Logo
 বর্ষ ১১ সংখ্যা ৩০ ৪ঠা মাঘ, ১৪২৫ ১৭ জানুয়ারী, ২০১৯ 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
দেশের বাইরে
প্রতিবেদন
 
http://sadiatec.com/
শ্রমিক আন্দোলন : মজুরি বৃদ্ধিই শেষ কথা নয়! -আনিস রায়হান  
পোশাক খাতের প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের মজুরি আগের তুলনায় গড়ে ৫১ শতাংশ বাড়লেও বিভিন্ন রকম ব্যাখ্যা দিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টির চেষ্টা চলছে।
টিপু মুনশী, মন্ত্রী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ১০ জানুয়ারি ২০১৯, বাংলা ট্রিবিউন

নির্বাচনের আগে দেশকে অস্থিতিশীল করতে কুচক্রী মহলের ইঙ্গিতে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। তবে তখন তারা ব্যর্থ হয়। এখন আবার নতুন করে এই আন্দোলন শুরু করেছে।
সিদ্দিকুর রহমান, সভাপতি, বিজিএমইএ। ৮ জানুয়ারি ২০১৯, ঢাকা টাইমস ২৪ ডটকম

শ্রমিকদের আন্দোলনের পেছনে কেউ উসকানি দিয়ে নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আছাদুজ্জামান মিয়া, ডিএমপি কমিশনার। ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ইত্তেফাক অনলাইন

আমাদের কাছে তথ্য উঠে এসেছে- আমাদের ধারণা ছিল শুধু মজুরি বৈষম্যের কারণে এই শ্রমিক আন্দোলন বা বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। আমরা দেখেছি, সেই মজুরির বাইরেও অনেক ইস্যু এসেছে। সেগুলো মজুরি কম বা মজুরি সমন্বয়ের বাইরে আছে। কোন কারখানায় ঘোষিত ন্যূনতম মজুরির চেয়েও বেশি দেয়া হয়েছে, সেই ফ্যাক্টরিও ভাঙচুর হয়েছে। এখানে খুবই সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ গ্রহণ করার বিষয় আছে।
আফরোজা খান, সচিব, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। ১০ জানুয়ারি ২০১৯, জাগো নিউজ ২৪ ডটকম

নতুন বেতনকাঠামোতে গ্রেড অনুযায়ী যে বেতন বেড়েছে, সে সম্পর্কে শ্রমিকদের ভালো ধারণা নেই। সে কারণেই ভুল-বোঝাবুঝি থেকে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
সানা শামীনুর রহমান, পুলিশ সুপার, শিল্প পুলিশ-১। ১০ জানুয়ারি ২০১৯, দৈনিক প্রথম আলো

মূল মজুরি আগে একসময় মোট মজুরির ৬০ থেকে ৬৬ শতাংশ ছিল। ২০১৩ সালে সেটি ৫৬ শতাংশ করা হয়। আর এবারের কাঠামোতে মূল মজুরি আরও কমে ৫১ শতাংশে নেমে গেছে। এই মূল মজুরি কম হওয়ায় শ্রমিকরা ওভারটাইমের অর্থ, ঈদের বোনাস ও অবসরকালীন ভাতা কম পাবেন। চাকরিচ্যুত হলে ক্ষতিপূরণও কম পাবেন। এই সবকিছুই মূল মজুরি ধরে হিসাব করা হয়। এসব অসংগতি শ্রমিক সংগঠনের পাশাপাশি সাধারণ শ্রমিকরাও বুঝতে পেরেছেন। সে জন্যই ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
আমিরুল হক আমিন, সভাপতি, জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন। ১২ জানুয়ারি ২০১৯, দৈনিক প্রথম আলো

১.
শ্রমিক আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশের পোশাক কারখানাগুলোয়। মালিকপক্ষ ও সরকারের অভিযোগ, বিশেষ কোনো মহল শ্রমিকদের উসকানি দিচ্ছে। আর শ্রমিক সংগঠন ও সাধারণ শ্রমিকরা স্পষ্ট করেই বলেছেন, মজুরি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মালিকরা কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। পাঁচ বছর পর বেতন বাড়লেও নতুন বেতন কাঠামো অনুসারে প্রকৃত বেতন বাড়ছে না।
জানা যায়, ২০১৩ সালে নতুন মজুরি ঘোষণার পর তা কার্যকর হয় ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে। প্রজ্ঞাপনের শর্তানুযায়ী ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে প্রতি বছর ক্রমবর্ধমান হারে শ্রমিকরা ৫ শতাংশ হারে বর্ধিত মূল (বেসিক) মজুরি পাবেন। তখন ১নং গ্রেডের একজন শ্রমিকের মূল মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮,৫০০ টাকা। নিয়ম অনুযায়ী ২০১৫ সালে ৮,৫০০ টাকার সঙ্গে ৫ শতাংশ  যোগ করে তার মূল মজুরি দাঁড়ায় ৮,৯২৫ টাকা। এভাবে ৫ শতাংশ হারে ফি বছর মূল মজুরি বৃদ্ধির ধারায় ২০১৯ সালে ওই শ্রমিকের মূল মজুরি দাঁড়ায় ১০,৮৪৮ টাকা। কিন্তু নতুন ঘোষিত মজুরি কাঠামোতে ১ নং গ্রেডের শ্রমিকের মূল মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে ১০,৪৪০ টাকা। অর্থাৎ ২০১৯ সালে বেতন না বাড়লে মূল মজুরি হিসেবে তার যা পাওয়ার কথা, নতুন বেতন কাঠামোতে সেখান থেকে তার কমে গেছে ৪০৮ টাকা। এভাবে ২নং গ্রেডের পুরনো শ্রমিকদের মূল মজুরি কমেছে ৪১৪ টাকা, এবং ৩নং গ্রেডের শ্রমিকদের কমেছে ৪১ টাকা।
পরবর্তী চারটি গ্রেডে মূল মজুরি কিছুটা বাড়লেও তা পাঁচ বছর পর বেতন বৃদ্ধির তুলনায় খুবই হতাশাজনক। ৪র্থ গ্রেডে বেড়েছে ৮০ টাকা, ৫ম গ্রেডে ১৬৫ টাকা, ৬ষ্ঠ গ্রেডে ১৯৭ টাকা ও ৭ম গ্রেডে ২৭১ টাকা। শ্রমিক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মালিকরা মূল মজুরি কমানোর কৌশল নিয়েছেন, যা বাস্তবায়নে সহায়তা করেছে সরকার ও মজুরি বোর্ড। মূল মজুরি অনুযায়ীই ওভারটাইমের টাকা মেলে। তাই মূল মজুরি না বাড়লে ওভারটাইমের টাকা বাড়বে না। ঈদের বোনাস ও অবসরকালীন ভাতাও এ কারণে কমে যাবে। চাকরিচ্যুত হলে ক্ষতিপূরণও কম মিলবে। শ্রমিকদের বঞ্চিত করার উদ্দেশেই মালিকরা এমন পথ নিয়েছেন বলে অভিযোগ।

২.
শ্রমিক অসন্তোষ শুরু হয়েছিল বিগত ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে। নভেম্বরে নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণার সময় বলা হয় ডিসেম্বর থেকে এটা কার্যকর হবে। ফলে শ্রমিকরা ডিসেম্বরের শুরুতেই মজুরির এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামেন। কিন্তু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নতুন কোনো সংকট সৃষ্টি হতে পারে ভেবে সরকার ও মালিকপক্ষ কারখানাগুলো ছুটি দিয়ে দেয়। জানানো হয় নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হবে জানুয়ারি ২০১৯ থেকে। এভাবে মালিকপক্ষের লাভের চিন্তা আর সময়ের গরমিলে সংকট আরও গভীর রূপ ধারণ করে, যা তারা কেউই অনুমান করেনি।
মূলত নতুন মজুরি নির্ধারণে কৌশল নেয়া হয়েছিল। ডিসেম্বর থেকে বেতন দেয়া গেলে এই কৌশল বাস্তবায়ন সুবিধাজনক হতো। সেক্ষেত্রে ২০১৯ সালের নতুন বর্ধিত বেতনের হিসাবটা যোগ হতো না। অর্থাৎ ২০১৮ সালে শ্রমিকের মূল বেতন যা দাঁড়িয়েছিল, নতুন বেতনকে তার সঙ্গে তুলনা করা হতো। নিয়ম অনুযায়ী ১ নং গ্রেডের একজন শ্রমিকের মূল বেতন বেড়ে ২০১৮ সালে হয়েছিল ১০,৩৩২ টাকা। নতুন কাঠামো অনুযায়ী তার মূল বেতন ১০,৪৪০ টাকা। অর্থাৎ বেতন বৃদ্ধি পেত ১০৮ টাকা। এখন যেখানে তার বেতন ৪০৮ টাকা কমে গেছে, তখন সেটা দেখা যেত না, বরং বেতন বৃদ্ধির প্রমাণই মিলত। ডিসেম্বর মাসে নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন দেয়া শুরু হলে এই বিপত্তি সৃষ্টি হতো না।
এটা যে কেবল নির্বাচনী গোলযোগের ভয়ে ঘটেছে, তা নয়। গার্মেন্ট মালিকরা সরাসরি এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যে যুক্ত ছিলেন, তার প্রমাণ মেলে সরকারের এ সংশ্লিষ্ট গেজেট থেকে। ২৫ নভেম্বর ২০১৮ তে প্রকাশিত হয় নতুন মজুরি সংক্রান্ত প্রথম গেজেট। তাতে শর্তাবলিতে ৪ নম্বরে উল্লেখ ছিল, ‘কোন শ্রমিকের বর্তমানে প্রাপ্ত মজুরীর সহিত এই প্রজ্ঞাপনে উল্লিখিত মজুরী যোগ করিয়া নূতনভাবে মজুরী নির্ধারণ করিতে হইবে।’ গেজেট প্রকাশের কয়েকদিন বাদেই, ২৯ নভেম্বর ২০১৮ প্রকাশিত হয় ওই গেজেটের সংশোধনী। সংশোধিত গেজেটে উক্ত শর্তাবলির ৪ নম্বর অংশটি বিলুপ্ত করা হয়। গেজেটে এমন সংশোধনীর সুফলটা মালিকদের ঘরেই যাওয়ার কথা। সুতরাং এটা কার চাপে বা কার কারণে হয়েছে, তা নিয়ে না ভাবলেও চলে।
মালিকপক্ষ এখন জোর দিয়ে বলছে যে, মোট মজুরি বৃদ্ধিটাই বড় কথা। শ্রমিকদের মোট বেতন যেখানে বেড়েছে, মূল মজুরি নিয়ে আন্দোলন করাটা সেখানে অহেতুক। সমস্যা সমাধানে তারা সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন, মোট মজুরি অপরিবর্তিত রেখে মূল মজুরি বৃদ্ধি করে সমন্বয় সাধনের জন্য। এটা স্পষ্ট যে, বেশি লাভ করতে গিয়ে তারা ফ্যাসাদে পড়েছেন।

৩.
সরকারপক্ষ শ্রমিকদের এ আন্দোলন নিয়ে মহাবিরক্ত। নির্বাচনে ‘মহাজয়’ লাভ করলেও তা নিয়ে অনেক অভিযোগ ছিল। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলন দানা বাঁধেনি। তাই সরকার যখন টানা তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার আনন্দ উদযাপনে ব্যস্ত, তখন শ্রমিকদের এই বাগড়া, তারা একেবারেই মেনে নিতে পারছেন না।
বারবার বলা হচ্ছে, শ্রমিকদের উসকানি দেয়া হচ্ছে। কোনো একটি মহল এর পেছনে রয়েছে। কিন্তু সরকারের তো গোয়েন্দা বাহিনী আছে, তারা তদন্ত করতে পারে। শ্রমিক এলাকাগুলো এমনিতেই কড়া নিরাপত্তার চাদরে মোড়ানো থাকে। কারা এর পেছনে আছে তা জানাটা তাদের পক্ষে মোটেই অসম্ভব নয়, তাহলে এই অন্ধকারে ঢিল ছোড়া কেন? অপরাধীদের কেন ধরা হচ্ছে না?
১০ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক প্রথম আলোর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে সাভার থানায় দেড় হাজার শ্রমিকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে শিল্পপুলিশ। মঙ্গলবারের শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় এ মামলা হলেও এতে গুলিতে শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনাটির কোনো উল্লেখ নেই। শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনায় পৃথক কোনো মামলাও হয়নি।
একজন শ্রমিক কেন গুলি খেয়ে মারা গেল? প্রশ্নটা এই সুযোগে তোলাই যায়। পুলিশ বাহিনী কি জানে, নিহত সুমনকে কারা গুলি করে হত্যা করেছে? তারা কেন মামলা নিল না, বা নিজেরাই তো বাদী হয়ে মামলা করার কথা, সেটা কি হয়েছে? শ্রমিকদের দাবি, পুলিশের গুলিতেই তার মৃত্যু হয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন থাকে, নাগরিকের ওপর গুলি চালানোর এই আদেশ কে দিয়েছে? উসকানিদাতাদের না ধরে বিক্ষুব্ধ শ্রমিককে গুলি করা কেন?
আর শ্রমিক আন্দোলন দমাতেই যদি এই গুলি করা হয়, তাহলে কি আবারও এটাই প্রমাণ হয় না যে, সরকার মালিকদের হয়ে সওয়াল করছে। শ্রমিকের সঙ্গে তার আচরণ কসাইয়ের মতোই। সরকারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেই মালিকরা বেতন নিয়ে এমন খেলা খেলতে পারছে। সরকার তবু জনগণের অর্থের টাকা থেকে মালিকদের সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছে।
এটা সবার জানা যে, গার্মেন্ট মালিকরা নানাভাবে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। দেশীয় কাপড় ব্যবহারে ৩ শতাংশ নগদ প্রণোদনা, অপ্রচলিত বাজারে ৩ শতাংশ নগদ প্রণোদনা, করপোরেট কর কমে হয়েছে ১২ শতাংশ, উৎসে কর কমিয়ে করা হয়েছে দশমিক ২৫ শতাংশ, শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি ও বন্ডেড ওয়্যার হাউসের সুবিধা পেয়ে থাকেন গার্মেন্ট মালিকরা। সরকারের এমন মালিক তোষণ কি সংবিধানসম্মত? যে সংবিধানের পবিত্রতা রক্ষায় তারা দিন-রাত সোচ্চার!

৪.
দেশের কমিউনিস্ট বা বামপন্থি নামে পরিচিত দলগুলো, শ্রমিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও পোশাক শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনকে আখ্যা দেয়া হয়েছে মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন হিসেবেই। বাহ্যিকভাবে যদিও দেখা যায় শ্রমিকরা মজুরির দাবিতে লড়ছে, কিন্তু সেই দেখাটা কতটুকু সত্য? শাসকশ্রেণি, ধনিকশ্রেণি, শিক্ষিতশ্রেণি ও তাদের চালিত সমস্ত মিডিয়া শ্রমিকের আন্দোলনকে মজুরির আন্দোলন হিসেবেই দেখাতে চায়। মজুরি কিছুটা বাড়লেই শ্রমিকের সমস্যার সমাধান- এই চেতনা তারা ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করে ফেলেছে। শ্রমিকরাও যে অনেকে তাদের এই প্রচারে ঘায়েল নন, তেমনটা বলা যাবে না।
কিন্তু শ্রমিকরা কি কেবল মজুরির জন্য লড়ছেন? মজুরিকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ হলেও তাদের আরও দাবি-দাওয়া আছে। ঘটনা হলো, সেগুলো শোনার মানসিকতা উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিতশ্রেণির নেই। তারা যেমন নারী শ্রমিকের ওপর নিপীড়নকে ‘নারী-নির্যাতন’ মনে করে না, গুলি করে শ্রমিক হত্যাকে ‘হত্যাকাণ্ড’ সাব্যস্ত করে না, তেমনি শ্রমিকের দাবি বলতে মজুরির দাবির বাইরে আর কিছু থাকতে পারে বলেও তারা স্বীকৃতি দেয় না।
মজুরির দাবি সবখানেই আছে, থাকে। থাকাটাই স্বাভাবিক। শ্রমিক শ্রম দিচ্ছেন, কিন্তু তার পাওনা বুঝে পাচ্ছেন না। অনেক শ্রম দিয়েও বেঁচে থাকার মতো রোজগার তার হচ্ছে না। তার জীবনের অনিশ্চয়তা কাটছে না, সচ্ছলতা আসছে না। সুতরাং মজুরির দাবি সামনের সারিতেই চলে আসে। তারা মানুষের মতো বেঁচে থাকার উপযোগী মজুরি দাবি করেন। তবে শুধু এটুকু নয়, শ্রমিকরা আরও অনেক কিছুই চান।
শ্রমিকদের দাবি, কারখানায় সুষ্ঠু শ্রম পরিবেশ থাকতে হবে। কারখানায় মালিকের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের দুর্ব্যবহার চলবে না। নারী শ্রমিকদের ওপর সকল নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। সরকার বা অস্ত্রধারী বাহিনী মালিকের হয়ে শ্রমিকদের শাসাবে না, তাদের প্রথম শ্রমিকের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। মাস্তান বা পুলিশ দিয়ে শ্রমিকের ওপর নির্যাতন চলবে না। মালিকরা যেমন কর ছাড় পান, তেমনি শ্রমিকদের প্রণোদনা দিতে হবে, কারণ উন্নয়নে তারাই প্রধান ভূমিকা রাখেন।
শ্রমিকদের এসব দাবির সারমর্ম হলো, তারা মানুষের মতো বাঁচতে চান, সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার চান, রাষ্ট্রে সমানাধিকার চান। তাদের এসব দাবির মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসে যে, রাষ্ট্র বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষা না করে গুটিকয়েক মালিকের স্বার্থকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। শ্রমিকরা এই অবস্থার পরিবর্তন চান, রাষ্ট্র ও তার বাহিনীর পরিবর্তন চান। তাই তারা দেশে দেশে রাজপথ দখলে নিয়ে বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থা ও রাষ্ট্রকাঠামোর প্রতি অনাস্থা জানাচ্ছেন।
কিন্তু শ্রমিকসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো শ্রমিকের আন্দোলনের এই মর্মকথা জনগণের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব নিলেও উল্টো তারাই যেন পুরো ব্যাপারটা ভুলে বসে আছে। নিহত শ্রমিক সুমনকে বরং তারা ভোটের রাজনীতিতে নিজেদের হতাশার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছেন। তাকে ‘হাসিনা সরকারের তথাকথিত উন্নয়নের ধারাবাহিকতার প্রথম শহীদ শ্রমিক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। কোনো কোনো শ্রমিক সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতা এমন হুঙ্কার দিয়েছেন যে, ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে এখন তারা চায় ভাতের অধিকার কেড়ে নিতে! কোথায় তাদের মনোযোগ, সেটা পরিষ্কার!

৫.
বাংলাদেশে শ্রমজীবীদের আন্দোলনের যেকোনো ইস্যুতেই শিক্ষিত সমাজে নানা ধরনের মতামত দেখা যায়। শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির দাবির বিরোধিতা করেও কিছু লোককে কথা বলতে দেখা যায়। এসব মতামত বা অবস্থানের ভিত্তি কি তা যাচাই করা জরুরি। তবে এখানে বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সংগঠনের কিছু মতামতের দিকে মনোযোগ দেয়া যায়। মজুরি বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে গত আগস্ট মাসে নানা আলাপ-আলোচনা হয়। তার মধ্যেই ৫ আগস্ট ২০১৮ সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) পোশাক খাতে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১০ হাজার ২৮ টাকা করার প্রস্তাব তুলে ধরে।
১০ আগস্ট ২০১৮ জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে একটি শ্রমিক সংগঠন ‘কী করে বাঁচে শ্রমিক’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে আলোচকরা বলেন, পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বাড়লে তা গার্মেন্টস শিল্প বিকাশে সহায়ক হবে। এ কারণে গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো উচিত।
৩০ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে ন্যায্য মজুরি দিয়ে শ্রমিকদের সম্মান করতে মালিকদের পরামর্শ দেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান।
একই ধারাবাহিকতায় বর্তমান আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১০ জানুয়ারি ২০১৯, দৈনিক জনকণ্ঠের ‘সম্পাদকীয়’তেও প্রকাশ পায় একই উদ্বেগ। পত্রিকাটি লেখে, এ কথাও স্মরণে রাখতে হবে যে, মালিকপক্ষেরও ছাড় দেয়ার সময় এসেছে। ব্যবসার লক্ষ্যই হচ্ছে মুনাফা অর্জন। কিন্তু সেক্ষেত্রে মানবিকতার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে। সরকার পোশাক শিল্পে ব্যবসায়ীদের বেশ কিছু ছাড় দিয়েছে। এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে বর্তমান সরকার ব্যবসায়ীবান্ধব। এখন ব্যবসায়ীদেরও শ্রমিকদের মজুরি বিষয়ে অনড় অবস্থা থেকে সরে আসতে হবে। কোনো পরিস্থিতিতেই দেশের পোশাক শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না।
১২ জানুয়ারি ২০১৯ দেশের শীর্ষ একজন অর্থনীতিবিদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দেখিয়েছেন যে, মজুরি বাড়ালে শিল্প ধসে পড়ার কোনো কারণ নেই। বরং তথ্য বলছে যে, মজুরি বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মালিকদের আয় বেড়েছে।
কিন্তু এসব তথ্য ও দাবি কি সত্য? শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির কারণে কি মালিকদের আয় বাড়ে? এটা সত্য হলে দুনিয়ার কোথাও মালিক-শ্রমিক বিবাদ হতো না। শ্রমিকের মজুরি বাড়িয়ে মালিক তার আয় বাড়িয়ে নিতেন। অর্থনীতির সাধারণ পাঠ বলে, মালিক যদি শোষণ বাড়াতে চায়, তাহলে তাকে হয় শ্রমঘণ্টা বাড়াতে হবে, অথবা কাজের চাপ বাড়াতে হবে, কিংবা মজুরি কমিয়ে দিতে হবে।
আজকের বিশ্বে শ্রমঘণ্টা বাড়ানো অসম্ভব। ফলে মজুরি কমানো, ছাঁটাই এবং কাজের চাপ বাড়িয়ে দেয়ার কৌশল নানা উপায়ে অনুসরণ করা হয়ে থাকে। একটি অঙ্কের মাধ্যমে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায়। ধরা যাক একটি গার্মেন্টের বার্ষিক মোট উৎপাদনের মূল্য = ৭,২১৩ কোটি টাকা, এখানে জড় পুঁজি/কাঁচামাল ও যন্ত্রের ক্ষয় = ৫,৪০৩ কোটি টাকা, বিকাশমান পুঁজি/মজুরি = ৯৮৭ কোটি টাকা ও উদ্বৃত্ত = ৮২৩ কোটি টাকা।
এখান থেকে শোষণের হারটা বের করতে হবে। সূত্র বলছে, শোষণের হার বের হয় মজুরির অনুপাতে উদ্বৃত্তকে হিসাব করে। অর্থাৎ, জড় পুঁজি বাদ দিলে মালিকের মোট আয় হয় = ১,৮১০ কোটি টাকা। এখান থেকে শ্রমিক পায় ৯৮৭ কোটি টাকা, আর মালিক পায় ৮২৩ কোটি টাকা। সুতরাং ১,৮১০ কোটিতে মালিকের আয় ৮২৩ কোটি টাকা হলে ১০০ টাকায় তার আয় = ৮৩.৪ টাকা। এখানে শোষণের হার = ৮৩.৪ শতাংশ। যার অর্থ হলো, পণ্য উৎপাদনে শ্রমিকের প্রাপ্য যত কম হয়, মালিকের শোষণের হার তত বেশি হয়।
মুনাফার হারটাও এখান থেকে বের করা সম্ভব। সূত্র অনুযায়ী, মুনাফার হার বের হয় উৎপাদনের জন্য খরচের অনুপাতে উদ্বৃত্তকে হিসাব করে। অর্থাৎ, মালিকের মোট খরচ = ৬,৩৯০ টাকা। এখান থেকে মালিক পাচ্ছে = ৮২৩ কোটি টাকা। সুতরাং ১০০ টাকায় মালিক পায় = ১২.৯ টাকা। এখানে মুনাফার হার = ১২.৯ শতাংশ। এর অর্থ হলো, মুনাফার হার তখনই বেশি বাড়বে, যখন উদ্বৃত্তের তুলনায় মোট ব্যয় কমবে। মালিকরা মোট ব্যয় কমাতে গিয়ে যন্ত্রপাতি বা কাঁচামালে বিনিয়োগ কমায় না। তারা চায় শ্রমিকের ব্যয় কমাতে। মুনাফার হার বাড়ানোর এই পদ্ধতির ব্যাপক প্রয়োগ ঘটছে অটোমেশনে।
তাহলে মজুরি বাড়িয়ে মুনাফা বাড়ানোর এই তত্ত্ব কোথা থেকে এলো? তাছাড়া মজুরি বৃদ্ধি করে যদি কারখানার আয় বাড়ে, তার অর্থ দাঁড়ায় মজুরি বৃদ্ধি একটি প্রণোদনা হিসেবে কাজ করেছে এবং এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ে আগের তুলনায় কাজ বেশি হয়েছে। অর্থাৎ কোনো না কোনো উপায়ে কাজের চাপ বাড়ানোর মধ্য দিয়েই মুনাফাটা আসছে।
এটা খুব পরিষ্কার যে, আরও অনেকের মতো এসব পক্ষও শ্রমিকের উচ্চ মজুরির দাবিদার। তারা বলেন, শ্রমিককে উচ্চ মজুরি দেয়া দরকার, কারণ উচ্চ মজুরি দিলেই শিল্পের বিকাশ নিশ্চিত হবে। তারা বোঝাতে চান যে, ভালো মজুরি পেলে শ্রমিকরা শান্ত থাকবে, কাজে মনোযোগ বাড়াবে। এই প্রক্রিয়ায় কারখানা ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। বিশ্বজুড়ে উদারপন্থিরা এরকম ধারণা প্রচার করে থাকেন। এতে যে দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটে তা হলো, শিল্পের বিকাশের জন্য শ্রমিকের মজুরি দরকার। শিল্পের বিকাশটা এখানে প্রধান।
বাস্তবে আমাদের দাবি হওয়া উচিত মালিকের মুনাফা বা শিল্পের ভবিষ্যতের জন্য নয়, শ্রমিকের মজুরি হবে তার দেয়া শ্রমের ভিত্তিতে। শ্রমিক যে পরিমাণ সম্পদ উৎপাদন করেছেন, তার পুরোটা মালিক তাকে এই ব্যবস্থায় দেবে না। অন্তত অধিকাংশটা যেন শ্রমিক পায় সেজন্য কথা বলা দরকার। তা না হলে শ্রমিককে বঞ্চিত করা কোনো মুনাফাখোর শিল্পের দরকার নেই। এখানেও একটা দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটছে, তা হলো, মজুরি হওয়া উচিত শ্রমের ভিত্তিতে। এখানে ন্যায্যতা প্রাধান্য পাচ্ছে, শ্রমিক বা মালিক কাউকে বিশেষভাবে সুবিধা দেয়ার কথা বলা হচ্ছে না।
শ্রমজীবী জনগণ পৃথিবীকে এগিয়ে নেয়, তারা আজকের অবস্থার পরিবর্তন চায়, জগৎকে আরও সামনে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে তারা বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। পৃথিবীর এই সম্মুখযাত্রার সাথী ও বাহন হওয়ায় শ্রমজীবীরা প্রগতিশীল। বিপরীতে প্রতিক্রিয়াশীল হলো তারা, যারা পৃথিবীকে আজকের অবস্থায় বেঁধে রাখতে চায়। যারা বলে আর কোনো পরিবর্তন নয়, বর্তমান ব্যবস্থাই চূড়ান্ত। তারাই প্রতিক্রিয়াশীল, যারা পৃথিবীকে আরও পিছিয়ে দিতে চায় কিংবা আজকের চলমান অনাচার ও অন্যায় ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখে। সে হিসেবে বলা যায়, সমাজে শ্রমিকের বন্ধু হিসেবে যারা পরিচিত, তারা আসলে অনেকেই শ্রমিকের বিকাশের প্রতিবন্ধক।

৬.
আর সবার মতো শ্রমিকেরও বিকাশের মূল শর্তটা হলো স্বাধীনতা। মানুষের মতো বাঁচার উপযোগী মজুরির পাশাপাশি শ্রমিকরা আরও অনেক দাবি তুলেছেন। কিন্তু এই মুহূর্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা হলো দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ ও সংগঠন করার অধিকার। এ দুটো বিষয় ছাড়া কেবল মজুরির আন্দোলন শ্রমিককে এতদিনকার তিমিরেই বেঁধে রাখবে।
আজকের এই আন্দোলন দিনের পর দিন চলবে না। এখন আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শ্রমিকরা বেশ খানিকটা সংগঠিত। তা সত্ত্বেও দেখা গেছে নিরস্ত্র শ্রমিকদের ওপর পুলিশ, বিডিআর হামলা চালিয়েছে। শ্রমিকরা এমন অভিযোগও তুলেছেন যে, কোনো কোনো গার্মেন্টের মালিক স্থানীয়ভাবে মাস্তান পোষে। সেই মাস্তানদের লেলিয়ে দেয়া হচ্ছে শ্রমিকের আবাসস্থলে। যারা সামনের সারিতে থাকছেন তাদের তালিকা করা হচ্ছে।
গতবার যখন মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন হয়েছিল ২০১৩ সালে, তখনও এরকমই ঘটেছিল। ২৯ আগস্ট ২০১৩ এক প্রতিবেদনে বাংলানিউজ ২৪ ডটকম জানায়, ‘প্রতিবাদ, আন্দোলন, মিছিল কোনো কিছুতেই পোশাক শ্রমিকদের ওপর চলমান নির্যাতন বন্ধ করা যাচ্ছে না।’
আলোচিত এই অনলাইন পোর্টালটি জানায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে বা দাবি আদায়ের আন্দোলনে যোগ দিলেই মালিকরা স্থানীয় ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের কাছে শ্রমিকদের কালো তালিকা পাঠিয়ে দেয়। পরবর্তীতে এসব সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের উঠিয়ে নিয়ে যায়, চলে নির্যাতন। কর্মস্থলে না যাওয়ার হুমকির শর্তে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। এমনকি আইনের দ্বারস্থ হলে শ্রমিকদের প্রাণনাশের হুমকি পর্যন্ত দেয়া হয়।
বর্তমান আন্দোলনের প্রেক্ষিতে তাই শ্রমিকদের এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি ২০১৩ সালে দেখা দিয়েছিল। তা প্রতিরোধ করা যায়নি, কোনো প্রতিকার হয়েছে বলেও জানা যায় না। এসব ঘটনায় কোনো গার্মেন্ট মালিকের বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ এনেছেন এমনটাও শোনা যায়নি। সুতরাং এবারও শ্রমিক নির্যাতনের ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। কিন্তু শ্রমিকরা যদি স্বাধীনভাবে সভা-সমিতি করার অধিকার ভোগ করতেন, তাহলে পরিস্থিতি এত খারাপ হতে পারত না। শ্রমিকদের অবশ্যই আট ঘণ্টা শ্রম দিয়ে বাঁচার মতো মজুরি ও সভা-সমিতি করার অধিকার প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় হতে হবে। এটা তাদের মানুষের মতো বাঁচা ও বিকশিত হওয়ার পথ খুলে দেবে।

৭.
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির দিকে নজর দিলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক শ্রমিক আন্দোলন বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। এটি কেবল মজুরি বৃদ্ধির প্রশ্নও নয়। কাছাকাছি সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রমিক আন্দোলন চলছে। পাশের দেশ ভারত থেকে শুরু করে উন্নত বিশ্বের দেশ ফ্রান্স পর্যন্ত এই আন্দোলনের ভারে কম্পমান। বিশ্বজুড়ে শ্রমিকশ্রেণি স্লোগান তুলছে, কেবল টিকে থাকা নয়, মানুষের মতো বেঁচে থাকতে চাই। অনিশ্চয়তা ও হতাশাজনক জীবনের দাসত্ব থেকে মুক্তি চাই।
বিভিন্ন দেশের সরকার ও মালিকপক্ষ মজুরি বা সুযোগ-সুবিধা কিছুটা বাড়িয়ে দিয়ে এই সংকট সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু ব্যাপারটা এত সহজে মিটবে না। বিশ্ব অর্থনীতি আজ যে পথে ধাবমান, শ্রমিকের আন্দোলন তা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। এসব আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এগুলো গড়ে উঠেছে সমাজে ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের বিরুদ্ধে। একদিকে গুটিকয়েক মানুষের হাতে জমা হচ্ছে বিপুল সম্পদ। অন্যদিকে সম্পদ সৃষ্টি করেও, ব্যাপক শ্রম দিয়েও অমানবিক জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ। এই অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পথ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে শ্রমিকরা।
গণবিরোধী অর্থনৈতিক সংস্কার আর শ্রমজীবী জনগণ মেনে নিতে চাচ্ছে না। প্রযুক্তির যে বিকাশ কর্মসংস্থান কমিয়ে দিচ্ছে, তা কার স্বার্থ রক্ষা করে, সেই প্রশ্ন তারা জোরেশোরেই তুলেছেন। কেন বেকারত্ব কমছে না? কোটি কোটি মানুষ এসব সমস্যায় পীড়িত হলেও কেন তার সমাধান না করে উল্টো তাদের ওপর কর চাপানো হচ্ছে? কেন ধনীদের কর হ্রাস করে তাদের সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো হচ্ছে? পৃথিবীর দেশে দেশে জনতা অস্বীকৃতি জানিয়েছে উন্নয়নের এমন পথ ও পদ্ধতি মেনে নিতে।
ফলে বিশ্বজুড়ে এক নতুন সংকট হাজির। এই সংকটটা এক দেশের নয়, গোটা বিশ্ব ব্যবস্থার। বিশ্বজুড়ে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। এর মধ্যেই কিছু মানুষের সম্পদ বাড়ছে। সম্পদ বৃদ্ধির স্রোতে যেন কোনো বাধা না আসতে পারে, তাই মালিকরা শ্রমিকশূন্য কারখানা বানানোর চেষ্টা করছে। ফলে বেকারত্ব বাড়ছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
এসব প্রবণতা নির্দেশ করছে যে, বিশ্ব আবার আর্থিক মন্দার দিকে এগিয়ে চলেছে। পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, মানুষের দৈনন্দিন চাহিদার জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দাম, বেকারত্ব, সব কিছু মিলিয়ে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংকটটা খুব পরিষ্কার। জনগণের কর বৃদ্ধি করে নিজেদের আরও বিপন্ন করা ছাড়া তাদের সামনে খুব কম বিকল্পই রয়েছে। এই আধুনিক যুগে যখন মানুষকে প্রায় পুরোপুরি বাজারমুখী যন্ত্রে পরিণত করা গেছে বলে মনে করা হয়, তখন বিশ্বজুড়ে এমন আন্দোলনের বিকাশ সাম্রাজ্যবাদীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে।
ইতিহাসের শিক্ষা তাদের ভয়ঙ্কর নির্দেশনাই দিচ্ছে। সেটা হলো, যত কঠিন অবস্থাই হোক, জনগণ সঠিক পথ খুঁজে নেবে এবং প্রতিক্রিয়াশীলদের স্থান হবে আঁস্তাকুড়ে।




গ্রেড    ডিসেম্বর ২০১৩-তে ঘোষিত মূল মজুরি    প্রতিবছর মূল মজুরির ৫% ইনক্রিমেন্টের ফলে বিভিন্ন বছরে মূল মজুরি    ২০১৯ এর জন্য সরকার ঘোষিত নতুন মূল মজুরি (টাকা)    মূল মজুরির প্রকৃত হ্রাস বৃদ্ধি (টাকা)
    
    ২০১৪ (টাকা)    ২০১৫ (টাকা)    ২০১৬ (টাকা)    ২০১৭ (টাকা)    ২০১৮ (টাকা)    ২০১৯ (টাকা)       
১    ৮৫০০    ৮৯২৫    ৯৩৭১    ৯৮৪০    ১০৩৩২    ১০৮৪৮    ১০৪৪০    -৪০৮
২    ৭০০০    ৭৩৫০    ৭৭১৮    ৮১০৩    ৮৫০৯    ৮৯৩৪    ৮৫২০    -৪১৪
৩    ৪০৭৫    ৪২৭৯    ৪৪৯৩    ৪৭১৭    ৪৯৫৩    ৫২০১    ৫১৬০    -৪১
৪    ৩৮০০    ৩৯৯০    ৪১৯০    ৪৩৯৯    ৪৬১৯    ৪৮৫০    ৪৯৩০    ৮০
৫    ৩৫৩০    ৩৭০৭    ৩৮৯২    ৪০৮৬    ৪২৯১    ৪৫০৫    ৪৬৭০    ১৬৫
৬    ৩২৭০    ৩৪৩৪    ৩৬০৫    ৩৭৮৫    ৩৯৭৫    ৪১৭৩    ৪৩৭০    ১৯৭
৭    ৩০০০    ৩১৫০    ৩৩০৮    ৩৪৭৩    ৩৬৪৭    ৩৮২৯    ৪১০০    ২৭১

Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
  • পাকিস্তানি গোয়েন্দার চোখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান -শুভ কিবরিয়া
  • যেভাবে বইটি রচিত হলো -শেখ হাসিনা
  • কোন খণ্ডে কি আছে
  • শ্রমিক আন্দোলন : মজুরি বৃদ্ধিই শেষ কথা নয়! -আনিস রায়হান
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.
    বর্তমান সংথ্যা
    পুরানো সংথ্যা
    Click to see Archive
    Doshdik
     
     
     
    Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive