Logo
 বর্ষ ১০ সংখ্যা ১৫ ২৬শে ভাদ্র, ১৪২৪ ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
দেশের বাইরে
প্রতিবেদন
 
http://sadiatec.com/
[উদযাপন] জন্মদিনের প্রিয় সঙ্গী  
৮ সেপ্টেম্বর কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের জন্মদিন উপলক্ষে তাকে নিয়ে লিখেছেন ইফতেখারুল ইসলাম

রায়েরবাজার এলাকায় সনাতনগড় নামে একটা জায়গা আছে। অভিজাত ধানমন্ডি থেকে অল্পই দূরে কিন্তু রাস্তাঘাটের করুণ দশার কারণে মনে হয় অনেকটা ভেতরে। আমাদের ছেলেবেলায় চারদিক অনেক খোলামেলা ছিল। তাই অনেক দূর থেকেই দেখা যেতো সেখানকার পথঘাট, মাটির তৈরি পুরনো বাড়ি, আর অল্প কিছু নতুন বিল্ডিং অথবা টিনের ঘর। জিকাতলা বাসস্ট্যান্ড থেকে কিছুদূর গেলেই একটা আলাদা জগৎ। ইট-বিছানো সরু রাস্তা। এক পাশের ইট সরিয়ে সদ্য বসানো হয়েছে ওয়াসার পানির পাইপ। তারপর তিতাস গ্যাসের লাইন বসানোর জন্য নতুন করে খোঁড়াখুঁড়ি। বাকি রাস্তার অনেকটাই ভেঙে-চুরে গেছে বর্ষার বৃষ্টিতে।
এই রাস্তার বেশ খানিকটা ভেতরে আমাদের বাড়ি। সুতরাং আমার কলেজে যাতায়াত আর অন্য সব ভাই-বোনের প্রতিদিনের চলাফেরা এই ভাঙা রাস্তার ওপর দিয়েই করতে হয়। বৃষ্টির পানি রাস্তায় জমে গেলে জুতো খুলে হাতে নিয়ে হাঁটা। সদ্য স্বাধীন দেশে মধ্য-সত্তরে এটা কোনো ব্যাপার না। কিন্তু এরই মধ্যে হঠাৎ শুনি আমাদের এ রাস্তার সংস্কার হবে। পুরো রাস্তা কংক্রিটে ঢালাইয়ের কাজ করে দেবে মিউনিসিপ্যালিটি। আজ যার নাম সিটি কর্পোরেশন। রাস্তা হয়তো সত্যিই করে দেবে, কিন্তু আমরা সেই অপেক্ষায় থাকি দীর্ঘকাল। তারপর অবশেষে একদিন সেখানে ইট-পাথর-বালি এনে জমা করা হয়। কিছু যন্ত্রপাতি আসে। কাজ শুরু হয়। মাঝে-মধ্যে কাজের তত্ত্বাবধান করে এক তরুণ কন্ট্রাক্টর। একদিন দূর থেকে তাকে দেখি। মনে হয় তার সঙ্গে আগে অন্য কোথাও দেখা হয়েছে। আমি নিশ্চিত হই, লেখালেখির সূত্রেই আমাদের পরিচয়। তাই এখানে তাকে দেখে আমি একটু বিস্মিত হই। একদিন   রাস্তায় দাঁড়িয়ে ওর সঙ্গে গল্প করি। বুঝতে চেষ্টা করি, কীভাবে এই পেশায় এলো অল্প বয়সের ছেলেটি। প্রায় আমারই বয়সের, জিন্স-টি-শার্ট পরা এই স্মার্ট তরুণের নাম ইমদাদুল হক মিলন।
আমাদের জন্মদিন যে একই তারিখে সেটা জানা ছিল না। তখনও আমাদের মধ্যে তেমন ঘনিষ্ঠতা নেই। আমি তখন সদ্য কলেজ শেষ করে ইউনিভার্সিটিতে ঢুকেছি। আর ওই বয়সে কেন এবং কীভাবে মিলন প্রথম শ্রেণির কন্ট্রাক্টর হিসেবে সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে কাজ শুরু করেছিল সেটাও জানা হয়নি। কিন্তু আমি ওই  কন্ট্রাক্টর সাহেবকে সমীহ করে চলি।
কিছুদিন পর নিয়মিত হয় আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ। আরও কজন বন্ধুর সঙ্গে একসঙ্গে আড্ডা, লেখালেখি ও নানারকম পরিকল্পনা। এভাবে দিন কাটে। আনন্দ, হই-চৈ আর হতাশার দিন। বন্ধুত্ব গভীরতর ও স্থায়ী হতে থাকে। সে সময় দেখেছি মিলন বই পড়ে প্রচুর আর লেখালেখিতে অসম্ভব সিরিয়াস। অথচ জীবিকার জন্য ও অন্য কিছু করতে চায়। এটা কীভাবে সম্ভব?
বিচিত্র কিছু করার চেষ্টা মিলন চালিয়ে গেছে আরও কিছুদিন। সত্তর-আশির দশকে আমাদের বেশকিছু নামি কবি ও লেখক এড এজেন্সিতে চাকরি করতেন। কপি, ক্যাপশন ও ট্যাগ লাইন লেখা, আর কিছু অনুবাদ। তাদের মতো আমিও ছাত্রজীবনে বেশ কিছুদিন এ ধরনের কাজ করি। কিন্তু মিলন আরও বড় কিছু করতে চায়। তাই চাকরির চেষ্টা না করে নিজেই এক সময় এড এজেন্সি প্রতিষ্ঠা করে ফেলে। তখন এ বিষয়টি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়। আমাদের বন্ধু ও পরিচিতজনদের প্রত্যেকে একটা করে এজেন্সি বা বিজ্ঞাপন সংস্থা তৈরি করছে। আর মিলন নিজে যখন দোয়েল নাম দিয়ে অফিস সাজিয়ে বসে তখন বিজ্ঞাপনের কাজ পাওয়া তো কোনো ব্যাপার না। মনে হয় ও বিশাল কোনো ব্যবসায়ী হতে চলেছে। তাহলে ওর লেখালেখির কী হবে ? সেটা নিয়ে অবশ্য বেশিদিন দুশ্চিন্তা করতে হয় না। শুরুতে ব্যবসায়ে বিপুল উত্তেজনা থাকলেও তা বেশ দ্রুতই স্তিমিত হয়ে আসে।
এর পরেও ও থেমে থাকেনি। চেষ্টা করেছে প্রকাশক হতে। প্রকাশক হিসেবে সফল হওয়া যে কোনো ব্যাপার না সেটা ওর কাছে অনেকবার শুনেছি। ওই প্রকল্পে বোধ করি হুমায়ূন আহমেদকেও যুক্ত করতে চেয়েছিল। তবে এগুলো যে আসলে অন্যের কাজ সেটা বুঝতে ওর খুব বেশি সময় লাগেনি।
জীবিকার প্রয়োজনে অন্য কিছু করতে চাইলেও আসলে মিলন শুরু থেকে মনেপ্রাণে শুধু লেখক হতেই চেয়েছে। সেখানেই তার সব উচ্চাকাক্সক্ষা। তাই মিলনকে নিজের লেখালেখির জন্য যথেষ্ট সময় দিতে হয়। আরও অনেকটা সময় সে ব্যয় করে পড়ার জন্য। এরপর আর সময় কোথায় ? অথচ লেখার বাইরে অন্য যে-কোনো পেশায় সফল হতে হলে সেখানে দিতে হয় গভীর মনোযোগ। সেটা মিলনের জন্য মোটেই সহজ নয়। ওখানে সে স্বচ্ছন্দ হবে কী করে ? কাজেই এক সময় তুচ্ছ হয়ে যায় এই সব জাগতিক কর্মকাণ্ড।  
আগেই বলেছি এক সময় আমাদের বন্ধুদের মধ্যে ছিল সার্বক্ষণিক যোগাযোগ। তখন আমাদের অনেকের বাড়িতেই ফোন ছিল না। মোবাইল ফোন, ই-মেইল, ফেসবুক ছাড়া নিত্যদিনের এই যোগাযোগ কেমন করে সম্ভব হতো সেটা ভাবলে এখন আশ্চর্যই লাগে। তার পরেও আমরা ঠিকই সময়মতো একত্রিত হয়ে যেতাম। ছাত্রজীবনে আমি যেখানে কাজ করতাম সেই অরিয়ল এডভারটাইজিং-এর অফিসে আর ফরিদুর রেজা সাগরের খাবার দাবার রেস্তোরাঁয় ছিল আমাদের আড্ডা।
বিভিন্ন কারণে সিনিয়র কবি, লেখক, সম্পাদক, নাট্যকার ও অধ্যাপকদের সঙ্গে আমাদের অনেকের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো সম্পর্ক ছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে মিলনের অবস্থা ছিল একদম অন্যরকম। নিজে গদ্যলেখক। কিন্তু ছোট-বড় নানা বয়সের কবির সঙ্গে ওর ঘনিষ্ঠতা। কবিরা কেন তাকে এত পছন্দ করত আর এত ভালোবাসতো তা আমার কাছে রহস্যময়। রফিক আজাদের সঙ্গে মিলনের সম্পর্ক তো সে সময় রীতিমতো বিখ্যাত। সেটাকে মিলন আরও জনপ্রিয় ও প্রবাদতুল্য করে তোলে নিজেদের নিয়ে লেখা উপন্যাসে।
আমার ঢাকা কলেজের শিক্ষক কবি মোহাম্মদ রফিক পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর হন। তার সঙ্গে ওই সময় আমার সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো। বৈশাখী পূর্ণিমার পর তার কাব্যগ্রন্থ কীর্তিনাশা তখন সদ্য বের হয়েছে। আমরা তার মুগ্ধ পাঠক। জাহাঙ্গীরনগরে তাঁর বাসায় গিয়েছি অনেকবার। তিনি ঢাকায় এলে একবার না একবার অরিয়ল অফিসে আসবেনই। অন্যান্য কাজ শেষে আমাদের অফিসে এসে কখনো কখনো গোসল ও বিশ্রাম সেরে তারপর ইউনিভার্সিটির বাস ধরতেন। কিছুদিন পর ঈর্ষার সঙ্গে লক্ষ্য করি যে এই কবির সঙ্গে মিলনের ঘনিষ্ঠতা হলো সবচেয়ে গভীর।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার আমার ঢাকা কলেজের শিক্ষক। ধারণা করি, আমি তার প্রিয় ছাত্রদের একজন। তার সম্পাদিত বিখ্যাত কণ্ঠস্বর পত্রিকায় আমার লেখা ছাপা হয়। কিন্তু কিছুদিন অন্য কাজে ব্যস্ত থাকলে আমার কথা একদম ভুলে যান স্যার। জনপ্রিয় লেখক এবং জনপ্রিয় ধারার কথাসাহিত্য সম্পর্কে স্যার কতটা কঠোর মনোভাব পোষণ করেন সেটা আমরা সকলেই জানি। অথচ আশ্চর্য হয়ে দেখি আমাদের বন্ধু মিলনের প্রতি স্যারের অসামান্য স্নেহ। আসলে একজন লেখকের শক্তি ও একাগ্রতাকে সকলেই মূল্য দেয়। সাহিত্যের মতো একটা বিষয়ের জন্য নিজেকে পুরোপুরি উৎসর্গ করে দেওয়াটা কোনো দেশে কোনো সমাজেই খুব বেশি দেখা যায় না। মিলনের এই অঙ্গীকারকে সম্মান জানিয়েছেন সকলেই।
তরুণ লেখক হিসেবে মিলনকে কবিরা কতটা ভালোবাসে তার আরও পরিচয় পাই সেই দিনটাতে যেদিন মিলন জার্মানি চলে যায়। আমরা তখনও ছাত্র। অল্প বয়সে তার এই স্বেচ্ছা-নির্বাসন আমাদের সবাইকে ব্যথিত করেছে। ওর যাবার দিনটাতে অনেকেই রীতিমতো শোকার্ত। বন্ধু-বিচ্ছেদের শোক কারও কারও খুবই গভীর। কিন্তু যাকে বলে ক্রমাগত অশ্র“-বিসর্জন সেটার প্রত্যক্ষদর্শী আমি ছাড়া খুব বেশি নেই।
স্মৃতি জিনিসটা এমনিতেই ঝামেলাজনক। আরও বিপজ্জনক হচ্ছে আমাদের বেপরোয়া তারুণ্যের স্মৃতি। এখন এ নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। কখন সেটা কার কোন অনুভূতিতে আঘাত করবে বলা মুশকিল। সে জন্যই আনুষ্ঠানিক স্মৃতিচারণে আমন্ত্রণ জানালে আমি সাধারণত এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করি। বলি যে, আমার হয়েছে সিলেক্টিভ এমনেশিয়া। নিরাপত্তাজনিত কারণে বিশেষ বিশেষ জিনিস ভুলে গেছি। আর বিশেষ উপাদানগুলো বাদ দিলে যে স্মৃতিটুকু বাকি থাকে সেটা নিজেদের যেমন অল্পই আনন্দ দেয় অন্য পাঠকের জন্যও হয়ে যায় প্রাণহীন ও নিরুত্তাপ।
তবু আমাদের সতর্ক থাকতেই হয়। ভুলে যেতে হয় কিছু গল্প। আর এই ভাবে আমাদের না-বলা গল্পগুলো হারিয়ে যায়। অন্যদিকে মিলনের স্মৃতিশক্তি ভয়াবহ রকমের প্রবল। ও সতীনাথ ভাদুড়ী অথবা তারাশঙ্করের কোনো উপন্যাসের চরিত্র, ঘটনা, সংলাপ এমনকি আস্ত প্যারাগ্রাফ মুখস্থ বলে দিতে পারে যে-কোনো সময়। তাই তার সঙ্গে সাহিত্য-আলোচনা অতি আনন্দের। এহেন স্মৃতিশক্তি নিয়ে সে যদি আমাদের কৈশোর-যৌবনের স্মৃতিচারণ শুরু করে তাহলে আমাদের অনেককেই রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজতে হবে অন্য কোনোখানে।
আশ্রয় খোঁজার প্রয়োজন ইতোমধ্যেই হতে পারতো। ‘বন্ধুবান্ধব’ নামে মিলনের একটা বড়সড় বই আছে। এই লেখা এক পাক্ষিক পত্রিকায় বের হয় ধারাবাহিকভাবে। একেক কিস্তি লেখা ছাপা হয় আর আমি আতঙ্কের সঙ্গে পত্রিকা কিনে এনে গোপনে পড়ে দেখি ওতে কার কার কথা লেখা আছে। কোন ঘটনার কী ধরনের স্মৃতি। পত্রিকাটা কে কে বাড়িতে নিয়ে যেতে পারবে। আর কেউ কোনো বিপদে পড়ল কি-না। শেষ পর্যন্ত কোনো বড় দুর্বিপাক ছাড়াই লেখাটা শেষ হয়েছে। বই বের হয়েছে, কিন্তু বিরাট কোনো ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেনি। আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার আগেই অবশ্য মিলন হুমকি দিয়ে রেখেছে যে এই বইটা কেবল শুরু। বন্ধুদের সঙ্গে নানা স্মৃতি নিয়ে আরও বিস্তারিত লেখার পরিকল্পনা আছে ওর। আমার কথা হলো, বন্ধুদের নিয়ে লেখার কী দরকার? ষাট বছর অথবা তারও বেশি বয়সে আমাদের সতের আঠারো অথবা একুশ বছর বয়সের স্মৃতিগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া না করাটাই নিরাপদ।
এবার মূল কথায় আসি। মিলন আমার বন্ধু সে জন্য গর্ব হয়। কারণ, মিলনকে বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের সেরা কথাসাহিত্যিকদের একজন বলে মনে করি। তার লেখা বেশ কয়েকটি উপন্যাস উৎকর্ষতার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আমাদের সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্ভারের মধ্যে তাদের অনায়াসে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। যাকে বলে কালজয়ী এমন কিছু লেখা মিলন আরও অনেক বছর আগেই লিখেছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এখন পরিণত বয়সে ও লিখবে আরও নতুন বিষয়ে, নতুনতর আঙ্গিকে।
সব পাঠক হয়তো ব্যাপারটা ধরতে পারেননি। কিন্তু সাহিত্যে মিলন যে একটা বড় কাজ করতে এসেছে তা শুরু থেকেই স্পষ্ট ছিল। প্রথম দিকে লেখা কিছু উপন্যাস, কয়েকটি ছোটগল্প আর পরবর্তীকালে রচিত দীর্ঘ উপন্যাস নুরজাহান পর্যন্ত নিজের আকাক্সক্ষা পূরণে অবিরত কাজ করেছে মিলন। তার অসামান্য সাফল্য দেখি কাহিনীর বিস্তারে, চরিত্র-সৃজন ও বিকাশে, পরিপার্শ্বের অনুপুঙ্খ বিবরণে। সমাজের     অন্তর্গত নানাবিধ ঘাত-প্রতিঘাত এবং তা থেকে তৈরি মানবিক জটিলতার উদঘাটনে কথাসাহিত্যিক হিসেবে মিলন তার উচ্চ সামর্থ্য এবং সুচারু শক্তিমত্তার স্বাক্ষর রেখেছে। বিশেষত সে অসামান্য কৃতিত্বের সঙ্গে আয়ত্ত করেছে গ্রামীণ জীবনপ্রবাহের সমস্ত খুঁটিনাটি। সমাজের অন্তর্গত সকল মানবিক দ্বন্দ্ব-জটিলতা এবং নানাপ্রকার সংঘাতের সূত্র তার জানা। এটা এক বিস্ময়।
আমাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে, এই শহরে সারাদিন ঘুরে বেড়িয়ে, নাগরিক আবহের মধ্যে বড় হয়ে কখন, কীভাবে এত কিছু আয়ত্ত করল সে ? কীভাবে সে দেখল গ্রামীণ সমাজের অভ্যন্তরীণ জটিলতা, অর্থনৈতিক ও পেশাভিত্তিক শ্রেণিবৈষম্য ও তা থেকে সৃষ্ট সংঘাত আর শহরের মধ্যবিত্ত ও নগরায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যস্বত্বভোগী সম্প্রদায়ের সঙ্গে গ্রামের ক্ষমতাবানদের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্বাভাবিক নৈকট্য ? এ ছাড়া নারী-পুরুষের ব্যবধান ও বৈষম্য, দমিত, দুর্বল ও নিরুপায় মানুষের ভাষাহীন বিবেক, ধর্মান্ধতার বাণিজ্য এবং তা থেকে তৈরি করা নানাবিধ স্বার্থান্বেষী শৃঙ্খল ও নিপীড়নমূলক ব্যবস্থাকে অনায়াসে গল্পের ভিতরে তুলে আনে ইমদাদুল হক মিলন। তাদের সে সঞ্চারিত করে আমাদের বোধের ভিতরে।
ওর লেখা সম্পর্কে বিশ্লেষণ-ধর্মী আলোচনা খুব বেশি চোখে পড়েনি আমার। সমকালীন সাহিত্যের কোনো একটি বড় কাজ নিয়ে আমাদের ফেনিল উচ্ছ্বাস অথবা সন্দিগ্ধ অবজ্ঞা-সংশয় যতখানি, বস্তনিষ্ঠ বিশ্লেষণ ও নৈর্ব্যক্তিক মূল্যায়নের আগ্রহ ততটা দেখি না। কিছু কিছু উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি সেই দাবি জানালেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমাদের সমালোচনা-সাহিত্য থাকে নিস্পৃহ ও  নিরুত্তর।
আমাদের এখানে সমকালীন সাহিত্য ও প্রকাশনা বিষয়ে আলোচনা সাধারণত অতি সংক্ষিপ্ত হয়। আর তা সীমাবদ্ধ থাকে দৈনিক সংবাদপত্রের সাহিত্য সাময়িকীর পরিসরে। ৮০০ থেকে ১২০০, অথবা বড়জোর ১৮০০ শব্দে। সেসব পত্রিকার পাতায় আবার অনেকখানি জায়গা দিতে হয় নোবেল, বুকার, পুলিৎজার অথবা অন্য কোনো পুরস্কার পাওয়া লেখকদের নিয়ে আলোচনা করার জন্য। বিদেশি বিখ্যাত লেখকদের নিয়ে আলোচনা লেখাটাও সহজ। ইন্টারনেট ঘাঁটলেই অনেক কিছু পাওয়া যায়। সহজেই মেলে রেফারেন্স। কিন্তু দেশের একজন সমকালীন লেখক সম্পর্কে লিখতে গেলে পুরোটাই নিজের পরিশ্রম। অথচ এই কাজ করে পাঠকের কাছে খুব বেশি মর্যাদা পাওয়া যায়  না। ফলে খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস অথবা রিজিয়া রহমানের নাম আমরা ভুলে যাই। সৈয়দ শামসুল হক, সেলিনা হোসেন, রাবেয়া খাতুন অনালোচিত থাকেন।  
মিলনের ছোট-বড় বেশকিছু উপন্যাস, তাদের ভাষা, চরিত্র, মনোজগত, সমাজ-প্রতিবেশ, পুরান ঢাকার বিলুপ্তপ্রায় জীবন ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন গ্রাম-চিত্রের জন্য এখনই যথাযথ মনোযোগ ও মর্যাদা পাবার উপযুক্ত। পরবর্তীকালে একসময় হয়তো এর প্রতিটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে তত্ত্ব-পদ্ধতি ও প্রকরণগত দিক থেকে উন্নতমানের আলোচনা ও গভীর গবেষণা হবে। হয়তো মিলনের সমাজ-নিরীক্ষণ অথবা বিস্তারিত আখ্যান থেকে নতুন দৃষ্টিকোণ ও শৈলী খুঁজবেন ভবিষ্যতের আলোচকগণ। কিন্তু এই আলোচনার সূচনাটি এখনই হওয়া দরকার।
দেশের অগণিত পাঠকের সঙ্গে মিলে আমিও কামনা করি ইমদাদুল হক মিলন দীর্ঘজীবী হোক। আরও চাই, দীর্ঘজীবী হোক তার রচনাবলি। পাঠক আর লেখক অর্থাৎ আমি আর মিলন যেন একসঙ্গে আমাদের জন্মদিন উদযাপন করতে পারি আরও অনেক বছর।
Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
ফিচার ও অন্যান্য
  • [অন্যদৃষ্টি] ভ্যান শেন্ডেল-এর চোখে বাংলাদেশ
  • ইমপ্রেস টেলিফিল্মের নতুন ছবি রবীন খানের 'মন দেব মন নেব'
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.
    বর্তমান সংথ্যা
    পুরানো সংথ্যা
    Click to see Archive
    Doshdik
     
     
     
    Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive