Logo
 বর্ষ ১০ সংখ্যা ১৫ ২৬শে ভাদ্র, ১৪২৪ ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
দেশের বাইরে
প্রতিবেদন
 
http://sadiatec.com/
এগিয়ে যাওয়া ও জনগণের বাস্তব অবস্থা -আনিস রায়হান  
আসছে ২০২১ সালে উদযাপিত হবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ৫০ বছর। সাড়ে চার দশকের এই পথচলায় দেশকে পাড়ি দিতে হয়েছে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ উত্তাল পরিস্থিতি। এখনও মোকাবিলা করতে হচ্ছে নানামুখী সমস্যা। কিন্তু এর মধ্যেই শোনা যাচ্ছে, দেশের অগ্রগতি, উন্নতির কথা। এক কথায় সবাই স্বীকার করছে যে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। সূচনাকালে যে দেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলা হয়েছিল, এখন তাকেই বলা হচ্ছে ‘নিউ এশিয়ান টাইগার’। চলতি ২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিজনেস ইনসাইডার ও ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বাংলাদেশকে এশিয়ার অর্থনীতির নতুন বাঘ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। এই যে অগ্রগতি, এর ভিত্তি কারা? তারা সবাই কি এর সুফল পাচ্ছে? যদি না পায় তাহলে কি এই অগ্রগতির ধারাবাহিকতা থাকবে? অনুসন্ধান, পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে সব উন্নতির কারিগর প্রধানত দেশের শ্রমজীবী জনগণ। সব হিসাবই বলছে, দেশের অগ্রগতির প্রধান তিনটি ক্ষেত্র হলো কৃষি, গার্মেন্ট ও রেমিটেন্স। শ্রমিক, কৃষক ও মধ্যবিত্তদের অক্লান্ত মেহনতের ফলেই এসব খাত থেকে তৈরি হচ্ছে সম্পদ, এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু যে পরিমাণ তারা খাটছেন, সেই তুলনায় তাদের উন্নতি সীমিতই। দেশের অগ্রগতির যে গল্প শোনা যাচ্ছে, দশের অগ্রগতি তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। গুটিকয়েকের হাতেই জমা হচ্ছে সম্পদ। ফলে বাড়ছে বৈষম্য, বিপুল জনগণকে যেতে হচ্ছে নানামুখী সংকটের মধ্য দিয়ে। দেশের উন্নতির বিভিন্ন হিসাব নিকাশ প্রচারে এলেও জনগণের সমস্যাগুলো থেকে যাচ্ছে অন্ধকারে।

১.
স্বাধীনতার পাঁচ দশকেও নিশ্চিত হয়নি মৌলিক চাহিদাগুলো। শিক্ষা ও চিকিৎসার অধিকার থেকে এখনও বঞ্চিত বহু মানুষ। যা পাচ্ছেন তাও মানসম্মত নয়। শিক্ষা নিয়ে সমাজে হাহাকার ক্রমাগত বাড়ছে। শিক্ষাবিদরাই চিন্তিত। সাধারণ মানুষ উচ্চশিক্ষার অধিকার বঞ্চিত। যেটুকু উচ্চশিক্ষা দেশে আছে, তারও বেহাল দশা। শিক্ষার মান নিয়ে আছে নানা প্রশ্ন। প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষাপত্র মূল্যায়ন, শিক্ষক নিয়োগÑ নানা অনিয়মের অভিযোগ শিক্ষা খাত নিয়ে। বছরের পর বছর একই অভিযোগ উঠতে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু কোনো প্রতিকার নেই। শিক্ষাবিদদের উদ্বেগের কথা বাদই দিলাম, শুধু সরকারের উদ্বেগের দিকে নজর দেয়া যাক।
২০১৫ সালের জুলাইয়ে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার খাতভিত্তিক পরামর্শ সভায় শিক্ষা খাত বিষয়ক এক আলোচনা হয়। তাতে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রালয়ের মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান, পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাস উদ্দিন আহমেদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি খালেদা ইকরাম, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বি আইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. বিনায়েক সেন। ওই সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম। তিনিসহ উপস্থিত সকলেই সেদিন শিক্ষার মান নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেন। তারা বলেন, মাধ্যমিক শিক্ষা খুব খারাপ অবস্থায় রয়েছে। বৃত্তিমূলক শিক্ষায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। আবার দেশে অর্ধশতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় থাকার পরও প্রতিষ্ঠান চালাতে বড় অঙ্কের বেতন দিয়ে বিদেশ থেকে লোক আনতে হচ্ছে। বাজেটে শিক্ষা খাতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ থাকলেও মানসম্মত শিক্ষা অর্জনে সেটি কোনো কাজে আসছে না। (৩ জুলাই ২০১৫, জনকণ্ঠ)
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা ২০১৫ সালে এই উপলব্ধিতে পৌঁছালেও তার ঠিক দুই বছর পরেও এসে দেখা যাচ্ছে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি নেই। গেল জুলাই মাসে সরকারি দলের দ্বিতীয় প্রধান নেতা সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, শিক্ষা এখন পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। এ কারণে অনেক শিক্ষার্থী চাতকের মতো প্রশ্নপত্র কোথায় ফাঁস হলো, সেদিকে তাকিয়ে থাকে। বেদনার সঙ্গে লক্ষ্য করা যায়, অনেক শিক্ষকও এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত। তিনি আরো বলেন, এই শিক্ষকতার কোনো মূল্য নেই। এ থেকে ছাত্ররা কিছুই পাবে না। তারা ভবিষ্যতে নৈতিকতা মানবে না। খারাপ আচরণ করবে। মন্ত্রী শিক্ষার মান নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে কোথাও নেই। শিক্ষার মান বাড়াতে হলে মানসম্মত শিক্ষা দরকার। (১৭ জুলাই ২০১৭, ভোরের ডাক)
মৌলিক চাহিদার মধ্যে মানুষ বিরাট দুর্ভোগে আছে চিকিৎসা নিয়েও। সেবার গুণগত মান সংরক্ষণে স্বাস্থ্য খাতের অপারগতা, সেবা প্রদানকারীদের অবহেলা, ভুয়া চিকিৎসকের আবির্ভাব, রোগীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক ব্যবহার, স্বাস্থ্য পরীক্ষার নামে অর্থ খোয়ানো, অননুমোদিত ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা, হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা যেন নিয়ম হয়ে উঠেছে। এসব কারণে সাধারণ চিকিৎসার জন্যও আর্থিক সঙ্গতি আছে যাদের, এরকম প্রচুর লোকজন দেশের বাইরে ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর পাড়ি দিচ্ছে অহরহ। বাংলাদেশে চিকিৎসা গ্রহণ করতে গিয়ে চিকিৎসকের কথা বা আচরণে সেবা গ্রহণকারীর মনে আস্থার সঞ্চার হচ্ছে না আদৌ। তাই দেখা যায়, প্রতি বছর চিকিৎসার জন্য প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা চলে যাচ্ছে বিদেশে। বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশন চিকিৎসা ভিসা প্রদানের জন্য ভিন্ন কেন্দ্র ও কাউন্টার খুলেছে, যা কিনা অভূতপূর্ব এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মানের প্রতি প্রকাশ্যে অবমাননা। এমন পরিস্থিতি সত্ত্বেও উদ্বেগের কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। সরকারের কর্মকর্তা এবং প্রধানদেরও যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যার একমাত্র সমাধান বিদেশ গমন। এদিকে আর্থিকভাবে মধ্যম শ্রেণি ও নিম্ন শ্রেণির পর্যায়ে থাকা মানুষ চিকিৎসা সমস্যার কোনো সমাধানই পাচ্ছে না। তাদের জন্য বড় কোনো অসুস্থতা মানে হয় ফতুর হওয়া, নয় তো দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে জীবন নাশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জনপ্রতি বার্ষিক স্বাস্থ্য ব্যয় ২৭ ডলার। অর্থাৎ মাসে ২০ টাকা। এ পরিমাণ অর্থ দিয়ে চিকিৎসা ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়। এ কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৬৪ লাখ লোক চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়েই গরিব হয়ে যায়। (১৫ মে ২০১৬, আমাদের সময়)
এদিকে ইউএসএইড বলছে, দেশে ধনী-গরিব নির্বিশেষে ৬৪ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা সেবা পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে বাধ্য হচ্ছে। অথচ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্বাস্থ্যসেবার মান এই অতিরিক্ত অর্থ খরচের তুলনায় অসন্তোষজনক। (২৪ অক্টোবর ২০১৬, বাংলানিউজ)
এসব খবরের বিপরীতে সরকারকে দেখা যায় একেবারেই নির্বিকার। নতুন বছরের বাজেটই এই সাক্ষ্য দিচ্ছে। ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৫.২ শতাংশ। বিগত অর্থবছরে যে বাজেট বরাদ্দ ছিল ১৭ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৫.১ শতাংশ। অর্থাৎ চিকিৎসা নিয়ে এত হতাশা সত্ত্বেও এ খাতে সরকার বাজেট বাড়িয়েছে মাত্র ০.১ শতাংশ, যা কিনা রীতিমতো পরিহাস!
শিক্ষা ও চিকিৎসা সংকটের সমাধানে এখনও কোনো সুষ্ঠু পরিকল্পনার ইঙ্গিত মিলছে না। মৌলিক চাহিদার অন্যতম এই খাত দুটিতে বিপুল মানুষ পিছিয়ে থাকায় দেশের নিউ টাইগার হওয়াটা যেন অসার কাগুজে বাঘের কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

২.
মানুষ খাটছে, কাজ করছে উপর্যুপরি। মধ্যবিত্তরা একাধিক চাকরি বা চাকরির পাশাপাশি অন্য মাধ্যম থেকে টাকা আয়ের জন্য সময় ও শ্রম দিচ্ছেন। এক চাকরি দিয়ে চলছে না। পরিবারের একজন সদস্য কাজ করলেও আর হচ্ছে না। একাধিক ব্যক্তিকে চাকরি করতে হচ্ছে। নিদেনপক্ষে ঘরে বসে উপার্জনের পথ ব্যয় করতে হচ্ছে গৃহিণীকে। দেশের অর্থনীতি এগুচ্ছে কিনা তারা জানেন না, শুধু জানেন ব্যয় বাড়ছে। বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে তারা আরও শ্রম বাড়াচ্ছেন অথবা খুঁজে ফেরেন আয় বাড়ানোর নতুন পথ। শ্রমজীবীরাও উপর্যুপরি খেটে চলেছেন দিন রাত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে, জিডিপির এত প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও বাড়ছে না কর্মসংস্থান। উল্টো এক দশক আগে যেখানে প্রতিবছর গড়ে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ কর্মসংস্থান বাড়ত, এখন তা কমে ৯ লাখ ৩৩ হাজারে নেমেছে। (২৯ মে ২০১৭, প্রথম আলো) এটা নিঃসন্দেহে মানুষের সংকট বাড়িয়েছে।
কর্মসংস্থান যাও আছে, সেখানে নেই শ্রমের পরিবেশ। বিরাজমান ব্যবস্থায় ঝুঁকিতে আছেন কর্মী ও শ্রমিকরা। অর্থনীতির বিকাশের কথা বলে সাড়ে চার দশক ধরে কৃষিতে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হলো তার ফলাফল ভয়াবহ। কার্যত এর মাধ্যমে কৃষি ব্যবস্থার ওপর একের পর এক আঘাতই করা হলো। ভর্তুকি তুলে দেয়া হলো। চাষের জমি চাষিদের কাছে বণ্টনের ব্যবস্থা রাষ্ট্র নিল না। সার, কৃষি উপকরণের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা হলো না। ইচ্ছামতো নলকূপ বিক্রি হলো, ভূগর্ভস্থ পানি তোলা হলো। বন-জঙ্গল উজাড় করে, জলাশয় ধ্বংস করে পরিবেশের ওপর বিরাট আঘাত হানা হলো। কীটনাশক, ফরমালিন, পেস্ট্রিসাইডের মতো প্রাণঘাতী নানা প্রযুক্তির সমাবেশ ঘটানো হলো। কৃষি, কৃষক ও ভোক্তার স্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করা হলো। পশ্চিমা একাডেমিশিয়ানরা যদিও বরাবরই মানবসম্পদের বিকাশের কথা বলেন, কিন্তু উন্নতির ফলাফল হিসেবে আমরা পাই বিপন্ন মানবসম্পদ। যাদের স্বাস্থ্য বিপন্ন, ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই।
উন্নয়নের হিসাব নিকাশে দিনরাত বলা হয় রেমিটেন্সের কথা। অথচ বাস্তব অবস্থা বলতে গেলে ‘ক্রীতদাস’ বলতে হবে তাদের। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যারা যান, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান, ‘ক্রীতদাস’ ছাড়া আর কোনো শব্দে তাদের অবস্থা ব্যাখ্যা করা যাবে না। তাদের শ্রমে, ঘামে মরুর দেশগুলো সবুজ হয়েছে। অথচ সেই সভ্যতার কারিগরেরা যে যাপন করছেন বন্দী ক্রীতদাসের জীবন তার খোঁজ ক’জন রাখে!
এদিকে কারখানায় শ্রমিকদের জীবন বিপন্ন। প্রায়শই আগুন লেগে, ভবন ধসে মারা পড়তে হচ্ছে তাদের। রানা প্লাজা, তাজরীনের নাম এদেশে কার না জানা। তার পরও অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি নেই। বয়লার বিস্ফোরণে মরেছে শ্রমিকরা। মালিকদের অবহেলা যার জন্য প্রধানত দায়ী। কারখানায় শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা কমারও কোনো সুযোগ নেই। সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বাড়লেও শ্রমিকদের বেতন বাড়াতে রাজি হয়নি সরকার। আন্দোলনে গেলে তাদের হামলা-মামলা দিয়ে দমন করা হয়েছে। আশুলিয়ার সেই উত্তাপ, আশঙ্কা, অবিশ্বাস এখনও মুছে যায়নি। আয় না বাড়লেও ব্যয় ঠিকই বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা বাড়াতে হয়েছে। গার্মেন্ট খাতের শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বললে জানা যায়, যে কারখানায় ওভার টাইম কম, সেখানে তারা থাকতে চান না।
দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা কাজ করে একজন শ্রমিক মাসে আয় করছেন সাত থেকে আট হাজার টাকা। লাখ লাখ শ্রমিক এরকম স্বল্প আয়ে দিনভর শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ঢাকা শহরে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের ঘরে ঘরে কাজ করছেন অসংখ্য গৃহশ্রমিক। তাদের অধিকাংশই ঘুরে ঘুরে কয়েকটি বাসায় কাজ করেন। প্রায় ১২ ঘণ্টা কাজ করেও তাদের মাসিক আয় পাঁচ-ছয় হাজার টাকা পার হয় না। সারাদেশে অসংখ্য দোকান। এসব দোকানে লাখ লাখ কর্মচারী। এদের আয় ৫০০ টাকা থেকে শুরু হয়, অধিকাংশেরই সর্বোচ্চ আয় পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। দেশে লাখ লাখ পরিবহন শ্রমিক। এরা একদিন অন্তর একদিন কাজ করে। বেশির ভাগই হেল্পার। চালকদেরও কম দায় নয়Ñ পুলিশের চাঁদা, টার্মিনালের চাঁদা, যন্ত্রাংশ মেরামতের ব্যয়। মাসে তাদের কত আয় থাকে? ঢাকার বাইরে যারা তাদের আয় তো আরও কম। অথচ এই খাতগুলোতে বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান। দেশের অগ্রগতির সূচকগুলোর সঙ্গে এসব মানুষের সম্পর্ক তাহলে ঠিক কোথায়?

৩.
দেশের শনৈঃ শনৈঃ উন্নতির এই যুগেও মানুষকে থাকতে হচ্ছে অন্তহীন দুর্ভোগের মাঝে। একটু পানি বাড়লে হাওড় ভেসে যাচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার একর জমির ফসল। নিঃস্ব হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। বন্যা আসছে রাতে বা দিন দুপুরে, কেউ জানতেও পারছে না। নেই কোনো সতর্কীকরণ ব্যবস্থা। হুট করে পানি ঢুকে ভেসে যাচ্ছে বসত ভিটা, গবাদি পশু। জীবন দিতে হচ্ছে শতাধিক মানুষকে। লাখ লাখ টাকা খরচ করে বানানো বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। বলা হচ্ছে ইঁদুরের বাসা বানানোর কথা। উন্নতির সব গল্প যেন এখানে এসে মুখ থুবড়ে পড়ছে।
এক পশলা বৃষ্টি হলে শহরের রাস্তাগুলো সব অচল। বড় দুই শহরের রাস্তাঘাটে নৌকা নামানোর আয়োজনও দেখা গেছে। যানজটের হিসাব তো আর নতুন করে দেয়ার কিছু নেই। বিশ্বব্যাংক বলছে, যানজটের কারণে রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। আর যানজটের কারণে বছরে যে আর্থিক ক্ষতি হয়, অঙ্কের হিসাবে তা প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই শহরে এখন ঘণ্টায় গড়ে প্রায় সাত কিলোমিটার গতিতে চলছে যানবাহন। বিশ্বব্যাংক বলছে, এভাবে চলতে থাকলে আর কিছুদিন পর হেঁটেই গাড়ির আগে যেতে পারবে মানুষ। মানুষের হাঁটার গড় গতি ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটার বলে মনে করা হয়। (২০ জুলাই ২০১৭, প্রথম আলো)
ঢাকা শহরের জনগণের বিপুল অংশই এবার ভয়াবহ চিকুনগুনিয়ার বলি হয়েছে। নাগরিক অব্যবস্থাপনার খেসারত দিতে হয়েছে তাদের। ভয়ঙ্কর এই অসুখ কত কর্মঘণ্টা নষ্ট করেছে, কত বয়স্ক ও শিশুর জীবন কেড়ে নিয়েছে, কত কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়েছে, কত মানুষকে অবসাদ ও হতাশায় নিক্ষিপ্ত করেছে, তার হিসাব কেউ খোঁজেনি।
দেখা যাচ্ছে শহর বা গ্রাম কোথাও নাগরিকরা ভালো নেই। অব্যবস্থাপনা আর অবহেলার বলি হচ্ছেন মানুষ। নেই সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা। দুর্ভোগ, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা নিয়েই ঘর থেকে বের হতে হয় নাগরিকদের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে থাকা মানুষ বা বাঁধভাঙা পানিতে ঘর-ফসল তলিয়ে যাওয়া মানুষটিকে দেশের অগ্রগতির হিসাব নিকাশের নানা চিত্র কি কোনো স্বস্তি দিতে পারছে?

৪.
শ্রমজীবী মানুষের অধিকাংশই ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা কবে থেকে ছেড়ে দিয়েছেন বলতে পারেন না। চাকরি থাকবে কিনা, কাজ পাওয়া যাবে কিনা, এসব প্রশ্নের কোনো সমাধান তাদের কাছে নেই। অনিশ্চয়তা তাদের সব কিছুতেই। যে বস্তিতে আছেন সেটা উচ্ছেদ হয়ে যাবে কিনা তাও তাদের জানা নেই। কৃষকরা জানেন না দফায় দফায় ফসলের ক্ষতি কীভাবে তারা কাটিয়ে উঠবেন। যাদের সন্তানেরা বিদেশ থেকে হাড়ভাঙা খাটুনির টাকা পাঠাচ্ছেন, তারা কোনোভাবে চাষবাসে ভর্তুকি দিয়ে টিকে আছেন। যাদের সেই উপায়ও নেই, তারা সন্তানদের শহরে কাজে পাঠাচ্ছেন। সেই সুযোগ না থাকলে বের হতে হচ্ছে নিজেকেই। আগামী বছর কী হবে, সেটা তারা ভাবতেও পারেন না। আজ কীভাবে যাবে, বড়জোর এই মাসের চিন্তা করা যায়।
গ্রাম-শহরের লাখ লাখ নারী-পুরুষ একেবারেই সাধারণ আয়ের জন্য বিদেশে যেতে প্রস্তুত। ২০১৫ সালে দেখা গেছে সৌদিতে মাত্র ১৬ হাজার টাকা বেতনের চাকরি পেতে লাখ লাখ নারী লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন নিবন্ধন করতে। বিদেশ যেতে তো অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিতেও পিছপা হচ্ছেন না। বিপজ্জনক উপায়ে সমুদ্রপথে বিদেশে পাড়ি জমানোর নানা চেষ্টার কথা সর্ব মহলই বিদিত। এরকম দুই হাজারেরও বেশি লোক এখন আটক আছেন তুরস্কে। (৪ জুলাই ২০১৭, বিবিসি বাংলা)
এদিকে ইউরোপে অবৈধভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশির সংখ্যা এক লাখেরও বেশি হতে পারে। (১৮ জুলাই ২০১৭, কালের কণ্ঠ) যেকোনো মূল্যে বিদেশ যাওয়ার এই চেষ্টার পরিণতি প্রায়শই হয় ভয়াবহ। ২০১৫ সালে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের গণকবরে শত শত বাংলাদেশির লাশ উদ্ধারের ঘটনা কারও অজানা নয়। কেন দেশের অর্থনীতির অগ্রগতি সত্ত্বেও মানুষ এরকম ঝুঁকি নিচ্ছে বিদেশ যাওয়ার জন্য?
মধ্যবিত্ত তরুণদের সঙ্গে কথা বললে বুঝা যায়, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে তারাও। অধিকাংশ মধ্যবিত্ত তরুণ বিদেশে পড়তে এবং সেখানেই থেকে যেতে আগ্রহী। ভবিষ্যৎ গড়তে তারা বিদেশে যাওয়ার বিকল্প দেখছেন না। চলে যাচ্ছে দেশের মেধাবী মুখগুলো। উচ্চশিক্ষা নিয়ে সেখানে গিয়ে তাদের যুক্ত হতে হবে খুব সাধারণ কোনো কাজে, যাতে হয়ত শিক্ষার কোনো দরকারই নেই। তবু তারা উদগ্রীব বিদেশে যেতে? যেখানে দেশের উন্নতির এত গল্প, সেখানে তরুণরা কেন বিদেশে যেতে এত আগ্রহী?
এর চেয়েও ভয়াবহ ব্যাপার হলো বিভিন্ন সূচকে দেশের অগ্রগতির কথা বলা হলেও দেশ নিয়ে মানুষের কোনো স্বপ্ন নেই! ২০২১ সালে বাংলাদেশের ৫০ বছরে দেশকে কোথায় দেখতে চান জিজ্ঞেস করলে যে কেউ হা করেই তাকিয়ে থাকে! যেন দেশের কাছে মানুষের নতুন কিছু পাওয়ার আশা নেই। সরকার যদিও ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের অর্থনীতির দেশ গড়ে তোলার আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেছিল, এত দুর্ভোগের মধ্যে থাকা মানুষ মধ্যম আয়ের আলাদা কোনো অর্থ খুঁজে পাচ্ছে না। নিজেরাও তারা আলাদাভাবে দেশের কাছে প্রত্যাশা করছে না। ক’দিন বাদে যে দেশের পঞ্চাশ বছর পূর্তি এ নিয়েও মানুষের মধ্যে কোনো উদ্দীপনা নেই। বরং শুনলে যেন হতাশা নিয়েই তাকান!
দেশের অর্থনীতিতেই শুধু উন্নতি ঘটছে না, সমাজে ক্রমাগত বেড়ে চলেছে বৈষম্য। অথচ বিপুল শ্রমজীবী, কৃষক ও মধ্যবিত্ত জনগণ ঠিকই দিন-রাত পরিশ্রম করছেন। আরও শ্রম দেয়া, বাড়তি ব্যয়ের ঘানি টানা, এ যেন তাদের কাছে বাংলাদেশের অগ্রগতির স্বরূপ। তারা কি এর চেয়ে ভালো কিছু প্রাপ্য নন?
Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
এই সময়/রাজনীতি
  • অনলাইন জরিপ ও জনমত
  • প্রশ্ন কার কাছে,খাদ্যমন্ত্রীর কাছে!? -গোলাম মোর্তোজা
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.
    বর্তমান সংথ্যা
    পুরানো সংথ্যা
    Click to see Archive
    Doshdik
     
     
     
    Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive