Logo
 বর্ষ ১০ সংখ্যা ২৩ ২২শে কার্তিক, ১৪২৪ ১৬ নভেম্বর, ২০১৭ 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
দেশের বাইরে
প্রতিবেদন
 
http://sadiatec.com/
রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গাদের দুঃখগাথা -সায়েম সাবু  
সায়েম সাবু, সরেজমিন থেকে
চোখগুলো ছল ছল করছে। শেষ কবে ঘুমিয়েছিল, তা হয়ত অনেকেরই মনে নেই। যারা বসে আছেন, তাদের চোখ ঘুমে ঢুলুঢুলু। কিন্তু ঘুমানোর উপায় কই! বৃষ্টির কান্না এসে দুঃখ বাড়িয়েছে উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের মাঝে। দিনভর বৃষ্টি  যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে রোহিঙ্গা পাড়ায়।
কাদা-বৃষ্টি সঙ্গে নিয়ে এক টুকরা পলিথিনে টঙ ঘর তুলে কেউ কেউ ঘুমানোর চেষ্টা করলেও, ক্ষুধা তাতে বাগড়া বাধিয়েছে। ক্ষুধার জ্বালা যে আর ওরা সইতে পারছে না, তা মলিন মুখগুলোই বলে দিচ্ছে। ঘুমের মতো মুখের হাসিও যে কবে উবে গেছে, তা জানা নেই রোহিঙ্গাদের।
বলছিলাম, রাষ্ট্রহীন, ভূমিহীন আরাকানের রোহিঙ্গাবাসীর দুঃখকথা। মিয়ানমার নামক রাষ্ট্রটিই তাদের রাষ্ট্রহীন করেছে। খোদ রাষ্ট্র, সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে আর হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে তাড়িয়ে দিচ্ছে সীমানার এপারে।
কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফ, বান্দরবানের নাইক্ষ্যাংছড়িজুড়ে এখন রোহিঙ্গা কান্না। রোহিঙ্গা কান্নায় অভিশপ্ত হচ্ছে বিশ্বসভ্যতা, দলিত হচ্ছে বিশ্বমানবতা। প্রাণভয়ে নিজ দেশ ছেড়ে ভিন দেশে ঠাঁই নিলেও প্রতিজন রোহিঙ্গা জীবন এখন একেকটি ‘দুঃখগাথা উপাখ্যান’।
কক্সাজারের উখিয়া উপজেলা এখন নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষের এক জনপদ। উখিয়া বাজার থেকে কুতুপালং, কুতুপালং থেকে বালুখালি রাস্তার দু’ধারে লাখো রোহিঙ্গা ঠাঁই খুঁজছে। ঠাঁই বলতে চার কোনায় চারটি খুঁটিতে পলিথিনের ঘর। তাও মিলছে না অনেকের। সমস্ত জায়গা আগেই দখল হয়ে গেছে। সহায়-সম্বলহীন রোহিঙ্গারা এখনও স্রোতের মতো আসছেন। ঠাঁই না পেয়ে অনেকেই রাস্তার পাশে বসে-দাঁড়িয়ে প্রহর গুণছেন। প্রাণ ভয়ে আরও কয়েক লক্ষ রোহিঙ্গা সীমানার কাছে অবস্থান নিয়েছেন বলে জানালেন পালিয়ে আসা মানুষ।
দিনের পর দিন পাহাড়ি পথ হেঁটে আর রাত জেগে জীবনের ঘানি আর টানতে পারছেন না রোহিঙ্গারা। একটু খাবার, একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই পেতে মরিয়া তারা। নারী, বৃদ্ধ আর শিশুরা এখানে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। যে সহায়তা মিলছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। খাবার মিলছে না। চুলাও জ্বলছে না।  গোসলের পানি তো দূরের কথা, খাবার পানিও মিলছে না নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের মাঝে। এমনকি প্রস্রাব-পায়খানার জায়গাও পাচ্ছেন না রোহিঙ্গারা।
কথা হয়, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু গ্রামে রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নেয়া আলমাস মিয়ার সঙ্গে। বলেন, আরাকানের মুসলিমরা এখন নরকে বাস করছে। যাকে পাচ্ছে তাকেই হত্যা করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। আমার ঘরবাড়ি-দোকানপাট সব জ্বালিয়ে দিয়েছে মগ জনগোষ্ঠী আর সেনাবাহিনী মিলে। ঈদের তিন দিন আগে পালিয়ে এসেছি। এতটুকু ক্যাম্পে এখন ১২০০ মানুষ বাস করছি। নতুন যারা আসছেন, তারা ঠাঁই পাচ্ছেন না। ঠাঁই পেলেও ঘর বানানোর উপকরণ মিলছে না।
তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, আমাদের জীবন রক্ষার্থে বাংলাদেশ সরকার যে ভূমিকা রাখছে, তা কখনই ভোলার নয়। আমরা অবিলম্বে বিশ্ববাসীর সহায়তা চাইছি।

‘গ্রামগুলোয় শুধুই লাশের গন্ধ’
‘মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মগ জনগোষ্ঠী মিলে রোহিঙ্গাদের গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে। গ্রাম ঘিরে সেনারা গুলি আর জবাই করে রোহিঙ্গাদের হত্যা করছে। গত ২৫ তারিখের পর প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমকে হত্যা করেছে। এখনও নানা জায়গায় লাশ পড়ে আছে।’
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রতি এমন অভিযোগ এনে বলছিলেন রোহিঙ্গা আরিফুর রহমান। আরিফুর রহমান আরাকান রাজ্যের তুমব্রু রাইট গ্রামে বসবাস করতেন। ব্যবসা করে বাড়ি-গাড়ি সবই করেছিলেন। মিয়ানমার সেনারা গত ৬ জুলাই তুমব্রু গ্রাম জ্বালিয়ে দিলে আরিফের বাড়িও পুড়ে ছাই হয়। পুড়ে দিয়েছে শখের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রাইভেট কারটিও।
এই ব্যবসায়ী রোহিঙ্গা মুসলিমদের অধিকার আদায়ে আন্দোলন করে আসছিলেন। দোভাষী হিসেবেও কাজ করেছেন সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাঝে। নির্যাতন-নিপীড়নের সকল খবরই রাখছেন দীর্ঘদিন থেকে। এখন প্রাণ ভয়ে সীমানা পেরিয়ে এপারে এসে তাঁবু করেছেন। পরিবারের ৭ জন সদস্য নিয়ে একই তাঁবুর নিচে বাস করছেন ঈদের পর থেকে।
বলেন, আরাকান রাজ্যে মোট ৫টি উপজেলা। সব উপজেলায় মুসলিম রোহিঙ্গা থাকলেও মন্ড, কুসিডং এবং রাসিডং উপজেলায় মুসলিম জনসংখ্যা বেশি। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই আমরা প্রতিটি নির্বাচনে ভোট দিয়ে আসলাম। কিন্তু ২০১৫ সালের পর থেকে সরকার আমাদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে আখ্যা দিতে থাকে।
মগদের এক ধর্মীয় নেতা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মুসলিম বিদ্বেষী বয়ান দেয়ার পর থেকেই মুসলমানদের ওপর নির্যাতন শুরু হয়। ওই ধর্মীয় নেতা সেনাবাহিনীর সঙ্গে আঁতাত করেই সন্ত্রাস উসকে দিচ্ছেন। সংঘর্ষ হলেও আগে কখনো এমন নির্যাতন হয়নি। আগে সেনারাই এসে আমাদের রক্ষা করত। আর এখন সেনারাই গুলি করছে, হত্যা করছে।
২৫ তারিখের পর সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আরো ২ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পার হওয়ার জন্য বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান করেছেন। তিন উপজেলার আর বাকি ১২ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম কী অবস্থায় আছে, তা কেউ জানে না। যারা পালিয়ে আসছেন, তারা বলছেন, গ্রামগুলোয় শুধুই রোহিঙ্গাদের লাশের গন্ধ।
তিনি মিয়ানমারের বিভিন্ন পয়েন্টে আটকা পড়া রোহিঙ্গাদের উদ্ধারে বিশ্ববাসীর কাছে আহ্বান জানান।

‘গোসলে গিয়ে রক্তে লাল হলেন শাশুড়ি’
‘বৃদ্ধ শাশুড়ি। তাকে হত্যা করবে না বলে সাহস করে বাড়িতে গিয়েছিল গোসল করতে। গোসলে গিয়ে রক্তে লাল হলেন শাশুড়ি। নিজের বাড়ির কাছে কখন বোমা (ল্যান্ডমাইন) পেতে রেখেছিল মিয়ানমার সেনাবাহিনী টের পাইনি।  সেই বোমাতেই দুই পা হারালেন আমার মায়ের মতো শাশুড়ি। সেদিনের ঘটনা বলতে পারি না। কষ্টে বুক ফেটে যায়।’
এ কান্না রোহিঙ্গা নারী খলিমা বেগমের। খলিমার বয়স ২০ ছুঁই ছুঁই। বিয়ে হয়েছে গেল বছর। বান্দারবনের তুমব্রু গ্রামের সীমানা ঘেঁষে মিয়ানমারের তুমব্রু রাইট গ্রাম। আদি পুরুষেরা ও গ্রামেই পত্তন গড়েছিল বলে জানালেন তিনি। গেল ২৫ আগস্ট গোলাগুলির পর ঈদের আগেই বাড়ি ছেড়ে বাংলাদেশ সীমানায় আশ্রয় নেন তার পরিবার।
শনিবার বিকেলে তুমব্রু রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা হয় খলিমার সঙ্গে। হাত উঁচিয়ে নিজ বাড়ি দেখিয়ে বলেন, বড় সংসার আমাদের। বাড়ি ছেড়ে আসতে মন চায়নি। কয়েক একর জমিতে ধান চাষ করেছি। প্রাণ বাঁচাতেই এপারে আসি।
শাশুড়ির আহত হওয়ার ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ক্যাম্পে গোসলের কোনো ব্যবস্থা নেই। কয়েক দিন গোসল না করতে পারায় শাশুড়ি অস্থির হয়ে যান। ৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে শাশুড়ি (সাবুকেন্নসা-বয়স ৭০ বছর) বাড়িতে যান গোসল করতে। গোসল সেরে সীমানার কাছে আসতেই বিকট শব্দ হয়। বোমায় (স্থলমাইন) এক পায়ের হাঁটুর নিচ থেকে উড়ে যায়। আরেক পায়ের মাংসও ছিঁড়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এরপর সেখান থেকে ফেরত দিলে উখিয়ায় খ্রিস্টান হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ডাক্তাররা তার দু’পা-ই কেটে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছেন।
সীমান্তে মিয়ানমার সেনাবাহিনী নতুন করে বহু স্থলমাইন পুঁতে রাখছেন বলে জানালেন আরেক রোহিঙ্গা এনাম হোসেন। বলেন, দিন-রাত সারাক্ষণ এখন স্থলমাইন পোঁতা হচ্ছে সীমান্তে। স্থলমাইন বিস্ফোরণে বেশ কয়েকজন মারাও গেছে উল্লেখ করেন তিনি।

‘বাপ-দাদার রাষ্ট্র ছিল না। আমাদেরও হলো না’
‘প্রথমে মগ (বৌদ্ধ সম্প্রদায়ভুক্ত গোষ্ঠী বিশেষ) কর্মীরা আগুন দিল। দূর থেকে বারুদমাখা তীর ছুড়তেই ঘরে ঘরে আগুন লাগল। এরপর সেনারা এসে আগুন লাগিয়ে দেয়। আগুনে আমার গোলাভরা সোনার ধান পুড়ে মুহূর্তেই ছাই হলো। আগুন লাগানোর পর এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকে। চোখের সামনেই গুলিতে ভাগনে মারা গেল। লাশটাও আনতে পারলাম না। সব রেখে পালায়ে চলে এলাম।’
ষাটোর্ধ্ব কুইল্লা মিয়ার এখন কিছুই নেই। বুক ভরা হাহাকার নিয়ে কোনোমতে বেঁচে আছেন। গোলাভরা ধান, মাঠ ভরা ফসল ছিল কুইল্লা মিয়ার। সব হারিয়ে এখন পাগলপাড়া। ছোট একটি পলিথিনের মাঝে ছয় ছেলেমেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে রাত কাটান।
কুইল্লা মিয়ার ঈদ আনন্দ ফিকে হয় ২৫ তারিখের পরেই। মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের মেদী গ্রামে গেরস্থ পরিবার বলে পরিচিতি ছিল তার। ২০ একর জমিতে ফসল ফলান। ২০০ মটকা (হাঁড়ি) ধান ঘরে ছিল সপ্তাহ খানিক আগেও। জমিতে সবুজ ধান। এখন সবই অতীত। ভিটে এখন ছাইয়ের ভাগাড়। গরু-ছাগল সব লুট হয়েছে। আবাদের জমি বেদখল। শূন্যহাতে বাংলাদেশে এসে রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে।
এক কাপড়ে বের হয়ে আসা কইল্লা মিয়া বেসরকারি সংগঠন এমএসএফ-এর পক্ষ থেকে এক ফালি পলিথিন নিয়ে টংঘর বানায়। এখন এই টংঘরই তার সম্বল।
বলেন, এভাবে সব ফেলে আসতে হবে কখনই ভাবি নাই। বাপ-দাদার ভিটে। মুহূর্তেই পুড়ে ছাই করে দিল। বাপ-দাদার রাষ্ট্র ছিল না। আমাদেরও হলো না। এই ছেলেমেয়ে নিয়ে এখন কোথায় যাব!

‘ধর্ষকের হাত কামড়ে পালাই’

দেশ ছেড়ে আসা প্রতিজন রোহিঙ্গার জীবন যেন একেকটি দুঃখগাথা উপাখ্যান। এমন সভ্য সমাজে মানুষ মানুষকে এভাবে নির্যাতন করতে পারে! মিয়ানমারের বৌদ্ধরা আর সেনাবাহিনী মিলে নির্যাতনের সমস্ত হাতিয়ার প্রয়োগ করেছে রোহিঙ্গাদের উপর। হত্যা, জখম, ধর্ষণ, আগুন দেয়া, লুটতরাজ কিছুই বাদ রাখেনি সেনাবাহিনী। দেশ তাড়াতে যা করবার, তার সবই করেছে মগ আর মারমা বৌদ্ধরা।
 সেনাবাহিনী আর মগদের নির্যাতনের ভয়ঙ্কর বর্ণনা দিচ্ছিল রোহিঙ্গা নারী সাবেকুন্নাহার। সাবেকুন্নাহারের বাড়ি মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশের মন্ডু উপজেলার ফকিরাবাজার গ্রামে। ৩৫ বছর বয়সী সাবেকুন্নাহারের ঘরে এক মেয়ে দুই ছেলে। স্বামী-সন্তানকে নিয়ে কক্সাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালংয়ে তাঁবু গেড়েছেন।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে নির্যাতিত এই নারী বলেন, ঈদের তিন দিন পরের ঘটনা। বিকেলে টুপি মাথায় দিয়ে বেশ কয়েক জন অপরিচিত লোক আমাদের গ্রামে প্রবেশ করে। চারজন আমাদের বাড়িতেও আসে। পরে বুঝতে পারি মুসলমানের বেশ ধরে বৌদ্ধ মগরা এসেছে। এর কিছুক্ষণ পরেই গ্রামে হৈ-চৈ পড়ে যায়। বাড়ি ঘরে আগুন জ্বলে ওঠে। চারিদিকে গুলির শব্দ।
ক্ষোভ আর ঘৃণা ভরে নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, যে চার জন এসেছিল, তারাই আটক করে বাড়ির উঠানে বেঁধে ফেলে আমাকে। সেখানে পাশের বাড়ির আরেক তরুণীকে এনে বিবস্ত্র করে। এরপর মগরা সেই নারীকে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়। আমার চোখের সামনেই সেনাবাহিনীর সদস্যরা পালাক্রমে ধর্ষণ করতে থাকে সেই তরুণীকে।
একপর্যায়ে তাকেও বিবস্ত্র করা হয় বলে উল্লেখ করে বলেন, জোর করে আমার শরীরের সমস্ত কাপড় ছিঁড়ে ফেলে সেনারা। এ সময় ব্যাপক মারপিটও করতে থাকে সেনারা। ইতোমধ্যে আমাদের বাড়িতেও আগুন লেগে যায়। মাথার উপর দিয়ে গুলি যেতে থাকে। এলোপাতাড়ি দৌড়াদৌড়ি শুরু করতে থাকে সবাই। আমি ধর্ষকের হাত কামড়ে পালাই। আর ঘরবাড়ির খবর নিতে পারি নাই। সেই ধর্ষিত নারীকে হত্যা করল নাকি পুড়ে মারল, তারও আর খবর পাইনি।

‘আমার তো দেশ নাই’
কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ সড়কের ব্যস্ততা বেড়েছে ঈদের আগ থেকেই। মিয়ানমার থেকে নির্যাতিত হয়ে আসা রোহিঙ্গারাই এ সড়কে ব্যস্ততা বাড়িয়েছে। ঘরহীন মানুষের কান্না মিলছে সড়কের দু’ধারেই। উখিয়া আসতেই পরিবহনের গতি থেমে যায় রোহিঙ্গাদের কান্নায়।
সড়কের পাশেই টংঘর পেতেছে নূর বেগমের বাবা শাজাহান। ঘরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা খালটিতে তখন স্রোত বইছে। দিনভর  বৃষ্টিই খালটির যৌবন এনে দিয়েছে শনিবার বিকেলে। খালের পাশেই একটি গাছের গুড়ি। তাতে বসে নূর বেগম কুঞ্চিসম কিছু একটা দিয়ে মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে পানিতে ছুঁড়ছে। শরতের আকাশ নাকি বেখেয়ালি। আকাশে মেঘ।  তবে বৃষ্টি হবে কি হবে না, তা বলতে পারছে না উদাসমনা আকাশ।
উদাসী আকাশে মিতালি করেছে কৈশোরে পা রাখা নূরও। কিছুই যেন ওর ভালো লাগে না। কী যেন হারিয়ে নদীর স্রোতে খুঁজতে চাইছে। বয়স যুগ পেরিয়েছে সবে। পাহাড়ে বাস বলে শরীরের গড়নও ছিমছাম। গায়ের রং দুধে আলতা। কৃষ্ণকায় চোখ দুটো ছলছল করছে। হারানোর বেদনা নয়, ক্ষুধার জ্বালা চোখে প্রকাশ পেয়েছে। সকাল বেলা খেয়েছিল। সন্ধ্যাতেও আর এক মুঠো দানা জোটেনি। পরনে ছায়ার মতো লুঙ্গি গুঁজে দিয়েছে গেঞ্জির উপর দিয়ে, আর তা যেন পেট আর পিঠ এক করে ফেলেছে। গোসল হয় না কতদিন, তা হয়তো ভুলে গেছে ও নিজেই। সোনালি চুলগুলো রুগ্ণ হয়েছে সাবান-শ্যাম্পুর পরশ না পেয়ে।
৫ ভাইবোনের মধ্যে নূর দ্বিতীয়। বড় বোনের বিয়ে দিয়েছে গেল বছর। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মগ পরিচালিত স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উঠেছে নূর। ভালো বাংলা জানে না। বাংলা পড়েওনি।
অন্যের সাহায্য নিয়ে কথা হয় এই কিশোরীর সঙ্গে। লাজুকতায় ভর করে জানালো তার বেদনাভরা মনের কথা।
ঈদের দুই দিন আগে ঘর পুড়ে দিয়েছে সেনাবাহিনী। ওই দিনই বাবা-মার সঙ্গে চলে আসে সীমান্তের কাছে। তার দুইদিন পর রাতের বেলায় সীমানা পার হয়ে উখিয়ার কুতুপালংয়ে আশ্রয় নেয় নূরের পরিবার। এক ফালি পলিথিনের নিচে সপ্তাহ ধরে দিন কাটছে নূরদের।
নূর বলে, খুব খারাপ লাগছে। স্কুলের বান্ধবীদের কথা মনে পড়ছে। স্যাররা আমাকে অনেক আদর করত। পাড়ার খেলার সাথীদের আর একজনেরও দেখা পাই না।
 চোখের পানি মুছতে মুছতে বলছিল, ওরা আমার ছাগলটিও পুড়ে মারল। আমার থাকার ঘরটিও পুড়ে গেছে।
 ফের মিয়ানমার যাবে কিনা এমনটি জানতে চাইলে নূর বলে ‘আমার তো দেশ নাই।’

তবুও জীবন থেমে থাকে না
শুক্রবার দুপুরে বৃষ্টির মধ্যেই মিয়ানমার সেনাবাহিনী (নাসাকা) সীমানায় টহল দিতে আসে। মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর সঙ্গে যৌথ মহড়ায় যখন সেনাবাহিনী এপারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় চোখ রাখছিল তখন সকলের মাঝেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছিল। আঙ্গুল উঁচিয়ে রোহিঙ্গারাই দেখিয়ে দিচ্ছিল সেনাবাহিনীর গতিবিধি।  রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ বললেন, সীমানা ঘেঁষে স্থলমাইন বসাতেই সেনাদের এই নজরদারি। বসাচ্ছেও বটে। ইতোমধ্যেই স্থলমাইন বিস্ফোরণে বেশ কয়েকটি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
বৃষ্টির পর সেনারা চলে গেলে মিয়ানমার বিজিপি (বর্ডার গার্ড পুলিশ) কড়া নজর ফেলে এপারে। ওপার থেকে রোহিঙ্গাদের পুশ করে এপারে পাঠিয়ে দিচ্ছে আরেক দল। বন্দুক উঁচিয়ে দূর থেকেই আতঙ্কের জানান দিচ্ছে বিজিপি।
কড়া নজরদারি চলছে সীমান্তের এপারেও। বিজিবি (বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড) সদস্যরা চৌকি বসিয়ে তল্লাশি করছে হরদম। সীমান্ত ঘেঁষে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো থেকে নতুন করে আর কাউকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরে আসতে দিতে চাইছে না বিজিবি। যারা আসতে চাইছেন, তাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে নো ম্যানস ল্যান্ডের মধ্যে থাকা ক্যাম্পগুলোতে।
ওপারে বিজিপি আর এপারে বিজিবি। মধ্যখানে রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গাদের বেঁচে থাকার লড়াই। নদীর স্রোতের মতো রোহিঙ্গা এসেছে, মিলছে নতুন ক্যাম্পগুলোতে। ওপার থেকে ঠেলছে আর এপার থেকে আটকে দিচ্ছে।
এত আইন, এত অস্ত্র! তাই বলে কি জীবন আটকে থাকে? জীবনের প্রয়োজনেই পা ফেলতে হয়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো থেকেও পা বেরিয়ে আসছে সীমানার এপারে। তবে বয়সীদের চেয়ে কোমলমতি শিশুরাই প্রয়োজনীয় রসদ জোগান দিচ্ছে ক্যাম্পগুলোতে।
বিশেষ করে খাবার পানি নিতে হচ্ছে শিশুদের দ্বারাই। এপারে স্থানীয় বাড়ি থেকে টিউবওয়েল চেপে দিনভর ক্যাম্পে ক্যাম্পে পানি নিচ্ছে শিশুরা। ডাক্তারের কাছে ওষুধ নিতেও পাঠানো হচ্ছে শিশুদের। শিশুরাই এপারে বাজার করে ফের ফিরে যাচ্ছে ক্যাম্পগুলোতে। বয়সী রোহিঙ্গাদের বাধা দিলেও শিশুদের আটকে দিচ্ছে না বিজিবির সদস্যরা।
Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
  • সৌদি আরব-ইরান : যুদ্ধ কি আসন্ন? -শুভ কিবরিয়া
  • দর কষাকষির মিশনে ট্রাম্প -আনিস রায়হান
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.
    বর্তমান সংথ্যা
    পুরানো সংথ্যা
    Click to see Archive
    Doshdik
     
     
     
    Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive