি নিজেই এ সিরিজ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তিনি এমন একজন খেলোয়াড়, যার বিকল্প এখনো বাংলাদেশ দলে তৈরি হয়নি। মাত্রই ফিরলাম, আশা করছি ভালোভাবেই সিরিজ শেষ করতে পারব। দলীয়ভাবে অন্তত একটি এক দিনের ম্যাচ জিততে চাই। মাশরাফির দলে ফেরাটা যেমন আনন্দের ঠিক তেমনি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে নির্বাচকরা কেন আশরাফুলের বিকল্প নেইÑ বলেও তাকে বিশ্রামে পাঠালেন?
দল নির্বাচন, কিছু প্রশ্ন? নিশ্চয়ই ভুলে যাননি বোর্ড সভাপতি এবং অধিনায়কের সেই বাকযুদ্ধের কথা। সাপ্তাহিক-এ আমরা বিস্তারিত জানিয়েছিলাম সেই ঘটনা। যেখানে দাম্ভিক বোর্ড সভাপতির কাছে মাথা নোয়াতে হয়েছিল সাকিব আল হাসানকে। সেই ঘটনা নিয়ে গঠিত হয়নি কোনো তদন্ত কমিটি। সর্বশক্তিমান অনির্বাচিত বোর্ড সভাপতিকে তার ভুল আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার মতো লোকের যে খুব অভাব। বোর্ড সভাপতি মোস্তফা কামাল তার ক্ষমতার কামান দেখালেন আবারো। এবার কোনো বাকবিত-া নয়, সরাসরি বাদ। নিজেই ক্ষমতার কাচি চালিয়ে দিলেন নির্বাচকম-লীর নির্বাচনে। কিছুদিন আগে বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল এবার ঘোষিত হবে ১৪ সদস্যের দল। আশরাফুলকে নিয়ে অন্যরকম করে ভাবতেও বলে দিয়েছিলেন এই সভাপতি। তিন ঘণ্টার সেই মিটিং শেষে নির্বাচকদের তাই এক একটি চুপসানো ফুটবলের মতোই মনে হচ্ছিল। একটু কষ্ট করে হলেও তারাও ভেবে নিয়েছিলেন ওর এখন ফর্ম নেই। তাই দল নির্বাচনের সময় মাথায়ই রাখা হয়নি আশরাফুলকে। এখন প্রশ্ন হলো নির্বাচক কমিটি কীভাবে দল গড়বে তা যদি অন্যরা ঠিক করে দেন তাহলে আলাদা করে এই কমিটি করে লাভ কি?
সভাপতির রকিবুল নাটক দল নির্বাচনের আগে মোটামুটি ধরেই নেয়া হয়েছিল রকিবুল এবার থাকছেন না। নিয়মিতভাবে কাজে নৈপুণ্যের খেসারত নিশ্চয়ই তাকে দিতে হবে। কিন্তু নির্বাচকরা জানালেন যে ১৪ সদস্যের যে দল ঘোষণা করতে যাচ্ছিলেন সেখানে ঠাঁই হয়েছিল রকিবুলের। রকিবুলকে নির্বাচকরা মনে করেছিলেন আপাতত মন্দের ভালোরূপে। কিন্তু আমাদের প্রবল ক্ষমতাধর বোর্ড সভাপতি এবং ক্রিকেট বিজ্ঞ মোস্তফা কামালের মনে হলো রকিবুলকে দলে রাখা যাবে না। নির্বাচকদের স্কোয়াডে কাচি চালিয়ে তাকে করে দিলেন ১৩ সদস্যের দল। দীর্ঘ ১০ বছর পর আবারো বাধাগ্রস্ত করা হলো দল নির্বাচনে নির্বাচকদের। বাংলাদেশের প্রথম টেস্টে হাবিবুল বাশারকে রাখা না রাখা নিয়ে শেষবারের মতো নির্বাচকদের দেখতে হয়েছিল এমন এক প্রহসন। রকিবুলকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ১৪ সদস্যের দলে থেকেও বাদ পড়তে হলো কাকে দোষ দেবেন? রক্ষণাত্মক ব্যাটিং করা রকিবুল ডিফেন্সিভ সুরে বললেন, ‘বোর্ড যা ভালো বুঝেছে তাই করেছে। বেশ কিছুদিন আমি সফলতা পাচ্ছি না। পারফর্ম করেই দলে ফিরতে চাই। বিধি নিষেধের যে দেয়াল জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের চারপাশে তাতে এভাবে না বলে উপায়ই বা কি? কিংবা হয়ত ভেসে উঠেছিল সভাপতির হাতে অধিনায়কের সেই লাঞ্ছনার স্মৃতি।
সভাপতির দর্শন খেলোয়াড়দের ফর্ম কখন থাকবে আর কখন পড়বে তা উপরওয়ালার লীলা বোঝার মতোই কষ্টকর। নির্বাচকরা খেলোয়াড়, তারা এ সত্য জানেন তাই তারা আশরাফুল এবং রকিবুল দু’জনকেই দলে রাখতে চেয়েছিলেন এবং সেটা কোনো সমস্যাও ছিল না। গত সিরিজেই ঘোষিত হয়েছিল ১৫ সদস্যের স্কোয়াড। দুর্দান্ত সংগঠক কামাল ভাবলেন ওদের অনেক সুযোগ দেয়া হয়েছে এবার বাদ দেয়া হোক। এ যেন তার আবাহনী। যেখানে সব কিছু তার মর্জির ওপর নির্ভরশীল কামালের সমস্যা বোধ হয় এখানেই যে তিনি এখনো আবাহনীর গ-ি থেকে বের হতে পারেননি। তা না হলে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে হঠাৎ রেগে যাওয়া। দল নির্বাচনের শুরুতে নির্দেশ দিয়ে দেয়া এবং পূর্ণ স্কোয়াড নির্বাচনের পরও কেন সেখানে কলম চালাতে যাবেন একজন বোর্ড সভাপতি? এ সম্পর্কে অনেক চেষ্টা করেও কামালকে ফোনে ধরা যায়নি।
সিরিজ থেকে প্রত্যাশা নিউজিল্যান্ড সিরিজে খারাপ করার পর দেশের মাটিতে তাই বাংলাদেশ দলের ওপর দর্শকের অনেক প্রত্যাশা এবং দল অবশ্যই কিছুটা চাপে থাকবে। অধিনায়ক জানালেন অন্তত একটি ওয়ান ডে জিততে চান তিনি। সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারলে দুটি ম্যাচও জেতা সম্ভব। ইংল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের রেকর্ড কিন্তু তা বলে না। এখন পর্যন্ত একটি ম্যাচও যে জেতা যায়নি একমাত্র এ ক্রিকেট পরাশক্তির বিরুদ্ধে। তবে চেনা পরিবেশ, অনভিজ্ঞ ইংল্যান্ড দল এবং ভালো করার জন্য উৎসুক হয়ে থাকা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জিততে হলে ইংল্যান্ড দলকে এবার ঘাম ঝরিয়েই জিততে হবে। বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটারদের ইদানীং মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরেই বেশি পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। তার পরও ওদের ঘিরে আমাদের যে অনেক প্রত্যাশা। |