Logo
 বর্ষ ১১ সংখ্যা ৩০ ৪ঠা মাঘ, ১৪২৫ ১৭ জানুয়ারী, ২০১৯ 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
দেশের বাইরে
প্রতিবেদন
 
http://sadiatec.com/
ইয়োলো ভেস্ট মুভমেন্ট : পথ দেখাচ্ছে ফরাসি জনগণ -আনিস রায়হান  
উন্নত অর্থনীতির দেশ ফ্রান্সে এখন চলছে অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা। সেখানকার শ্রমিকশ্রেণি ও নিম্ন আয়ের মানুষ গত অক্টোবরের (২০১৮) মাঝামাঝি এক আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়। যা ক্রমান্বয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভে যুক্ত হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। পুলিশের হামলা, গ্রেপ্তার, প্রেসিডেন্টের আশ্বাস ও ভুল স্বীকার, কোনো কিছুই পিছু হটাতে পারেনি আন্দোলনকারীদের। তারা সে­াগান তুলেছেন, ‘আমরা বাঁচতে চাই, শুধুমাত্র টিকে থাকতে চাই না।’
ফ্রান্সের ৪১ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এতদিন পর্যন্ত নিজেকে অনমনীয় ও দৃঢ় সংকল্পের অধিকারী একজন অর্থনৈতিক সংস্কারক হিসেবে পরিচিত করে তুলেছিলেন। কিন্তু জনতা তার লাগাম টেনে ধরল। সাবেক এ ব্যাংকার ২০১৭ সালের মে মাসের নির্বাচনে ৬৬ দশমিক ১ শতাংশ ভোট পেয়ে ফ্রান্সের সবচেয়ে কম বয়সী প্রেসিডেন্ট হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। কিন্তু দেড় বছর না পেরোতেই ইতোমধ্যে জনতা তাকে যেন ছুড়ে ফেলেছেন। গত এপ্রিলে ম্যাক্রোর জনপ্রিয়তা ৫৯ শতাংশ থাকলেও তাতে নাটকীয় ধস নেমেছে। গত সপ্তাহের এক জরিপ বলছে, প্রেসিডেন্টের প্রতি নাখোশ হয়ে উঠেছেন ফ্রান্সের ৭৫ ভাগ মানুষ। তার মন্ত্রীদের প্রতিও নামমাত্র আস্থা নেই ফরাসি নাগরিকদের। শুধু তাই নয়, ম্যাক্রোঁর নীতির বিরুদ্ধে চলা বর্তমান আন্দোলনের মতো তীব্র কোনো গণআন্দোলন ফরাসি সমাজে গত ৫০ বছরেও দেখা যায়নি।
ইতোমধ্যে ফ্রান্স ও ইউরোপের গণ্ডি পেরিয়ে এই আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। পৃথিবীর দেশে দেশে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন দিন দিন কঠিন হচ্ছে। দেশে দেশে বেড়ে চলেছে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব। উন্নয়ন ও সংস্কারের নামে মানুষের সীমিত যেসব অধিকার রয়েছে, সেগুলো কাটছাঁট করা হচ্ছে। দেশে দেশে সম্পদ সৃষ্টির হার বাড়লেও সমাজের বিপুল মানুষ তার অংশীদারত্ব পাচ্ছে না, গুটিকয়েকের হাতে চলে যাচ্ছে তা, বেড়ে যাচ্ছে বৈষম্য। গণমানুষের অনিশ্চয়তা বেড়েই চলেছে। ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নেই, নেই কাজের নিশ্চয়তা। এই পরিবেশ যখন জেঁকে বসছে, যখন এর কোনো সমাধানের পথ দেখা যাচ্ছিল না, তখন রাস্তা খুলে দিয়েছেন ফরাসি জনগণ।

২.
ঘটনার শুরু ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে। পরিবেশ বাঁচানোর কথা বলে নতুন বছরের প্রথম দিন থেকে জ্বালানি কর বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর প্রশাসন। এছাড়া পুরনো গাড়ি থেকে বেশি ধোঁয়া বের হয় বলে সেগুলো ব্যবহারে জরিমানারও প্রস্তাব করা হয়েছিল। সরকারের প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে প্রতি লিটার ডিজেলে ৬ দশমিক ৫ সেন্ট এবং পেট্রলে ২ দশমিক ৯ সেন্ট করে দাম বেড়ে যেত। এছাড়া শহরতলি ও গ্রামে বাস করা গরিব মানুষের পুরনো গাড়ির জন্য অনেক জরিমানা গুনতে হতো।
পরিবেশকে ঢাল বানানো হলেও বাস্তবে ফ্রান্সে জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি নতুন কিছু ছিল না। দেশটিতে ধারাবাহিকভাবে জ্বালানির দাম বেড়ে চলেছে, গত ১২ মাসে বেড়েছে ২৩ শতাংশ। ২০১৮ সালে ম্যাক্রোঁর সরকার হাইড্রোকার্বনে কর বাড়ায়। এতে প্রতি লিটার ডিজেলে ৭ দশমিক ৬ সেন্ট এবং পেট্রলে ৩ দশমিক ৯ সেন্ট করে খরচ বেড়েছে ভোক্তাদের। এর মধ্যেই ঘোষণা দেয়া হয় ২০১৯ সালের শুরু থেকে ডিজেল ও পে-ট্রলের দাম আরও বাড়বে। এর বিরুদ্ধে অক্টোবরের মধ্যভাগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রথমে একটি পিটিশন ছড়িয়ে পড়ে। তাতে স্বাক্ষর করেন তিন লাখেরও বেশি মানুষ।
শুরুর দিকে কিছু শহরতলিতে প্রতিবাদ হলেও নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহেও এটা তেমন কিছু ছিল না। সরকারও একে তেমন একটা পাত্তা দেয়নি। কিন্তু ১৭ নভেম্বর এ আন্দোলন চরম রূপ ধারণ করে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে বিবিসি অনলাইনের খবরে জানানো হয়, ২ লাখ ৮০ হাজার মানুষ ফ্রান্সজুড়ে সেদিন বিক্ষোভে অংশ নেয়। ক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ চড়াও হয়, আহত হন ২২৭ জন। সেদিন ৫২ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর থেকে প্রতি শনিবার এই আন্দোলনের সমর্থনে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে লোকজন নেমে আসছে।
এ সপ্তাহেও রাস্তায় ছিল মানুষ। আন্দোলন অষ্টম সপ্তাহ পূর্ণ করেছে। ছুটির দিনের এই আন্দোলন শুরুর তুলনায় এখন একটু স্তিমিত। এ সপ্তাহে প্রায় ৩৪ হাজার মানুষ আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। আইনত প্রত্যেক ফরাসি গাড়িচালককে জ্বলজ্বলে হলুদ জ্যাকেট গাড়িতে রাখতে হয়। এই জ্যাকেট পরে বিক্ষোভ করার কারণে গণমাধ্যমে এটা ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন নামে পরিচিতি পেয়েছে। প্রথম দিকে আন্দোলনের ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ছিলেন নিশ্চুপ। কয়েক সপ্তাহ তিনি অনমনীয় অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। যদিও জরিপগুলো জানায়, ফ্রান্সের ৭০ শতাংশের মতো মানুষ এ আন্দোলন সমর্থন করেন।

৩.
প্রাথমিকভাবে জ্বালানি কর বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হলেও ধীরে ধীরে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, সর্বনিম্ন অবসর সুবিধা, কর ব্যবস্থার পরিবর্তন ও অবসরকালীন বয়সসীমা কমানোসহ অন্তত আরও ৪০টি দাবি তুলে ধরে আন্দোলনকারীরা। আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, নতুন প্রেসিডেন্ট কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও কর হ্রাসের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে করছেন তার উল্টোটা। তিনি গরিব মানুষের মনোভাব অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু ঠিকই রক্ষা করে চলেছেন ধনীদের। তাই তাকে এলিটদের প্রেসিডেন্ট নামেও ডাকা হচ্ছে। আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার, জনমতকে গুরুত্ব না দেয়ার জন্য প্রেসিডেন্টকে দায়ী করা হচ্ছে। এলিটবান্ধব অভিহিত করে তার গৃহীত সংস্কার কার্যক্রম বন্ধের ডাক দেয়া হয়েছে।
ব্যাপক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে প্রথমে প্রেসিডেন্টের প্রশাসন আরোপিত জ্বালানির ওপর আরোপিত নতুন কর কয়েক মাস স্থগিতের ঘোষণা দেয়। ৪ ডিসেম্বর টেলিভিশনে দেয়া এক ভাষণে জ্বালানি করের প্রস্তাব ছয় মাস পিছিয়ে দেয়ার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী ফিলিপ। এছাড়া পুরনো গাড়ি ব্যবহারে যে জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছিল, সেটিও তিন মাসের জন্য স্থগিত করার সিদ্ধান্ত জানায় সরকার। কিন্তু কর একবারেই বিলোপ করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েও বিক্ষোভ থামানো যায়নি।
১০ ডিসেম্বর ২০১৮ প্রেসিডেন্টের রাষ্ট্রীয় ভবন এলিসি প্যালেস থেকে টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেয়া ১৫ মিনিটের ভাষণে ম্যাক্রোঁ বলেন, (উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য) আমি দায়িত্ব স্বীকার করে নিচ্ছি। পরিস্থিতির মোড় ঘোরাতে তিনি একগুচ্ছ নতুন প্রতিশ্রুতির ঘোষণা দেন। জ্বালানির ওপর আরোপিত কর বাতিল ছাড়াও ফরাসি প্রেসিডেন্ট যেসব উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছেন, তার একটি হলো ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১০০ ইউরো বাড়ানো। আগে ন্যূনতম মাসিক মজুরি করসহ ১ হাজার ৪৯৮ ও কর বাদে ছিল ১ হাজার ১৮৫ ইউরো। ম্যাক্রোঁ সরকার মজুরি বৃদ্ধির দাবি অনেকদিন ধরেই নাকচ করে আসছিল। তাদের বক্তব্য ছিল, মজুরি বাড়ালে চাকরির সুযোগ বাড়বে তো না-ই, বরং কমবে।
নতুন ঘোষণায় আরও আছে, নিম্ন আয়ের অবসর ভাতা গ্রহণকারীদের জন্য পরিকল্পিত কর বৃদ্ধি বাতিল করা হবে। এ ছাড়া নিয়োগকর্তারা কর্মীদের বছরে একটি করমুক্ত বোনাস দেবেন। জানানো হয়, এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকারের ব্যয় বাড়বে ৮০০ কোটি থেকে ১০০০ কোটি ইউরো। অনমনীয় প্রেসিডেন্ট আন্দোলনের মুখে নরম হলেও ধনীদের ব্যাপারে তার নমনীয়তা তখনও বেশিই ছিল। তাই ধনীদের ওপর কর বাড়ানোর কোনো ঘোষণা দেননি ম্যাক্রোঁ। তিনি বলেন, ‘এটা করলে ফ্রান্স দুর্বল হয়ে পড়বে। কারণ, ফ্রান্সের এখন কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।’ কিন্তু ঠিকই শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত জনগণের অর্থনৈতিক দুর্দশা প্রতিরোধের এ আন্দোলন ঠেকাতে ম্যাক্রোঁ সেদিনের ভাষণে দেশে অর্থনৈতিক-সামাজিক জরুরি অবস্থা জারি করেন। এরপর থেকে আন্দোলনকারীদের ওপর দমন, নিপীড়ন, ধরপাকড় বেড়েছে।

৪.
তরুণ ম্যাক্রোঁর প্রেসিডেন্ট হওয়াটা ছিল অভাবিত। মূলত বড় ধনীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো তার পক্ষ নিয়েছিল। উগ্র জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে তিনি ইইউ নেতৃবৃন্দেরও আস্থা কুড়িয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে  ট্রাম্পের জয়, ব্রিটেনের ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়া, ফরাসি সমাজে ডানপন্থি বর্ণবাদী শক্তির উত্থান এবং ফরাসিদের একলা চলার ভয়ই ম্যাক্রোঁকে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে সাহায্য করে। ম্যাক্রোঁ বাণিজ্যের মানুষ, আগে ছিলেন ব্যাংকার। কাজ করেছেন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর হিসেবে পরিচিত রথচাইল্ড অর্থনৈতিক পরিবারের রথচাইল্ড ব্যাংকে। ফরাসি সরকারের অর্থনৈতিক বিভাগে কাজ করেছেন। ওঁলাদ সরকারের মন্ত্রীও ছিলেন তিনি। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে নির্বাচনের পরিকল্পনা করেন।
কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও সরকারের ব্যয় কমানোটাই ছিল ম্যাক্রোঁর কেন্দ্রীয় সে­াগান। কিন্তু ক্ষমতায় এসেই তিনি বড় ধনীদের সুবিধা দিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। কর্পোরেট কর হ্রাস করে জাতীয় অর্থনৈতিক উদ্যোগের ঘোষণা দেন। অভিযোগ ওঠে, এতে ধনীরা ছাড় পাচ্ছে এবং জাতীয় অর্থনৈতিক উদ্যোগের নামে জনগণের ভর্তুকির টাকা ধনীদের পকেটে ঢুকানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। বড় ধনীদের প্রতিনিধি হিসেবে চিহ্নিত হন ম্যাক্রোঁ।
জনগণ দেখেন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, করের বোঝা কমানো, বেকারত্ব লাঘব, কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ঠিকই ধনীদের কর কমাচ্ছেন আর গরিবদের ওপর একের পর এক বোঝা চাপাচ্ছেন। সংস্কারের নামে পেনশনের আয় কমিয়ে দেয়া, রেলকর্মীদের অবসরের বয়স বাড়ানো, আরও বেশি করারোপ, ব্যয় সংকোচন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, ব্যাপক চাকরিচ্যুতি, গণছাঁটাই, শ্রমিক ও চাকরিজীবীদের বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা কেটে নেয়া, ছাত্রছাত্রীদের মহার্ঘ ভাতা কেটে নেয়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি নির্বিচারে প্রয়োগ করা হচ্ছে। পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এবং রাষ্ট্রীয় শক্তির জোরে তিনি উদ্ধত ও কর্তৃত্বপরায়ণ মনোভাব প্রদর্শন শুরু করেছিলেন।
এসবের বিপরীতে ফরাসি জনগণ চুপ ছিলেন না। শ্রম আইন পরিবর্তনের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে বেশ কয়েকটি ধর্মঘট ও বিক্ষোভ হয়েছে। বড় বিক্ষোভ করে রেল শ্রমিকরা। সরকারি রেল কোম্পানি এসএনসিএফ-এর সংস্কারের পরিকল্পনা নেয় সরকার। বর্তমান আইনে এসএনসিএফের কর্মীদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতি বছর বেতন বৃদ্ধি পায়, আগেভাগে অবসরে যাওয়াসহ বছরে ২৮ দিনের সবেতন ছুটির সুযোগ মেলে। স্থায়ী চাকরিরতদের বরখাস্তের নিয়ম ছিল না। আবার কর্মীদের নিকটাত্মীয়দের জন্য বিনা ভাড়ায় রেল ভ্রমণের সুযোগ ছিল। সংস্কারের আওতায় শ্রমিকদের এসব সুযোগ-সুবিধা কমানোর উদ্যোগ নেয় ম্যাক্রোঁ সরকার। শ্রমিকদের অভিযোগ, সংস্কারের কথা বলে কার্যত এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় খাতগুলোকে বেসরকারিকরণের পথে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।
এই আন্দোলনের পর অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির আওতায় নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও ছাঁটাইয়ের বিধি নমনীয় করা থেকে পিছু হটে সরকার। কিন্তু ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে কড়া নিয়ম থাকলেও স্বল্প সময়ের চাকরির নতুন নিয়ম চালু করা হয়। ঠিকে শ্রমিক নিয়োগ দেয়া হলে কেবল মজুরি দিলেই চলবে। এভাবে মজুরির আনুষঙ্গিক ব্যয় থেকে মালিকদের মুক্তি দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া হয়। বলা হয়, এর ফলে নিয়োগকারীরা কর্মীদের যোগ্যতা যাচাই করার যথেষ্ট সময় পাবেন। সরকারের এই মনোভাব শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিরাট বাধা। সরকার ছাঁটাইয়ের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় কর্মপরিবেশ ও এ সংক্রান্ত অধিকার লঙ্ঘনের হার বেড়ে গেছে।
তা সত্ত্বেও ব্যয় কমাতে ও ছাঁটাই সংক্রান্ত নিয়ম শিথিল করতে আরও সংস্কারের প্রস্তুতির কথা জানায় ফরাসি সরকার। সরকারের মনোভাবের প্রকাশ মেলে একজন শীর্ষ অর্থনীতিবিদের মন্তব্যে। আর্থিক সংস্কার প্রসঙ্গে মিশেল রুইমি বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ দিতে করের ক্ষেত্রে আরও ছাড়ের প্রয়োজন। সরকারকেও মজুরির সঙ্গে যুক্ত আনুষঙ্গিক ব্যয় কমাতে হবে। সেইসঙ্গে প্রশিক্ষণ ও ধারাবাহিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে? একমাত্র এভাবেই প্রতিযোগিতার বাজারে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য টিকে থাকতে পারবে।’
কিন্তু জনগণ এর বিপরীতে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ নিতে সরকারকে আহ্বান জানায়। ন্যূনতম মজুরির পরিমাণ বৃদ্ধি এবং অতীতে উচ্চবিত্তদের উপর যে ‘সম্পদ কর’ ধার্য ছিল সেটি আবারও ফিরিয়ে আনার দাবি তোলা হয়। ম্যাক্রোঁ প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এই কর বাতিল করে দিয়েছিলেন। এর পক্ষে তার যুক্তি ছিল, ধনী ব্যক্তিরা এতে উৎসাহী হয়ে বিনিয়োগ বাড়াবে, যা নতুন চাকরির ক্ষেত্র তৈরি করবে। সে সময় লোকে তাকে ধনিকশ্রেণির প্রেসিডেন্ট উপাধি দেন।
২০১৮ সালের মার্চ ও এপ্রিলে প্রেসিডেন্টের সংস্কারের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে শ্রমিকরা। এরপর মে মাসে একই দাবিতে কালো জ্যাকেট পরে বিক্ষোভ করেন ফরাসিরা। প্যারিসে মে দিবসের শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে কয়েক দফা ধর্মঘটের মাইলফলক পেরিয়ে অবশেষে জ্বালানি করের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমে সরকারকে চাপে ফেলতে সমর্থ হলেন আন্দোলনকারীরা।

৫.
ফরাসি জনগণের এই আন্দোলন বেশকিছু দিক থেকে অনন্য। সারা পৃথিবীর মানুষের জন্য এখান থেকে শিক্ষা নেয়ার রয়েছে। কারা এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করছেন? বিক্ষোভকারীরা আসছেন ফ্রান্সের শহরতলি ও গ্রামাঞ্চল থেকে। স্বল্প আয়ের সাদারা এই আন্দোলনের মূল শক্তি। এরা অধিকাংশই শ্রমজীবী ও পেশাজীবী নারী-পুরুষ। ক্লার্ক, সেক্রেটারি, আইটি কর্মী, ফ্যাক্টরি কর্মী, সেবা ও স্বাস্থ্য খাতে কাজ করা মানুষ। বয়স্ক পেনশনধারী ও সিঙ্গেল মায়েদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন সংস্থার জরিপে এসেছে দেশটির অন্তত ৭৫ ভাগ মানুষ এ আন্দোলন সমর্থন করেন।
এই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি গড়ে উঠেছে সমাজে ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের বিরুদ্ধে। একদিকে গুটিকয়েক মানুষের হাতে জমা হচ্ছে বিপুল সম্পদ। অন্যদিকে সম্পদ সৃষ্টি করেও, ব্যাপক শ্রম দিয়েও অমানবিক জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ। এই পরিস্থিতি চলছে তো চলছেই। ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পথ স্মরণ করিয়ে দিল।
পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় সহায়তায় ধনীদের স্বার্থ রক্ষা একটি সাধারণ ঘটনা। জনগণের করের টাকা থেকে এমন সব উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় যে, ধনীরা তা থেকে সুবিধা পায়। তাদের কর ছাড় দেয়া হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রণোদনা, আর্থিক সুবিধা দেয়া হয়। সরকারি সম্পত্তি বেসরকারিকরণের মাধ্যমে বড় ধনীদের হাতে তুলে দেয়া হয়। বড় ধনীরা রাজনৈতিক দলে ও সরকারে নিজেরা অংশগ্রহণ করে বা তাদের প্রতিনিধিদের পাঠিয়ে কিংবা সরকারকে প্রভাবিত করে এসব সুবিধা হাতিয়ে নেয়। ফরাসি জনগণ জানিয়ে দিল, গরিবের শ্রমে সৃষ্ট সম্পদ দিয়ে পুঁজিপতিদের তোষণ আর চলতে পারে না।
গণবিরোধী অর্থনৈতিক সংস্কার আর ফরাসি জনগণ মেনে নিতে চাচ্ছে না। প্রযুক্তির যে বিকাশ কর্মসংস্থান কমিয়ে দিচ্ছে, তা কার স্বার্থ রক্ষা করে, সেই প্রশ্ন তারা জোরেশোরেই তুলেছেন। গুটিকয়েক মালিকের মুনাফার জন্য রাষ্ট্র কেন কর্মসংস্থান কমানোর প্রযুক্তিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে! কেন উৎপাদনের খরচ কমাতে কারখানাগুলো বিদেশ যায়, যাচ্ছে? কেন বেকারত্ব কমছে না? কোটি কোটি মানুষ এসব সমস্যায় পীড়িত হলেও কেন তার সমাধান না করে উল্টো তাদের ওপর কর চাপানো হচ্ছে? কেন ধনীদের কর হ্রাস করে তাদের সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো হচ্ছে? উন্নয়নের এমন পথ ও পদ্ধতি মেনে নিতে ফরাসি জনগণ অস্বীকার করেছেন।
ঔদ্ধত্য ও কর্তৃত্বপরায়ণ শাসন বর্তমান বিশ্বে বেড়েই চলেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্ষমতায় আসছে কট্টরপন্থি শাসকরা। এমনকি উদারপন্থি হয়েও ম্যাক্রোঁও তাদের পথই ধরলেন। ফরাসি জনগণ রাষ্ট্রের সেবকের এমন আচরণ মেনে নিতে রাজি নয়। তারা প্রেসিডেন্টকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ফরাসি জনগণের ঐতিহ্যের কথা। প্রেসিডেন্টের কর্তৃত্বপরায়ণ মানসিকতার বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানামুখী প্রচার চালাচ্ছেন। এমনকি ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের অধিকাংশ ঘটনা ঘটেছে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের আশপাশের এলাকায়। আন্দোলনকারীরা প্রাসাদের দিকে বারবার এগোনোর চেষ্টা করেছেন এবং প্রেসিডেন্টকে উচিত শিক্ষা দেয়ার মনোভাব ব্যক্ত করেছেন।
প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থার চিত্রটি এই আন্দোলনেও দেখা গেল। কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, জনগণ বিদ্যমান ও শক্তিশালী হিসেবে পরিচিত রাজনৈতিক দলগুলোকে ছুড়ে ফেলছে। মাঝেমধ্যেই তারা অপেক্ষাকৃত নতুন রাজনৈতিক শক্তি বা নেতৃত্বকে সমর্থন দিচ্ছে। ম্যাক্রোঁও সেই হিসেবেই উঠে এসেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তিনি রাজনীতির চলমান সংস্কৃতিই রক্ষা করলেন। আগের শাসকদের চেয়ে নতুন কিছু করলেন না। ফলে তাকে ছুড়ে ফেলে দিতেও ফরাসিদের বেশি সময় লাগল না। পাশাপাশি আন্দোলনকারীরা অপরাপর রাজনৈতিক দল ও ট্রেড ইউনিয়নসহ মূল ধারার গণমাধ্যমের প্রতিও অনাস্থা জানিয়েছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পরিবর্তনকামীরা নিশ্চয়ই ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের এসব বৈশিষ্ট্য থেকে শিক্ষা নেবেন।

৬.
বিশ্বজুড়ে এখন অটোমেশনের হাওয়া বইছে। ফ্রান্সের বর্তমান সংকটের সঙ্গে এর সম্পর্ক আছে। ফরাসি সরকার আন্দোলনের দাবির মুখে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর কথা বললেও তা বাস্তবায়ন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। ক্ষোভ চাপা দিতে তাৎক্ষণিক যেসব উদ্যোগ নেয়া হবে, তার প্রভাব খুব অল্প সময় বজায় থাকবে।
ফরাসি সরকারের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সে বেকারত্বের হার বর্তমানে ৯ দশমিক ২ শতাংশ। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ইংল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসে ৫ শতাংশ ও জার্মানিতে ৪ শতাংশ। ২০১২ সালের একটা হিসাব বলছে ২০০৪ থেকে ২০১২, এই আট বছরে ফ্রান্সে সাড়ে চার লাখ মানুষ চাকরি খুঁইয়েছে। এর বড় কারণ, শ্রমের খরচ বাঁচাতে ফ্রান্সের চৌহদ্দি ছেড়ে অপেক্ষাকৃত অনুন্নত দেশের উদ্দেশে উৎপাদন-শিল্পের নিষ্ক্রমণ। বর্তমান আন্দোলনের আগে গত কয়েক বছর ধরে ফরাসি সমাজে চালিত জরিপগুলোতে বেকারত্বের বিষয়টি দীর্ঘদিন পর্যন্ত সর্বোচ্চ উদ্বেগের জায়গায় ছিল।
ম্যাক্রোঁর সরকার বলছে, তারা কর্মসংস্থান বাড়াবে। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথ তা বলে না। যুক্তরাজ্যভিত্তিক বৃহৎ হিসাবরক্ষক সংস্থা ‘প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপার্স’ (পিডব্লিউসি) ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘রোবট কি সত্যিই আমাদের চাকরি চুরি করবে?’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যে পরিমাণ মানুষ কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত আছেন, তাদের মধ্যে কী পরিমাণ লোক কাজ হারাবেন, তার একটি হিসাব দেয়ার চেষ্টা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিবেদনে অটোমেশনের প্রভাবকে তারা তিনটি ওয়েভ বা ঢেউয়ে বিভক্ত করেছে। বলা হয়েছে, অ্যালগরিদম ওয়েভ দিয়ে ২০-এর দশকের শুরু। এ সময় বর্তমান কর্মজীবী পুরুষদের ২ ও নারীদের মধ্যে ৪ শতাংশ কাজ হারাবে। দ্বিতীয় ধাপে ২০-এর দশকের শেষভাগে দেখা যাবে অগমেন্টেশন ওয়েভ। তখন কর্মহানির অনুপাতটা হবে পুরুষ ১৬ ও নারী ২৩ শতাংশ। তৃতীয় ধাপে ৩০-এর দশকের মধ্যভাগে আসবে অটোনমি ওয়েভ। এখনকার কর্মজীবী পুরুষদের ৩৫ ও নারীদের ২৬ শতাংশেরই তখন কোনো কাজ থাকবে না।
প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপার্স জানিয়েছে, উপরের তিন ঢেউয়ের প্রথম ধাক্কাতেই ফ্রান্সে বর্তমান কর্মজীবীদের ৪ শতাংশ কাজ হারাবেন। দ্বিতীয় ধাক্কায় এটা উন্নীত হবে ২২ শতাংশে। আর তৃতীয় ধাক্কার সময় দেখা যাবে এখনকার কর্মজীবীদের মধ্যে ৩৭ শতাংশই কর্মহীন হয়ে গেছেন।
ফ্রান্সে বিভিন্ন খাতে কীভাবে অটোমেশনের প্রভাব পড়বে সেই চিত্রও তুলে ধরেছে পিডব্লিউসি। তাদের হিসাবে, ইউরোপের উন্নত এই দেশটির ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের ৫৩ শতাংশ শ্রমিক আছে অটোমেশনের ঝুঁকিতে। তেমনি পাইকারি ও খুচরা কেনাবেচার কাজে নিয়োজিতদের ৪১ শতাংশ, স্বাস্থ্য ও সমাজকর্মে নিয়োজিতদের ২৯ শতাংশ, শিক্ষায় ১৭ ও নির্মাণশিল্পের ৪১ শতাংশ শ্রমিক কাজ হারানোর উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
ফরাসি সমাজে কাজ খোয়ানোর ধারায় কারা এগিয়ে থাকবে সেই হিসাবও দিয়েছে পিডব্লিউসি। তরুণদের মধ্যে ৪২ শতাংশ, মধ্যবয়স্কদের ৩৫ ও বয়স্কদের মধ্যে ৪০ শতাংশের কাজ থাকবে না। তবে উচ্চশিক্ষিতদের ঝুঁকি কম হবে। এদের ১৪ ভাগের কাজ থাকবে না। কিন্তু মধ্যম শিক্ষিতদের ৪১ ও স্বল্প শিক্ষিতদের ৫১ শতাংশই কাজ হারাবেন।
২০১৭ সালে প্রকাশিত ম্যাকিনজি গ্লোবাল ইনস্টিটিউশনের গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, আমেরিকা এবং জার্মানির এক-তৃতীয়াংশসহ পৃথিবীব্যাপী প্রায় ৮০ কোটি মানুষ ২০৩০ সালের মধ্যে চাকরিশূন্য হবে। ৩০ শতাংশেরও বেশি কর্মঘণ্টা স্বয়ংক্রিয় মেশিন বা রোবটের আওতায় চলে যাবে। চাকরি হারানো মানুষকে যে শুধু নতুন চাকরি খুঁজতে হবে তা নয়, তাদের মধ্যে প্রায় ৩৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষকে নিজেদের পেশা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো পেশা গ্রহণ করতে হবে।
আন্দোলনকারীদের দাবির মুখে ম্যাক্রোঁ বলছেন, ছাঁটাই ও শ্রমিক অধিকার সংকুচিত করা হবে না। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তিনি যা করতে শুরু করেন, এই ঘোষণা তার বিপরীত। ম্যাক্রোঁর সমস্ত পদক্ষেপ ছিল বিশ্বব্যাংকের এজেন্ডার অনুকূল। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ২০১৯ সালের বিশ্ব উন্নয়ন প্রবণতা সম্পর্কিত ‘কাজের পরিবর্তনশীল প্রকৃতি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে যুক্তি তুলে ধরা হয় যে, প্রযুক্তির কারণে পুরনো শ্রমবাহিনী বদলে যাচ্ছে, নতুন শ্রমিক তৈরি হচ্ছে। কিন্তু বিদ্যমান বিধিবিধানের কারণে নিয়োগকর্তারা পুরনো শ্রমিকদের সরাতে ও নতুন শ্রমিকদের কাজ দিতে পারছে না।
বিশ্বব্যাংক ওই প্রতিবেদনে বিদ্যমান শ্রমিক সুরক্ষা হ্রাসে বেশকিছু পথও বাতলে দিয়েছে। যেমন, কম শ্রমিকের প্রবিধান থাকতে হবে, ন্যূনতম মজুরির আবশ্যিকতা নির্মূল করতে হবে। নিয়োগকর্তাকে জরুরি প্রয়োজনে ছাঁটাইয়ের সুযোগ দিতে হবে। চুক্তির শর্তাদিতে সুযোগ-সুবিধাসীমিত করতে হবে। দেশে দেশে শ্রম ও কর্মসংস্থান সংশ্লিষ্ট আইন, নীতি ও প্রবিধানমালায় এরকম নানা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক। ম্যাক্রোঁ এতদিন সেই নীতিই বাস্তবায়ন করেছেন। বিশ্বব্যাংকের এজেন্ডা বাস্তবায়নের এই ধারা দেখিয়ে দেয় যে, তিনি নিজ দেশের জনগণের প্রয়োজন নয়, পশ্চিমা বিশ্বের বৃহৎ কর্পোরেট ও সম্পদশালী গোষ্ঠীগুলোর এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত আছেন। ফলে মিঠে কথা বলে সংকট এড়ানো গেলেও সমস্যার সমাধান হবে না, ওই সংকট আবার ফিরে আসবে।

৭.
সংকটটা একা ফ্রান্সের নয়, ফরাসি প্রেসিডেন্টও একা নন। বিশ্বজুড়ে মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। জনগণের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। এর মধ্যেই কিছু মানুষের সম্পদ বাড়ছে। সম্পদ বৃদ্ধির স্রোতে যেন কোনো বাধা না আসতে পারে, তাই তারা শ্রমিকশূন্য কারখানা বানানোর চেষ্টা করছেন। ফলে বেকারত্ব বাড়ছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এটা নির্দেশ করছে যে, বিশ্ব আবার আর্থিক মন্দার দিকে এগিয়ে চলেছে।
পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, মানুষের দৈনন্দিন চাহিদার জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দাম, বেকারত্ব, সব কিছু মিলিয়ে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনমানসে যে তীব্র ক্ষোভ, তার প্রকাশ ঘটেছে ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকারের বিরুদ্ধে। বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো আর্থিক সংকটের প্রেক্ষিতে ধনীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করছে আর গরিবদের ওপর আরও করের বোঝা চাপাচ্ছে। কট্টরপন্থি  ট্রাম্প, পুতিন, থেরেসা মে’র সঙ্গে উদারপন্থি ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বা অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের মধ্যে এক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য নেই। ট্রাম্প-পুতিন যেমন অস্ত্রের ক্ষমতা বাড়াচ্ছেন, থেরেসা মে, শি জিনপিংরা চান তাদের ক্ষমতা আরও বিস্তৃত করতে, তেমনি মার্কেল আর ম্যাক্রোঁও চাইছেন ইউরোপীয় সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে। দুনিয়াটাকে আরও বড় সংকটের মুখে ঠেলে দিতে এদের কারও আপত্তি নেই।
এটা পরিষ্কার যে, সংকটটা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার। এটা কট্টর, ডান, মধ্যম বা বাম, উদারদের সমস্যা নয়। ফরাসি প্রেসিডেন্ট একা নন, সকল পুঁজিবাদী দেশের শাসকরাই এ সংকটের অংশ। বিশ্বকে এরা সবাই মিলেই হাতে ধরে এই জায়গায় নিয়ে এসেছেন। আগামী কয়েক বছরে আর্থিক মন্দা তীব্র হতে পারে বলে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা। এই শাসকরা তাই ভয় পাচ্ছেন, জনগণ এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে। ফ্রান্সের আন্দোলন বিশ্ববাসীকে পথ দেখাতে পারে। ব্রেক্সিটের ইস্যু ধরে এমন বিক্ষোভ ব্রিটেনেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট।
সব দেশের শাসকরা এই আন্দোলনের অবসান চায়। তবে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন এখনও চলমান। এই আন্দোলন এ দফায় আবারও শক্তি ধারণ করতে পারে। সরকারের দমনপীড়ন বাড়লে সেরকম সম্ভাবনাই বেশি। তবে দাবি আদায়ের ফলে এ দফার আন্দোলন ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে গেলেও আবারও তা ফিরে আসবে। কারণ আন্দোলনের শর্তগুলো এখনও বিরাজ করছে। একই শর্ত যেহেতু দেশে দেশে রয়েছে, তাই আন্দোলন আরও হবে। আগামী দিনগুলোতে বৈষম্য ও অনিশ্চয়তা যত তীব্র হবে, গণমানুষের ক্ষোভের প্রতিফলনও তত বেশি ঘটবে।
ফরাসি লড়াকুরা আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করেছেন। সরকারের কর্তৃত্ব ও ঔদ্ধত্যকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। সংগঠিত জনগণের শক্তি কী তা আবারও দেখিয়ে দিয়েছেন। আন্দোলনের বাইরে যে বিশ্বে শান্তি আনার অন্য কোনো পথ নেই, এই আন্দোলন সেটাও স্পষ্ট করে দিয়েছে। শাসকরা গায়ে খাটা মানুষগুলোর মুখ থেকে কোনো কথা শুনতে রাজি নয়। তারা পুলিশ দিয়ে ভয় দেখায় আর আইন দিয়ে মানুষকে আটকাতে চায়। কিন্তু জনতা রুখে দাঁড়ালে তারা নত হতে বাধ্য হয়। ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনে সৃষ্ট এসব নজির সম্ভাবনার পথই দেখাচ্ছে।
Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
  • পাকিস্তানি গোয়েন্দার চোখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান -শুভ কিবরিয়া
  • যেভাবে বইটি রচিত হলো -শেখ হাসিনা
  • কোন খণ্ডে কি আছে
  • শ্রমিক আন্দোলন : মজুরি বৃদ্ধিই শেষ কথা নয়! -আনিস রায়হান
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.
    বর্তমান সংথ্যা
    পুরানো সংথ্যা
    Click to see Archive
    Doshdik
     
     
     
    Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive