Logo
 বর্ষ ১০ সংখ্যা ১৫ ২৬শে ভাদ্র, ১৪২৪ ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
দেশের বাইরে
প্রতিবেদন
 
http://sadiatec.com/
বাংলাদেশ রেলওয়ে : ভেতর বাহির -এম. এ. আলীম  
সকল মজার গল্প প্রাচীন সুদিনে সূচিত, আর এসব গল্পের শেকড় অতীতাশ্রিত। বাংলাদেশ রেলওয়ের সূচনাপর্ব, উদ্ভব ও বিস্তারের গল্পও মজার অতীত ইতিহাস সহায়। এর মহাকাব্যিক উপাদান ও বৈশিষ্ট্য যেমনি মুগ্ধ করে তেমনি সুদীর্ঘ ইতিহাসের সর্পিল রোমাঞ্চকর প্রক্রিয়াও ধ্যানমগ্ন করে।
পরিবহন আর মানব ইতিহাস প্রায় একই সময়ের। কিন্তু পরিবহন পরিবারের নতুন সদস্য রেলওয়ে। স্টিম ইঞ্জিনের আবিষ্কারের পরই রেলওয়ের জন্ম ১৮২৫ সালে ব্রিটেনে রেল পরিষেবা চালুর মাধ্যমে। বাংলাদেশ রেলওয়ের অগ্রযাত্রা শুরু হয় ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর দর্শনা হতে জগতী পর্যন্ত ৫৩.১১ কি. মি. রেললাইন চালুর মধ্য দিয়ে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে ব্রিটিশ রেলওয়ে ব্যবস্থার উত্তরসূরি। এটি চার স্তরে বিকাশ লাভ করেÑ
১.    প্রথম সময়কাল (১৮৪৯-১৮৬৯) : এই সময়কালে ভারতীয় রেলওয়ে ওল্ড গ্যারান্টিড সিস্টেমের আওতায় পরিচালিত হতো এবং সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্ডিয়া বিভিন্ন রেলওয়ে কোম্পানিকে বিনা অর্থে ভূমি প্রদান করত। মূলধনের জন্য নির্দিষ্ট হারে সুদ দেয়া হতো।
২.    দ্বিতীয় সময়কাল (১৮৬৯-১৮৮০) : এই সময়কালে কন্সট্রাকশনের আওতায় সরকার কর্তৃক রেললাইন নির্মাণের খরচ সরাসরি বহন এবং ঋণের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করা হতো।
৩.    তৃতীয় সময়কাল (১৮৮০-১৯২৫) : সরকার মডিফাইড গ্যারান্টিড সিস্টেম চালুকরত নিজেই রেললাইন নির্মাণ কাজ বহাল রাখে। ১৮৮১ সালে বেঙ্গল সেন্ট্রাল রেলওয়ে কোম্পানি এবং ১৮৮২ সালে আসাম-বেঙ্গল কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। রেলওয়েকে সরকারি সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। শুধু কোম্পানি কর্তৃক মূলধন সরবরাহ করা হতো। সরকারের হাতে ছিল চুক্তির শর্ত আরোপের ক্ষমতা। ১৯০২ সাল নাগাদ রেলওয়ে ৩৩টি প্রশাসনিক ইউনিটে বিভক্ত ছিল, যার মধ্যে ২০টি ছিল কোম্পানি।
৪.    চতুর্থ সময়কাল (১৯২৫ পরবর্তী) : ১৯২৫ পরবর্তী সময়ে সরকার রেল বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিজ হাতে নিয়ে নেয় এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
বাণিজ্য এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১৯০৫ সালে ইন্ডিয়ান রেলওয়ে বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২৪ সালে রেলওয়ে বোর্ডকে পুনর্গঠিত এবং শক্তিশালী করার মাধ্যমে রেল ব্যবস্থাপনায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। রেলওয়ে বোর্ড সরকারের পক্ষে সাচিবিক দায়িত্ব পালন করতো এবং রেলওয়ে বোর্ডের সিদ্ধান্ত ছিল চূড়ান্ত। জেনারেল ম্যানেজারগণ দৈনন্দিন প্রশাসন এবং ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত হন।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সরকার রেলওয়ে বোর্ডের পরিবর্তে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে রেলওয়ে ডিভিশন স্থাপন করে। এর প্রধান ছিলেন ডাইরেক্টর জেনারেল। ৩১ আগস্ট ১৯৫৯ সালে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পাকিস্তান রেলওয়ে বোর্ড স্থাপিত হয় এবং রেলওয়ে বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন কেন্দ্রীয় সরকারের সচিব। এই বোর্ডের অধীনে রেলওয়ে কোডের আওতায় দায়িত্ব পালনের নিমিত্তে পাকিস্তান পূর্ব রেলওয়ে এবং পাকিস্তান পশ্চিম রেলওয়ের জন্য দুজন জেনারেল ম্যানেজার নিয়োগ করে। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান রেলওয়েকে দ্বিখ-িত করে পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ে স্থাপিত হয়। পশ্চিম পাকিস্তান রেলওয়ে বোর্ডকে সরকারের সাচিবিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়া হলেও পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ে বোর্ডকে প্রাদেশিক সরকারের রেলওয়ে, ওয়াটার ওয়ে অ্যান্ড রোড ট্রান্সপোর্ট ডিপার্টমেন্ট-এর অধীনে ন্যস্ত করা হয়। ফলে রেলওয়ে বোর্ড তথা রেলওয়ে ব্যবস্থাপনা রেল পরিচালনায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা হারায়। বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ নানা দাতা সংস্থার খেলাপি ও অবাস্তব সুপারিশে রেলওয়েতে চলছে ভাঙাগড়ার খেলা।
১৯৭৩ সালে রেলওয়ে বোর্ড ভেঙে জিএম সিস্টেম, ১৯৭৬ সালে রেলওয়ে বোর্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ১৯৮২ সালে রেলওয়ে বোর্ড ভেঙে ডিজি সিস্টেম (রেলওয়ে ডিভিশন) এবং ডিজিকে সরকারের সচিবের ক্ষমতা প্রদান, ১৯৯৬ সালে রেলওয়ে ডিভিশনকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একীভূতকরণের মাধ্যমে ডিজির ক্ষমতা হরণ। রেল প্রশাসনের সিনিয়র কর্মকর্তাদের রেল পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু হতে দূরে সরিয়ে রাখায় জাতি যথোপযুক্ত রেল পরিবহন সেবা হতে আজও বঞ্চিত। ভারতীয় রেলওয়ে বোর্ড শুধুমাত্র সরকারের সাচিবিক দায়িত্ব পালন করছে না, এর চেয়ারম্যান সরকারের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি। ব্যবস্থার কারণে ভারতীয় রেলের উন্নতি হবে না তো কার হবে? বাংলাদেশ রেলওয়ে আজ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে।
ক্রমপুঞ্জীভূত যেসব সমস্যার কারণে বাংলাদেশ রেলওয়ের সেবার মান ও পরিমাণ প্রতিযোগী পরিবহন মাধ্যমের সমপর্যায়ে রাখা সম্ভব হয়নি, এর মধ্যে অন্যতম হলো,
ক. উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত রেলওয়ে অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা।
খ. রেল পরিসম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অপর্যাপ্ত বরাদ্দ।
গ. রেলওয়ে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং রেলওয়ে সিস্টেম আধুনিকায়নে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ।
ঘ. প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্যিক রেল পরিচালনার জন্য রেল ব্যবস্থাপনার যথাযথ সাংগঠনিক কাঠামো ও ক্ষমতায়নের অভাব।
ঙ. প্রতিযোগী পরিবহন মাধ্যম বিশেষ করে সড়ক পরিবহনের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা।
এসব সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানের ওপরই নির্ভর করছে রেলওয়ের অগ্রগতি। স্বল্প পরিসরে এ নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যাক।

অবকাঠামোগত সংকট
অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাই দেশের রেল ব্যবস্থাকে মূলত পঙ্গু করে রেখেছে। এ সমস্যা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় অবিভক্ত ভারতবর্ষের রেল নেটওয়ার্কের মাত্র ২৮০০ কি. মি. বাংলাদেশ ভূখ-ের অন্তর্ভুক্ত হয়। ব্রডগেজ লোকোমোটিভ, ক্যারেজ ও ওয়াগন ওয়ার্কশপ (কাঁচরাপাড়া), সিগন্যালিং অ্যান্ড ইন্টারলকিং ওয়ার্কশপ (বেসিয়াঘাটা), স্টোন কোয়ারিজ, শ্লিপার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (আসাম), টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (কাঁচরাপাড়া), ট্রাফিক ট্রেনিং স্কুল ইত্যাদি দেশভাগে ভারতের অংশে পড়ে।
অবকাঠামোগত সমস্যার মধ্যে আরও রয়েছে, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত নেটওয়ার্ক একাধিক গেজ বিশিষ্ট এবং যমুনা নদী দ্বারা বিভক্ত। যমুনার পশ্চিম পাশে প্রধানত ব্রডগেজ লাইন যা কলকাতামুখী। পূর্বাংশ মিটারগেজ যা এদেশের পূর্বাঞ্চল ও আসামকে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। যমুনার দুটি স্থানে ফেরি সংযোগ রেল ব্যবস্থাকে ৩টি নেটওয়ার্কে বিভক্ত করেছিল। উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত রেল নেটওয়ার্কের বিন্যাস ঢাকাকেন্দ্রিক বাংলাদেশের কর্মকা-ের জন্য উপযোগী নয়। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও খুলনার সঙ্গে ঢাকার স্বল্প দূরত্বের সরাসরি রেল সংযোগ নেই। ময়মনসিংহ জেলা সদর ছাড়া কোনো বড় জেলা সদরের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার স্বল্প দূরত্বের রেল সংযোগ নেই।
এসব সমস্যা সমাধানে অদ্যাবধি তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং ১৯৪৭ সালের ২৮০০ কি. মি. রেলপথ হ্রাস পেয়ে ১৯৯৮ সালে ২৭৪৬ কি. মি.-এ দাঁড়িয়েছিল। একই সময় ৬০০ কি. মি. সড়কপথ বেড়ে ২৭০০০ কি. মি.-এ দাঁড়ায়। বর্তমানে সড়ক পথের দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০,০০০ কি. মি. এবং রেলপথের দৈর্ঘ্য ২৮৭৭ কি. মি.। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে ২৯৯টি ব্রিজ, ১১৬ কি. মি. রেলওয়ে ট্র্যাক, সিগন্যাল কেবিন ও স্থাপনা, ৭২২টি প্যাসেঞ্জার কোচ, ১৪৮৪টি মালবাহী ওয়াগন, ১৪০টি ইঞ্জিন, ৩টি প্যাসেঞ্জার ফেরি, ১১টি মেরিন ক্রাফটস ক্ষতিগ্রস্ত এবং ধ্বংস হয়। ১৩০০ অভিজ্ঞ কর্মকর্তা ও দক্ষ কর্মচারী পাক হানাদারদের হাতে শহীদ হন। এ ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা দুষ্কর ছিল। এদিকে স্বাধীন দেশের পরিবহন চাহিদার অনুসরণে বর্তমানের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে ঢাকা কেন্দ্রিকভাবে। এতে রেল ব্যবস্থা প্রতিযোগিতার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ গঠনের পর অদ্যাবধি রেলওয়ের বিকাশের জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। যদিও বিচ্ছিন্নভাবে নেয়া কিছু পদক্ষেপ রেলওয়ের পক্ষে ইতিবাচক হয়েছে। সরকার কর্তৃক ২৩ জুন ১৯৯৮ তারিখে যমুনা নদীর উপর দিয়ে দু-অঞ্চলের মধ্যে সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপনে রেলওয়ের ঐতিহাসিক প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে অপার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। যমুনা সেতু দিয়ে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে ডুয়েল গেজ লাইনের মাধ্যমে সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। গেজ সুষমকরণ এবং নেটওয়ার্ক ঢাকামুখী করে গড়ে তোলার জন্য এটিই প্রথম যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বর্তমান রুট কিলোমিটার ২৮৭৭-এর মধ্যে ডুয়েলগেজ-৩৬৮ কি. মি.; ব্রডগেজ-৬২৪ কি. মি.; মিটারগেজ-১৮৯৯ কি. মি.। যমুনা সেতু রেল সংযোগের মাধ্যমে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে ৩টি পকেট নেটওয়ার্কের মধ্যে আন্তঃসংযোগ স্থাপিত হয়েছে। দেশের উল্লেখযোগ্য পর্যটন শহর কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ প্রকল্পটিকেও যুগান্তকারী বলা যায়।
তা সত্ত্বেও এখনও রেলওয়ে নেটওয়ার্কের অন্যান্য অংশ ঢাকা অভিমুখী করে বিন্যাস করা হয়নি। বন্দরনগরী, বিভিন্ন জেলা সদর এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্রের সঙ্গে সরাসরি ও স্বল্প দূরত্বের রেল সংযোগ এখনও অনুপস্থিত। বর্তমানে পদ্মা সেতু প্রকল্পে রেললাইন সংযোগ, খুলনা-মংলা বন্দরে রেললাইন সংযোগ এবং পায়রা বন্দরের সঙ্গে রেল সংযোগ প্রকল্প যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচনার দাবি রাখে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু করণীয় রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হলো, রাজধানী ঢাকা, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম, সমুদ্র বন্দর মংলা, পায়রা ও কক্সবাজার এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ও ব্যবসা কেন্দ্রের গুরুত্ব বিবেচনায় রেল নেটওয়ার্ক পুনর্বিন্যাস করা।

অপর্যাপ্ত বরাদ্দ
রক্ষণাবেক্ষণ খাতে অপর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের কারণে বিদ্যমান পরিসম্পদের আয়ুষ্কাল এবং মানের ক্রমাবনতি ঘটেছে। এতে করে রেল পরিষেবার গুণগত মানেরও ক্রমাবনতি ঘটছে। জরাজীর্ণ এবং সেকেলে প্রযুক্তি ব্যবহার করে আধুনিক অন্যান্য পরিবহন মাধ্যমের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বজায় রাখা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিষেবা প্রদানের জন্য যে রাজস্ব বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয় তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। এজন্যই ২৮২টি লোকোমোটিভের মধ্যে অধিকাংশের আয়ু ফুরিয়ে গেছে এবং চলাচলের অনুপযোগী কিংবা অকেজো। ১৪৯২টি যাত্রীবাহী কোচের মধ্যে ৪৫৩টি চলাচলের অনুপযোগী। বরাদ্দ ছাড়া এই প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা সম্ভব নয়।
রেলওয়ে ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ন্যূনতম বার্ষিক বরাদ্দ প্রয়োজন প্রায় ৬০ কোটি টাকা। অথচ তার বিপরীতে বরাদ্দ পাওয়া যায় মাত্র ২৫/২৬ কোটি টাকা। রোলিং স্টক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বার্ষিক ন্যূনতম প্রয়োজন ১৫৫ কোটি টাকা কিন্তু বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ ৩০ কোটি টাকারও কম। বাংলাদেশ রেলওয়েতে স্টেশন রয়েছে ৪৪৪টি; এর মধ্যে স্থায়িভাবে বন্ধ করা হয়েছে ১১৬টি এবং আংশিক বন্ধ করা হয়েছে ৬৯টি। স্টেশন মাস্টার, পয়েন্টসম্যানের স্বল্পতাহেতু এ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়েছে।
স্টেশন বন্ধ হওয়ায় ব্লক সেকশন দীর্ঘতর হচ্ছে এবং ট্রেনের ক্রসিং/প্রিসিডেন্ট দিতে অস্বাভাবিক বিলম্ব ঘটছে। ব্লক সেকশনের দৈর্ঘ্য ৬-৮ কি. মি.-এর স্থলে ১৫-২০ কি. মি.-এ উন্নীত হচ্ছে এবং ফলশ্রুতিতে সেকশনাল ক্যাপাসিটি হ্রাস পাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাশাপাশি ২টি স্টেশন বন্ধ করা হয়েছে। স্টেশন বন্ধ থাকায় পেপার লাইন ক্লিয়ারের মাধ্যমে ট্রেন চালানোর ফলে ট্রেন পরিচালনায় নিরাপত্তা বিঘিœত হচ্ছে। মানবিক ভুলের কারণে যে কোনো মুহূর্তে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। গার্ড, লোকোমাস্টার, লোকোমোটিভ-এর অভাবে ট্রেন চলাচল বিশেষ করে মালগাড়ি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। মালগাড়ি কল দিয়ে একাধিকবার পুটব্যাক/বাতিল করতে হচ্ছে।
ঢাকা আইসিডি ১৯৮৭-এর এপ্রিল মাসে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৭-২০০৮ সালে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকা আইসিডি পর্যন্ত ৪০,৩৭৩ টিইউস কন্টেইনার পরিবাহিত হয় এবং ঢাকা আইসিডি থেকে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত পরিবাহিত কন্টেইনারের সংখ্যা ৪১,৫৮৭ টিইউস। আয় হয়েছিল ৫৯.৮৬ কোটি টাকা। আপ ডিরেকশনে ৩টি এবং ডাউন ডিরেকশনে ৩টি করে দৈনিক ৬টি কন্টেইনার ট্রেন চালাতে পারলে আয় করা যেত কমপক্ষে ২০০ কোটি টাকা। কিন্তু লোকোমোটিভের অভাবে ২টির বেশি ট্রেন চালানো যাচ্ছে না। ২০১৪-১৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে আগত আমদানি পণ্যবাহী কন্টেইনারের সংখ্যা ১০,১৯,০৭২। উল্লেখ্য, এ সমস্ত কন্টেইনারের প্রায় ৬০% মালামাল বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চলের জন্য আনীত হয়। এর এক-তৃতীয়াংশ রেলযোগে পরিবাহিত বলে সংখ্যা দাঁড়াত প্রায় ২,০৩,৮১৪ টিইউস। কিন্তু বাস্তবে পরিবাহিত হয়েছে ৩৩,২১৬ টিইউস।
আন্তঃনগরসহ অন্যান্য যাত্রীবাহী ট্রেনের ক্রসিং/প্রিসিডেন্স-এর কারণে দীর্ঘ ব্লক সেকশনের উভয় প্রান্তে ধীরগতির মালবাহী গাড়ি ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই স্টেশনে বিলম্বিত হচ্ছে। একদিকে মালবাহী গাড়ির জন্য লোকোমোটিভ ও লোকোমাস্টারের অভাব, অপরদিকে অনভিপ্রেত ও অনিবার্য বিলম্বের কারণে গার্ড, লোকোমাস্টার ও লোকোমোটিভের চরম অপচয় হচ্ছে।
জনবলের অভাবে ট্রেন দুর্ঘটনা বাড়ার পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ে ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছায় না। ১৯৬৯-৭০ সালে কর্মচারীর সংখ্যা ছিল ৫৫,৮২৫ জন, ১৯৮৯-৯০ সালে ৫৯,৫১৮ জন যা ২০০৭-০৮ সালে এসে দাঁড়ায় ৩১,৮৭৪ জনে। ২০১৪-১৫ সালে অবস্থা আরও নাজুক হয়। মোট কর্মচারী দাঁড়ায় ২৭,৬২০ জনে। প্রকৌশল, যন্ত্রপ্রকৌশল ও পরিবহন বিভাগে ১৯৬৯-৭০ সালে কর্মচারী ছিল যথাক্রমে ১২,০১৯, ২০,০০৫ ও ১১,৮৮৫ জন এবং ২০১৪-১৫ সালে হ্রাস পেয়ে তা দাঁড়ায় যথাক্রমে ৫৮১৬, ৭৬৫১ ও ৪৭০৮ জনে।
এ সংকট মোকাবিলার জন্য স্টেশনমাস্টার, লোকোমাস্টার, গার্ড, পয়েন্টসম্যান, গেটম্যানের পদ আশু পূরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নব নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রশিক্ষণ, পেশাগত জ্ঞান প্রদানের মাধ্যমে অভিজ্ঞ করে তুলতে সময় লাগবে। আপাতত অবসরে যাওয়া কর্মচারীদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে এ সমস্যার আংশিক সমাধান করা যেতে পারে। যারা এলপিআর-এ যাবেন তাদের এলপিআর বাতিলের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের ৪৪৪টি স্টেশনের মধ্যে বৃহদাকার ও জংশন স্টেশনের সংখ্যা ২৬টি। কারখানার সংখ্যা ৬টি। বাংলাদেশ রেলওয়েতে প্রতিদিন ৩৬৪টি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করে। যার মধ্যে আন্তঃনগর (মৈত্রী)  ৯৪টি, মেইল/এক্সপ্রেস ১১৬টি এবং লোকাল/মিক্সড ১২৮টি। এ ছাড়া ২টি কন্টেইনার ট্রেনসহ গড়ে ৩০টি মালবাহী ট্রেন চলাচল করে। বার্ষিক পরিবাহিত যাত্রীর সংখ্যা প্রায় ৬৭ মিলিয়ন এবং মালামালের পরিমাণ ২৫৫ মিলিয়ন টন। লোকোমোটিভ-এর মধ্যে ৬৮ শতাংশ বয়সোত্তীর্ণ। বাজেট বরাদ্দের অপ্রতুলতার কারণে সিডিউল রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির মাত্র ৪০% বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়। ১৪৭৪টি যাত্রীবাহী গাড়ির মধ্যে বয়সোত্তীর্ণ ৫০০-এর অধিক। ৫০ শতাংশ গাড়ির সিডিউল মেরামত সম্ভব হয় না।
এছাড়া রেলওয়ের অধিকাংশ স্টেশন এখনও মনুষ্যনির্ভর, মান্ধাতার আমলের সিগন্যালিং ব্যবস্থা বিদ্যমান। সিগন্যালিং ব্যবস্থা পুরাতন ও জরাজীর্ণ হওয়ায় ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তা ও দ্রুততা কাক্সিক্ষত পর্যায়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।  জনবলের অভাবে ট্রেন দুর্ঘটনা বাড়ার পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ে ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছায় না।
অপর্যাপ্ত বরাদ্দ প্রতিবন্ধকতা নিরসনে কিছু করণীয় রয়েছে। চাহিদা মোতাবেক নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিতকরণ এবং বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে জরুরি পুনর্বাসনের জন্য প্রকল্পের মাধ্যমে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। নেটওয়ার্ক সুষমকরণ, সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। রেল ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত সুবিধাদির জন্য এখন সারা বিশ্বে আন্তঃমহাদেশীয় পরিবহন করিডরে রেলওয়েকে মুখ্য বাহন হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। রেলওয়ে সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব এবং নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।
যানজট নিরসনে ট্রেন রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। একটি মালবাহী ট্রেন ১১০টি ১০ টনি ট্রাকের সমপরিমাণ মালামাল পরিবহন করতে পারে। একইভাবে ৮০টি বাসের সমসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করতে পারে একটি ট্রেন। একই দূরত্বে সমপরিমাণ মাল পরিবহনে ট্রেনের চেয়ে ট্যাক্সি ৮.৩ গুণ এবং ট্রাক ৩০ গুণ বেশি পরিবেশ দূষণ করে। ফুয়েল কস্ট রেলের চেয়ে ট্যাক্সিতে ৩.৫ এবং ট্রাকে ৮.৭ গুণ বেশি। জমির ব্যবহার রেলের চেয়ে সড়কে প্রায় ৪ গুণ বেশি। দুর্ঘটনাজনিত কারণে ট্রেনের চেয়ে সড়কে ২০০/২৫০ গুণ বেশি। যেমন ২০০২-২০০৩ সালে রেলে ছোট-বড় দুর্ঘটনা সংঘটিত হয় ৫২৪টি, মৃত্যুর সংখ্যা ২৮ জন, আহত ১৪৪ জন। একই সময়ে সড়কপথে সরকারি হিসাবে দুর্ঘটনা ৩,৭০৯, বেসরকারি হিসাব মতে ৮,০০০টি। মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবমতে ২,৫৯৯ জন, বেসরকারি হিসাবমতে ১০,০০০ জন। আহত ২৫,০০০ জন। ২০১৪-১৫ সালে রেলে ৩১২টি দুর্ঘটনায় মৃত্যু ৮২ জন যার অধিকাংশই লেভেলক্রসিং গেটে সংঘর্ষজনিত। আর সড়কে সরকারি হিসাবে ২,৮৮৬ জন, কিন্তু বাস্তবে ১০,০০০ জনের কম নয়। ২০১৪-১৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার আর আহত হয় ১,০০,০০০ জন।
এ যুগ সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ রেলওয়েকে দেশের ও আন্তর্জাতিক চাহিদার নিরিখে যুগোপযোগী করার বাস্তব প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ষাটের দশকে রেলে যাত্রী পরিবহনের হার ছিল ৫০ শতাংশ, যা এখন নেমে দাঁড়িয়েছে ১২ শতাংশে। মালামাল পরিবহনের হার ৪০ শতাংশ থেকে নেমেছে ৭ শতাংশে। এ দুরবস্থার আশু নিরসন প্রয়োজন। অন্যথায় আমাদের পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। ঢাকা-ময়মনসিংহ, গাজীপুর-নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা-ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, চট্টগ্রাম-ফেনী, চট্টগ্রাম-নাজিরহাট, দোহাজারী রুটে কমিউটার ট্রেন সার্ভিস চালু করা গেলে এই দুই নগরের জনসংখ্যা ৪০ শতাংশ কমানো যাবে। ঢাকা শহর বর্তমানে মনুষ্য বাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সচেতন নাগরিকদের এই অসহনীয় চরম দুরবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য সোচ্চার হতে হবে।

রেলওয়ের বাহনের পরিসংখ্যান (২০১৪-১৫)
বিবরণ    মিটারগেজ    ব্রডগেজ    ডুয়েলগেজ    মোট
রেলপথ (রুট কি.মি.)    ১৬৪৮    ৬৫৯    ৫৭০    ২৮৭৭
লোকোমোটিভ    ১৮৬    ৯৬    -    ২৮২
ক্যারেজ (যাত্রীবাহী কোচ)    ১১৬২
    ৩১২    -    ১৪৭৪
মালবাহী ওয়াগন    ৭১০০    ৩০০১    -    ১০১০১

জরুরি ক্যাটাগরির কর্মকর্তার সংখ্যা

ক্যাটাগরি    মঞ্জুরি    কর্মরত    ঘাটতি
স্টেশন মাস্টার    ১২২৪    ৭৬৫    (-) ৪৫৯
গার্ড    ৫০৮    ৩৭৫    (-) ১৩৩
পয়েন্টসম্যান    ১৪৪৫    ৯৮৯    (-) ৪৫৬
গেটম্যান    ২১৮০    ১৩৯৬    (-) ৭৪৮
লোকোমাস্টার    ১৭৪২    ১০৫৬    (-) ৬৮৬


সুষম নেটওয়ার্ক
নেটওয়ার্কের সীমাবদ্ধতা দূরীকরণ এবং নেটওয়ার্ক পুনর্বিন্যাস করা ছাড়াও দেশের সার্বিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবহন চাহিদা মেটানো এবং রেলওয়েকে দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যেমন, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রেল রুটে ইলেকট্রিক ট্রেন চালু করা। আন্তর্জাতিক মানের দ্রুতগতিসম্পন্ন প্যাসেঞ্জার গাড়ি ও লোকোমোটিভ সংগ্রহ। নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-টঙ্গী-গাজীপুর রুটে কমিউটার ট্রেন প্রবর্তন এবং দ্রুত ৩য় ও ৪র্থ রেললাইন নির্মাণ। ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে লাইন ক্যাপাসিটি বৃদ্ধির লক্ষ্যে আখাউড়া-লাকসাম ডাবল রেললাইন নির্মাণ শুরু হয়েছে, এই প্রক্রিয়াকে বিস্তৃত করা। * টঙ্গী-জয়দেবপুরের মধ্যে প্রস্তাবিত ২য় আইসিডি (inland container depot.) নির্মাণ। সকল ইপিজেড ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে রেল সংযোগ নির্মাণ। ঢাকা হতে টঙ্গী পর্যন্ত এলিভেটেড রেললাইন নির্মাণ। বিশ্বের বড় বড় নগরীর ন্যায় ঢাকা নগরীতে পাতাল রেল প্রবর্তন এবং সার্কুলার রেল নির্মাণ।
সাউথ এশিয়ান সাব-রিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশনের আওতায় রেল কানেকটিভিটির ওপরও নজর দেয়া দরকার। আগামীতে রেল ওয়াগনযোগে মংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর হতে মালামাল নেপাল, ভুটান, আসাম, ত্রিপুরা, কুনমিং (চীন) পর্যন্ত পরিবাহিত হবে। এর সম্ভাব্য রুটগুলো হলো,
*    খুলনা/চট্টগ্রামÑরাজশাহী-রোহনপুর-সিংগাবাদ-কাটিহার-রক্সোল-বীরগঞ্জ।
*    খুলনা/চট্টগ্রাম-দিনাজপুর-বিরল-রাধিকাপুর-যোগবাণী-বিরাটনগর।
*    খুলনা/চট্টগ্রাম-লালমনিরহাট-বুড়িমারী-চ্যাংরাবান্ধা-জয়গাঁও-ফুনসোলিং।
*    ঢাকা/চট্টগ্রাম-শাহবাজপুর-মহিষাসন-মালিগাঁও; চট্টগ্রাম-আখাউড়া-আগরতলা।
*    চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-ঘুনধুম-ম্যান্ডালয়-মুসে-ডালী-কুনমিং।
করিডর, ট্রানজিট, ট্রানশিপমেন্ট সিস্টেমের কোনোটির আওতায় মালামাল পরিবাহিত হলে বাংলাদেশের স্বার্থ কিভাবে সুরক্ষিত থাকবে, সেটা আগেভাগেই নির্ধারণ করতে হবে। আগামী দিনে কোন সিস্টেমে মালামাল পরিবাহিত হবে তা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে নির্ধারণ করতে হবে। তবে করিডর সিস্টেম পরিহার করাটাই সুবিবেচিত পদক্ষেপ হবে। এপিডি (anti-pilfrage device) ব্যবস্থা সম্বলিত ফ্ল্যাট ওয়াগনযোগে কন্টেইনারাইজড মালামাল পরিবাহিত হলে মালামালের খোয়া যাওয়া, চুরি হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বর্তমানে ভারতের সঙ্গে বেনাপোল-পেট্রাপোল, দর্শনা-গেদে রুটে ওয়াগনযোগে মালামাল আনা-নেয়ার ব্যবস্থা চালু আছে। বাংলাদেশ রেলওয়েতে দূরপাল্লার ভারতীয় বা অন্য কোনো দেশের জন্য ওয়াগনযোগে মালামাল পরিবাহিত হলে প্রচলিত ভাড়া ছাড়াও ট্রাক ও ব্রিজের রক্ষণাবেক্ষণ ফি আদায় করতে হবে। ভারতীয় বিসিএক্স ওয়াগনযোগে ৫৬ টন মালামাল পরিবাহিত হয়। এ ধরনের বোঝাই ওয়াগন আমাদের ট্রাক ও ব্রিজের উপর দিয়ে চালনা করা হলে অবকাঠামোর আয়ুষ্কাল দ্রুত নিঃশেষ হবে।

সাংগঠনিক কাঠামো ও ক্ষমতায়ন
রেলওয়ের কর্মকা- প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনার জন্য রেল ব্যবস্থাপনায় যথাযথ সাংগঠনিক কাঠামো ও ক্ষমতায়নের অভাব রয়েছে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় রেল ব্যবস্থাপনা সরকারের সার্বিক আর্থিক বিধি-বিধানের আওতায় রেল পরিষেবা প্রদান করে থাকে। এ ধরনের সাংগঠনিক কাঠামোর আওতায় বাণিজ্যিক দক্ষতার ভিত্তিতে পরিবহন সেবা প্রদান সম্ভব নয়।
সাংগঠনিক কাঠামো ও ক্ষমতায়নে করণীয় হলো, রেল পরিচালনার জন্য যুগোপযোগী সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। রেল পরিষেবা দক্ষ এবং বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে পরিচালনার জন্য সরকার কর্তৃক রেল ব্যবস্থাপনাকে অধিকতর স্বায়ত্তশাসন, বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে অধিকতর ক্ষমতা প্রদান করতে হবে। ভারতীয় রেলের আদলে আলাদা রেল মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করে সরাসরি তার অধীনে রেলওয়ে বোর্ড স্থাপন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে রেলওয়ে বোর্ড সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবে এবং রেলওয়ে বোর্ডের চেয়ারম্যান হবেন সরকারের সচিব।

অসম প্রতিযোগিতা
সড়ক অবকাঠামোর ব্যাপক এবং একতরফা সম্প্রসারণের কারণে দেশের রেল ব্যবস্থা অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন। পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, বিগত ৬৩ বছর পাকা সড়কপথ ৬০০ কি. মি. থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৫০,০০০ কি. মি.; আর রেলওয়ে মাত্র ২,৯০০ কি. মি. এর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে। সড়ক অবকাঠামোর নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় সরকার বহন করে থাকে। এ ব্যয়ের সামান্য অংশই রোড ট্যাক্স ও ফুয়েল চার্জ-এর মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে ফেরত আসে। রেল অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় রেলওয়ের আয়-ব্যয়ের হিসাবে প্রতিফলিত হয়।
১৯৭৩-৭৮ সময়কালে পরিবহন খাতের মোট বরাদ্দের ২৩.৯০ ভাগ করা হয়েছিল রেলওয়ের জন্য। ১৯৯৫-৯৭ সালে রেলের বরাদ্দ নেমে আসে পরিবহন খাতে মোট বরাদ্দের ৮ ভাগে। অন্যদিকে সড়ক পরিবহনের জন্য বরাদ্দের পরিমাণ বেড়ে ৯২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবে ৬ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক (২০১১-১৫) পরিকল্পনায় উন্নয়ন কর্মসূচিতে রেলের জন্য ৪,৩৫১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়, যা সড়ক পথের তুলনায় অপর্যাপ্ত।
গাড়ি নির্মাতা, গাড়ি আমদানিকারক, সড়ক নির্মাণ ঠিকাদার, পরিবহন ব্যবসায়ীদের স্বার্থ দেখার জন্য আছে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, মন্ত্রণালয়ের অত্যুৎসাহী কর্মকর্তাগণ। রেলকে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে চলেছিল ভাঙা-গড়ার খেলা। কর্মচারী সংখ্যা কমিয়ে রেল পরিবহন ব্যবস্থা আজ প্রান্তীয় সীমানায়। অবসরের পর বিশ্বব্যাংক, এডিবিতে কনসালট্যান্ট হিসেবে নিয়োগ লাভের প্রত্যাশায় রেলওয়ের কিছুসংখ্যক সিনিয়র কর্মকর্তা রেলের ধ্বংসযজ্ঞে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষায় রোড সেক্টরের কস্ট রিকভারি ৩৫ শতাংশ এবং রেলওয়ে সেক্টরের কস্ট রিকভারি ৬৫ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে। সড়ক খাতে পরোক্ষ ভর্তুকির হার রেল খাতের প্রত্যক্ষ ভর্তুকির চেয়ে অনেক বেশি। পরিবহন কাঠামোতে সরকারি বিনিয়োগ ও ভর্তুকির সমতা বিধান এবং রেল ও সড়ক উভয় অবকাঠামোর ক্ষেত্রে একই ধরনের চার্জিং ব্যবস্থা প্রয়োগ করা না হলে সুষম প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। পরিবেশবান্ধব, জ্বালানি সাশ্রয়ী, অধিকতর নিরাপদ এবং স্বল্প ভূমি ব্যবহারকারী মাধ্যম হিসেবে রেল পরিবহনের আলাদা মূল্যায়ন বাংলাদেশে করা হয় না। ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যায় সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে যোগাযোগ রক্ষায় রেলই ছিল একমাত্র কা-ারি।
অসম প্রতিযোগিতা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ করণীয় রয়েছে। সমন্বিতভাবে পরিবহন মার্কেট নিয়ন্ত্রণের জন্য রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ গঠন করা। সকল পরিবহন অবকাঠামোর জন্য সুষম চার্জিং ব্যবস্থা নির্ধারণ এবং এসবের জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিবিধান প্রণয়ন ও কার্যকর করা। পরিবহন খাতে প্রকল্পের অর্থনৈতিক মূল্যায়নে রেল পরিবহনের অন্তর্নিহিত সুবিধাদি প্রতিফলনের ব্যবস্থা করা। পরিবহন অবকাঠামো ব্যবহারের জন্য সুনির্দিষ্ট এবং সুষম প্রাইসিং-এর বিধান প্রতিষ্ঠা করা।
এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল রেলওয়ের জন্য একটি সুষম প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বাংলাদেশ রেলওয়ে

Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
  • এই হাত মানুষের : ওঁরা বাঁচতে চায়... -শুভ কিবরিয়া
  • চোখের জলে ভাসছে সাগর পাড় : থামছে না রোহিঙ্গা স্রোত -সায়েম সাবু
  • উত্তর কোরিয়ার দাপট ভেতর-বাহির -আনিস রায়হান
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.
    বর্তমান সংথ্যা
    পুরানো সংথ্যা
    Click to see Archive
    Doshdik
     
     
     
    Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive