Logo
 বর্ষ ৯ সংখ্যা ৩৭ ১১ই ফাল্গুণ, ১৪২৩ ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
দেশের বাইরে
প্রতিবেদন
 
http://sadiatec.com/
জাপানের হলগুলো হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশিদের জন্য  
জা পা ন

রাহমান মনি

অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য তীব্র হল সংকটে পড়তে যাচ্ছে জাপান প্রবাসীরা। একে একে হলগুলো হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশিদের জন্য। আর এই জন্য দায়ী বাংলাদেশিরা নিজেরাই। নিয়ম না মানা, অসচেতনতা এবং অসহযোগিতা এ জন্য বহুলাংশে দায়ী। তার উপর রয়েছে নামে-বেনামে চিঠি, ফোন বা ফ্যাক্স বার্তা প্রেরণ। নিজের স্বার্থের হানি ঘটলেই একে অপরের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করে অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে টেলিফোন করে বিষোদ্গার কিংবা একটি ফ্যাক্স বার্তা পাঠিয়ে আয়োজন ভণ্ডুল করার পাঁয়তারা করা হচ্ছে কর্তৃপক্ষের কাছে। আর এতে করে একদিকে যেমন কর্তৃপক্ষের কাছে বিভিন্ন কৈফিয়ত দিতে হচ্ছে আয়োজকদের, তেমনি দেশের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণœ হচ্ছে।
সংস্কৃতিমনা বাংলাদেশিরা জাপানের মাটিতে বাংলাদেশের সংস্কৃতি তুলে ধরার জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। জাপানের মাটিতে এসব আয়োজনের মধ্যে স্বল্পসংখ্যক খোলা মাঠে হয়ে থাকলেও সিংহভাগ আয়োজন হয়ে থাকে হলের ভেতরে। খোলা মাঠে বা ঘরোয়া পরিবেশে যেভাবেই আয়োজন করা হোক না কেন উভয় ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের কাছে যথাযথ আবেদনের মাধ্যমে অনুমতিসাপেক্ষে প্রস্তুতি নিতে হয়। কর্তৃপক্ষের অনুমোদন মিললে প্রশাসনও বিভিন্ন সহায়তা করে থাকে। এবং প্রায় প্রতিটি বড় আয়োজনের বিষয়ে গোয়েন্দা শাখাগুলো নড়ে বসে। পূর্ব থেকে শুরু করে অনুষ্ঠান শেষেও বিভিন্নভাবে তারা নোট নিয়ে থাকে।
জাপানে প্রবাসীদের দ্বারা খোলা মাঠে আয়োজনগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং এক বৃহত্তম আয়োজন হচ্ছে টোকিও বৈশাখী মেলা। এই মেলাকে ঘিরে প্রতিটি প্রবাসীর মধ্যে অন্যরকম সাড়া জাগে। সার্বজনীন এই মেলায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা ছাড়াও স্থানীয় জাপানিসহ অন্যান্য দেশের নাগরিকবৃন্দ অংশ নিয়ে উপভোগ করে থাকেন। তাই মেলা হয়ে যায় সার্বজনীন এবং অন্যতম মিলন মেলায়। এছাড়াও খোলা মাঠে বনভোজন, পুষ্প দর্শন, ক্রীড়া অনুষ্ঠানগুলোর আয়োজন করা হয়ে থাকে।
হল নিয়ে যেসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় তার মধ্যে ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো প্রাধান্য পায়। এছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড তো রয়েছেই স্ব স্ব ব্যানারে।
ধর্মীয় আয়োজনগুলোর মধ্যে মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর সোসাইটি কর্তৃক আয়োজিত ইফতার মাহফিল ও ঈদ পুনর্মিলনী প্রধান। উভয় আয়োজনে পাঁচ শতাধিক প্রবাসী অংশ নিয়ে থাকে। এর পরপরই রয়েছে সার্বজনীন পূজা কমিটি কর্তৃক আয়োজিত দুর্গোৎসব এবং সরস্বতী পূজা। উভয় আয়োজনে প্রায় তিন শতাধিক প্রবাসী অংশ নিয়ে থাকে। তবে দেখার বিষয় হচ্ছে দুটি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আয়োজন হলেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশীয় সংস্কৃতির রেওয়াজ অনুযায়ী উভয় আয়োজনেই সব ধর্মের অনুসারীরা অংশ নিয়ে থাকেন।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান শিশু-কিশোরদের জন্য আয়োজন ‘প্রবাস প্রজন্ম’। অনুষ্ঠানটি জাপানে দুই প্রজন্মের মিলন মেলা হিসেবে খ্যাত। সার্বজনীন এ আয়োজনেও পাঁচ শতাধিক দর্শক শ্রোতার সমাগম ঘটে। অনুষ্ঠানটি জাপান প্রবাসীদের সবার অনুষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। সব বয়সের নারী-পুরুষ এতে স্বতঃস্ফূর্ত অংশ নিয়ে থাকে। ২০০৭ সাল থেকে সবার সহযোগিতায় অনুষ্ঠানটি নিয়মিত পালিত হয়ে আসছে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের দ্বারা পরিচালিত দুইটি সাংস্কৃতিক সংগঠন উত্তরণ এবং স্বরলিপি তাদের নিয়মিত বর্ষপূর্তি আয়োজন, বসন্ত উৎসব, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস নিয়মিত পালন ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক ও আঞ্চলিক সংগঠনসমূহ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। এছাড়াও কিছু কিছু ব্যক্তিগত কাজেও (জন্মদিন পালন, বিবাহ-উত্তর সংবর্ধনা, পিঠা উৎসব, সাম্প্রতিক পান্তা ইলিশ) হল ভাড়া নেয়া হয়ে থাকে। আর সবকিছুই নেয়া হয় যথাযথ নিয়ম মেনে ব্যবহার করার অঙ্গীকারের মাধ্যমে।
কিন্তু জাতি হিসেবে আমাদের খুব ভালো একটি সুনামের পাশাপাশি দুর্ভাগ্যজনক একটি দুর্নামও রয়েছে। সুনামটি হচ্ছে একজন বাংলাদেশি অনেকগুলো ভালো কাজ করতে পারে। আর দুর্নামটি হচ্ছে অনেকগুলো বাংলাদেশি মিলে একটি ভালো কাজ সুষ্ঠুভাবে করতে পারে না। শুরুটা করতে পারা গেলেও শেষটাতে আর ধারাবাহিকতা থাকে না। মত-অমতের কারণে দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে একই আয়োজন একাধিকবার এবং ভিন্ন ভিন্নভাবে আয়োজনের কথা আমাদের সবারই জানা। ফোবানা সম্মেলন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
জাপানে তেমন কোনো বিড়ম্বনার পরিস্থিতি না হলেও জাপানে অনুষ্ঠান আয়োজনের সংখ্যা কিন্তু কম নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর কথা বাদ দিলে অন্যান্য সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ব্যবসায়িক বা ধর্মীয় সংগঠনগুলোর যেকোনো আয়োজনে সার্বিকভাবেই সবার অংশগ্রহণ থেকে থাকে। বিশেষ করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে। তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো, এসব আয়োজনে সবাইকে অংশগ্রহণের জন্য উদার্ত আহ্বান জানানো হয় অন্তর্জালের মাধ্যমে স্থানীয় পোর্টালগুলোতে। তাই সবাই অংশ নিতে পারে অন্তত দর্শক সারিতে। তাদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানের শ্রীবৃদ্ধি ঘটে নিঃসন্দেহে। তাই পরিচিত মুখগুলোই দৃষ্টিগোচর হয় প্রায় প্রতিটি আয়োজনে।
কিন্তু সমস্যা হলো দর্শক সারিতে যাদের আগমন ঘটে থাকে এবং দর্শক সারিতে বসে যাদের অনুষ্ঠান উপভোগ করার কথা তাদের দর্শক আসনে আর দেখা যায় না। আর মাঝেমধ্যে যদিও দেখা যায় তা অনুষ্ঠান উপভোগ নয় বিভিন্ন আলাপচারিতায় অথবা আসা-যাওয়ার মধ্যে। আর এতে করে পাশের আসনে বসা দর্শকদের অসুবিধা তো বটেই, হলের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য আয়োজকদের বিড়ম্বনা, অতিথিদের মনোযোগে ছন্দপতনের চেয়েও আরও বেশি সমালোচিত হতে হয় কর্তৃপক্ষের কাছে। হল কর্তৃপক্ষ আয়োজকদের বারবার ভর্ৎসনা এবং আয়োজকদের কর্তৃক অনুরোধ সত্ত্বেও ওই লোকগুলো দর্শক আসনে না বসে দাঁড়িয়ে আড্ডারত থাকতেই যেন বেশি পছন্দ করে থাকেন। এবং একই মুখগুলো প্রতিটি অনুষ্ঠানেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করতে থাকে। এরা নির্দিষ্ট এবং চিহ্নিত। অনেকেই আবার ছোটখাটো কর্মিসভার কাজটিও সেরে ফেলেন ওসব অনুষ্ঠানে।
বাংলাদেশের সিনেমার হলগুলোর আসনে ছারপোকার কামড়জনিত সমস্যা জাপানের হলগুলোতে না থাকলেও কেন জানি আসনগুলো এসব নির্দিষ্ট দর্শকদের আকৃষ্ট করতে পারে না বা ব্যর্থ। অথচ এই লোকগুলোই কিন্তু জাপানি আয়োজনে বা কোম্পানির সভায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করে থাকেন অথবা কোম্পানির বসের কথাগুলো অপ্রিয় হলেও শুনে থাকেন।
এরপর রয়েছে হলের নির্দিষ্ট নিয়মকানুন না মানার প্রবণতা। জাপানের অনেক হল আছে যেখানে হলের ভেতর পানাহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু হলের ভেতর পানাহার করা তো বটেই উচ্ছিষ্টগুলো যত্রতত্র ফেলে রাখা এমনকি সন্তানের প্রাকৃতিক কর্ম সারার পর বদলকৃত ডাইপারগুলোও রেখে যাওয়া হয় হলের ভেতর। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পেট বোতল কিংবা ক্যানগুলোতে অর্ধ পানকৃত অবস্থায় রাখার ফলে নিজ কিংবা শিশু-কিশোরদের পায়ে লেগে মেঝের কার্পেট নষ্ট হয়ে যায়। আর চিপসের কথা না হয় না-ই বললাম। হলের ভেতর চিপসের অবস্থান দেখলে শরতে ঝরে পড়া গাছের পাতা কিংবা ফুলের পড়ন্ত পাপড়ি বলে ভুলের সম্ভাবনা রয়েছে।
সময় না মেনে চলা আমাদের সহজাত একটি প্রবৃত্তি রয়েছে। জাপানে আসার পর দীর্ঘদিন বসবাস করার পরও তা বদল করতে পারিনি। বাঙালি টাইম বলে নির্দিধায় তা চালিয়ে দেই। অথচ যখন এই আমরাই আবার কর্মক্ষেত্রে টাইম কার্ড পাঞ্চ করি তখন কিন্তু বাঙালি টাইম আর থাকে না, তখন হয়ে যায় টাইম ইজ টাইম। এজন্য অবশ্য আয়োজকদের ব্যর্থতাই বেশি দায়ী। কারণ সময়মতো অনুষ্ঠান শুরু না করার প্রবণতা প্রথম থেকেই লক্ষণীয়। বাঙালি টাইম তাই একঘণ্টা সময় হাতে রেখেই অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়া রীতিমতো একটি রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। ৬টায় হল পাওয়া যাবে অথচ ৫টায় শুরু হবে ঘোষণা দেয়া হয়ে থাকে। তাও আবার অন্তর্জালে। কিছুসংখ্যক লোক অবশ্যই সময় মেনে চলেন এবং সময় মেনে হলে চলে আসার পর বিড়ম্বনার স্বীকার হন। আবার কিছুসংখ্যক আছেন যারা ঘোষণাকৃত সময়েরও বেশ কিছুক্ষণ পর অনুষ্ঠান স্থলে উপস্থিত হন। অবশ্য তাদের পদধ্বনির পরই অনুষ্ঠান শুরু হয়ে থাকে। তার মূল্যায়ন করতে গিয়ে সময় মেনে চলাদের অবমূল্যায়ন করা হয়।
আর দেরি করে আসা থেকে দেরি করে যাওয়াটাও লক্ষণীয়। নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পরও হল ত্যাগ করার লক্ষণ দেখা যায় না কারোর ভেতর। বারবার হল ত্যাগ করার ঘোষণা দেয়া সত্ত্বেও গল্পগুজবে মেতে থাকেন অনেকেই। আর সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেলফি তোলা। কে কত সেলফি তুলতে পেরে দ্রুত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার ও প্রসার ঘটাতে পারে রীতিমতো তার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয় অনেকেই। আর অতিথিদের সঙ্গে ছবি তোলা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই সময় পার হয়ে গেলেও হল গোছাতে বেগ পেতে হয় আয়োজকদের। অনেক সময় অর্ধ গোছানো অবস্থায় হল বুঝিয়ে দিতে গিয়ে কর্তৃপক্ষের ভর্ৎসনার শিকার হতে হয়। আর তখনই আয়োজকদের মনোবল ভেঙে যায়।
একটি আয়োজনস্থল যেখানে একাধিক হল থাকে। সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র কিংবা জাপানি ভাষায় বুনকা সেন্টার, কমিউনিটি সেন্টার বা হল (কাইকান) যেখানে একই সময় একাধিক গোষ্ঠী, সংগঠন বা কমিউনিটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই জাপানিরা বা জাপানিদের আয়োজনটাই সিংহভাগ থাকে। আর হল লবিগুলো ব্যবহারের অধিকার থাকে সবার। জাপানিরা নির্দিষ্ট সময় এসে হলে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করে অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরপরই আয়োজনস্থল ত্যাগ করেন হলের নিয়ম মেনে। আর বাংলাদেশিরা হয় ঘণ্টাখানেক আগে কিংবা পরে এসে বাইরে হৈ-হল্লা করে এবং অনুষ্ঠান শেষেও আড্ডায় মেতে থাকার কারণে হল কর্তৃপক্ষ বারবার তিরস্কার করার পরও ত্যাগ করেন বিলম্বে।
আর এসব কারণেই হল কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশিদের সহজে হল দিতে চাচ্ছে না। অত্যন্ত বিনয়ী জাতি হিসেবে জাপানিরা সরাসরি না করে না দিয়ে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করছেন হল দেয়ার ক্ষেত্রে।
জাপানে প্রতিটি আয়োজনেই হল কর্তৃপক্ষ নিজস্ব পর্যবেক্ষণ করে থাকে। আর হলগুলো সার্বক্ষণিক ক্যামেরার আওতায় আনার কারণে আয়োজন স্থলে কোনো কিছু অস্বীকার করার জো নেই। অনেক বাঙালিই অজ্ঞাত কারণে বিষয়গুলোতে কোনো পাত্তা না দিয়ে অনিয়ম করে থাকেন। ধূমপান নিষিদ্ধ এলাকায় ধূমপান করে খোসাটি নিচে ফেলে রেখে কিংবা পান করা কফির ক্যানটিকে এস্ট্রে বানিয়ে সেখানে রেখে ক্যানটি রেখে দিয়ে প্রমাণ মুছে ফেলার ভান করেন নিজ অজ্ঞতার কারণে। অনুষ্ঠান শেষে অনিয়মগুলো পর্যালোচনা করে কর্তৃপক্ষ।
৩ মে ২০১৫ তাকিনোগাওয়া কাইকানে প্রবাস প্রজন্মের একটি অনুষ্ঠান হয়। অনুষ্ঠানের মধ্যে মোট ছয়বার ঘোষণা দেয়া হয় নিয়ম মানার। পোস্টার ছেয়ে যায় বিভিন্ন অনুরোধ জানিয়ে এবং বাংলা অক্ষরে। তারপরও বাঙালি কমিউনিটি তাতে কর্ণপাত করেনি। আর তাতেই চটেছেন হল কর্তৃপক্ষ। যথারীতি অনুষ্ঠান শেষে অনিয়ম পর্যালোচনা শেষে ডাক পড়ে আয়োজক কর্তৃপক্ষের। যেহেতু আয়োজকদের একজন হিসেবে এবং আমার নামে হল বুকিং হওয়ায় আমাকেই ডাকা হয়।
অনুষ্ঠানের বিভিন্ন অনিয়মের ভিডিও ফুটেজ তুলে ধরে তাদের ক্ষোভের কথা জানান এবং ভবিষ্যতে আর বাংলাদেশিদের হল দেয়া যাবে কি না ভেবে দেখবেন কি না জানাবেন বলে শাসিয়ে দেন।
অনিয়মগুলোর মধ্যে নির্দিষ্ট সময় এবং অনুষ্ঠান শেষ হওয়া সত্ত্বেও স্থান ত্যাগ না করা। নির্দিষ্ট স্থান ব্যতীত ধূমপান করা এবং উচ্ছিষ্ট ফেলে রাখা কিংবা ক্যানের ভেতর ভরে হলের পাশে রেখে যাওয়া, চুইংগাম ফেলে কার্পেট নষ্ট করা (একাধিক স্থানে, হলের ভেতর এবং বাইরে), খাবারের উচ্ছিষ্ট রেখে যাওয়া পানাহার নিষেধ সত্ত্বেও। ভাবী/বোনরা সাজুগুজো করার সময় সাজুগুজো সামগ্রী নিচে ফেলা, বেসিন নষ্ট করা, ওয়েটিং রুমের সোফা এবং হলের আসন পানীয় জাতীয় কিছু ফেলে ভিজিয়ে ফেলে রেখে যাওয়া এবং হলের পাশে ও হলের বাইরে দাঁড়িয়ে উচ্চৈঃস্বরে গল্পগুজবে মেতে থাকার কারণে অন্যের বিরক্তির কারণ হওয়া।
জাপানে বিশেষ করে টোকিওর কিতা সিটিতে আয়োজনগুলোর জন্য হল ভাড়া সাধারণত আমার নামেই হয়ে থাকে। ক্রিসমাস, প্রবারণা পূর্ণিমা, পূজা কিংবা ইফতার বা যেকোনো আয়োজনেই আমার নামে হলগুলো বুকিং দেয়া হয়ে থাকে। এছাড়া অন্যান্য আয়োজন তো রয়েছেই। এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোর সভা সমাবেশের হলও আমি নিয়ে থাকি তাদের অনুরোধে। তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো, হলগুলো বুকিং দিতে বিশেষ করে সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্রগুলো বুকিং দেয়ার যোগ্য কার্ড আমার রয়েছে। আর এই কার্ডের মাধ্যমে ভাড়ার পরিমাণটা অর্ধেকে নেমে আসায় আর্থিক সুবিধাটাও কম নয়। তাই হল নিতে হলে প্রথম অনুরোধটি আমার কাছেই আসে। আমি দলমত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে হল নিয়ে দিয়ে থাকি বাংলাদেশের স্বার্থে বা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো কাজে। আর্থিক সুবিধাটাও কিন্তু কম স্বার্থ জড়িত নয়।
এজন্য আমার বিরুদ্ধে ক্ষোভ বা নালিশও কম যায় না হল কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ দূতাবাস, বাংলাদেশ এবং জাপান সরকারের উচ্চ পর্যায়ে। তার অন্যতম কারণ আমি জাপান সরকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধনকৃত একজন সাংবাদিকও বটে। আমার সাংবাদিক ভাইয়েরা এসব অভিযোগদাতাদের অন্যতম কিংবা ইন্দনদাতা। তাদের অভিযোগ আমি নাকি জাপান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বেচে খাচ্ছি। তবে ক্রেতা বা বিক্রিকৃত অর্থের পরিমাণটা উল্লেখ নেই। আর স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ যায় আমি নাকি এই কার্ড দিয়ে ব্যবসা করে থাকি। আর এর অন্যতম কারণ হচ্ছে বিভিন্ন দলের দল-উপদলে বিভক্তি। এক দলকে হল নিয়ে দিলে অপর দল নাখোশ হয় আমার উপর। তাই নামে-বেনামে অভিযোগ পাঠায় আমার নামে। আমি অবশ্য বিষয়টিকে উপভোগ করি। কারণ হচ্ছে, ভালো হোক বা মন্দ হোক আমি কাজ করছি তাই তারা ভুল ধরতে পারছেন। বাসায় বসে থাকলে কোনো কাজ করতে পারব না আর কেউ কোনো ভুলও ধরতে পারবে না।
তবে এবার ৩ মে ২০১৫ অনুষ্ঠান আয়োজন নিয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগটি অতিশয় গুরুতর এবং বিশ্ব নাড়া দেয়ার মতো। বাংলাদেশ দূতাবাসসহ বিভিন্ন দরবারে আমার বিরুদ্ধে লিখিতভাবে অভিযোগ জানানো হয়েছে আমি নাকি প্রবাস প্রজন্ম নামে শিশু-কিশোরদের জঙ্গি প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছি। অভিযোগ পাওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার, জাপান সরকার কিংবা বিশ্ব মোড়ল আমেরিকার এফবিআই নড়েচড়ে বসেছে কি না আমার জানা নেই। বিষয়টি নিয়ে পরবর্তীতে আমি আদ্যোপান্ত লিখব। কারণ পাঠকদের জানার অধিকার আছে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ বিষয়ে তখন তারা সাংবাদিক গোলাম মোর্তোজা, ড. জাফর ইকবাল, ড. ইয়াসমীন, ফরিদুর রেজা সাগর, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, সুবীর নন্দী, বারী সিদ্দিকী, ফাহমিদা নবী, মুস্তাফা মনোয়ার, রফিকুল আলম কিংবা আবিদা সুলতানাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠাতে পারবেন। কারণ তারা সবাই প্রবাস প্রজন্ম জাপানের ডাকে জাপান এসেছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্যারের কথা না হয় বাদই দিলাম।
হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান কিংবা বৌদ্ধ যেকোনো ধর্ম, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, স্বরলিপি কিংবা উত্তরণ যেকোনো সংগঠনের জন্য দায়িত্ব নিয়ে হল নেয়ার পরও আমি জঙ্গি নেতা উপাধি পেয়েছি তাও আবার দূতাবাসসহ উভয় দেশের উচ্চপর্যায়ে এবং স্থানীয় প্রশাসনে লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে। বিষয়টি আমাকে পুলকিত করে বটে।
কিন্তু এতদ কিছুর পরও তাকিনোগাওয়া কাইকান হল কর্তৃপক্ষের ডাকে সাড়া দিয়ে আমি যেমন সবকিছুর দায় মাথায় নিয়ে আত্মসমর্পণ করেছি, ক্ষমা চেয়েছি আবার একই সঙ্গে বাংলাদেশের বাংলাদেশিদের মাথা উঁচু করিয়েছি, প্রতিবাদ করে এসেছি।
ভিডিও ফুটেজের কোনো কিছুই অস্বীকার করার উপায় নেই, নিয়ম না মানায় আমি ক্ষমা চেয়েছি। কিন্তু যখনই বলেছে নিয়ম না মানা কি বাংলাদেশিদের অভ্যাস কি না? কেন বাংলাদেশিরা নিয়ম মানতে চায় না? হলে না থেকে হলের বাইরে আড্ডা মারে, কেন ধূমপান নির্দিষ্ট এলাকা ছাড়া করে? এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি। বলেছি বাংলাদেশিরা নিয়ম মানে না এই কথা তুমি বা তোমরা বলতে পার না। হয়ত কিছুসংখ্যক লোক অনিয়ম করতে পারে আর তার দায় তোমরা একটি জাতির উপর চাপিয়ে দিতে পার না। একটি জাতির নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার তোমাদের নেই। তোমরা কি সবাই ভালো? সবাই যদি ভালো হবে তাহলে, তোমাদের দেশে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জেলখানা, আইন আদালত রয়েছে কেন? কেনই বা রাস্তাঘাটে সিগারেট ফুকার পর অবশিষ্ট পড়ে থাকতে দেখা যায়? আমাকে নিয়ে যা বলার বলো, কিন্তু আমার জাতীয়তা বা জাতিকে নিয়ে কিছু বললে তার প্রতিবাদ আমি করবই।
হল কর্তৃপক্ষের কথা হচ্ছে তুমি বা তোমার মতো কয়েকজন ভালো হলেই হবে না সবাইকে নিয়ম মানার প্রবণতা থাকতে হবে। আমরা চাই তোমরা সংস্কৃতি চর্চা করো, কিন্তু মনে রাখতে হবে হলগুলো সবার ব্যবহারের জন্য। কাজেই নিয়ম মেনে চলতে হবে।
এই হলেই আগামী ১১ অক্টোবর স্বরলিপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং ২২ নভেম্বর উত্তরণের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হবে এবং উভয় আয়োজনই আমার নামে হল বুকিং, তাই কথা আর বাড়ানো যায়নি।
সবশেষে প্রবাসী ভাইবোনদের কাছে আকুল আবেদন আপনার একটি কাজের সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তি জড়িত। তাই নিজ কর্মের দায় দেশ বা জাতির উপর না বর্তায় সেই দিকে সজাগ থাকুন, হলের নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করুন, হলে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করুন এবং অন্যকে উপভোগে সহায়তা করুন। সর্বোপরি নিজ সন্তানকে নিজ দায়িত্বে রাখার চেষ্টা করুন। কারণ আপনার/আমার কারণে জাপানের হলগুলো বাংলাদেশিদের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে এটা কারোরই কাম্য নয়। আয়োজকদের সহায়তা করুন। কারণ আয়োজকরা আপনাদের উপভোগের জন্য আয়োজনের ব্যবস্থা করে থাকেন।
rahmanmoni@gmail.com
Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
প্রবাসে
  • সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এবং মানিক চৌধুরী স্মরণে শোকসভা
  • বিশ্ব কবিতার সংকলনে স্থান পেলেন কবি হাসানআল আব্দুল্লাহ
  • সীমা লঙ্ঘনকারীর সাজা
  •  মতামত সমূহ
    Author : Catsnamesbob
    How to name a kitten? Found here unique kitten names http://allcatsnames.com/girl-kitten-names-unique full list of names for cats.
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.
    বর্তমান সংথ্যা
    পুরানো সংথ্যা
    Click to see Archive
    Doshdik
     
     
     
    Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive