 |
চট্টগ্রামের সীতাকু-ের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড এখন মৃত্যুপুরীর আর এক নাম। শুধু গত বিশ বছরে ৪০০ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে তারও কয়েক গুণ ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল এ্যাকশন (ইপসা)- এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু স্থানীয়দের মতে মৃতের সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই এই সংখ্যার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হবে সন্দেহ নেই। এই প্রতিবেদনের জন্য তথ্য সংগ্রহ করার সময়ও মারা যায় আরো আটজন। আর মারাত্মক আহত হয় ৫০ জন। শিশু শ্রমিক ব্যবহার। আর পরিবেশ দূষণের ব্যাপার তো আছেই। সীতাকু-ের ভাটিয়ারীর এলাকায় এখন শিশুদের বৃদ্ধি ঘটছে না বলে জানিয়েছে চিকিৎসকরা। এর ওপর নতুন করে শুরু হয়েছে ভূমিদস্যুতা। সম্প্রতি স্থানীয় সাংসদপুত্রদের ইয়ার্ড দখল, সাংবাদিকদের মারধর এবং উপকূলীয় বনভূমি ধ্বংস করে ইয়ার্ড দখলের কারণে আবার সামনে এসেছে এই সম্ভাবনাময় শিপ ব্রেকিং শিল্প। যা আমাদের দেশের রি-রোলিং কারখানার প্রধান কাঁচামাল সরবরাহকারী। যেখান থেকে সরকার ৯০০ কোটি টাকা রাজস্ব পায়। এদিকে প্রতিদিন শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে শ্রমিক মৃত্যুর প্রতিবাদে ফুঁসলে উঠেছে চট্টগ্রামের শ্রমিক সংগঠনগুলো। করছে বিক্ষোভ সমাবেশ, মিছিল-মিটিং। জানিয়ে দিয়েছে তাদের ডেট লাইন। খুব শিগগিরই এই অবস্থার পরিবর্তন না হলে বড় ধরনের আন্দোলনে যাবে এই শ্রমিকরা। তাই চট্টগ্রামের সব শ্রমিক সংগঠন মিলে তৈরি করেছে চট্টগ্রাম শিপ ব্রেকিং শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরাম। কিন্তু মালিকরা তার পরেও খেয়াল খুশিমতো জাহাজ ভাঙছে। আসলেই কি হচ্ছে চট্টগ্রামের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে? এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন আল-মামুন খান
আজকের এই শ্রমিক মরণ ফাঁদ ইয়ার্ডের যাত্রা শুরু হয়েছিল সেই ষাটের দশকে। ষাটের দশকের গোড়ার দিকে এক সামুদ্রিক ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে অতি দূর সমুদ্রে নাবিকরা পথের দিশা হারিয়ে ফেলেছিল। সেই গ্রিক নাবিকের জাহাজটি ভিড়েছিল ফৌজদারহাট সমুদ্র সৈকতে। তবে জাহাজটি আর সমুদ্রে ভাসানো সম্ভব হয়নি, দীর্ঘদিন কাত হয়েছিল সমুদ্র সৈকতে। ১৯৬৪ সালে স্ক্র্যাপ হিসেবে ভাঙ্গার দায়িত্ব নিয়েছিল স্টিল হাউসের স্বত্বাধিকারী শফি, হাতেম, জুনু এবং সুজা। এর মাধ্যমে শুরু হলেও আরো পরে অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের পর বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত পাকিস্তানি জাহাজ আল-আব্বাস ভাঙ্গার মধ্য দিয়ে এখানে মূলত জাহাজ ভাঙ্গা শুরু হয়। এখন সীতাকু-ের ভাটিয়ারী, মাদাম বিবিরহাট, চেয়ারম্যানঘাটা, লালবাগ, কদমরসুল, ফুলতলা, বারআউলিয়া, ছোট এবং বড় কুমিরাতে প্রায় এক শত শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড গড়ে উঠেছে। আর এর পরিমাণ দিন দিন বাড়ছেই।
মৃত্যুপুরী শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ২৬ ডিসেম্বর ২০০৯ মাদাম বিবিরহাটের রহিম স্টিল নামের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে ‘এমটি এ-গেইট’ নামের জাহাজে দুর্ঘটনায় মারা যায় চারজন। নিহতরা হলেনÑ ঝালকাঠি জেলার কাঁঠালিয়ার মোহাম্মদ সেলিম, বগুড়ার ধুনটের রানা বাবু, নওগাঁর রবিউল এবং অন্য জনের পরিচয় জানা যায়নি। গত ১৩ অক্টোবর সকালে সাগর উপকূলের পাকিজা শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের জাহাজের ট্যাংকে নামে সীতাকু-ের সোনাইছড়ি গামারীতল এলাকার কবির উদ্দিন সওদাগারের ছেলে সাহাব উদ্দিন (৩৮), একই এলাকার মামুন (২৪) ও কিশোরগঞ্জের নাছির। নামার সঙ্গে সঙ্গেই বিষাক্ত গ্যাসে নিস্তেজ হয়ে যায় তিনজনই। কিন্তু ঘটনাস্থলেই মৃত্যু ঘটে সাহাব উদ্দিনের। আর বাকি দু’জন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে নেয়ার পর মৃত্যু ঘটে। এ ব্যাপারে সীতাকু- থানায় একটি মামলা হয়। মামলা নং-২/১৩-১০-০৯। পাকিজা শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের শ্রমিকদের অভিযোগ, শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে বিচিং করার আগে প্রতিটি জাহাজের গ্যাস ফ্রি করা বাধ্যতামূলক থাকলেও এটিতে তা করা হয়নি। শ্রমিকরা আরো অভিযোগ করেন, যদি মামুন এবং নাছিরের তাড়াতাড়ি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেত তাহলে এদেরকে বাঁচানো যেত। এ ব্যাপারে পাকিজা শিপ ইয়ার্ডের মালিক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মন্তব্য করতে রাজি হননি। এই দুর্ঘটনার পরদিনই অর্থাৎ গত ১৪ অক্টোবর ঘটে আরো একটা দুর্ঘটনা। এ দিনও সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই রংপুরের বদরগঞ্জের আবদুল আজিজের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম (২৫) মাদাম বিবিরহাটে অবস্থিত হাবিব স্টিল নামের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে কাজ শুরু করে। কাজ শুরু করতে না করতেই ওপর থেকে তার ওপর লোহার প্লেট পড়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু ঘটে জাহাঙ্গীর আলমের। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইপসার গবেষণায় দেখা গেছে শুধু ১৯৯৫ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত দুর্ঘটনায় গত পনেরো বছরে ৪০০-এর ওপরে শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু সীতাকু- তথা শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড এলাকার বাসিন্দা এবং স্থানীয় সাংবাদিক এম সেকান্দর হোসাইন, গিয়াস কামাল সাগরসহ কয়েকজন সাংবাদিক জানান এই শ্রমিক নিহতের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। তবে শিপ ইয়ার্ড বাড়লেও আগের তুলনায় একটু কম দুর্ঘটনা ঘটছে। যার অধিকাংশ মৃত্যু দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটেছে। আর বাকিগুলো ঘটেছে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায়। এ বছর মারা গেছে অর্ধশতাধিক। আর গত বছর মারা গেছে আরো ১৫ জন। তবে প্রায় বছর ঘটছে বড় বড় দুর্ঘটনা। যাতে মারা যাচ্ছে একসঙ্গে অর্ধশতাধিক। সর্বশেষ এমনই একটি বড় দুর্ঘটনা ঘটে ২০০০ সালে। টিটি ডেনা ট্যাঙ্কার বিস্ফোরণে মারা যায় অর্ধশতাধিক শ্রমিক। এর ঠিক বছর দুয়েক আগে ’৯৮ তে কবির স্টিলে ঘটে আরো একটি বড় দুর্ঘটনা। সেই দুর্ঘটনাতে মারা যায় ২২ জন শ্রমিক। এ তো হলো নিহতদের কথা। কিন্তু দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করতে হয় প্রতিবছর আরো তিন শ’রও বেশি। প্রবেশ নিষেধ! শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে পূর্বের মতো এখন আর ঢুকতে দেয়া হয় না। শ্রমিক ছাড়া আর বাইরের কেউই ঢুকতে পারবে না। এমনকি যে কোনো প্রকার গবেষণার জন্য ঢোকাও নিষেধ। চেয়ারম্যানঘাটের শফি ইয়ার্ডে ঢোকার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কোনো দিন জাহাজ দেখিনি তাই দেখতে আসছি বলার পরও ১০ মিনিট গেটে বসায়ে রাখে এ প্রতিবেদককে। প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে তোলে। বার বার জিজ্ঞাসা করে সঙ্গে থাকা ব্যাগের ভেতরে কোনো ক্যামেরা আছে কিনা? এর পরে শর্তসাপেক্ষে ঢুকতে দেয়। আবার শর্ত হলো কোনো শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলা যাবে না। কিন্তু ভেতরে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলতেই ইয়ার্ডে মালিকের লোকজন তেড়ে আসে। পরবর্তীতে স্থানীয় এক সাংবাদিকের সহযোগিতায় বেরিয়ে আসে এ প্রতিবেদক। এ অবস্থা শুধু চেয়ারম্যানঘাটের শফি ইয়ার্ডে নয়; প্রতিটি শিপ ইয়ার্ডেই সাংবাদিক এবং এনজিও কর্মীদের ঠেকাতে এমন ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানায় আম্বিয়া স্টিলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক।
মুরগি দিয়ে পরীক্ষা নতুন আনা স্ক্র্যাপ জাহাজে বিষাক্ত গ্যাস কি পরিমাণ আছে তা পরীক্ষা করা হয় মুরগি দিয়ে। একটা মুরগি ট্যাঙ্কারের মধ্যে ছেড়ে দেয়া হয় এবং এর পর দেখা হয় মুরগির অবস্থা কি! যদি মুরগি মারা যায় তবে ধরে নেয়া হয় বিষাক্ত গ্যাস আছে। আর মারা না গেলে তো কথাই নেই। সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিক ঢুকিয়ে দেয়া হয় জাহাজ কাটার জন্য। আবার সব সময় সেটাও করা হয় না। কোনো প্রকার গ্যাস ফ্রি না করেই জোর করে ঢুকিয়ে দেয়া হয় শ্রমিকদের জাহাজ কাটার জন্য। আর তখনই ঘটে দুর্ঘটনা। এমনটাই ঘটেছে গত ১৩ অক্টোবর সকালে সাগর উপকূলের পাকিজা শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের জাহাজের ট্যাঙ্কে। আর তার সঙ্গে সঙ্গেই মারা যায় তিন শ্রমিক। কোনো প্রকার আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় না গ্যাস ফ্রি করতে। মুরগি পরীক্ষা করে যদি গ্যাস আছে বলে মনে করে মালিকের হর্তাকর্তারা সে ক্ষেত্রে জাহাজের নিচের দিক দিয়ে ছিদ্র করে দেয়। যাতে জোয়ারের পানি ঢুকে গ্যাসের পরিমাণ কমে যায়। কিন্তু বিশিষ্ট পরিবেশবিদ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সভাপতি ড. মোঃ মাকসুদুর রহমান জানান, এই ভাবে গ্যাস ফ্রি করা কতটুকু পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সেই বিচার পরে করলেও প্রথমে দেখতে হবে এর দ্বারা আদৌ ভালোভাবে বিষাক্ত গ্যাস মুক্ত হয় কি না?
দালালদের হাতে জিম্মি শ্রমিকরা দালালদের হাতে জিম্মি হয়ে আছে শ্রমিকরা। স্থানীয় ভাষায় যাদেরকে মাঝি বলে ডাকা হয়। আবার কেউ কেউ ফোরম্যান বলে ডাকে। এই ফোরম্যান বলাটা মালিকদের পক্ষ থেকেই বেশি। দালালরাই এই শিপ ব্রেকিংপাড়ায় মহাপ্রভু। তারা যা বলে তাই করতে হয়। এমনকি যা খাওয়ায় তাই খেতে হয়। টাকাটাও আসে এই দালালদের হাত দিয়ে। মালিকরা তাদের হাতে টাকা তুলে দেন শ্রমিক আনার জন্য। সেই টাকা দাদন হিসেবে শ্রমিকদের দেয়ার কথা। আর তার বিনিময়ে তারা পায় মোটা অঙ্কের টাকা। আবার ওই শ্রমিক যতদিন কাজ করবে ততদিন পর্যন্ত প্রতি ঘণ্টা হতে এরা পাবে ৩-৫ টাকা পর্যন্ত। আর তাই তাদের মাস শেষে আসে বড় অঙ্কের টাকা। কথা হয় এমনই এক দালালের সঙ্গে। আজিজ মিয়া নামের এই মাঝি (দালাল) চেয়ারম্যানঘাটের মরিয়ম স্টিলে শ্রমিক দেয়। তার বাড়ি কুড়িগ্রামে। গত সাত বছর ধরে সে এখানে শ্রমিক এনে দিচ্ছে। এতেই তার অবস্থা ফিরে গেছে। এখন সে সাড়ে বারো বিঘা জমির মালিক। আবার চার কক্ষের এক তলা একটা বাড়িও করেছে সে। শুধু তাই নয়, জেলা সদরে জমি কেনার কথা ভাবছে সে। তবে এই পেশা ছেড়ে দেয়ার কথা বলে সে। এর কারণ হিসেবে জানায় আর শ্রমিকদের ঠকাতে ভালো লাগে না তার। উত্তরাঞ্চল থেকেই বেশি শ্রমিক আনে এই দালালরা। খোঁজ নিয়ে জানা যায় প্রত্যেকটি শিপ ইয়ার্ডে মঙ্গাপীড়িত জেলাগুলোর শ্রমিকরাই বেশি। শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে আরো জানা যায়Ñ বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, ময়মনসিংহ, নওগাঁ, চাঁদপুর এবং দিনাজপুরের শ্রমিকই বেশি।
উজাড় হচ্ছে সবুজ বেষ্টনী উপকূলীয় এলাকায় যে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলেছে সাধারণ মানুষ সরকারের বন বিভাগের সহযোগিতায় সেটা কেটে ফেলেছে নতুন শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড মালিকরা। আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর গত ১০ মাসে সীতাকু-ের সোনাছড়ি ও কুমিরা উপকূলে নতুন করে অন্তত ৪০টি নতুন ইয়ার্ড গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ মাসে গড়ে চারটির বেশি নতুন শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড গড়ে উঠেছে উপকূলীয় এলাকার সবুজ বেষ্টনী উজাড় করে। এর মধ্যে গত পনেরো দিনেই ১৬টি নতুন শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড গড়ে উঠেছে। এর আগের ৩০ বছরে নগরের ফৌজদারহাট থেকে বার আউলিয়া পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ছিল মাত্র ৫৬টি। অর্থাৎ বছরে দুটিরও কম। কিন্তু বর্তমানে প্রতিদিন গড়পড়তায় একটির মতো নতুন শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড গড়ে উঠছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী কাটা শুরু হলেও বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে চলে উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী ধ্বংসের প্রতিযোগিতা। প্রায় অর্ধ লাখ ঝাউগাছ কেটে ফেলেছে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড মালিকরা। যার মধ্যে রয়েছে সম্প্রতি দখল করে ছেড়ে দেয়া স্থানীয় সাংসদ এবিএম আবুল কাশেম মাস্টারের দুই ছেলে এস এম আল মামুন এবং এস এম আল নোমানের চারটি শিপ ইয়ার্ড। সীতাকুণ্ড উপকূল রক্ষার জন্য ১৯ বছর ধরে তৈরি করা ৬শ একর দীর্ঘ ভাটিয়ারী, সোনাইছড়ি ও কুমিরায় ম্যানগ্রোভ বনটির মৃত্যু ঘটল মাত্র ৫ মাসে। আর এ সময়ে নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের অভিযোগে সুনির্দিষ্ট অর্ধশতাধিক ব্যক্তিসহ কয়েক হাজার ব্যক্তিকে আসামি করে ১৭টি মামলা হলেও ২ জনকে আটক করা ছাড়া কোনো ভূমিকা রাখেনি পুলিশ। ১৯৯২ সালে সীতাকুণ্ড উপকূলীয় অঞ্চলকে সব রকম প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে সোনাইছড়ি মৌজায় গড়ে তোলা হয় ৬শ একরের ম্যানগ্রোভ বন। সেই থেকে দীর্ঘ ১৯ বছরে বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে এই বনের হাজার হাজার গাছ উপকূল রক্ষার দেয়াল হয়ে গড়ে উঠলেও মাত্র ৫ মাস সময়ে শেষ হয়ে গেছে তার সবটুকুই। সীতাকুণ্ড উপকূলীয় বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সীতাকুণ্ড উপকূলের বৃক্ষ নিধনের ইতিহাস দীর্ঘ দিনের হলেও ১৯৯২ সালে ভাটিয়ারী, সোনাইছড়ি ও কুমিরায় গড়ে তোলা ম্যানগ্রোভ বনটির বৃক্ষ নিধন শুরু হয় চলতি বছরের প্রায় প্রথম থেকে। এ সময় শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড নির্মাণের জন্য নির্বিচারে সরকারি কেওড়া এবং বাইন গাছ উজাড় করে কয়েকটি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ। ওই সময় ঘটনার দু’দিন পর এ বনের গাছ কাটার অভিযোগে প্রথম মামলাটি হয় শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড মালিক মোঃ আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে। এ সময় আলাউদ্দিন ১৬৫টি গাছ কেটে ফেলে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিলে বন বিভাগ ৬০টি উদ্ধার করে। সেই থেকে শুরু হয় বৃক্ষ নিধনযজ্ঞ। বনবিভাগের নথিপত্রে দেখা যায়, গত ৫ মাসে বৃক্ষ নিধনের অভিযোগে বিভিন্ন শিপ ইয়ার্ড মালিক, শিপ কাটিং কন্ট্রাক্টরসহ সুনির্দিষ্ট অর্ধশতাধিক ব্যক্তিসহ অজ্ঞাত পরিচয় কয়েক হাজার ব্যক্তির বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা হলেও পুলিশ দুই চুনোপুঁটি যারা শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড শ্রমিক। তাদের ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার তো দূরের কথা এ বিষয়ে অভিযোগ পর্যন্ত করেনি সীতাকু- থানার পুলিশ। গত ৩ জুলাই সোনাইছড়িতে দু’দিনে সাড়ে ২০ হাজার ও এর ৪ দিন পর ভাটিয়ারিতে ২ হাজার কেওড়া ও বাইন গাছ উজাড়ের ঘটনা ঘটে। সীতাকুণ্ড উপকূলীয় রেঞ্জ কর্মকর্তা জামিল মোহাম্মদ খান সাপ্তাহিককে জানান, ১৯৯১ থেকে তিল তিল করে গড়ে তোলা ৬শ একর দীর্ঘ ম্যানগ্রোভ বনের প্রায় পুরোটাই মাত্র কয়েক মাসে ১৫ দফায় উজাড় হয়ে গেছে । তিনি আরো জানান, বর্তমানে অর্ধলাখ গাছের বাগানে মাত্র ১৫/১৬শ গাছ অবশিষ্ট আছে। আর অবশিষ্ট গাছগুলো যেখানে রয়েছে সে জায়গাটি জাহাজ ভিড়ানোর উপযুক্ত না হওয়ায় এখনো কোনো ইয়ার্ড দখল করেনি বলে বেঁচে আছে। রেঞ্জ কর্মকর্তা আরো বলেন, এই বনটি ছাড়াও তাদের অধীনে রয়েছে আরো বেশ কয়েকটি বন। কিন্তু অস্ত্র এবং যানবাহনবিহীন মাত্র ২৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে এ বিশাল বনভূমি রক্ষা করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে হুমকির মুখে রয়েছে অন্য বাগানগুলোও। অপরদিকে সম্প্রতি কুমিরা এলাকায় যে সব শিপ ইয়ার্ডে গাছ কাটা হয়েছে ঐসব ইয়ার্ডে বুলডোজার দিয়ে মাটি ওলট পালট করে দিয়ে গাছের অস্তিত্ব মুছে পেলেছে শিপ ইয়ার্ড মালিকরা। স্থানীয়রা বলছেন, শিপ ইয়ার্ড হলে এলাকার ও দেশের উন্নয়ন হবে কিন্তু জলোচ্ছ্বাসের নিরাপত্তা বিধান না করে শিপ ইয়ার্ড নির্মাণ করলে জননিরাপত্তা হুমকির মুখে পতিত হবে। সোনাইছড়ির বার আউলিয়ায় ১৯৯২ সালে কবির স্টিল নামে একটি শিপ ইয়ার্ড এলাকায় কয়েক হাজার গাছ কেটে ইয়ার্ড নির্মাণ করে। এ সময় স্থানীয় চেয়ারম্যান মরহুম শাহেন-শাহ্ শাজাহান চৌধুরী বাদী হয়ে ওই ইয়ার্ড মালিক আলহাজ শাহজাহানের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। কিন্তু মামলা করলে কি হবে? উপকূলীয় রেঞ্জ অফিস থেকে যথেষ্ট পরিমাণ তথ্য হাজির করলেও পুলিশ দিয়ে দিচ্ছে। এ পর্যন্ত ১৭টি সীতাকু- থানা থেকে পাঁচটি মামলার ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছে। সে ক্ষেত্রে তারা নথিতে উল্লেখ করছে ‘এসব আসামি বাইরের জেলার মানুষ। এদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এবং স্থানীয় কেউ এর সঙ্গে জড়িত না।’ এমনকি স্থানীয় সাংসদ এ বি এম আবুল কাশেম মাস্টারের ছেলে এস এম আল মামুনসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে সীতাকু- থানায় মামলা করতে না পেরে চট্টগ্রাম চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে মামলা করে গত ১৯/০২/০৯ তারিখে। পুলিশ তদন্ত করে ঐ একই রিপোর্ট দেয়। এ গুলোর বিরুদ্ধেও উপকূলীয় রেঞ্জ অফিস নারাজি দেয়। আবার গত বছর কোরবানির ঈদের দিন সকালে এফএনএফ শিপ রিসাইকিলিংয়ের মালিক আলাউদ্দিনের গু-ারা উপকূলীয় রেঞ্জ প্রহরি শ্রী দুর্গা পদ (৩৬) এবং ইসহাককে (৩২) মারাত্মক আহত করে গাছ কেটে ফেলে। এই মামলাটিও পুলিশ তদন্ত করে ঠিক একই কথা লিখা ফাইনাল রিপোর্ট দেয়। যদিও উপকূলীয় রেঞ্জ অফিসের পক্ষ থেকে সেটির বিরুদ্ধেও নারাজি দিয়েছে। বর্তমানে এফএনএফ শিপ রিসাইকিলিংয়ের মালিক আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা আছে বিচারাধীন। এদিকে এলাকাবাসী এবং উপকূলীয় রেঞ্জ অফিসের একাধিক প্রহরির কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে এই গাছ কাটার নেতৃত্ব দিচ্ছে ভাটিয়ারীর পাকা মসজিদ গ্রামের বাদশা নামের এক প্রাক্তন মেম্বার। পাকা মসজিদ এলাকায় বাদশার কথা জিজ্ঞাসা করতেই অনেকে জানি না আর সমস্যা আছে বলে জানায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাকা মসজিদের কয়েকজন জানায়, এই বাদশা মিয়া গাছ কাটার জন্য কন্ট্রাক্ট নেই। যে কয়টি গাছ মারতে পারবে সে অনুযায়ী সে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড মালিকদের কাছ থেকে টাকা নেবে। বর্তমান তার বিরুদ্ধে চারটি মামলা রয়েছে। কিন্তু বাদশা মেম্বার বুক ফুলিয়ে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে পুলিশের সামনেই। কিন্তু পুলিশ তাকে আটক করছে না। যা এলাকাবাসীর কাছে পুলিশের ভূমিকাকে রহস্যজনক মনে হচ্ছে। সীতাকু- থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম এ বিষয়ে সাপ্তাহিক-কে বলেন আমার কিছুই করার নেই। তাই ৪-৫টি মামলার ফাইনাল প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছি এবং বাকিগুলোও দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন, জমির যারা মালিক তারা যদি নিজেদের গাছ নিজেরা কাটে তাহলে তো আমার কিছুই করার নেই। যেহেতু উপকূলীয় বন অফিস থেকে জমির মালিকানা বিষয়ে কাগজপত্র দেখাতে পারছে না। দুর্ঘটনায় মৃত শ্রমিকদের পাওনা আদায়ে অসযোগিতার কথা বললে তিনি অস্বীকার করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আমাদের ব্যাপক সহযোগিতার কারণেই তারা সঠিক সময়ে ক্ষতিপূরণ পেয়ে থাকে। সীতাকুণ্ড উপকূলীয় রেঞ্জ কর্মকর্তা জামিল মোহাম্মদ খান সাপ্তাহিককে আরো জানান, আমাদের লোকজন নিয়মিত টহল দেয়। কিন্তু স্বল্প এই জনবল দিয়ে বাকি যে হাজারখানেক গাছ আছে তা রক্ষা করার চেষ্টা করছি। তবে বাকি গাছগুলো রক্ষার জন্য পুলিশ প্রশাসন থেকে ব্যাপক সাহায্য এবং উপকূলীয় রেঞ্জের জনবল বৃদ্ধি না করলে বাকি গাছগুলো রক্ষা করা অসম্ভব।
পরিবেশ দূষণ জাহাজ ভাঙ্গার আরেক চরম শিকার পরিবেশ। সীতাকু- এবং এর আশপাশের এলাকায় বাতাসে এখন শুধুই সীসার গন্ধ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস এ্যান্ড ফিশারিজ, ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি এ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের কয়েকটি গবেষণায় শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের ফলে ভয়াবহ দূষণের চিত্র ফুটে উঠেছে। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গবেষণা হলোÑ ওসঢ়ধপঃ ড়ভ ংযরঢ় রহ ঃযব পড়ধংঃধষ বহারৎড়হসবহঃ ড়ভ ইধহমষধফবংয/ চৎবংবহঃ ংঃধঃঁং ড়ভ ংযরঢ় নৎবধশরহম ুবধৎফ ধহফ রঃং বভভবপঃ ড়হ বহারৎড়হসবহঃ/অ পড়সঢ়ধৎধঃরাব ঢ়বহ-ঢ়রপঃঁৎব ড়ভ ঢ়ড়ষষঁঃরড়হ ংঃধঃঁং ড়ভ ঃযব পড়ধংঃধষ নবষঃ ড়ভ ইধহমষধফবংয রিঃয ংঢ়বপরধষ ৎবভবৎবহপব ঃড় ঐধষরংযধৎ ধহফ ংযরঢ় নৎবধশরহম ধৎবধ,ঈযরঃঃধমড়হম. যেখানে জাহাজ ভাঙ্গার কারণে তীব্র দূষণের কথা বলা হয়েছে। যা মানুষ এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি স্বরূপ। সেখানে আরো বলা হয়েছে জাহাজ ভাঙ্গার সময় পরিবেশে যে ক্ষতিকর পদার্থগুলো পড়ে সেগুলো হলোÑ ক্যাডমিয়াম, লেড, মার্কারি, অর্গানেটিন, এ্যাসবেস্টস, পেট্রোলিয়াম হাইড্রোকার্বন বা তেল, ব্যালস্ট পানি, বিলজ পানি, উদ্বায়ু যৌগও বস্তুকণা। সীতাকু-ের জেলেরা তাদের পেশা হারিয়েছে দু’টি কারণে। প্রথমত এই উপকূলে এখন আর কোনো মাছ পায় না তারা। শুধু বর্ষা মৌসুমে উপকূল হতে বেশ দূরের গভীর সমুদ্রে কিছু ইলিশ পাওয়া যায় বলে জানায় রূপলাল নামের জেলে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সভাপতি ড. মোঃ মাকসুদুর রহমান জানান, এই পদার্থগুলো মানুষের শরীরের ওপর এবং পরিবেশের ওপর প্রভাব আর্সেনিক বিষক্রিয়ার মতোই ধীর প্রক্রিয়ায় করে থাকে। এ শ্রমিকরা বুঝতে পারছে না এর প্রভাবটা তাদের ওপর কোনো ধরনের পড়ছে। তিনি আরো বলেন, যে শ্রমিকরা বাঁচার তাগিদেই এখানে আসছে সেই শ্রমিক নিজেই বুঝতে পারছে না সে মৃত্যুকে কাছে টানছে। তাই এক্ষুণি পরিবেশ এবং শ্রমিকদের কথা চিন্তা করে শুধু জাহাজ ভাঙ্গার জন্য আলাদা নীতিমালা করা দরকার বলে আমরা মনে করি। সেটা না করতে পারলে চট্টগ্রামের এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় পরিবেশের মহাবিপর্যয় ঘটবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এই জন্য পরিবেশবান্ধবভাবে জাহাজ ভাঙছে যেসব দেশ তাদেরকে অনুসরণ করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (চট্টগ্রাম) আবদুস সোবহান জানায়, আমরা নিয়মিত জরিপ করছি। ইতোমধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে বেশ কয়েকটি ইয়ার্ড সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করেছে কিন্তু তাদের এ স্বপক্ষে কোনো কাগজপত্র জমা দিইনি। (উল্লেখ্য, পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের ঝকঝকে ভবনটিও পাহাড় এবং গাছ কেটে করা হয়। যার উদ্বোধন করেন সাবেক চারদলীয় জোট সরকারের বন ও পরিবেশমন্ত্রী তরিকুল ইসলাম ১৬ আগস্ট,২০০৫। যার জন্য এই পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপর কেউ নির্ভর করতে পারছে না)। সীতাকু-ের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড এলাকায় এখন শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটছে না মাত্রাতিরিক্ত পরিবেশ দূষণের কারণে। ভাটিয়ারির বয়স্করাও আক্রান্ত হচ্ছে নতুন নতুন রোগে।
সনাতনী পদ্ধতিতে জাহাজ কাটা মান্ধাতার আমলের পদ্ধতি দিয়ে চলছে জাহাজ কাটার কাজ। প্রতিটি ইয়ার্ডেই তিন থেকে চারটি করে বিভিন্ন সাইজের জাহাজ কাটছে শ্রমিকরা। ইন্টারনেট থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী জাহাজ কাটার কয়েক ধরনের পদ্ধতি রয়েছে। সেগুলো হলো বিচিং পদ্ধতি, বার্থ পদ্ধতি, ব্লক-ব্রেকিং পদ্ধতি, হাইটেক পদ্ধতি। এর মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক পদ্ধতিটি হলো বিচিং পদ্ধতি। যেটি অনুসরণ করা হয় সীতাকু- শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে। স্ক্র্যাপ জাহাজগুলো ভাঙ্গার জন্য সমুদ্র তীরে আনা হয় এর পর কাটিং গ্যাস, টর্চ ও করাত ব্যবহার করে জাহাজের কিছু কিছু দ্রব্য পাইপ, ক্যাবল ইত্যাদি যুক্ত করা হয়। ধাতব টুকরোগুলো সরানোর বা বিযুক্ত করার জন্য কোনো প্রকার ক্রেন ব্যবহার করা হয় না। মূলত ছোট ছোট টুকরো করে এগুলো ওয়্যার মেশিন দিয়ে সরানো হয়। এই মারাত্মক পদ্ধতির মাধ্যমে জাহাজ কাটার ফলে দুর্ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু উন্নত দেশে জাহাজ ভাঙ্গা হয় বার্থ পদ্ধতিতে। এ পদ্ধতিকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়Ñ প্রথমত, জাহাজটি ড্রাইভকে স্থানান্তর করা হয় যেখানে ক্রেন সার্ভিস, অগ্নিনিরোধক এবং জাহাজের বিভিন্ন অংশ রাখার জন্য খালি জায়গা থাকে। এবং এ ধাপেই এ্যাসবেস্টস যুক্ত যন্ত্রাংশ, বৈদ্যুতিক ক্যাবল এবং বর্জ্যসমূহ সরানো হয়। দ্বিতীয়ত, জাহাজের বিভিন্ন অংশ বা যন্ত্রাংশ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে কেটে ক্রেনের সাহায্যে সরটিং অঞ্চলে নিয়ে রাখা হয়। ক্রেনের কার্য ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে বিযুক্ত যন্ত্রাংশের আকার ছোট বা বড় করা হয়। এভাবে যন্ত্রাংশ সরিয়ে জাহাজ হাল্কা হলে এর অবশিষ্টাংশ টেনে ডকে তোলা হয় এবং বিভিন্ন অংশ কাটা হয়। আর সর্বশেষ আলাদা করে রাখা বড় ধাতব অংশগুলোকে টর্চ বা যান্ত্রিক ক্যাটারের সাহায্যে ছোট ছোট খ-ে কাটা হয়। এভাবে জাহাজ কাটা হলে দুর্ঘটনা অনেক কমে যাবে। আবার খরচটাও তুলনামূলকভাবে একটু কম। তবে একদম দূষণমুক্ত নয়।
চলছে জমি দখলের ধুম শিপ ব্রেকিং এখন নতুন করে আলোচিত হয়েছে জমি দখল-বেদখল নিয়ে। গত ৭ অক্টোবর আওয়ামী লীগের স্থানীয় সাংসদ এ বি এম আবুল কাশেম মাস্টারের দুই ছেলে এস এম আল মামুন এবং এস এম আল নোমান চারটি শিপ ইয়ার্ড দখল করে নিয়ে নেয়। সেখানে চারদিক হতে ঘিরে দেয়া হয়। এগুলো হলো পাকিজা ইন্টারপ্রাইজ, প্রাইম স্টিল, আসাদী স্টিল এবং মুসলিমা শিপ ব্রেকিং ইন্ডাস্ট্রিজ। দখলের ব্যাপারে এস এম আল মামুন জানায় এটি তাদের পূর্বের কেনা জমি। এখন শুধু সীমানা চিহ্নিত করছে মাত্র। কিন্তু এলাকাবাসী এবং দখল হয়ে যাওয়া শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের মালিকরা জানায়, সাংসদ এ বি এম আবুল কাশেম মাস্টারের দুই ছেলে এস এম আল মামুন এবং এস এম আল নোমান জমি কিনেছে মাত্র ১৬ শতাংশ। কিন্তু দখল করেছে আট একর। দখল করে নিলেও তিন দিন পর ফেরত দেয়। এ তো হলো সাম্প্রতিক ঘটনা; জমি দখলকে কেন্দ্র করে মারামারি-ধাওয়া পাল্টাধাওয়া আজকের বিষয় নয়। যার শুরু বেশ আগেই। বিএস রেকর্ড মতে পূর্বে সন্দ্বীপ সাগরের চ্যানেলটি ছিল একটা বড় খাল। পঞ্চাশের দশকের পর হতে এটি আরো বড় হতে থাকে। আর ষাটের দশকে এটি সাগরের মোহনায় পরিণত হয়। এর ফলে কয়েক শ একর চলে যায় সাগর এলাকায়। যা এক সময় মানুষের বসতি এলাকা ছিল। যেটি পিএস এবং আর এস রেকর্ডে পাওয়া যায়। ’৯১-এর ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এলাকার মানুষ জানমালের নিরাপত্তার জন্য সাগর তীর ছেড়ে আরো উপরে উঠে আসে। তখন মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ছিল। সলিমপুর থেকে কুমিরা পর্যন্ত বড় বেড়িবাঁধ দেয়া হয়। সরকার ’৯৫-এর দিকে এসে বেড়িবাঁধের বাইরের এলাকাকে জলমহল হিসেবে ঘোষণা করে, যা পূর্বে ব্যক্তি মালিকানাধীন ছিল। কিন্তু সরকার জলমহল ঘোষণা করলেও সেটা নিয়ে কারোরই কোনো মাথাব্যথা ছিল না। কারণ এই লোনা জমির নামমাত্র মূল্যও ছিল না। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ব্যবসা জমজমাট হতে থাকে। শুরু হয় সাগর পাড়ের জমি নিয়ে সমস্যা। শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড করতে আগ্রহীরা সাগর পাড়ের জমি কিনতে ধারণা দেয়া শুরু করে স্থানীয়দের কাছে। আর এই ফাঁকে বেশ কিছু ধূর্ত জমির মালিক এক জমি দফায় দফায় বিক্রি করে। সেই থেকে শুরু হয় জমি নিয়ে সমস্যা।
কাঠগড়ায় ইয়ার্ডের মালিকরা বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং সুপার স্টিল লিমিটেডের মালিক জাফর আলম এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে শিপ ব্রেকিংয়ের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। এখন এই খাত থেকে বিরাট রাজস্ব পাচ্ছে এ জন্য কিছু এনজিও এই শিপ ব্রেকিংয়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। যাতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ এবং নিরাপত্তার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা হাসপাতাল নির্মাণ করছি যাতে তারা চিকিৎসা পায়। কিন্তু সেটি কবে নাগাদ শেষ হবে এবং কোন ধরনের চিকিৎসা পাবে শ্রমিকরা । এ বিষয়টি জানতে চাইলে পরবর্তীতে জানানোর কথা বলেন। পরিবেশ দূষিত করার অভিযোগের কথা বললে তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেনÑ অন্য যেসব দেশে শিপ ব্রেকিং হচ্ছে সেসব দেশে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে না? শুধু আমরা ভাঙলেই দূষণ হয়! এর পর প্রশিক্ষণের কথা বললে বলেন শ্রমিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে কোনো প্রকার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। দেখতে দেখতে শেখো প্রশিক্ষণের বদলে এভাবেই চলে শিপ ব্রেকিংয়ের কাজ। এমনকি তার শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড সুপার স্টিল লিমিটেডের শ্রমিকরাও এ ধরনের প্রশিক্ষণের কথা প্রথম শুনেছে।
শিপ ব্রেকিং সম্ভাবনাময় শিল্প বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং এ্যাসোসিয়েশনের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে সরকার জাহাজ ভাঙ্গা খাত থেকে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করছে। বাংলাদেশের এই জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পের ওপর প্রত্যক্ষভাবে জড়িত রয়েছে প্রায় তিন লাখ শ্রমিক। আবার পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে আরো ২৫/৩০ লাখ শ্রমিক। কারণ দেশের অভ্যন্তরে কোনো লোহার খনি না থাকার কারণে স্টিল মিল এবং রি-রোলিং মিলগুলো প্রায় সম্পূর্ণভাবে এর ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ আমাদের নির্মাণ শিল্পের অনেকটাই এর ওপর নির্ভরশীল। দেশে প্রায় ৭০০-এর বেশি রি-রোলিং এবং স্টিল মিল রয়েছে, যার মূল কাঁচামালের যোগানদাতা দেশের ৭০টি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড। মূলত জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প হতে গার্ডার, ৫ ইঞ্চি বাই ৮ ইঞ্চি পুরু লোহা ছাড়াও বিভিন্ন সাইজের প্লেট থেকেই বিভিন্ন গ্রেডের এমএস রড, এমএস বার, এ্যাঙ্গেল এবং স্টিল শিট তৈরি করা হয় বলে জানায় একাধিক স্টিল এবং রি-রোলিং মিলের মার্কেটিং ম্যানেজার। সম্প্রতি চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় জাহাজ ভাঙ্গা হতে সংগৃহীত স্ক্র্যাপ এবং রি-রোলিং মিলে উৎপাদিত এমএস পরীক্ষা করে দেখে এটি খুবই উন্নতমানের। এ ব্যাপারে বায়েজিদ স্টিল মিলের কমার্শিয়াল ম্যানেজার স্বপন কুমার জানা, অন্য স্টিল মিলগুলোর মতো অধিকাংশ কাঁচামাল আসে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলো হতে। এ ছাড়া পরোক্ষভাবে অনেক ছোট ছোট শিল্প এর ওপর নির্ভরশীল। শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলো অন্তিমমুখী জাহাজের শেষ গন্তব্যস্থল। শিপ ইয়ার্ডে জাহাজগুলোকে প্রধানত লোহার জন্য ভাঙ্গা হয়। যা বাংলাদেশে শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে যেমন তেমনি জাহাজ তৈরিতে ব্যবহৃত প্রচুর উপাদানের পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করেছে। তাই একে কেন্দ্র করে আরো কিছু শিল্প গড়ে উঠেছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল-জেনারেটর এসেসমেন্ট এ্যান্ড মেশিনারিজ, ফাউন্ড্রি ও ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ শিল্প এবং ডাউস ও ব্রাস মেটাল শিল্প, নৌবাহিনীর টেলিকমিউনিকেশন, ফারনেস ওয়েল, বোট, ক্যাবল, ইলেকট্রনিক্স, ডোর, সিলিন্ডার এবং ফার্নিচার শিল্প। সব মিলে শিপ ব্রেকিং ইন্ডাস্ট্রিকে কেন্দ্র করে ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড প্রায় ২০টির ও বেশি লিংকেজ শিল্প গড়ে ওঠেছে। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মঈনুল ইসলাম জানান, এদেশের অর্থনীতিতে জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে নির্মাণ শিল্পের ওপর এর প্রভাব বেশি। তাই এ দিকে সরকারের বিশেষ নজর দেয়া উচিত। কারণ এই শিল্পটি এখন বাংলাদশের অর্থনীতিতে ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে। তাই এর ওপর কোনো প্রকার আঘাত আসলে সেটা এদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত লাগবে। তাই অর্থনীতিবিদসহ এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত সবাই দেশের অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সম্ভাবনাময় এই খাতকে বাঁচানোর জন্য পরিবেশ দূষণ রোধ করে কীভাবে এই খাতকে আরো গতিশীল করা যায় তার স্বপক্ষে মত দিয়েছেন। যদিও স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে জাহাজ ভাঙ্গার জন্য এখনো আলাদা কোনো আইন করেনি সরকার! তাই সবাই আশা করছেন দ্রুত এমন নীতিমালা করতে হবে যাতে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড আর থাকবে না লাশ উৎপাদনের কারখানা।
‘মালিকদের পাশবিক মনোবৃত্তির পরিবর্তন ঘটানো উচিত’ মোহাম্মদ আলী শাহীন জাহাজ ভাঙ্গা কর্মকর্তা ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল এ্যাকশন (ইপসা)
সাপ্তাহিক : কোন লক্ষ্যকে সামনে রেখে আপনারা জাহাজ ভাঙ্গা নিয়ে কাজ শুরু করেন? মোহাম্মদ আলী শাহীন : শ্রমিকদের অধিকার লঙ্ঘিত তো হচ্ছেই; তার ওপর একের পর এক শ্রমিক মরতে দেখে আমরা ২০০৩ সাল থেকে জাহাজ ভাঙ্গা শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করি। আমরা শ্রমিকদের আইনি সহায়তাসহ সব ধরনের অধিকারের বিষয়ে সচেতন করে যাচ্ছি। সাপ্তাহিক : দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে জাহাজ ভাঙ্গার মূল সমস্যা বর্তমানে কোনটা মনে করেন? মোহাম্মদ আলী শাহীন : এর জন্য বিশেষ কোনো আইনকানুন নেই। যার কারণে নিয়মিত ঘটছে শ্রমিক মৃত্যুর মতো ঘটনাগুলো। এছাড়া আহত হচ্ছে নিয়মিত যেগুলো আমাদের অনেক সময়ই অজানা থেকে যাচ্ছে। তাই এক্ষুণি সবার সঙ্গে আলোচনা করে একটা আলাদা আইন হওয়া প্রয়োজন। নইলে কখনই শ্রমিক মৃত্যুর হার কমানো সম্ভব নয়। সাপ্তাহিক : সরকারের এই বিষয়ে বিশেষ কোন দিকটার দিকে নজর দেয়া উচিত বলে মনে করেন? মোহাম্মদ আলী শাহীন : তিনটি (পরিবেশ ও বন, নৌ পরিবহন ও যোগাযোগ, শিল্প) মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দেয়া উচিত। এ ছাড়া আরো একটি বডি থাকবে এগুলোকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আর এগুলোর মধ্যে স্পষ্টভাবে কাজের বণ্টন থাকতে হবে। সাপ্তাহিক : শিপ ব্রেকার মালিকদের কি করা উচিত? মোহাম্মদ আলী শাহীন : শিপ ব্রেকার মালিকদের পাশবিক মনোবৃত্তির পরিবর্তন ঘটানো উচিত। সেই সঙ্গে অতি মুনাফার লোভ হতে অবশ্যই সরে আসতে হবে। দেশের মানুষ এবং দেশের প্রতি মমত্ববোধ সৃষ্টি করতে হবে। আর একটা দাবি সবসময়ই রইল। সেটা হলো সমুদ্র সৈকত হতে এই শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড সরাতে হবে।
‘আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে সরকারকেই’ তপন দত্ত আহ্বায়ক চট্টগ্রাম শিপ ব্রেকিং শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরাম
সাপ্তাহিক : শ্রমিকদের এই অবস্থার জন্য আপনারা কি কি কর্মসূচি নিয়েছেন? তপন দত্ত : শিপ ইয়ার্ডের কোনো ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে উঠতে দেয়নি মালিক পক্ষ। তাই আমরা চট্টগ্রামের সব শ্রমিক সংগঠন এক হয়ে চট্টগ্রাম শিপ ব্রেকিং শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরাম গঠন করেছি। আর ইতোমধ্যে আমরা প্রধান মন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছি, গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করেছি। যেখানে জেলা প্রশাসককে অনুরোধ করেছি মালিক পক্ষকে আনার জন্য। আর গত ১৬ অক্টোবর শহীদ মিনার চত্বরে শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদে বিরাট বিক্ষোভ সমাবেশ করেছি এবং নিয়মিত এ ধরনের কর্মসূচি দিচ্ছি। যেখানে সব পর্যায়ের শ্রমিকরা একাত্মতা ঘোষণা করেছিল শ্রমিক হত্যার বিচারের দাবিতে। খুব শিগগিরই আমরা শিল্প এবং পরিবেশ মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে আমরা আমাদের শ্রমিক হত্যার বিচারের দাবি তুলে ধরব। এ ছাড়া শ্রম, পরিবেশ, শিল্প মন্ত্রীকে আমরা স্মারকলিপি পাঠাব খুব শিগগিরই তার জন্যও প্রস্তুতি চলছে। সাপ্তাহিক : শিপ ইয়ার্ডের শ্রমিকদের রক্ষার জন্য সরকারের কাছে আপনাদের দাবি কি? তপন দত্ত : দেশ এবং আন্তর্জাতিক যেসব আইন রয়েছে পরিবেশ এবং শ্রম বিষয়ে সেসব যথাযথ ভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে সরকারকেই। এর কোনো বিকল্প নেই। আর সেটা না করতে পারলে এই শ্রমিক হত্যা বন্ধ হবে না। আর ক্ষতিপূরণের বিষয়ে বিশেষ লক্ষ্য রাখতে হবে। বিশেষ করে কর্মস্থলে চিরদিনের মতো অকার্যকর হয়ে যাওয়া শ্রমিকদের নায্য পাওনা যথাসময়ে মিটিয়ে দিতে হবে। সাপ্তাহিক : শিপ ইয়ার্ডের শ্রমিকদের রক্ষার জন্য মালিকদের কাছে আপনাদের আহ্বান কি? তপন দত্ত : প্রত্যেক শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা দিতে হবে; এটা তার অধিকার। এ ছাড়া প্রত্যেক শ্রমিককে নিয়োগপত্র, প্রশিক্ষণ, পরিচয়পত্র দিতে হবে, ঠিকানা সংরক্ষণ করতে হবে। আর দুর্ঘটনা পরবর্তী সময়ে যাতে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নেয়া যায় সে জন্য অন্তত একটা এ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে সামান্য হলেও চিকিৎসা পাবে শ্রমিকরা। |