Logo
 বর্ষ ১১ সংখ্যা ৩০ ৪ঠা মাঘ, ১৪২৫ ১৭ জানুয়ারী, ২০১৯ 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
দেশের বাইরে
প্রতিবেদন
 
http://sadiatec.com/
[অভিমত] জনমুখী বইমেলা জরুরি  
আলমগীর খান

প্রতি বছর ফেব্র“য়ারি মাসে বাংলা একাডেমি আয়োজিত বইমেলা বাংলাদেশের বিশেষ করে ঢাকা শহরের সাহিত্যানুরাগী মানুষের মনে বিশেষ প্রেরণা সঞ্চার করে। মাসজুড়ে ঢাকায় একটা উৎসবের আমেজ জমে ওঠে। পত্রিকায় ও টেলিভিশনে প্রতিদিনই কোনো না কোনো আয়োজন থাকে বইমেলা নিয়ে। এক বিরাটসংখ্যক মানুষ অনেক আগে থেকেই উন্মুখ হয়ে থাকেন বইমেলার দিনগুলোর জন্য। বইমেলা কেবল ফেব্র“য়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হলেও এর আয়োজন বছরখানেক ধরে চলতে থাকে। প্রকাশকগণ প্রতিবার সামনের বইমেলাকে লক্ষ্য করে বই প্রকাশের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকেন। লেখকগণও বইমেলাকে কেন্দ্র করে মনে মনে একটা প্রস্তুতি নিতে থাকেন। এর কারণ আমাদের দেশে বই বিক্রির সবচেয়ে বড় অংশটা ঘটে বইমেলায়।
 এই উৎসবের ছবির মাঝেই কয়েকটা দুর্বলতা নিহিত। আমাদের দেশে বই প্রকাশ মূলত বইমেলাকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। মেলার দুয়েক মাস আগে থেকে সারা বছরের বই প্রকাশের তোড়জোড় শুরু হয়। ছাপাখানার ব্যবসা বাড়ে ও সেইসঙ্গে শ্রমিকদের দমবন্ধ হতে থাকে। অনেকের কাছে যেনতেন প্রকারে বই প্রকাশই মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে। বহু বই প্রকাশ হয়, যাদের অনেকগুলোর একটিও বিক্রি হয় না। অনেকগুলো মোটেও মানসম্মত নয়। মানসম্মত হওয়ার যেসব অপরিহার্য দিক আছে তার প্রায় কোনোটিই পূরণ হয় না এসব প্রকাশনায়। প্রথমেই যা চোখে পড়ে তা হলো দায়সারা প্রচ্ছদ ও বানান ভুলের ছড়াছড়ি। এরপর পড়তে গিয়ে অনেকগুলোর বেলায় দেখা যাবে বিষয়বস্তুর অগভীরতা ও রচনাশৈলীর অভাব। সম্পাদনার বালাই নেই!
এর মাঝেও আবার ভালো বই নিঃসন্দেহে অনেক থাকে। কিন্তু মানহীন বইয়ের ভিড়ে মানসম্মত বইয়ের হারিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। বই প্রকাশের ক্ষেত্রে টাকার দৌরাত্ম্য সহজেই চোখে পড়ে। ভালো লিখেও অনেকে বই বের করতে পারেন না প্রকাশকের অভাবে। আবার টাকার জোরে অনেকেই দু-দশটা বই বের করছেন। সংখ্যার দিক থেকে যে আমাদের দেশে প্রকাশকের অভাব আছে তা নয়, তবে মেধাবী ও দূরদর্শী প্রকাশকের অভাব এ দেশে প্রকট। যেখানে লেখকরাই হচ্ছেন প্রকাশকদের টাকা কামাইয়ের উৎস অর্থাৎ লেখকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে প্রকাশকরা বই ছাপেন বা ছাপতে বাধ্য হন সেখানে প্রকাশনা-শিল্প যে ব্যবসায়িক বা শৈল্পিক কোনো অর্থেই দাঁড়ায়নি তা স্পষ্ট। অল্প কিছু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম মাত্র।
এই টাকা ও বিজ্ঞাপন বা প্রচারণার দৌরাত্ম্যে পাঠকরা খেই হারিয়ে ফেলেন। ভালো পড়–য়া না হলে ভালো বই বাছাই করা তার পক্ষে কঠিন। সেজন্য তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কয়েকটি নামকরা প্রকাশনা সংস্থার দিকে ঝুঁকে পড়েন ও তাদের দোকানে ভিড় করেন। নামকরা প্রকাশনা সংস্থাগুলোর কিছু মানহীন বইয়েরও কাটতি ভালো হয়। অথচ নামের বাজারে জায়গা না থাকায় অনেক প্রকাশকের ভালো বইও দাম পায় না। আজকের দুনিয়ায় নামের বাজারে জায়গা কিনতে পয়সাপাতি খরচ করতে হয়, শুধু ভালো কাজ দিয়ে পুরোটা হয় না। অতএব পাঠকের ক্ষেত্রে এখানে সংকটটা হলো ভালো বইয়ের হদিশ পাওয়া।
পাঠকের পক্ষে ভালো বইয়ের হদিশ পাওয়ার উপায় কী? বই নিয়ে আলোচনা। বইয়ের আলোচনা এ দেশে হয় না বললেই চলে। যা-ও হয় তার আবার পাঠক পাওয়া দুষ্কর। পত্রপত্রিকারও এ ব্যাপারে আগ্রহ কম। তবে ফেব্র“য়ারি মাসজুড়ে পত্রপত্রিকায় ও টেলিভিশনে নানারকম বইয়ের খবর পাওয়া যায়। তাতে বইগুলোর সামান্য পরিচিতি জানা যায় মাত্র। সেক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই বড় প্রকাশনা সংস্থা ও নানা উপায়ে ক্ষমতাশালী লেখকদের আধিপত্য থাকে। এ থেকে কোনো বই সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া যায় না। ফলে পাঠকের পক্ষে চিন্তা উদ্রেককারী বইয়ের খোঁজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ দেশে সমালোচনা সাহিত্য না দাঁড়ানোর ফলে এই সংকটটি বহাল তবিয়তে বিদ্যমান আছে। বইমেলা-কেন্দ্রিক বই প্রকাশের ডামাডোলের মাঝেই এসব সংকট স্পষ্ট।
এ গেল বইমেলার কয়েকটি দুর্বলতার দিক। কিন্তু ভালো দিকও অনেক। আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ বইবিমুখ, এক্ষেত্রে তথাকথিত শিক্ষিত ও নিরক্ষরে কোনো ভেদ নেই। আমাদের জাতিতে বই-সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। সার্টিফিকেটকেন্দ্রিক ও চাকরিমুখী আমাদের এই শিক্ষা ব্যবস্থায় স্কুল-কলেজের বাইরে কোনো কিছুকে বই-ই মনে করা হয় না। টেক্সট বইয়ের বাইরে একমাত্র পাঠ্য বা তারচেয়েও বেশি পাঠ্য হলো নোটবই বা গাইডবই। আর তারপরেই পাঠ্য বইয়ের মর্যাদা পায় চাকরির জন্য লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় পাস করার বই। এসব বইয়ে শিখিয়ে দেয়া হয় কীভাবে কোনো বিষয়ে কিছু না জেনেও কী করে জানার এমন ভাণ করা যায় যে কেউ ফাঁকি ধরতেই পারবে না। যেমন রবীন্দ্রনাথ বা শেক্সপিয়রের এক লাইন না পড়েও যে কেউ কঠিন কঠিন প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করে এমন পণ্ডিত বনে যেতে পারে যে, কোনো প্রচলিত ধাঁচের পরীক্ষায় বাপেরও সাধ্য নেই তাকে আটকানোর।
এমন দুর্দশাজনক পরিস্থিতিতে বাংলা একাডেমি আয়োজিত বইমেলা মরুভূমিতে মরূদ্যানের মতো বৈ কি। এই মেলায় অনেক মানুষের সমাগম ঘটে। তাদের সবাই যে বই কিনেন তা নয়, অনেকেই বেড়াতে আসেন। যারা বই কিনেন ও বেড়াতে আসেন তারা প্রত্যেকেই মনের মধ্যে একটা বই-সংস্কৃতি নিয়ে বাড়ি ফেরেন। মানুষের মাঝে জ্ঞানানুরাগ তৈরিতে এর একটা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকে। কিন্তু মেলা-আয়োজক কর্তৃপক্ষ দায়সারাভাবে এ কাজটা করে থাকেন। বইমেলাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার কোনো উদ্যোগ তাদের মাঝে চোখে পড়ে না। মেলা আয়োজনে একমাত্র প্রকাশকের কথাটাই ভাবা হয়, লেখক ও পাঠক কোনো বিবেচনার মধ্যে আসেন না। ফলে প্রতি বছর একই ধাঁচে মেলা আয়োজিত হয়, আর মাঝে মাঝে কর্তৃপক্ষের উটকো খবরদারির কথা জানা যায়।
আমাদের বেশিরভাগ জাতীয় উদ্যোগ যেমন রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক, বাংলা একাডেমির এই বইমেলাও তাই। অথচ দেশের সব  প্রান্তের মানুষই এরকম একটা মেলায় অংশ নিতে চায়। অনেকেই ঢাকার বাইরে থেকে বইমেলায় আসেন। কিন্তু যদি দেশের সব জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এমন একটি মেলার আয়োজন করা হতো দেশব্যাপী তার ব্যাপক প্রভাব পড়তো। বইমেলা যে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে লাভজনকভাবেই করা যায়, তার প্রমাণ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থার উদ্যোগে নিয়মিত বইমেলা আয়োজিত হয়। যতদূর জানি, সেসব মেলায় বই বিক্রির পরিমাণ যথেষ্ট ভালো, কোথাও কোথাও এমনকি তা অবিশ্বাস্যরকম বেশি। স্পষ্টতই মানুষ বই পড়তে চায়। কিন্তু বইকে মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন আছে। বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ বা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শিল্পকলা একাডেমি এরূপ উদ্যোগের কথা ভেবে দেখতে পারে। যেভাবেই হোক না কেন, একুশের বইমেলাকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন।
শুধু প্রকাশকদের মেলা থেকে বইমেলাকে মুক্ত করা প্রয়োজন। সেজন্য মেলায় ধ্র“পদী লেখকদের প্রত্যেকের নামে স্টল বরাদ্দ করা যেতে পারে। যেমন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসীম উদ্দীন, জীবনানন্দ প্রমুখের নামে আলাদা আলাদা স্টল বা কর্নার থাকতে পারে যেখানে তাদের সব রচনা পাওয়া যাবে। আবার ইংরেজি ভাষার বইয়ের জন্যও দুয়েকটা স্টল বরাদ্দ রাখা যেতে পারে। মনে রাখা প্রয়োজন জ্ঞানানুরাগ তৈরি ও বিস্তারই বড় কথা, প্রকাশকদের ব্যবসার চেয়ে। কেননা এই জ্ঞানানুরাগ তৈরি ও বিস্তার না হলে প্রকাশকদের ব্যবসাটাও দাঁড়াবে না।
বইমেলা আয়োজনের মাঝেও বাংলা একাডেমির নানা দুর্বলতা ও ত্র“টি-বিচ্যুতি রয়েছে। সেগুলো দূর হওয়া প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আয়োজকদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও সুস্থ বিকাশ। একুশের বইমেলা আমাদের জাতীয় জীবনে আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিস্তার করে একটি জ্ঞানানুরাগী সমাজ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে যদি এই মেলাকে আরও জনমুখী করে তোলা যায়।
লেখক: আলমগীর খান
প্রচার সম্পাদক, বাংলাদেশ লেখক ঐক্য
মতামত লেখকের নিজস্ব
Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
ফিচার ও অন্যান্য
  • খেলার মাঠ থেকে রাজনীতিতে আলোচিত যারা...
  • [অভিমত] জনমুখী বইমেলা জরুরি
  • গ্রামের বিবর্তন -আতাউর রহমান মারুফ
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.
    বর্তমান সংথ্যা
    পুরানো সংথ্যা
    Click to see Archive
    Doshdik
     
     
     
    Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive