Logo
 বর্ষ ১১ সংখ্যা ৩০ ৪ঠা মাঘ, ১৪২৫ ১৭ জানুয়ারী, ২০১৯ 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
দেশের বাইরে
প্রতিবেদন
 
http://sadiatec.com/
‘সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা’-খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ  
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ । অর্থনীতিবিদ। সাবেক ডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক। গবেষণা করছেন উন্নয়নের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে।
রাজনীতি, উন্নয়ন, গণতন্ত্রের প্রসঙ্গ নিয়ে মুখোমুখি হন সাপ্তাহিক-এর। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদের গণতন্ত্র মডেলের দিকে যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন। দুর্নীতিরোধে আশু পদক্ষেপ নিলে সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়বে, যা বৈধতার সংকট দূর করবে বলে মনে করেন এ বিশ্লেষক।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

সাপ্তাহিক : টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় এলো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার। নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এবারে।  এ মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য কোন চ্যালেঞ্জকে সামনে আনবেন?
 খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : বাংলাদেশের এই মুহূর্তের চ্যালেঞ্জকে দু’ভাগে ভাগ করতে হবে। একটি হচ্ছে এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। অপরটি হচ্ছে, একটি নতুন সরকার ক্ষমতায় আসলে স্বাভাবিক কিছু চ্যালেঞ্জ সামনে আসে, সে বিষয়টি।
সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। এক কোটির বেশি হবে বেকার যুবক। তারা না পারছে শ্রমিক হতে, না পাচ্ছে চাকরি। এই শিক্ষিত যুবকদের কাজে লাগাতে না পারলে, তারা অন্যদিকে চলে যেতে পারে, যা জাতির জন্য বড় ক্ষতি বয়ে আনতে পারে।
সাপ্তাহিক : কিন্তু এত বেকারের চাকরি দেয়া সম্ভব?
ইব্রাহিম খালেদ : আমি ঠিক চাকরির কথা বলছি না। এত লোকের চাকরি দেয়া সম্ভব না। তবে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। এর জন্য কথায় আটকে না থেকে যথাযথ কমিটমেন্ট এবং কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করা দরকার। এখন পর্যন্ত আমরা সেটা দেখতে পাইনি। বিশেষ করে এই সরকারের গত আমলে আমরা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার তেমন লক্ষণ দেখতে পাইনি।
সাপ্তাহিক : এবারে কী আশা করছেন?
ইব্রাহিম খালেদ : আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বেকার সমস্যা দূরীকরণে প্রতিজ্ঞা করেছে। আমি আশা করছি, এই সরকার যেন এ ব্যাপারে স্বচ্ছ একটি রূপরেখা দেয়।
আমি বলব, এত মানুষের চাকরি দেয়া সম্ভব না, কিন্তু উদ্যোগ তৈরি করা সম্ভব, যার মধ্য দিয়ে কাজের ক্ষেত্র তৈরি করা যাবে। এটি অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি। উদ্যোগ গ্রহণের মানসিকতা দরিদ্রদের মধ্যেও থাকে। মূলধন থাকে না বলে তারা প্রকাশ করতে পারে না। এ কারণেই আমরা ক্ষুদ্র এবং মাঝারি উদ্যোক্তদের প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেয়ার কথা বলছি।
সাপ্তাহিক : প্রণোদনা দেয়ার দাবি অনেক আগে থেকেই। কিন্তু দেয়া হচ্ছে না। বৈষম্যের অর্থব্যবস্থায় এই সময়ে প্রণোদনা আসলে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারবে?
ইব্রাহিম খালেদ : আমরা যদি কল্যাণ অর্থব্যবস্থায় থাকতাম তাহলে প্রণোদনার প্রসঙ্গ আসত না। আমরা এখন পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় পুরোপুরি প্রবেশ করেছি। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় বড় ব্যবসায়ীরা ছোট ব্যবসায়ীদের সব খেয়ে ফেলে। যেমন আগে গ্রামের গরিব একজন বৃদ্ধা নিজ হাতে মুড়ি ভেজে বিক্রি করত। এখন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানও মুড়ি বিক্রি করছে। অর্থনীতির ভাষায় উৎপাদন বাড়লে খরচ কমে। এ কারণে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের এক কেজি মুড়ি তৈরি করতে যে খরচ পড়বে, তার চেয়ে বেশি খরচ পড়বে ওই বৃদ্ধার। ফলে ওই বৃদ্ধা আর মুড়ির বাজারে টিকে থাকতে পারছে না।
বাজার থেকে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের রক্ষা করতে হলে সরকারকে অবশ্যই ভর্তুকি দিতে হবে। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাংকের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও কৃষি খাতে ভর্তুকি দিলেন। এর উপকারিতা ছিল বলেই কৃষকরা আজ ফসলে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলছে বাংলাদেশকে।
সাপ্তাহিক : পুঁজি নিজেই পুঁজির সমস্যা। এমন রাষ্ট্রে শাসকশ্রেণি পুঁজির ওপর ভর করেই টিকে থাকে।
ইব্রাহিম খালেদ : হ্যাঁ। তবে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের কল্যাণ অর্থনীতি কাজ করে। জার্মানসহ অনেক দেশেই ধনীদের কাছ থেকে কেটে নিয়ে গরিবদের ভর্তুকি দেয়া হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবায় ভর্তুকি দেয়া হয়। এটি সমাজে ভারসাম্য আসে।
আমাদের সংবিধানে সমাজতন্ত্রের কথা আছে। কিন্তু ভুলে গেছি। আপনি বড় ব্যবসায়ীদের টিকিয়ে রাখুন, কিন্তু রাষ্ট্র, সমাজ তো মানুষের কল্যাণে। ধনীদের কাছ থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় কেটে এনে গরিবদের দিন। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাতেও জাপানে সবচেয়ে কল্যাণমুখী অর্থব্যবস্থা। আমি টয়োটা কোম্পানিতে গিয়ে দেখেছি, তারা শুধু ইঞ্জিন তৈরি করত। আর বাকি সব অন্য কোম্পানিকে তৈরি করার সুযোগ করে দেয়।
এতে ছোট এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও লাভবান হচ্ছে। মানুষে মানুষে সমতা হচ্ছে। সরকারের উপরেই সবাই নির্ভর করছে না। কিন্তু সরকার সুযোগ করে দিচ্ছে।
সাপ্তাহিক : জাপান-জার্মানির প্রেক্ষাপট বাংলাদেশে মানায়। এমন সমাজ নীতি এ রাষ্ট্র ধারণ করে?
ইব্রাহিম খালেদ : প্রশ্ন এখানেই। রাষ্ট্র পরিচালকদের মানসিকতা আছে কী-না, সেটাই বড় বিষয়। এসএমই নিয়ে অনেক কথাই হচ্ছে। অথচ এর কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। কল্যাণ অর্থনীতির কথা সংবিধানে আছে। পুঁজিবাদের কথা বলা নেই। সরকার চাইলে যে কোনো সময়ে উদ্যোগ নিতে পারে।
সাপ্তাহিক : ব্যবসায়ীদের হাতে রাজনীতি। দিনে দিনে ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি বাড়ছে সংসদে। এমন সরকার ব্যবস্থায় কল্যাণমুখী অর্থনীতির আশা করা যায়?
ইব্রাহিম খালেদ : এটা ঠিক, রাজনীতি আর ব্যবসা এক বিষয় না। পাশের দেশ ভারতে বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাউকে ব্যাংকের পরিচালক হতে দেয় না। আমাদের এখানে সে চিত্র ভিন্ন। টাকার লালসাটাই মুখ্য। অন্যের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে নিজের মুনাফাটাই মুখ্য করে দেখে।
এ কারণেই রাজনীতিটা অন্তত রাজনীতিবিদদের হাতে থাকলে যে কোনো উদ্যোগ নেয়া সহজ হয়। আর বাংলাদেশের রাজনীতি এখন ব্যবসায়ীরাই নিয়ন্ত্রণ করছে। যে কারণে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে ব্যবসায়ীদের স্বার্থেই। যেমন, ব্যাংকিং ব্যবসায় নিয়ম ছিল একই পরিবার থেকে দুই জনের বেশি পরিচালনা পর্ষদে থাকতে পারবেন না। কিন্তু আইন পরিবর্তন করে এখন একই পরিবার থেকে চারজনকে আসার সুযোগ করে দেয়া হলো। তার মানে আইন করে একটি ব্যাংককে একটি পরিবারের হাতে তুলে দেয়া হলো। এই নীতি কোনোভাবেই কল্যাণ অর্থনীতির সহায়ক না।
সাপ্তাহিক : এই নীতিহীন নীতির বিষয়টি সরকারেরও বোঝার কথা।
ইব্রাহিম খালেদ : আমরা তো আর নীতি পরিবর্তন করতে পারি না। আমরা আমাদের কথা বলেই যাব। সরকার কেন করছে, তার ব্যাখ্যা সরকারই ভালো দিতে পারবে।
সাপ্তাহিক : এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের যাত্রা কোন পথে?
ইব্রাহিম খালেদ : আমি মনে করি, বাংলাদেশ এখন পুঁজির দিকেই যাচ্ছে। যদিও সংবিধান পুঁজির দিকে যাওয়া সমর্থন করে না। কারণ এখনও সংবিধানে সমাজতন্ত্রের কথা বলা আছে। সংবিধানের চার মূলনীতি তো আপনি অস্বীকার করতে পারেন না। আবার মুখে শুধু স্বীকার করার মধ্যেই কোনো সার্থকতা থাকে না।
আমি মনে করি না, বাংলাদেশ কঠিন সমাজতন্ত্রের দিকে যাবে। তবে ভারসাম্য বজায় রেখে কল্যাণমুখী অর্থ ব্যবস্থার দিকে যাওয়া যেতেই পারে। জার্মানি পারলে আমরা পারব না কেন?
সাপ্তাহিক : বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আর কী চ্যালেঞ্জের কথা বলবেন?  
ইব্রাহিম খালেদ : বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে মানে জিডিপি’র পরিমাণ বাড়ছে। প্রশ্ন হচ্ছে এই জিডিপি কার হাতে যাচ্ছে। গবেষণায় বেরিয়ে আসছে মাত্র ৫ ভাগ মানুষের হাতে জিডিপি।
জিডিপি ১৭ কোটি মানুষের কাছে সমানভাবে বণ্টিত হবে, তা মনে করি না। কিন্তু অধিক মানুষের কাছে এর সুবিধা যাবে, এটি আশা করা যেতেই পারে। ৫ ভাগের কাছেই সব আটকে যাবে এটি হতে পারে না। ট্যাক্স ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাই বেশি দিচ্ছে। বড় ব্যবসায়ীরাই বেশি ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে। ব্যবসায়ীরা ঠিক মতো ট্যাক্স দিলে দশ লাখ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করতে সমস্যা হতো না। ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে সত্যিকার রাজনীতিকরা আর কিছু করতে পারছে না।
ব্যবসায়ীদের হাত থেকে রাজনীতি মুক্ত হলেই সমতা ফিরবে। প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পেয়ে ১০ শতাংশ হোক। কিন্তু তাতে ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হতে হবে। সবার মাঝে বণ্টনের ব্যবস্থা করা হোক। আর এখন এটাই বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজনীতি ব্যবসায়ীমুক্ত এবং ক্ষুদ্র এবং মাঝারি ব্যবসায়ীদের মাঝে ভর্তুকি দিতে পারলেই রাষ্ট্র কল্যাণ অর্থনীতির দিকে যাবে। তবে সেটা করবে কী-না, তা নির্ভর করে সরকারের উদ্যোগের ওপর।
সাপ্তাহিক : এই চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সুশাসনের অভাবকে কীভাবে মেলাবেন?
ইব্রাহিম খালেদ : গত দশ বছর ধরে এই সরকার ক্ষমতায়। আমরা সুশাসনের প্রচ- অভাব লক্ষ্য করেছি। এই সরকারের ওপর ব্যবসায়ী এবং দুর্নীতিবাজদের প্রভাব আছে। এবারে সরকার ইশতেহারের প্রতিজ্ঞা কতটুকু পূরণ করতে পারবেন, সেটাই দেখার বিষয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সরকার নতুন করে যাত্রা শুরু করলে প্রশংসা পাবে বলে মনে করি। তবে মনে রাখতে হবে, দুর্নীতিবাজদের দিয়ে দুর্নীতি রোধ করা যায় না।
দুর্র্নীতি দমন করতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। যেমন- ব্যাংকিং খাতের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সম্পূর্ণ ক্ষমতা দিতে হবে। ২শ বছরের ইতিহাসে দেখা গেছে, কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বেসরকারি ব্যাংকের মালিকদের সঙ্গে বসেন না। অথচ আমাদের এখানে অর্থমন্ত্রী গভর্নরকে হোটেলে ডেকে নিয়ে সিআরআর পরিবর্তন করিয়েছেন। এটি একটি টেকনিক্যাল বিষয়, যা একেবারেই বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব বিষয়। অথচ অর্থমন্ত্রী এখানে প্রভাব খাটিয়ে সিআরআর পরিবর্তন করলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক, পিএসসি, দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব খাটালে রাষ্ট্রের কাঠামো শক্তিশালী হয় না। বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ! তবুও তাকে ধরা গেল না। কেন? দুদেেকর চেয়ারম্যান খুবই ভালো মানুষ। কিন্তু তিনি পদক্ষেপ নিতে পারছেন না, কারণ হয়তো উপর মহল থেকে চাপ আছে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে না ধরার। দুদক, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্তিশালী করতে হলে রাজনৈতিক চাপ কমাতে হবে।
সাপ্তাহিক : সব কিছুই রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত। এই চাপ কমানো সম্ভব?
ইব্রাহিম খালেদ  : সরকার মানে একটি অর্গানাইজেশন। আওয়ামী লীগ তাদের ইশতেহারে বলেছে, দুর্নীতি একেবারে দূর করবে। তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষিতেই আমরা আশাবাদ ব্যক্ত করছি। কীভাবে দুর্নীতি রোধ করতে পারেন, তার জন্য আমরা পরামর্শ দিতে পারি। কিন্তু করবেন কী-না, তা আমরা বলতে পারি না।
দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব এবং সেটা নির্ভর করে ব্যক্তির উপরে।
সাপ্তাহিক : একজন ব্যক্তি চাইলেই কী সব সম্ভব?
ইব্রাহিম খালেদ : মালয়েশিয়ায় এক সময় ব্যাপক দুর্নীতি ছিল। মাহাথির মুহাম্মদ ক্ষমতায় আসার পরেই চিত্র পাল্টে যায়। আমি বহুবার সে দেশে গিয়েছি। তিনি তথাকথিত গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নন। যদিও তিনি নির্বাচন করেই ক্ষমতায় এসেছেন। শেখ হাসিনা মাহাথিরের মতো স্বৈরাচার হলে আমার আপত্তি নেই। গণতন্ত্রের দুর্বলতা কাটিয়ে খানিক স্বৈরনীতি অবলম্বন করলেই দুর্নীতি রোধ করা যায়। যদি শেখ হাসিনা মাহাথিরের মতো নীতি অবলম্বন করেন, তাহলে দুর্নীতি দূর করা সম্ভব। নইলে দুর্নীতি আরও বেড়ে যাবে।
সাপ্তাহিক : রাজনীতির সংকট জিইয়ে রেখে স্বৈরনীতি তো আরও বিপদ ডেকে আনতে পারে?
ইব্রাহিম খালেদ : গণতন্ত্রে সংসদীয় ব্যবস্থা হচ্ছে দুই চাকার সাইকেল। এক চাকায় কোনোভাবেই চলতে পারে না। সরকার এবং বিরোধী দল হচ্ছে সাইকেলের দুই চাকার মতো। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের সংসদে বিরোধী দল শত্রুতে পরিণত হয়েছিল। এর কারণ হচ্ছে আদর্শগত বিভাজন। অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের পর যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি না। জনগণ এখন তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে।
সাপ্তাহিক : কিন্তু তাহলে তো সংসদ ‘এক চাকার সাইকেল’ই ...
ইব্রাহিম খালেদ : অনেকটা তাই। স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রত্যাখ্যানের মধ্যে দিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে, সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকছে না। সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা দরকার, যারা মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা এবং বঙ্গবন্ধুতে বিশ্বাস রাখবে। এমন একটি বিরোধী দল গঠন করাই রাজনীতির এখন অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
সাপ্তাহিক : সরকার তো বিরোধী দলে বিশ্বাসী নয়। বিরোধী শক্তিকে নিঃশেষ করার প্রক্রিয়া চলছে বলে অভিযোগ।
ইব্রাহিম খালেদ :  আজকের এই সংকট ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে জঘন্য হত্যাকা-ের মধ্যে দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে। বঙ্গবন্ধু এবং জাতীয় চার নেতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি পুনর্বাসিত হয়েছিল। এ কারণেই মুক্তিযুদ্ধের হত্যাকারীদের বাংলাদেশের রাজনীতিতে আর আশ্রয় মিলবে না।
এ কারণেই আমরা এমন একটি বিরোধী দল চাই যারা আওয়ামী লীগ বিরোধী কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের।
সাপ্তাহিক : এমন বিরোধী শিবিরে কারা আসতে পারত?
ইব্রাহিম খালেদ : বামপন্থিরা চাইলে শক্তিশালী বিরোধী দল হতে পারত। কিন্তু তারা দিনে দিনে আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে। আর ডানপন্থিদের ওপর তো আস্থা রাখা যায় না। মধ্যপন্থি এবং বামপন্থিরা মিলে একটি সরকার বিরোধী বলয় গড়ে তুলতে পারে।
সাপ্তাহিক : এই পরিস্থিতির মধ্যে নতুন কোনো সংকটের আভাস মেলে কী-না?
ইব্রাহিম খালেদ : একটি দল দিয়ে সংসদ ভালো চালানো যায় না। সব একতরফা হয়ে যায়। যদিও অনেক উদাহরণ আছে একদলীয় শাসনব্যবস্থার। চীনে এক দলেই সব চলছে। হংকং, সিঙ্গাপুরেও অনেকটা তাই। কিন্তু আমাদের রাজনীতির ইতিহাস এবং সংস্কৃতি দ্বি-দলীয় বা বহুদলীয়।
সাপ্তাহিক : চীন, হংকং বা সিঙ্গাপুরের সরকারগুলো জনআস্থা রেখে একদলীয় শাসন কায়েম করেছে। শেখ হাসিনার সরকারের জনআস্থায় বড় ধরনের সংকট আছে বলে মনে করা হচ্ছে।  
ইব্রাহিম খালেদ : চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। চীনে কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আছে। অন্যদের মাথা ব্যথা নেই। চীনের মাথা ব্যথা ব্যবসা নিয়ে। কে ব্যবসার সুযোগ করে দিল তাই নিয়ে তাদের হিসাব-নিকাশ। উন্নয়নকে তারা সবার আগে জায়গা দিচ্ছে।
সাপ্তাহিক : এমন উন্নয়নে গণতন্ত্র চাপা পড়ে। বাংলাদেশে তাই হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে?
ইব্রাহিম খালেদ : আমি ঠিক তা মনে করি না। মাহাথিরের গণতন্ত্রেও উন্নয়ন আছে। দক্ষিণ কোরিয়া স্বৈরনীতি অবলম্বন করেই উন্নয়নে গেছে। এশিয়ার চারটি দেশের উন্নয়ন নিয়ে বিশ্বব্যাংক বিস্ময় প্রকাশ করেছে, যেসব দেশে গণতন্ত্র প্রশমিত রাখা হয়েছে।
সাপ্তাহিক : স্বৈরনীতির পতনের খবরও আছে। ফিলিপাইন দাঁড়াতে পারেনি। গাদ্দাফি, সাদ্দামের পরিণতি ভয়াবহ হলো।
ইব্রাহিম খালেদ : গাদ্দাফি আর মাহাথির এক বিষয় নয়। গাদ্দাফি স্বৈরপন্থায় ক্ষমতায় এসেছে। আর মাহাথির নির্বাচিত হয়ে এসে স্বৈরনীতি অবলম্বন করেছেন। জনগণ মাহাথিরকে সমর্থন করেছে। কিন্তু ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে মাহাথির যা ভালো মনে করেছেন, তাই করছেন। জনগণের সঙ্গে আর আলাপের প্রয়োজন মনে করেননি।
সাপ্তাহিক : তাহলে বাংলাদেশ কী মাহাথিরের পথে, যেখানে গণতন্ত্রের চাইতে উন্নয়ন বড় করে দেখা হয়?  
ইব্রাহিম খালেদ : গণতন্ত্র একেবারে আড়ালে পড়ে যাচ্ছে আমি তা মনে করি না। গণতন্ত্র হচ্ছে চর্চার ব্যাপার। আমাদের এখানে দীর্ঘ সময় সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্র হত্যা করেছে। উন্নয়ন হয়নি। ১৯৯১ সালে আমাদের নতুন করে শুরু করতে হয়েছে।
গণতন্ত্র সরকার দিতে পারে না। এটি চর্চার ব্যাপার। অধিকার অর্জন করে নিতে হয়। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য ঠিক থাকলে এমনিতেই গণতন্ত্রের চর্চা হবে। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য নিয়ে সরকারের উন্নয়ন যথেষ্ট বলেই মনে করা হচ্ছে।
সাপ্তাহিক : শিক্ষার উন্নয়ন নিয়েও তো বিতর্ক উঠছে।
ইব্রাহিম খালেদ : শিক্ষার প্রসার আর মান আলাদা বিষয়। এখন দেশে শিক্ষার প্রসার ঘটছে। ৯০ ভাগ মানুষ সাক্ষর করতে পারলে জাতির উন্নয়ন ঘটবেই। মান নিয়ে পরে উন্নয়ন ঘটবেই। শিক্ষার প্রসারের কারণেই শ্রীলঙ্কা এত এগিয়ে গেল। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যে যদি প্রচুর ব্যয় করা যায়, তাহলে আগামী ২০ বছরে বাংলাদেশ উন্নত দেশে যাবে। এরপর গণতন্ত্রও ভালো অবস্থানে দাঁড়াবে। এর আগে ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়েই যাবে বলে মনে করি।
সাপ্তাহিক : তাহলে আপাতত ভাঙা-গড়াই নিয়তি?
ইব্রাহিম খালেদ : গণতন্ত্রের সংকট থাকার পরেও কিন্তু বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। জনগণকে সম্পদে রূপ দিতে পারলেই উন্নয়ন সম্ভব। বাঙালিদের মেধা এবং পরিশ্রম করার ক্ষমতা যে কোনো দেশের নাগরিকের থেকে বেশি।
১৯৭২ সালে বাংলাদেশে হাতেগোনা কয়েকজন শিল্পপতি ছিল। এখন গার্মেন্টে বাংলাদেশের শিল্পপতিরা বিশ্বসেরা। আমরা ভারতকে পার করেছি। পাকিস্তানের মানুষ বাংলাদেশকে অনুসরণ করতে চায়। এটি তো বিস্ময়।
এ কারণেই আমরা মাহাথিরের গণতন্ত্রের মডেলের কথা বলছি। তবে এমন শাসন ব্যবস্থায় ভালো নেতৃত্ব দরকার।
সাপ্তাহিক : কিন্তু এখন তো বিশ্বমহলকে এড়িয়ে আপনি দেশ শাসন করতে পারবেন না। অন্যরাও বাধা হতে পারে।
ইব্রাহিম খালেদ : হ্যাঁ, অন্যরাও বাধা হতে পারে। তবে এখন হবে না। উন্নয়নের প্রসার ঘটলে পাশের দেশও বাধা হতে পারে। চীন এবং ভারত বাংলাদেশে ঢুকে গেছে। এ দুটি দেশ বাংলাদেশে ব্যবসা করতে চাইলে বাধা আসবেই। তবে উন্নয়ন ঘটে গেলে ব্যবসা ঠেকিয়ে রাখা যায় না। আর ভারত এবং চীন বাংলাদেশের জন্যও বড় মার্কেট।
গার্মেন্টে আমরা সবচেয়ে ভালো করছি এখন। ইউরোপ-আমেরিকার বাজার দখল বাংলাদেশি পোশাকে। তথ্য-প্রযুক্তিতে ঘাটতি রয়েছে। এক্ষেত্রে উন্নয়ন করতে পারলেই বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ করতে পারব।
সাপ্তাহিক : পুরনো একটি বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাই। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন। আজও তদন্ত প্রতিবেদন অপ্রকাশ রয়ে গেল। কী বলবেন এতদিন পর?
ইব্রাহিম খালেদ : উপরের মহলের কেউই চান না যে আমি তা মনে রাখি। আমি মনে করি, বিশেষ সিন্ডিকেট শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। এই সিন্ডিকেট না ভাঙতে পারলে শেয়ারবাজারে স্থিরতা আসবে না।
গুটিকয়েক ব্যক্তি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ দখল করে রাখছে। কিন্তু কেন? ১ হাজার সদস্য করলে সমস্যা কোথায়? তার মানে কয়েকজন ব্যক্তির হাত থেকে মুক্ত করার কোনো উপায় পাচ্ছে না কর্তৃপক্ষ।
কেলেঙ্কারির কারণে কয়েকজনের শাস্তি দেয়া হলো। কিন্তু মূল হোতারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। আর এ কারণেই শেয়ারবাজারে সর্বমহলের আস্থা ফিরছে না।
Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
সাক্ষাৎকার
  • ‘কোনোভাবেই দুর্নীতিকে বরদাস্ত করব না’-শ ম রেজাউল করিম
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.
    বর্তমান সংথ্যা
    পুরানো সংথ্যা
    Click to see Archive
    Doshdik
     
     
     
    Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive