Logo
 বর্ষ ১১ সংখ্যা ২১ ১৯শে কার্তিক, ১৪২৫ ১৫ নভেম্বর, ২০১৮ 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
দেশের বাইরে
প্রতিবেদন
 
http://sadiatec.com/
নতুন বাঁকে তুরস্ক-জার্মান সম্পর্ক -সাইমন মোহসিন  
জার্মান কূটনৈতিক মনস্তত্ত্বে ‘অংশীদারিত্ব’ শব্দটির অর্থ কেবল প্রাতিষ্ঠানিক অর্থেই সীমাবদ্ধ। এতে বন্ধুত্ব কিংবা উষ্ণতার কোনো অবকাশ নেই। জার্মানি ও তুরস্কের মধ্যকার সম্পর্ক অংশীদারিত্বের জার্মান তাৎপর্যতেই সীমিত। মূল্যবোধ কিংবা পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার কোনো লেশ নেই এতে।
জার্মানি ও তুরস্কের সম্পর্কের মূলভিত্তি হলো জার্মানির প্রায় ৩০ লাখ তুরস্ক বংশোদ্ভূত অভিবাসী নাগরিক। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুই দেশের মধ্যকার বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও নিরাপত্তা স্বার্থ। বিশেষ করে ২০১৫ সাল থেকে শুরু হওয়া শরণার্থী ইস্যু এই দুই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অযাচিত সংযোগ ও একইসঙ্গে দ্বন্দ্ব গড়ে তুলেছে। ঐতিহাসিকভাবে জার্মানি-তুরস্কের সম্পর্ক মিলন-বিচ্ছেদের গাঁথায় পরিপূর্ণ। কিন্তু গত কয়েক বছরব্যাপী সম্পর্কের টানাপড়েন যেন নতুন এক মাত্রা অর্জন করেছে।
গত মাসেই তুরস্কের রাষ্ট্রপতি এরদোগান জার্মানি সফর করেন। লক্ষ্য - দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়ন। গত কয়েক বছরে বেশকিছু ছোট-বড় ঘটনা সম্পর্কের ভিত দুর্বল করে দিয়েছে।
২০১৬ সালের ৩১ মার্চ। জার্মান কমেডিয়ান জ্যান বোহমারম্যানের লেখা এরদোগানের বিরুদ্ধে একটি ব্যঙ্গাত্মক কবিতার জন্য তুর্কি রাষ্ট্রপতি এরদোগান বোহমারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেন। জার্মান আইনজীবীগণ সেই বছরের অক্টোবরে অভিযোগ বাতিল ঘোষণা করলেও ঘটনাটি আঙ্কারা ও বার্লিনের মধ্যে কূটনৈতিক দ্বন্দ্বের রসদে পরিণত হয়।
২ জুন, ২০১৬। জার্মান সংসদ ১৯১৫ সালের অটোমান যুগে আর্মেনিয়াতে সংঘটিত হত্যার ঘটনাকে প্রায় সর্বসম্মতভাবে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তুরস্ক জার্মান সংসদের এই সিদ্ধান্তের নিন্দা জানায় কারণ তুরস্কের যুক্তি হলো আর্মেনিয়ার সেই সহিংস ঘটনার ফলে মৃতের সংখ্যা যা ধারণা করা হয় তার চেয়ে অনেক কম ছিল এবং সেই সহিংসতায় অনেক তুর্কি মুসলিমও নিহত হয়।
১৫ জুলাই, ২০১৬। দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দেয় এইদিনের ঘটনা। তুরস্ক সামরিক বাহিনীর একটি অংশ রাষ্ট্রপতি এরদোগানকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু তাদের এই অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ধর্ম প্রচারক ফেতুল্লাহ গুলেনের প্রতিষ্ঠানকে এই ব্যর্থ অভ্যুত্থানের নেপথ্যের প্রভাবক ও পরিকল্পনাকারী বলে অভিযোগ তুলেন এরদোগান। বার্লিনে আশ্রিত এই ফেতুল্লাহ গুলেনের বিপক্ষে জার্মানি কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় এবং ব্যর্থ অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধেও কোনো সুষ্ঠু ও পরিষ্কার অবস্থান গ্রহণ না করার কারণে এরদোগান জার্মানির নিন্দা জানান। অন্যদিকে, ব্যর্থ অভ্যুত্থান পরবর্তী দিনগুলোতে, তুর্কি প্রশাসন দেশের সামরিক বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক বিশাল অভিযান চালায়। এই অভিযানে সামরিক বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও সরকারি কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তা ও শিক্ষকসহ প্রায় হাজার হাজার ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। জার্মান রাজনীতিবিদগণ এই গণগ্রেফতারের নিন্দা জানান। অনেক তুর্কি কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ ও সামরিক বাহিনীর সদস্য দেশ থেকে পালিয়ে জার্মানিতে আশ্রয় প্রার্থনা করেন।
পশ্চিম জার্মানির কোলোন শহরে বসবাসকারী বিশাল কুর্দিশ জনগোষ্ঠী এরদোগানের এই গণগ্রেফতারের বিপক্ষে জার্মানিতে বিক্ষোভ করে। আর তুরস্কের কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) নেতা আব্দুল্লাহ ওসালানের মুক্তি দাবি করেন। তুরস্ক প্রশাসন পিকেকে দলকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে গণ্য করে। আঙ্কারা অভিযোগ তোলে যে বার্লিন পিকেকে সন্ত্রাসী দলকে ব্যাহত করতে যথেষ্ট উদ্যোগ নিচ্ছে না।
২০১৭ সাল, ১৪ ফেব্রুয়ারি। সাংবাদিক ডেনিজ ইয়ুসেলকে তুর্কি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আটক করে। তিনি একজন জার্মান নাগরিক। এছাড়া আরও দুজন জার্মান নাগরিক, সাংবাদিক মেসালে টোলু এবং মানবাধিকার কর্মী পিটার স্টুডটারকেও তুরস্ক প্রশাসন আটক করে। তুরস্ক তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী দলকে সহযোগিতার অভিযোগ আনলেও জার্মানি এটাকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে আখ্যা দেয়।
২০১৭ সালের মার্চ মাসে জার্মানির কয়েকটি এলাকায় তুরস্কের কয়েকজন মন্ত্রীর জনসভার আয়োজনে নিষেধাজ্ঞা জারি করে জার্মান প্রশাসন। জনসভাগুলোর লক্ষ্য ছিল পরের মাসে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি এরদোগানের ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অনুষ্ঠেয় গণভোটের জন্য এরদোগানের পক্ষে সমর্থন জোগানো। এরদোগান এই নিষেধাজ্ঞাকে জার্মানিতে তুর্কি নাগরিক ও সফরকারি তুর্কি সাংসদদের বিরুদ্ধে নাৎসি কৌশল হিসেবে আখ্যা করায় জার্মান নেতৃবৃন্দ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন।
৩০ মার্চ, ২০১৭। আঙ্কারার বিরুদ্ধে গুলেন সমর্থক ও এবং গুলেন আদর্শবাদী প্রায় ২০০-এরও অধিক প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ তুলে বার্লিন। জার্মানিতে আশ্রয়প্রার্থী তুর্কি নাগরিকগণ অভিযোগ তুলেন যে জার্মানির অভিবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাগণ তুরস্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত গণমাধ্যমের কাছে তাদের তথ্য ফাঁস করে দিচ্ছে।
২০১৭ এর আগস্ট মাস। এরদোগান জার্মানির প্রধান তিন রাজনৈতিক দলকে তুরস্কের শত্রু আখ্যায়িত করেন। জার্মানিতে বসবাসকারী তুর্কি জনগোষ্ঠীর প্রতি আহ্বান জানান তারা যেন এই তিন দলকে ভোট না দেয়। এঞ্জেলা মার্কেলের দল তার এই আহ্বানের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়।  মার্কেল বলেন, এরদোগান জার্মানির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছেন।
২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস। নির্বাচনী এক বিতর্কে মার্কেল বলেন যে, তুরস্ককে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্যপদ দেয়া উচিত হবে না বলে তিনি মনে করেন। এ বিষয়ে তিনি অন্যান্য ইইউ নেতৃবৃন্দের সঙ্গেও কথা বলবেন বলে জানান। পরের মাসে তুরস্কের জন্য ইইউ সদস্যপদ পূর্ববর্তী অর্থায়ন রোধ করার পদক্ষেপকে তিনি সমর্থন দেন।
২০১৮ সালের জানুয়ারি মাস। তুরস্কের সামরিক বাহিনী ও তাদের সিরিয়ান বিদ্রোহী মিত্রদল সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত কুর্দি জনগোষ্ঠীর দখলে থাকা আফরিন এলাকায় অভিযান চালায়। জার্মান রাজনীতিবিদগণ এই অভিযানের নিন্দা করেন এবং জার্মানে অবস্থিত কুর্দি জনগোষ্ঠী এই অভিযানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে।
জুলাই ২০১৮। জার্মান ফুটবল তারকা মেসুত ওজিল এরদোগানের সঙ্গে সাক্ষাতের কারণে সমালোচনার সম্মুখীন হলে এরদোগান ওজিলের পক্ষে অবস্থান নেন এবং ওজিলের বিরুদ্ধে জাতিগত বর্ণবাদ করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন।
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ তে এরদোগানের জার্মানি সফর বিভিন্ন বিবাদে জর্জরিত সম্পর্কোন্নয়নের বার্তা বহন করে। এরদোগান সফরের আগে তার লেখা একটি মন্তব্য প্রতিবেদনে বলেন যে বিশ্বে চলমান নাটকীয় পরিবর্তনের দরুন জার্মানি ও তুরস্ক উভয়ের জন্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে একটি নতুন অধ্যায় রচনা করা অনিবার্য হয়ে পড়েছে। পরস্পর বিভেদ ও বিরোধ ভুলে পরস্পরের সম্পৃক্ত স্বার্থের ওপর মনোনিবেশ করা অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। এরদোগান আরও লেখেন যে উভয় রাষ্ট্রই সন্ত্রাসবাদ, শরণার্থী সমস্যা ও বাণিজ্য যুদ্ধের মতো হুমকি ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
আঙ্কারা ও বার্লিনের সম্পর্ক গত কয়েক বছরে যে কতটা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে আর বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন নেই। তবে, এই সমস্যাগুলোর সমাধানের পথ অন্বেষণের মাধ্যমে সম্পর্কোন্নয়নের সদিচ্ছা উভয় রাষ্ট্রই প্রদর্শন করছে। দুই দেশের সরকারই সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও জোরদার করার প্রতি সচেষ্ট। বহুমাত্রিক সমস্যাগুলো নিয়ে দুই দেশের কূটনীতিকরা নতুন উদ্যমে সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার কথা ব্যক্ত করছেন। আর এই ইতিবাচক পরিবর্তনের নেপথ্যে এরদোগানের বলা হুমকিগুলো প্রধান ভূমিকা পালন করছে।
সিরিয়ায় চলমান সমস্যার কারণে উদ্ধৃত অবৈধ শরণার্থী সমস্যা এর অন্যতম কারণ। কিন্তু এই দুই দেশ এই সমস্যার সম্মুখীন প্রায় গত ৫ বছরব্যাপী। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা বাণিজ্য যুদ্ধ যা বিশ্ব স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তার সঙ্গে রয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা। যা জার্মান ও তুরস্ক দুই দেশের অর্থনীতির জন্য প্রভাব ফেলবে। ফলে, তুরস্ক ও জার্মানি এই সব হুমকির বিপক্ষে পরস্পরকে সহযোগিতা করতে আগ্রহী। পারস্পরিক এই সহযোগিতার জন্য এরদোগান যে কতটা আগ্রহী সেটা জার্মানিতে তার সফরসঙ্গীদের দিকে তাকালেই পরিষ্কার। গত মাসের জার্মানি সফরে এরদোগানের সফরসঙ্গী ছিলেন তার সরকারের অর্থমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান। সফরসঙ্গীদের তালিকা থেকে এই দুই দেশ, অন্তত এরদোগান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নে কোন কোন বিষয়ে গুরুত্বারোপ করতে আগ্রহী সেটাও আঁচ করা যায়।
জার্মানি গুলেন ও তার প্রায় ১০০০ সমর্থককে আশ্রয় দিয়েছে। তুরস্ক গুলেনের দল এফইটিও-কে সন্ত্রাসী দল হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। জার্মানিতে আশ্রিত গুলেন সমর্থকদের বিপক্ষে তুরস্কে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়ে আছে। জার্মান প্রশাসন গুলেনের বিপক্ষে এখনো কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। তবে, জার্মান পররাষ্ট্র দফতরের জুন ২০১৮ সালের একটি প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি জানায় যে, জুলাই ২০১৬-তে তুরস্কে সংঘটিত ব্যর্থ অভ্যুত্থানের নেপথ্যে গুলেন ও তার সমর্থকদের ভূমিকা ছিল। এই প্রতিবেদন যে গুলেন ও তার সমর্থকদের প্রতি জার্মানির দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ইঙ্গিত, তা তুরস্কের দৃষ্টি এড়ায়নি। একইসঙ্গে, তুরস্ক আখ্যায়িত আরেকটি সন্ত্রাসী দল পিকেকে’র বিরুদ্ধে জার্মান প্রশাসন সম্প্রতি কিছু অভিযান চালিয়েছে। তুরস্ক প্রশাসন যে এসব পদক্ষেপসমূহকে অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
গত মাসে তুরস্কের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ তুরস্কের মুদ্রামূল্যে ধস বয়ে আনে। অবস্থা প্রায় আর্থিক সংকটের দিকে ধাবিত হয়। এই সফরের মাধ্যমে তুরস্ক ও জার্মান অর্থমন্ত্রীদ্বয় চলমান মাসেই আবারও বৈঠক করবেন। আলোচনার বিষয়বস্তু হলো তুরস্কের জন্য আর্থিক সহায়তা। ইউরোপ ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কে তিক্ততার কারণে এরদোগান মস্কো শিবিরে যোগ দেয়ার জোর ইঙ্গিত দিয়ে চলেছেন। জার্মানি ও ইইউ’র জন্য তুরস্ক প্রদত্ত নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্কের সঙ্গে সুসম্পর্ক ইইউকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ নিরূপণে সহায়তা প্রদান করে। আর ইইউ এখন মূলত জার্মানির উঠান। একইসঙ্গে ইরাক ও সিরিয়া থেকে আগত অবৈধ শরণার্থী সমস্যা থেকেও ইইউকে রক্ষা করছে তুরস্ক। এজন্য ইইউ’র জন্য ইতিবাচক মনোভাবী তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, তুরস্কের আর্থিক সমস্যা এবং সিরিয়া সমস্যা ক্রমশ মস্কোর সঙ্গে আঙ্কারার সম্পর্কের সীমাবদ্ধতাকেই প্রবল করে তোলে বলে ইউরোপিয়ান বিশেষজ্ঞদের ধারণা। তাদের মতে, আঙ্কারা খুব ভালো করেই জানে যে রাশিয়া কখনোই পূর্ণরূপে তুরস্কের কৌশলগত অংশীদার হতে পারবে না। এর অন্যতম কারণ হলো বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতি এই দুই রাষ্ট্রের আপাত দৃষ্টিভঙ্গিতে বিস্তর পার্থক্য । এজন্য তাদের কৌশলগত স্বার্থ কখনোই একই গতি ও প্রেক্ষাপটে সম্পৃক্ত হতে পারবে না। তারা ভালো করেই জানেন যে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল ও ইইউ’র মতো আর্থিক সহায়তা রাশিয়া দিবে কিংবা দিতে পারবে এমন আস্থা তুরস্কের নেই বললেই চলে।
জার্মানির দিক থেকে বিবেচনা করলে তুরস্কের সঙ্গে সদ্ভাব জার্মানির অভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। এখানে তুরস্কের সঙ্গে স্বাক্ষরিত অবৈধ শরণার্থী বিষয়ক চুক্তি নিয়ে একটু ্আলাদা করেই বলতে হয়।
ইরাক ও সিরিয়ার চলমান সহিংসতা থেকে রক্ষা পেতে সেখান থেকে আগত অবৈধ শরণার্থীরা ইইউ’র রাষ্ট্রগুলোতে, বিশেষ করে জার্মানিতে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করে। এই শরণার্থীদের আগমনে ইইউ রাষ্ট্রগুলোকে তাদের অভ্যন্তরীণ মানবসহায়তা ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। এর প্রধান কারণ হলো ইইউ’র রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আপামর পশ্চিমাবিশ্বে সম্প্রতি আবির্ভূত বিদেশি আগন্তুকদের বিপক্ষে ভয় ও ঘৃণার দৃষ্টিভঙ্গি। এই সমস্যা থেকে রক্ষা পেতে ইউরোপিয়ান রাষ্ট্রগুলো তুরস্কের শরণাপন্ন হয় এবং আঙ্কারার সঙ্গে ২০১৬ সালের মার্চে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে।
ইউরোপে শরণার্থীদের আগমন ব্যাহত করা ইইউ রাষ্ট্রসমূহের জন্য জরুরি হয়ে পড়ে কারণ ইইউ এই নতুন আগন্তুক জনগোষ্ঠীর জন্য সৃষ্ট আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ গ্রহণে নারাজ। এই শরণার্থীদের ইউরোপ আগমনের জন্য প্রধান পথ হলো তুরস্কের মধ্যদিয়ে। তুরস্কের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের পর অবৈধ শরণার্থী আগমনের পরিমাণ প্রায় ৯৯ শতাংশ হ্রাস পায়। এর ফলে সমুদ্রে অনাহূত মৃত্যুর ঘটনাও এড়ানো সম্ভব হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় তুরস্ক ৬ বিলিয়ন ইউরো অর্থসহায়তা পাবে এই লাখ লক্ষ শরণার্থী দেখভালের জন্য।
তাছাড়া, জার্মানির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলেও তুরস্কের সঙ্গে সদ্ভাব জার্মানির স্বার্থের অনুকূল। তুর্কি বংশোদ্ভূত প্রায় ৩০ লাখ জার্মান নাগরিক এর প্রধান কারণ। সঙ্গে রয়েছে জার্মানিতে বসবাসকারী কুর্দি জনগোষ্ঠী। এই দুই জনগোষ্ঠীই তুরস্কের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অগ্রগতি ও প্রেক্ষাপট দ্বারা প্রচ-ভাবে প্রভাবিত। তুরস্কের অভ্যন্তরীণ কোনো ঘটনা জার্মানিতে অবস্থানরত এই জনগোষ্ঠীদ্বয়ে বিস্ফোরণ করতে সক্ষম। এমতাবস্থায়, তুরস্কের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন করে জার্মানির মধ্যে অবস্থানরত এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ওপর এক পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা জার্মানির সকল নীতি-নির্ধারকদের জন্য জরুরি।
এছাড়াও, জার্মানি তার ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরান ও রাশিয়ার জ্বালানি মজুদের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু পোল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি রাশিয়া থেকে জার্মানি পর্যন্ত নর্ড স্ট্রিম ২ নামক গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এই পাইপলাইন রাশিয়ান প্রাকৃতিক গ্যাস জার্মানি পর্যন্ত পৌঁছে দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করত। ন্যাটো জোটের এই দুই সহোদরের এমন আচরণ জার্মানিকে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে। জার্মানি এখন আপাতত বিকল্প গ্যাস উৎস সন্ধান করছে এবং তুরস্ক সেই ভূমিকা অনায়াসে পালন করতে সক্ষম। এজন্য জার্মানি আবারও ট্রান্স-আটলান্টিক ন্যাচারাল গ্যাস পাইপলাইনের পরিকল্পনা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার বিবেচনা করতে পারে।
এছাড়া জার্মানি ও তুরস্কের মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক তো রয়েছেই। টাকার অঙ্কে সেটা জার্মানির জন্য এখনও তেমন গুরুত্বপূর্ণ না হলেও, বাণিজ্যের ভারসাম্য জার্মানির পক্ষে। আবার, টাকার অঙ্কে হিসাব করলে জার্মানি বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অস্ত্র বিক্রেতা এবং তার দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা হলো তুরস্ক। সম্প্রতি জার্মান নাগরিকদের আটক করার কারণে জার্মানি এই অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করে। কিন্তু তুরস্ক সেই জার্মান সাংবাদিকদের মুক্ত করার পর অস্ত্র সরবরাহ আবারও চালু হয়েছে।
জার্মানি ও তুরস্কের সম্পর্কে অনেক টক, ঝাল, মিষ্টি রয়েছে বৈকি। কিন্তু, তাদের সম্পর্কটা পারস্পরিক স্বার্থান্বেষী এবং এদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পরস্পরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই বাস্তবতাগুলো সম্বন্ধে দুই দেশের নীতিনির্ধারকগণ সর্বদাই অবগত। হয়তো, কিছু ঘটনা ও তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক অতিউদ্যমের কারণে তারা সবসময় এটা উপলব্ধি করেন না। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে দীর্ঘসূত্রতা, বৈচিত্র্যতা ও অস্থিতিশীলতা সহজেই তাদের এ বিষয়গুলো স্মরণ করিয়ে দেয়। যেমনটা, মার্কেল ও এরদোগান আবারও টের পাচ্ছেন। এজন্যই তারা এখন সব সমস্যার স্পর্শকাতরতা ও বাস্তবতার আলোকে যুক্তিসঙ্গত সমাধানের দিকে এগিয়ে যাবেন বলে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস। দুই দেশের কূটনীতিকগণ সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য বন্ধ দরজার পেছনে সংলাপে বসবেন। আর অন্যরা তাদের স্বাভাবিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে এগিয়ে যাবেন বলেই সবার বিশ্বাস।
Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
দেশের বাইরে
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.
বর্তমান সংথ্যা
পুরানো সংথ্যা
Click to see Archive
Doshdik
 
 
 
Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive