Logo
 বর্ষ ১১ সংখ্যা ৩০ ৪ঠা মাঘ, ১৪২৫ ১৭ জানুয়ারী, ২০১৯ 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
দেশের বাইরে
প্রতিবেদন
 
http://sadiatec.com/
সম্ভাবনা ছিল মহাকাব্যের -সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী  
১৯৭৮-এ ভাষা আন্দোলনের ওপর আমি একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। তাতে যা বলেছিলাম সেটি এরকমের, ভাষা আন্দোলনকে একজন বুদ্ধিজীবী ‘রায়ট’ বলেছিলেন, আরেকজন বুদ্ধিজীবী ‘ট্র্যাজেডি’ বলেছেন। কোনটি সত্য, কোন বর্ণনা? এ কি রায়ট ছিল, নাকি ট্র্যাজেডি? এ প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়, অপ্রত্যাশিত নয়, কেননা এরা উভয়েই, দু’জন বুদ্ধিজীবীই, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। পরিচিত, স্বীকৃত ও মান্য। তাহলে কি আমরা এই দুই ভিন্ন মতকে অবলম্বন করে ভাগাভাগি হয়ে যাব, আমাদের মধ্যে কেউ হবেন রায়টপন্থি কেউ ট্র্যাজেডিপন্থি? গড়ে উঠবে দু’টি পরস্পরবিরোধী স্কুল? তর্ক চলবে, বাধবে বিত-া, লাগবে কলহ?
একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলনকে যিনি রায়ট বলে প্রচার করেছিলেন এক কথায় যদি তার পরিচয় দিতে হয় সাফ সাফ বলতে হবে তিনি ছিলেন প্রতিক্রিয়াশীল। সকল সময়ে, সর্ব অবস্থায়, সম্ভব হলে প্রকাশ্যে, অসুবিধে দেখলে গোপনে, কিন্তু অনমনীয় রূপে তিনি সামাজিক ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তনের বিরোধী ছিলেন এবং তিনি পক্ষে ছিলেন শাসন কর্তৃপক্ষের। মানসিকতায় ও দৃষ্টিভঙ্গিতে, অনুভবে ও কল্পনায় তিনি যে প্রতিক্রিয়াশীল ছিলেন, এ খবর জানতো সবাই। একাত্তর সালে হানাদারদের সঙ্গে তাকে সহযোগিতা করতে দেখে তাই কেউ বিস্মিত বা হতাশ হননি।
দ্বিতীয় বুদ্ধিজীবী, যিনি ট্র্যাজেডির তত্ত্ব দিয়েছেন, প্রগতিশীল বলে প্রায় ততটাই পরিচিত যতটা রায়টবাদী পরিচিত প্রতিক্রিয়াশীল বলে। একাত্তরে তিনি সেনাবাহিনীকে খোঁজেননি, সেনাবাহিনীই তাকে খুঁজেছে, ধরতে না পেরে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণসহ চৌদ্দ বছরের কারাদ- ঘোষণা করেছে। কাজেই অবস্থাগত দূরত্ব তাদের মৌলিক, বিরোধিতা তাদের অবৈরী নয়, বৈরী।
তাই তো বলতে হয়, বায়ান্নর আন্দোলন যদি একজনের চোখে রাত হয় অপরজনের চোখে হবার কথা দিন। বলতে হয় এ আন্দোলন যদি রায়ট হয়ে থাকে তবে এ অবশ্যই ট্র্যাজেডি নয়, আর যদি ট্র্যাজেডি হয়ে থাকে তা হলে কিছুতেই সে রায়ট নয় এবং প্রশ্ন দাঁড়ায়কোন মত আমরা গ্রহণ করব? কোন দিকে যাবরায়টের দিকে নাকি ট্র্যাজেডির দিকে? কোনটি সত্য, রায়ট না ট্র্যাজেডি?
সত্য কোনোটাই নয়। একুশে ফেব্রুয়ারিতে যে আন্দোলন হয়েছিল সেটি আর যাই হোক রায়ট ছিল না। লাঠিসোঁটা বা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দুই পক্ষ পরস্পরকে আক্রমণ করেনি, যেমন করেছে, ধরা যাক, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়। না, এ আন্দোলনকে দাঙ্গা বলে চালাতে হলে যে কল্পনাশক্তি আবশ্যক তা সহজপ্রাপ্য নয়। কিন্তু তাই বলে ট্র্যাজেডিও নয় এ আন্দোলন। যদি কেউ একে নাটক হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন তবে তিনি অবশ্যই ভ্রান্ত। আন্দোলন নাটক ছিল না, ছিল জীবনমরণ সংঘর্ষ। যদি একে ট্র্যাজেডি বলা হয়ে থাকে এ বিবেচনায় যে এর পরিণত হয়েছে বিয়োগান্ত তবে সে-ধারণাও মিথ্যা। বায়ান্ন সালে ঢাকার রাজপথ রুধিরাক্ত হয়েছে, রক্তপাত শোক ডেকে এনেছে ব্যক্তি জীবনে, পারিবারিক জীবনে; কিন্তু তার পরিণতি তো বিয়োগান্ত হয়নি, ওই আন্দোলন এক নতুন পথ তৈরি করে দিয়েছে, যে পথ ক্রমসম্প্রসারণশীল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের তথা অর্থনৈতিক মুক্তির। একুশ তো নতুন জন্মের দিন, ব্যথার মধ্য দিয়ে নবজন্মের। একুশে যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের মৃত্যু তো ব্যর্থ হয়নি, তারা প্রাণ হারাননি ব্যক্তিগত কোনো দুর্বলতার কারণেযেমন নাকি ট্র্যাজেডির নায়কেরা হারিয়ে থাকেন। ট্র্যাজেডি ও মার্টডম দুই বিপরীত প্রান্তের ব্যাপার, শহীদের জীবন করুণার পাত্র নয়, কখনো।
কিন্তু ঐ ‘প্রগতিশীল’ বুদ্ধিজীবী যে একে ট্র্যাজেডি বলেছেন সে অন্য এক কারণে। এই মোটা অর্থেই বলেছেন, এই অর্থে যে এ একটি দুর্ঘটনা, যাকে এড়ানো যেত এবং এড়ানো উচিত ছিল। হায়, কর্তৃপক্ষের বোকামির জন্য এমন একটি করুণ দুর্ঘটনা ঘটে গেল। সাক্ষাৎকারে (সাক্ষাৎকারেই বলেছেন তিনি এই কথা) তিনি এও জানিয়েছেন আমাদের যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য যদি কিছুটা কা-জ্ঞানের পরিচয় দিতেন, যদি তিনি সামনে দাঁড়িয়ে যেতেন ছাত্রদের মিছিলের, তাহলে গুলিও ছুটতো না, আন্দোলনও হতো না। কিন্তু উপাচার্য তেমনটি করেননি, তাই তো আন্দোলন আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়ল দেশে, সেই আন্দোলনের শিখায় পুড়ে ছারখার হয়ে গেল অনেক কিছু।
এই বুদ্ধিজীবী শুধু বুদ্ধিজীবীই নন, তিনি প্রগতিশীলও এবং তিনি সমাজতত্ত্ববিদও। তিনি বলছেন, ইতিহাস অন্যপথে ঘুরে চলে যেত উপাচার্য যদি দায়িত্বজ্ঞানের পরিচয় দিতেন। ছাত্ররা বুঝি খেলাধুলা করতে এসেছিল, ভাষার প্রশ্ন বোধ করি ছিল ছেলেখেলার ব্যাপার, যেন এর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না সামাজিক দ্বন্দ্বের, শাসক-শাসিতের সম্পর্কের, শোষক-শোষিতের মধ্যকার বিরোধের। ব্যাপার আরও আছে। কোন দৃষ্টিতে এই প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী দেখছেন এ আন্দোলনকে? দেখছেন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে। কর্তৃপক্ষের সঙ্গেই ছিলেন তিনি।
শুরুর প্রসঙ্গে ফিরে যাই। একজন বলছেন রায়ট, আরেকজন বলছেন ট্র্যাজেডি। অনেক দূরত্ব দু’জনের মধ্যে। কিন্তু সত্যি কি দূরে তারা পরস্পরের? তারা দু’জনেই যে ব্যর্থ হয়েছেন আন্দোলনের চরিত্র অনুধাবনে সে ব্যাপারটি তো খুবই স্পষ্ট। এখানে দুই দৃষ্টিহীনের ঐক্য। কিন্তু শুধু দৃষ্টিহীনতায় নয়, ঐক্যবদ্ধ তারা দৃষ্টিভঙ্গিতেও। যিনি রায়টবাদী তিনি এ আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন একথা তিনি বলছেন না; কিন্তু যিনি ট্র্যাজেডিবাদী তিনিও তো ছিলেন এর বিপক্ষেই, তিনিও তো দুঃখ প্রকাশ করছেন কেন এই দুর্ঘটনা এড়ানো গেল না তাই নিয়ে। তাহলে তফাৎ কোথায়? তফাৎ কতটুকু? তফাৎ কলাপাতার এপিঠ ওপিঠের মতো, একপক্ষ বলতে পারে আমরা ওপিঠের তাই অনেক ভালো এপিঠের চেয়ে, কিন্তু একই কলাপাতা, একই শ্রেণির তারা।
এবং সেটিই আসল কথা, একই শ্রেণির অন্তর্গত তারা, একইভাবে ব্যর্থ, আন্দোলনকে বুঝতে, দেশের ব্যাপক জনসাধারণের আশা-আকাক্সক্ষার নিকটে যেতে। সেই জন্যই কলাপাতার এপিঠ ওপিঠের মতো দূরের, কিন্তু আসলে কাছের। এরা তর্ক বাধান, অবান্তর মূল্যহীন প্রসঙ্গের অবতারণা করে। এরা আন্দোলনের কারণ বুঝতে পারেন না এবং পারেন না বলেই অকিঞ্চিতকর শোনায় তাদের মন্তব্য। তারা বিপথগামী করতে চান আন্দোলনকারীদের। তারা মিত্র নন। ইনিও নন, তিনিও নন।
ওদিকে মধ্যবিত্ত শ্রেণিরই একাংশ, যারা তরুণ, তারা এগিয়ে গিয়েছেন আন্দোলনের দিকে, হৃদয় দিয়ে সত্যকে বুঝেছেন, বুঝেছেন রায়টপন্থি ও ট্র্যাজেডিপন্থিদের সামান্যতা, কর্ণপাত করেননি তাদের তর্কে, বাক্বিস্তারে। তারাই আশা, তারাই আলো। তারা উজ্জ্বল অন্যদের অন্ধকারে। অন্ধকার এদের বিপথগামী করতে পারে না। যখন পারে না, যতটা পারে না, তখন এবং তাতেই এদের গৌরব।
আমার ওই আটত্রিশ বছরে পূর্বের পুরাতন উপলব্ধির দিকে ফিরে তাকালাম বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর পটভূমি হিসেবে।
রায়ট তো নয়ই, ট্র্যাজেডিও নয়, রূপক যদি ব্যবহার করতে হয় তবে সেটি হলো মহাকাব্যের। সে-রকমেরই ছিল ঘটনার প্রসার ও গভীরতা। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অর্জনটা মোটেই সামান্য নয়, যা অনিবার্য ছিল এই আন্দোলন তাকেই ত্বরান্বিত করেছে। ওটা ছিল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান, ভিত্তিতে ছিল দ্বি-জাতি তত্ত্বের প্রত্যাখ্যান এবং তার জায়গায় ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের প্রতিষ্ঠা। বাঙালি মুসলমানের ভেতর যে দ্বৈত সত্তা আছে সে-ধারণাটি মিথ্যা নয়, একই সঙ্গে সে বাঙালি ও মুসলমান। বাঙালি সত্তাটিই মুখ্য হবার কথা, হলে কোনো বিরোধ থাকত না। কিন্তু হিন্দু ও মুসলিম মধ্যবিত্তের ভেতর স্বার্থগত দ্বন্দ্ব হিন্দু বাঙালিকে যেমন কেবলি হিন্দু করে তুলতে চেয়েছে, তেমনি মুসলমান বাঙালিকে মুসলমান পরিচয়ে পরিচিতি হতে উৎসাহ জুগিয়েছে। সেই দ্বন্দ্বেই অখ- বাংলা রাষ্ট্রীয়ভাবে দ্বিখ-িত হয়ে গেছে। প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র থেকে হিন্দু মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অপসারণের ফলে মুসলমান বাঙালি মধ্যবিত্ত নিজেকে মুক্ত হবে ভেবেছিল, কিন্তু অচিরেই দেখা গেছে তার উন্নতির পথকে অবরুদ্ধ করে দাঁড়িয়ে গেছে অবাঙালি পাকিস্তানিরা। এই নতুন দ্বন্দ্বটিই বিস্ফোরণের আকার ধারণ করেছে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে চাপিয়ে দেবার পাকিস্তানি ষড়যন্ত্রে। নেতৃত্ব মধ্যবিত্তই দিয়েছে, সাধারণ মানুষ সঙ্গে ছিল, বস্তুত তারাই ছিল আন্দোলনের মূল শক্তি। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে তারা এসেছিল মুক্তির আশায়, যেমন এর আগে যোগ দিয়েছিল তারা পাকিস্তান আন্দোলনে, একই আশায় উদ্বুদ্ধ হয়ে। পাকিস্তান আন্দোলন মুক্তি আনেনি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ট্র্যাজেডিই ছিল চূড়ান্ত বিচারে। সেই ট্র্যাজেডির আওতা থেকে বের হয়ে আসার ইচ্ছা থেকেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের জনঅভ্যুত্থানটি ঘটে।
এই অভ্যুত্থানের ভেতর যে মহাকাব্যিক সম্ভাবনা ছিল তা দ্রুতই প্রকাশ পেয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির জন্যই আন্দোলন ছিল। কিন্তু বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতিতে আন্দোলনের অন্তর্নিহিত যে আকাক্সক্ষা সেটি নিবৃত্ত হয়নি বরং আরও এগিয়ে গেছে। জনঅভ্যুত্থানের প্রাথমিক ফল ছিল ১৯৫৪-তে প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি। তারপরে ঘটে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ১৯৬৯-এর জনঅভ্যুত্থান। এর দু’বছর পরে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং সেই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা।
মনে হবে যেন একাত্তরের বিজয়ের ভেতর দিয়েই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মহাকাব্যিক সম্ভাবনায় অর্জন পূর্ণ হয়ে গেছে। কেননা বাংলা ভাষা তো অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি, গৃহীত হয়েছে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। কিন্তু সম্ভাবনা যে পূর্ণ হয়নি সেটি তো খুবই স্পষ্ট। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা স্বীকৃতি পেয়েছে ঠিকই, তবে রাষ্ট্রের ভাষা তো বাংলা হয়নি। তার একটি বড় প্রমাণ এই যে, উচ্চ আদালতের আবেদন-আর্জি এবং রায় সবই এখনো আগের মতোই ইংরেজিতেই লেখা হয়ে থাকে। আরেকটি প্রমাণ উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা যথার্থ প্রচলনে বিঘœ রয়েছে। তৃতীয়, কিন্তু কম জরুরি নয় এই সত্য যে, দেশে তিন ধারার শিক্ষা মহাসমারোহে চালু রয়েছে এবং ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার গুরুত্ব বাড়ছে। তদুপরি দেশের যারা শাসক সেই বিত্তবান শ্রেণির মানুষের সন্তানেরা ইংরেজি মাধ্যমেই পড়াশুনা করছে। এখানে উল্লেখ্য যে, ইংরেজির জোরটা কিন্তু ভাষার ভেতর নেই। আছে ভাষা ব্যবহারকারীদের জোরের ভেতর। ইংরেজি ভাষীরা আজ সারা বিশ্বের ওপর কর্তৃত্ব করছে, আমেরিকার নেতৃত্বে। সেই সত্যটিই ভাষার আধিপত্যে প্রতিফলিত। সব কিছু মিলিয়ে নিষ্ঠুর বাস্তবতাটি হলো এই যে, মহাকাব্যের সম্ভাবনা পূর্ণতা পায়নি।
না-পাবার কারণ কিন্তু অস্পষ্ট নয়। সেটি হলো এই যে, এখন যারা দেশ শাসন করেন এক সময়ে তারাই রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে ছিলেন। তখন তারা ছিলেন মধ্যবিত্তের প্রগতিশীল অংশ, আন্দোলন যাদের কাছে না-ছিল রায়ট, না ট্র্যাজেডি। একাত্তরের পরে ওই প্রগতিশীলদের একাংশই শাসন ক্ষমতা পেয়ে গেছে, ধনী হয়ে উঠেছে এবং তাদের ভূমিকা স্বভাবতঃই দাঁড়িয়েছে জনবিরোধী, অর্থাৎ প্রতিক্রিয়াশীল। এই বিত্তবানেরা ইংরেজি জানাকে খুবই গুরুত্ব দেয়। তারা মনে করে ইংরেজির চর্চা বৈষয়িক ও সামাজিক উভয় দিক দিয়েই সুবিধাজনক। এখন যুগ চলছে বিশ্বায়নের এবং ইংরেজি হচ্ছে বিশ্বায়নের রাষ্ট্রভাষা। তাই ইংরেজি চর্চা তাদের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিকভাবে বিচরণের সুযোগ করে দিচ্ছে। বাংলা তাদের কাছে প্রাদেশিক ভাষা। এর চর্চা করা মানে বিশ্ব থেকে বিচ্যুত হওয়া, গ্রাম্য হয়ে পড়া। এই শ্রেণিটি পুঁজিবাদী আদর্শে দীক্ষিত, ঠিক যেমন ছিল আগের শাসকেরা। আসলে এদের সকলেরই এক রা। নিজেদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচার-আচরণ এবং সন্তানদের শিক্ষিত করার প্রশ্নে যে পরিমাণে বাংলা ভাষার প্রতি এদের অনীহা ঠিক সেই পরিমাণেই এরা প্রতিক্রিয়াশীল। সমাজে এরাই আদর্শ। মধ্যবিত্তের যে বড় অংশ নিচের দিকে নেমে গেছে তারাও এদের দৃষ্টান্ত বলে জানে এবং এদের মতোই যে কোনো উপায়ে সম্ভব ধনী হতে চায়। বিদ্যমান ব্যবস্থায় ধনী হওয়া মানেই প্রতিক্রিয়াশীল হওয়া, জনগণ থেকে এবং জনগণের ভাষা থেকে দূরে সরে যাওয়া। যত ধনী হবে ততই দূরত্ব বাড়বে। সাধারণ মানুষের থেকে দূরে সরে যাওয়াটাই প্রতিফলিত হয় বাংলা ভাষা থেকে তাদের দূরত্বে।
বাংলা ভাষার পক্ষে বায়ান্নর যে অভ্যুত্থান তাকে স্তিমিত করার কাজে চুয়ান্নর নির্বাচন একটি ভূমিকা রেখেছে। তখনকার শাসক শ্রেণি আশা করেছিল নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিভাজন তৈরি করবে। বিভাজনটি প্রথমে তৈরি হয়নি, কেননা যারা আন্দোলনের ফসলকে নিজেদের গোলায় তুলে ক্ষমতায় যেতে চাইছিলেন তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন, যুক্তফ্রন্ট গঠন করেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগটি যখন হাতে এসে গেল তখন তারা ঠিকই বিভক্ত হয়ে গেলেন। প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক পরিষদের অধিবেশন কালেই যুক্তফ্রন্টেরই দু’অংশের সংঘর্ষে স্পিকার নিহত হলেন। সামরিক শাসন চালু হয়ে গেল। সেই শাসনের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটে ঊনসত্তরে। তাকে স্তিমিত করার লক্ষ্যে সত্তর সালের নির্বাচন দেয়া হয়; এবারেও ভেতরে ভেতরে আশাটি ছিল মানুষকে বিভক্ত করার। কিন্তু এবারও মানুষ বিভক্ত হলো না, এবার যুক্তফ্রন্ট হলো না বটে, তবে চুয়ান্নতে যুক্তফ্রন্ট যে একচেটিয়া রায় পেয়েছিল, আওয়ামী লীগও সেই রায়টিই পেল। চুয়ান্নর রায়টি ছিল স্বায়ত্তশাসনের, সত্তরেরটি স্বাধীনতার। কিন্তু রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় (অর্থাৎ আসল) শাসকেরা স্বাধীনতার রায় মানতে প্রস্তুত ছিল না, তারা তাই গণহত্যা শুরু করে দিল। এরপর স্বাধীনতা; স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে বাঙালি মধ্যবিত্তের বিত্তবান অংশের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত হওয়া। এই মধ্যবিত্ত এখন বিভক্ত; তাদের ভেতর ক্ষমতার সাংঘর্ষিক দ্বন্দ্বই এখন রাজনীতির মূল ধারা। এখনো কোনো স্পিকার প্রাণ হারাননি সত্য, কিন্তু সংসদীয় গণতন্ত্র অচল অবস্থাতেই রয়েছে।
শাসক শ্রেণি বাংলা ভাষার মিত্র নয়। অতীতেও ছিল না, এখনো নয়। কারণ একই। অতীতের শাসকেরা যেমন ছিল জনবিরোধী, বর্তমান শাসকেরাও তাই। শাসকেরা নিজেদের মধ্যে লড়াই করে, কিন্তু তারা মতাদর্শিকভাবে অভিন্ন। সেই আদর্শের নাম পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদ জনস্বার্থবিরোধী, তাই বাংলা ভাষার বিরোধীও বটে।
শহীদ দিবস আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এটিকে বিশ্ব জনগণের স্বীকৃতি বলবার কোনো উপায় নেই। এটি জাতিসংঘের একটি প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কোর স্বীকৃতিমাত্র। তাছাড়া এ হচ্ছে একুশের ফেব্রুয়ারিকে মর্যাদাদান, বাংলা ভাষাকে মর্যাদাদান নয়। বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিকভাবে মর্যাদা পাবে কী করে, দেশেই তো পাচ্ছে না। দেশে যার আদর নেই, বিদেশে তার আদরের আশা কোথায়?
বাংলা ভাষাকে পুঁজিবাদী শাসকেরা যে ভালোবাসে না তার আরও একটি প্রমাণ এই যে ভাষাকে তারা বিকৃতভাবে ব্যবহার করে। ভুল করলেও লজ্জা পায় না। অথচ ইংরেজি ব্যবহারে ভুল করলে মর্মে মর্মে দগ্ধ হয়। এই শাসকেরা কোনো কিছু ঠিকমতো করতে পারে না, বাংলা ভাষার ব্যবহারে তারা শুদ্ধ হবে কী করে?
অথচ বাংলা ভাষাকে ব্যবহার না করলে আমরা না পারব সুস্থ ও স্বাভাবিক হতে, না পারব আত্মসম্মানে ও গৌরবে সমৃদ্ধ হতে। কথাটির সঙ্গে এটিও যোগ করা দরকার যে, শুধু ভালোবাসা ভালোবাসো বলাটাই যথেষ্ট নয়, তাতে কাজ হবে না, যাকে ভালোবাসতে চাই তাকেও উপযুক্ত পাত্র হিসেবে গড়ে তোলা চাই। এমন কি অন্ধ ভালোবাসাও কার্যকর থাকবে না, যখন ভালোবাসার জন্য উপযুক্ত ভিন্ন পাত্রকে বিকল্প হিসেবে পাওয়া যাবে।
তাই বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করা অত্যাবশ্যক। সর্বত্র প্রচলনের মধ্য দিয়ে এ ভাষা সমৃদ্ধ হবে। সেই সঙ্গে দরকার হবে জ্ঞানবিজ্ঞানের উপযুক্ত প্রকাশ-মাধ্যম হিসেবে একে গড়ে তোলা। তারও আগে অবশ্য চাই জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা। চর্চা এবং মাতৃভাষার মধ্য দিয়ে চর্চার প্রকাশ, এ দুটো কাজ এক সঙ্গে ঘটানো গেলে তবেই ভাষা ধনী হয়ে উঠবে, জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চাও দেশের মানুষের কাছে লভ্য ও শ্রদ্ধেয় হবে। জ্ঞান নিজেও পূর্ণাঙ্গ হয় না যদি না তার প্রয়োগ ঘটে। প্রয়োগের জন্য ভাষা চাই এবং এক্ষেত্রে মাতৃভাষার চেয়ে সেরা কেউ নেই।
কাজটা কারা করবেন? করবেন তারাই যারা জ্ঞানী ও দেশপ্রেমিক। জ্ঞানের চর্চা ও দেশপ্রেমের চর্চা এক সঙ্গে হওয়াটিকে বলা যাবে সোনায় সোহাগা। কিন্তু দেশপ্রেমিক কারা? তারাই দেশপ্রেমিক যারা দেশের সকল মানুষকে ভালোবাসেন। সকলের মুক্তি চান, নিজের মুক্তির সম্ভাবনার সঙ্গে সকলের মুক্তির প্রয়োজনীয়তাকে মিলিয়ে দেখেন। অতদূরই যেতে হবে, নইলে দেশপ্রেমিক হওয়া যাবে না।
প্রশ্ন উঠবে বাংলা ভাষাকে ভালোবাসার পাত্র হিসেবে গড়ে তোলার পথে অন্তরায়টা আসলে কোথায়? জবাব হলো, সেটা রয়েছে গোটা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থায়। এ ব্যবস্থা পুঁজিবাদী, যার অর্থ এ ব্যবস্থা ব্যক্তিকে সমৃদ্ধ করতে চায় সমষ্টিকে বঞ্চিত রেখে। পুঁজিবাদে দীক্ষিত হওয়ার কারণেই রাষ্ট্র জনগণের পক্ষে থাকতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং জনগণের ভাষার সঙ্গে বৈরী আচরণ করছে।
বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরে এবং মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই তাই রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন চাই। যাকে মহাকাব্যিক সম্ভাবনা বলছি সেটি আসলে ব্যবস্থা পরিবর্তনেরই প্রতিশ্রুতি। সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। সমাজবিপ্লব ঘটেনি। যাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলি সেটি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রকৃত পরিচয় হচ্ছে সমাজবিপ্লবের চেতনা। সেই চেতনা বাস্তব রূপায়ণ ঘটেনি, যে জন্য বাংলা ভাষা তেমনভাবে সমৃদ্ধ, সম্মানিত ও প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। যেমনভাবে হওয়ার কথা ছিল।
প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি আসে এবং নীরবে স্মরণ করিয়ে দিয়ে যায় যে পুঁজিবাদকে শক্তিশালী হতে দিয়ে আমরা মুক্ত হতে পারব না। বলে একথাও যে, মানুষের শত্রু ও ভাষার শত্রু অভিন্ন এবং সেই শত্রুর নাম হচ্ছে পুঁজিবাদ। একুশের এই ইশারাতে সাড়া দেয়া না-দেয়ার ওপরই বাংলা ভাষার এবং বাংলা ভাষীদের ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল। এক কথায় বলতে গেলে বাংলাকে যথার্থ অর্থে রাষ্ট্রের ভাষা হতে গেলে রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের হাতে হস্তান্তর প্রয়োজন হবে। সরকার বদলাচ্ছে, ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটছে, কিন্তু ক্ষমতা তো জনগণের কাছে যাচ্ছে না।
তাই বলে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার কাজটায় আমরা যে বিরাম দেব তা নয়। কিন্তু লক্ষ্যটি যতই দূরবর্তী হোক তাকে জানা ও চেনা দরকার আমাদের মুক্তির জন্যই। বাংলা ভাষার মুক্তি এবং আমাদের নিজেদের মুক্তি ওতপ্রোতভাবে পরস্পর সংলগ্ন।

 লেখায় : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
বিশ্লেষন
  • বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আমি
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.
    বর্তমান সংথ্যা
    পুরানো সংথ্যা
    Click to see Archive
    Doshdik
     
     
     
    Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive