Logo
 বর্ষ ১০ সংখ্যা ২৩ ২২শে কার্তিক, ১৪২৪ ১৬ নভেম্বর, ২০১৭ 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
এই সময়/রাজনীতি
ডায়রি/ধারাবাহিক
স্বাস্থ্য
খেলা
প্রতিবেদন
সাহিত্য সংস্কৃতি
বিশ্লেষন
সাক্ষাৎকার
প্রবাসে
দেশজুড়ে
অনুষ্ঠান
ফিচার ও অন্যান্য
নিয়মিত বিভাগ
দেশের বাইরে
প্রতিবেদন
 
http://sadiatec.com/
মাটির কাছাকাছি -শামসুল হুদা  
জীবনের পেছন ঘরে তাকিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার একটা আলাদা স্মৃতিভার আছে। কিন্তু সেই লড়াকু দিনে কি ফেরা যায়? মঠবাড়িয়া থেকে কুষ্টিয়া, বাম আদর্শে নিবেদিত ছাত্ররাজনীতি, পরিবারের অমত, হোলটাইমার রাজনৈতিক কর্মী, শ্রমিক আন্দোলন, সামরিক আদালতে দণ্ড, কারাবরণ, ষাট-সত্তর দশকের উত্তাল অগ্নিগর্ভ রাজনৈতিক ঘনঘটা, সত্তরের নির্বাচন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের স্মরণযোগ্য ভাষণ, ২৫ মার্চের গণহত্যা, মুক্তিযুদ্ধ, কলকাতা গমন, স্বাধীনতা, নতুন দেশ- জীবন পাঠের সেইসব ডঙ্কাবাজা, উত্তাল, অগ্নিময় স্বপ্নঘোরের দিনে ফিরেছেন আজকের কর্মিষ্ট মানুষ শামসুল হুদা।
শামসুল হুদা জন্মেছেন ১৯৪৮ সালের ১ এপ্রিল পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলায়।

২.
তিনি কৈশোরেই রাজনৈতিক সাহিত্য ও ষাটের দশকের সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সংস্পর্শে আসেন। বাম রাজনীতি ও মার্ক্সীয় ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে পরবর্তীতে নিবিড়ভাবে তৃণমূলে শ্রমিক ও কৃষকের আন্দোলন-সংগঠন গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসন, স্বাধিকার ও সর্বোপরি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। আশির দশকের শেষার্ধ অবধি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। সাংবাদিকতা ও লেখালেখির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
পরবর্তী সময় সচেতভাবে যুক্ত হন দেশের, অধিকারবঞ্চিত ভূমিহীন, গ্রামীণ নারী-পুরুষ, আদিবাসী, সংখ্যালঘু ও দলিতসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাগ্য উন্নয়ন ও মানবাধিকার সুরক্ষার আন্দোলনে। ভূমি ও কৃষি সংস্কারের প্রচেষ্টা, উদ্যোগ ও আন্দোলনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গড়ে তোলেন অন্য সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট (এএলআরডি) নামের বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান। এক সময় দেশের বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনগুলোর একমাত্র শীর্ষ সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান এডাবের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তার স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে অনেক অজানা কথা। ষাট, সত্তর ও আশির দশকসহ প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক, সামাজিক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য, বিশ্লেষণের নানা দিক। এবার প্রকাশিত হলো আত্মস্মৃতির প্রথমপর্ব


মুক্তিযুদ্ধের পথে
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদবিরোধী কিংবদন্তি নেতা ড. মার্টিন লুথার কিং স্বপ্ন দেখতেন মানবিক সাম্য প্রতিষ্ঠার। ১৯৬৮ সালে দেয়া এক ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি সেই স্বপ্নের কথা (ও যধাব ধ ফৎবধস) মার্কিন জনগণ তথা বিশ্ববাসীকে শুনিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একদিন তার দেশ জেগে উঠবে, তারা সব বর্ণবাদী বৈষম্য, অন্যায় ও জুলুমের অবসান ঘটাবে।
ষাটের দশকে সেই যুগ পরিবর্তনের হাওয়ায় পৃথিবীর এই অংশের নতুন প্রজন্ম প্রায় একই ধরনের বিশ্বাস নিয়ে বেড়ে উঠছিল। আমি সেই যুগ স্বপ্নে বিভোর কিশোর-তরুণদের একজন হিসেবে নানা রোমান্টিক, বিপ্লবী আকাক্সক্ষা নিয়ে জীবনের পথে পা বাড়িয়েছিলাম। মনের গভীরে ছিল আশা জাগানিয়া প্রত্যয়, একদিন আমাদের এই প্রিয় স্বদেশ সব অনাচার, বৈষম্য, ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত হবে। এক সত্যিকার আলোকিত, সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদশূন্য, নারী-পুরুষের সমান অধিকারভিত্তিক, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন এক সমাজ গড়ে উঠবে, আমাদের সম্মিলিত নিষ্ঠা, শ্রম, ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।
আমাদের সে স্বপ্ন কতটুকু পূরণ হয়েছে? স্বপ্ন পূরণের প্রক্রিয়ায় আমি কি সামান্যতম অবদান রাখতে পেরেছি? পেরেছি কি সামাজের পশ্চাতে পড়ে থাকা মানুষের জীবনের কোনো অনালোকিত খ-াংশে আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে দিতে এতটুকু ভূমিকা রাখতে? আমার মধ্য ষাটোর্ধ্ব জীবনের পড়ন্ত বেলায় এ আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি আমাকে দাঁড়াতেই হচ্ছে। জীবনের গল্প বলার আয়োজন প্রধানত এই আত্মজিজ্ঞাসাকে উপলক্ষ করে, নিজের কাছে তো বটেই, অন্যের কাছেও কৃত কাজের স্বতঃপ্রণোদিত কৈফিয়ত তুলে ধরার তাগিদে।  
মাটির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকে যাদের জীবন, তাদের নিকটবর্তী থেকে তিন দশকেরও বেশি সময় কাজ করার সুবাদে যে স্বপ্ন অন্তরে লালন করেছি, বাস্তবে তার রূপটি কেমন ছিল তা জানা জরুরি। জীবনকে বোঝা, জানার চেষ্টার নামই জীবন। সেই অভিজ্ঞতার নানা উপাখ্যান, গল্প স্মৃতির ভা-ারে জমে আছে। সহৃদয় পাঠকদের উদ্দেশে সে গল্প বলতে চেষ্টা করব। ১৯৭১ সালের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার একটি গল্প দিয়েই শুরু করা যাক।  
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ-এর মধ্য রাতে ঢাকায় পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীর গণহত্যা শুরু হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল, পিলখানা, রাজারবাগসহ সর্বত্র শিক্ষক-ছাত্র-ইপিআর,  পুলিশ, সাধারণ শ্রমজীবী, পেশাজীবী নারী-পুরুষ-শিশুদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি বর্বরতার সূচনা হয়েছিল। আমি তখন কুষ্টিয়া শহরে অবস্থান করছিলাম। গণহত্যা শুরুর প্রায় সাথে সাথেই কুষ্টিয়া শহরে যে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে তাতে উদ্যোগী ভূমিকা নেবার সুযোগ আমার ছিল না। তবে এই প্রতিরোধকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন জানানোর মধ্য দিয়ে মুক্তির সংগ্রামের সাথে প্রথম প্রহর থেকেই সম্পূর্ণ একাত্ম হয়েছিলাম।
কুষ্টিয়ায় ইপিআর মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর নেতৃত্বে ৩০ মার্চ পাক-হানাদারদের ওপর আক্রমণ শুরু হয়। মিলপাড়া ওয়্যারলেস স্টেশন, পুলিশ লাইন ও সার্কিট হাউসে অবস্থানরত পাক-সেনাদের উচ্ছেদ করে ১ এপ্রিল কুষ্টিয়া শহর হানাদার মুক্ত হলো। এই প্রেক্ষাপটে এক বন্ধুকে নিয়ে কলকাতা যাই আসন্ন যুদ্ধে ভারতীয় বাম শক্তির সমর্থন ও সহযোগিতার আশ্বাস পেতে। তার পর সংগ্রামের পরবর্তী পর্যায়ের প্রস্তুতি নিতে গ্রামে চলে যাই। ডা: টি হক ও তার আত্মীয়-ঘনিষ্ঠজনদের স্বেচ্ছায় দান করা ৩টি দোনালা বন্দুক  ও কিছু গুলি সাথে করে শহরের অদূরে গড়াই পার হয়ে কয়া গ্রামে আশ্রয় নিই। ডা. তফাজ্জল হক (টি, হক), কুষ্টিয়া ন্যাপ ( মোজাফ্ফর)-এর অন্যতম নেতা ছিলেন। তিনি ডেকে আমাকে বলেছিলেন, মুক্তির যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এই বন্দুক গুলি নিয়ে যান, কাজে লাগান। চলে যাই। মাও সেতুং ও ভিয়েতনামের জেনারেল ন’গুয়েন গিয়াপের লেখা গেরিলা যুদ্ধের কৌশল সম্পর্কিত নানা রচনা ও বই পড়ে গেরিলা যুদ্ধের যে সামান্য পুঁথিগত জ্ঞান হয়েছিল তার ওপর ভর করেই মুক্তিযুদ্ধে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করা ও প্রশিক্ষণ দেয়ার এক রোমাঞ্চকর বাসনা নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। অনিল চন্দ্র ঘোষ, ব্রজেন বিশ্বাস ও অন্যান্য সহকর্মী, বন্ধুদের সহযোগিতায় কিছু একটা করার পরিকল্পনা নিয়েছিলাম।
১৬ এপ্রিল ভোর রাতে পাকিস্তানি হানাদাররা মুক্ত কুষ্টিয়া শহর পুনরায় দখলে নেয়। ১৫ এপ্রিল রাতে আমি শহরেই অবস্থান করছিলাম। মধ্য রাত থেকে অবিরাম শেল বর্ষণ ও গোলাগুলির আওয়াজ শোনা গিয়েছিল। ওই সব ভারী অস্ত্রের গোলাবর্ষণ মোকাবিলা করে তাদের প্রতিরোধ করার প্রস্তুতি সে সময় কুষ্টিয়া শহরে অবস্থানরত জনগণ বা  মুক্তিযোদ্ধাদের ছিল না। অতঃপর নিরাপদ অবস্থানে চলে যাওয়াই ছিল সেই সময়ের রণকৌশলের জরুরি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আমিও সে কাজই করেছিলাম।
আগের দিন রাতে আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যোগদান করেছিলাম। এ বিষয়ে পরে যথাস্থানে বিস্তারিত বলব। বৈঠক শেষ করে শেষ রাতে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে ভোরের অন্ধকার কাটতে না কাটতেই শহর ত্যাগ করেছিলাম। আমার মূল আস্তানা ছিল কয়া গ্রামে। মাঝে মাঝে কুমারখালী ও খোকসা থানার বিভিন্ন গ্রামে হেঁটে কিংবা সাইকেলে, কখনো বা মোটরসাইকেলে কারও পেছনে বসে যেতাম কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও বৈঠক করতে।
কয়ার বন্ধু অনিল ঘোষের বাড়িতে রাতে অবস্থান করছিলাম। সেখানে একদিন পরান বন্দ্যোপধ্যায় নামে মোহিনী মিলের একজন সিনিয়র কর্মচারী বিপন্ন বিধ্বস্ত চেহারায় এসে উপস্থিত হলেন। আমি তাকে চিনতাম, পরানদা-ও আমাকে চিনতেন, তবে আগে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করিনি। পরানদা তার দুর্ভাগ্যের কথা জানালেন। বললেন, বহু কষ্টে নিজের জীবন নিয়ে শহর ছেড়ে বাইরে আসতে পেরেছেন, তবে তার স্ত্রী এবং দুই পুত্র সন্তান এখনো মোহিনী মিলের স্টাফ কোয়ার্টারে আটকে আছে। তার আশঙ্কা, মুক্ত করে না আনলে তাদের জীবন বিপন্ন হবে। পরানদা বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। কলকাতার প্রখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেতা হারাধন ব্যানার্জী পরানদার অগ্রজ। তিনি সপরিবারে সেখানে গিয়ে আশ্রয় নেবার পরিকল্পনা করছিলেন। এ রকম সময় তার ওপর শারীরিক আক্রমণের আশঙ্কায় শহর ছাড়তে হয়েছে। প্রায় একই সময় অনিলদার বড় মামা কুমারখালীর এমএন হাইস্কুলের অঙ্কের প্রবীণ শিক্ষক সুবোধ ঘোষের নিখোঁজ হবার খবর এসেছিল। তাই তার খোঁজ নেয়াও তার স্বজনদের কাছে একটি অত্যন্ত জরুরি কাজ হয়ে উঠেছিল। উভয় পরিবারই আমার ওপর ভরসা করতেন এবং আশা করছিলেন আমি হয়তো তাদের উদ্ধারে কোনো সাহায্য করতে পারব।
বিপন্ন দুই পরিবারের এই অবস্থায় আমি কুষ্টিয়া শহর থেকে তাদের উদ্ধার করা যায় কি না, তা নিয়ে ভাবতে লাগলাম। এ সময় গেলাম হোসেন নামের মোহিনী মিলের এক শ্রমিকনেতা আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। গোলাম ভাই শ্রমিক আন্দোলন করতে গিয়ে মোহিনী মিলের চাকরি হারিয়েছিলেন অনেক বছর আগে। তিনি পার্টিশনের আগে মেটিয়াজুরুজ, বোম্বের বিভিন্ন মিলে কাজ করার সুবাদে চমৎকার হিন্দি ও উর্দু বলতে পারতেন। উর্দু এত ভালো বলতেন যে তিনি বাঙালি না বিহারি, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ত। ’৭১ সালের ওই দিনগুলোতে তিনি কুষ্টিয়া শহরে বিহারিদের রাজত্বে অবাধে ঘুরে বেড়াতেন আর আমাদের খোঁজখবর দিতেন।
ঠিক করলাম গোলাম ভাইকে সঙ্গী করে অবরুদ্ধ কুষ্টিয়া শহরে প্রবেশ করব। উদ্দেশ্য, অনিল ঘোষের বড় মামা সুবোধ ঘোষ আটক অবস্থায় কুষ্টিয়া জেলা কারাগারে বন্দী থাকতে পারেন বলে যে ধারণা হয়েছিল, তার সত্যতা যাচাই করা। বেঁচে থাকলে তাকে উদ্ধারের উপায় খোঁজা। এছাড়া পরানদার অবরুদ্ধ পরিবার অর্থাৎ স্ত্রী ও দুই শিশুপুত্রকে তাদের বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে আসার বন্দোবস্ত করা। এ কাজে দুটি অবাঙালি (পাঠান) পরিবারের সহায়তা নেব।
এই দুটি অবাঙালি পরিবারের সঙ্গে আমার আগে থেকেই  জানাশোনা ও ঘনিষ্ঠতা ছিল। এরা মূলত পেশোয়ারি পাঠান। এদের মধ্যে একটি পরিবার ছিল আমার শ্রমিক আন্দোলনের এক সহকর্মী করিম বক্স খানের ভাগ্নী বেবি ও ভাগ্নেজামাই আফতাব খানের পরিবার। অন্যটি শরবতী খান নামের একজন নিরীহ, সরল পাঠান ব্যবসায়ীর পরিবার। এই দুই পরিবারের সঙ্গেই আমার নিবিড় সখ্য ও আন্তরিক সম্পর্ক ছিল নিকট আত্মীয়ের মতো।
কুষ্টিয়া শহরে ঢোকার জন্য লালন শাহর সমাধির পাশঘেঁষা ছেঁউড়িয়ার রাস্তা দিয়ে এগিয়ে গেলাম। আমার পরনে ছিল লুঙ্গি, সাধারণ একটি শার্ট ও হাতে দৈনন্দিন বাজারের ব্যাগ। আমার রাজনৈতিক পরিচিতি আড়াল করার জন্য এই বেশ। মোহিনী মিলের কাছাকাছি হতেই আমাকে অবাঙালি পাহারাদাররা আটকে দিল। এরা প্রায় সবাই ছিল বহিরাগত। পরে বুঝতে পেরেছিলাম এদের মধ্যে মোহিনী মিলে কর্মরত কয়েকজন বিহারি শ্রমিকও ছিল। ধরা পড়তেই আমাকে তারা জেরা করা শুরু করল। গোলাম ভাই আমার কিছুটা সামনে ছিলেন । তিনি আমাকে আটক করার সঙ্গে সঙ্গে বিপদ যে আসন্ন তা আঁচ করতে পেরে আমাকে ছাড়াবার বৃথা চেষ্টা না করে দ্রুত ওই স্থান ত্যাগ করলেন। আমি ভাবলাম, আমি যতই নিজকে নিরীহ প্রমাণ করার চেষ্টা করি না কেন, ওরা তা বিশ্বাস করবে না। তবু আমি ওদের জেরার উত্তরে নিজকে শান্ত রেখে সময় ক্ষেপণের চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলাম, আমার ভাঙা ভাঙা উর্দু-বাংলার জগাখিচুড়ি ভাষায়। কিন্তু বুঝতে আমার বাকি রইল না, ওরা আমার কোনো উত্তরেই সন্তুষ্ট হচ্ছে না। এমন অবস্থায় ওদের করণীয় কী, তা ঠিক করার জন্য আমাকে বসিয়ে রেখে কয়েকজন একটু দূরে দেয়ালের অপর পাশে গিয়ে সলাপরামর্শ সেরে নিল। আমি নিশ্চিত অনুমান করলাম,  এখনই এসে আমাকে নিকটবর্তী শ্মশান-সংলগ্ন গড়াই পারে নিয়ে যাবে। সেখানে গুলি করে, নয়তো জবাই করে হত্যা করবে। কারণ ওই সময় এভাবেই প্রতিদিন অনেক নিরীহ মানুষকে ঠিক ওই স্থানেই হত্যা করা হতো।
ঠিক এ রকম ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াবার অনুভূতি তো সচরাচর হয় না, আমারও এর আগে হয়নি। তাই ঠিক এর সঠিক বর্ণনার ভাষাও জানি না। জুলিয়াস ফুচিকের ‘ফাঁসির মঞ্চ থেকে’ বইটি একাধিকবার পড়া ছিল। ক্ষুদিরাম, মাস্টারদা সূর্য সেনের জীবনীও পড়েছিলাম। হয়তো সে জন্যই ভয়ে মুষড়ে পড়িনি। কিংবা ওদের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবার মতো কোনো অনুনয় বাক্যও মনে আসেনি। স্থির হয়ে নীরবে অপেক্ষা করতে লাগলাম। আর তখনই যেন কোনো অলৌকিক শক্তির নির্দেশে আকস্মাৎ দেবদূতের মতো বাইসাইকেলে ছুটে এলেন আমার পরম বিশ্বস্ত শুভাকাক্সক্ষী শরবতী খান, কাঁধে ঝুলানো স্টেনগান। কয়েক শ’ গজ দূর থেকেই চিৎকার করে বলতে লাগলেন ক্রুদ্ধ গম্ভীর স্বরে উর্দুতে, ‘খবরদার, ও আমার ভাই। ওকে ছেড়ে দাও, নইলে তোমাদের নিস্তার নাই।’
বলতে বলতে শরবতী খান কাছে এসে থামলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, আমাকে কে আটক করেছে? ওরা কেউই সাহস করে বলল না, কে এ কাজ করেছে। সবাই এ ওর মুখের দিকে তাকাতে লাগল। শরবতী খান ছো মেরে আমাকে তার বাইসাইকেলে সামনে বসিয়ে চলে গেলেন আড়–য়াপাড়ায় তার বাসায়। সেদিন রাত ওই বাসাতেই কাটিয়েছিলাম তার পরিবারের পরম মমতাভরা আতিথেয়তায়। খুলে বললাম আমার শহরে আসার কারণ। শরবতী খান প্রথমে আমাকে তিরস্কার করলেন তাকে কোনো খবর না দিয়ে এসে যে বোকামি করেছি তার জন্য। তারপর সব রকমের সাহায্য করতে চেষ্টা করেছিলেন। পরান বন্দ্যোপধ্যায়ের স্ত্রী-পুত্রদের উদ্ধার করা সম্ভব হলেও অনিলদার মামা সুবোধ ঘোষের কোনো হদিস পাওয়া গেল না।
উল্লেখ্য, শরবতী খান তখন ওই অবাঙালি বিহারি ঘাতকদের কাছে ছিলেন আতঙ্কের প্রতীক। সেই সময় একজন পাঠান মেজর সম্ভবত কুষ্টিয়া শহরের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে ছিলেন। তাই শরবতী খানের ক্ষমতা ও প্রভাব ওদের জানা ছিল। তার এই ক্ষমতা ব্যবহার করে সে সময় শরবতী খান কুষ্টিয়া শহরের হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে অনেক বাঙালি পরিবারের জীবন রক্ষা করেছিলেন। সেদিনের সেই অতিনাটকীয় উদ্ধারের ঘটনাটি ওইভাবে যদি না ঘটত, গোলাম ভাই যদি সময়মতো শরবতী খানকে অবাঙালি ঘাতকদের হাতে আমার আটক হবার খবর দিতে না পারতেন কিংবা শরবতী খানের সেখানে পৌঁছাতে আর কিছু বিলম্ব হতো, হয়তো জীবনলীলা সেখানেই সাঙ্গ হতো। তাই ওই দিনের কথা মনে পড়লেই মনে হয় আমি বুঝি অপ্রত্যাশিত বোনাস জীবনের অধিকারী। বড়ই ভাগ্যবান মনে হয় নিজেকে। পরম করুণাময়ের প্রতি এর জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই। অসীম শ্রদ্ধাভরে সামান্য লেখাপড়া জানা বন্ধুবৎসল অসম্ভব বিশ্বস্ত সেই পাঠান পরিবারটির কথা স্মরণ করি। তাদের কল্যাণ কামনায় মন ভরে ওঠে কানায় কানায়। এরা পেশোয়ার থেকে কুষ্টিয়ায় এসে বসবাস করছিলেন অনেক বছর আগে থেকে। তবে আমার সঙ্গে শরবতী খান ও তার স্ত্রীর যে নিবিড় আত্মীয়তা গড়ে উঠেছিল ’৬৮-’৬৯ সালে, তা থেকে এটুকু জানতাম, আমাকে রক্ষা করতে তারা জীবন দিতেও কুণ্ঠিত হতেন না। পাঠানরা বন্ধুর জন্য জীবন কোরবানি দিতেও দ্বিধা করে না।  
এদের কাছে আমি চিরঋণী হয়েই আছি। পাকিস্তান চলে যাবার পর একাধিকবার খোঁজ করেও শরবতী খানের সঙ্গে যোগাযোগ করে উঠতে পারিনি। শুধু মনে মনে তার পরিবারের কল্যাণ কামনা করেছি আর রবীন্দ্রনাথের ভাষায় করুণাময়কে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেছি,
‘আমারে তুমি অশেষ করেছ এমনই লীলা তব।
ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছ জীবন নব নব ॥’

আমার পারিবার
জীবনের বিচিত্র পথের নানা অভিজ্ঞতার পারিবারিক বাস্তবতা ও তার শিক্ষাগুলি জানার আগে আমার পরিবার সম্পর্কে কিছু বলা আবশ্যক। শেকড়ের পরিচয় বুঝতে হলে সামাজিক অবস্থানটি জানা একান্ত জরুরি। আমার পিতামহ ওসমান গণি ছিলেন তার পিতার একমাত্র পুত্রসন্তান। তার পিতা আরজান উল্লাহ এবং আমার পিতামহের পিতামহ বাবর উল্লাহ ছিলেন কৃষক। বাবর উল্লাহর বাবা ছিলেন রেহিম উল্লাহ। যত দূর জানা যায়, তিনিও কৃষক ছিলেন। এদের আদি বাস ছিল মাদারীপুর জেলার অন্তর্গত গোসাইরহাট থানায়। রেহিম উল্লাহর ছেলে বাবর উল্লাহ কৃষি কাজের পাশাপাশি কৃষিপণ্য বেচা-কেনার ব্যবসা করতেন বলে শোনা যায়। সেই উপলক্ষেই তার ছেলে আরজান উল্লাহকে নিয়ে তিনি মঠবাড়িয়ার সাপলেজায় প্রথম আসেন। এরা কেউই সম্ভবত লেখাপড়া শেখার সুযোগ পাননি। আমার দাদা ওসমান গণি প্রথম স্কুলে যাবার সুযোগ পেয়েছিলেন। তার পিতা আরজান উল্লাহর শিক্ষার ব্যাপারে আগ্রহ ছিল। একমাত্র পুত্র সন্তানকে স্কুলে পাঠালেও কন্যা সন্তানদের কাউকেই তিনি লেখাপড়া শেখাতে পারেননি।  
আমার প্রপিতামহ একদিন ঘর মেরামতের জন্য আমাদের সাপলেজার পুরনো বাড়ির পেছনের বাগানে গেলেন বাঁশ কাটতে। দেখা পেলেন এক হিংস্র বাঘের। সাহসী হাতের ভারী কুঠার দিয়ে বাঘকে তিনি শুধু পরাস্তই নয়, বধ করেছিলেন। তিনি অবশ্য আহত হয়ে অনেক দিন শয্যাশায়ী ছিলেন। নিহত বাঘটিকে টানতে টানতে তিনি যখন বাড়ির ভেতরে নিয়ে এসেছিলেন, তখন পরিবারের সবাই আতঙ্কে হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিল। কয়েক গ্রাম ও পাড়া-প্রতিবেশীরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তাকে দেখতে এসেছিলেন এবং তার বাহাদুরির জন্য ধন্য ধন্য করেছিলেন। তখন বাঘের উৎপাত ওই অঞ্চলে প্রায়ই চলত, তাই ইংরেজ প্রশাসন থেকে বাঘ মারাকে উৎসাহিত করা হতো। কেউ বাঘ মেরে মানুষের জীবন রক্ষা করলে তাকে তিরস্কারের বদলে পুরস্কৃত করা হতো।
আমার পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে ছিল বৃহত্তর ফরিদপুরের শালাল পীরের অনুসারী বা মুরীদ। আমার ছোটবেলায় ওই পীর বংশের প্রতিনিধি চান্দু মৃধা সস্ত্রীক আমাদের গ্রামের বাড়িতে আসতেন। তারা সাধারণত শীতকালে নিজেদের বোটে চড়ে আসতেন। মাদারীপুর জেলার ডামুড্যা থেকে বোটে আসতে তাদের কয়েক দিন লাগত। পীর চান্দু মৃধাকে আমরা ডাকতাম ফকির বাবা বলে। তার স্ত্রীকে বলতাম ফকির মা। এই পীর বাবার কিছু লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য ছিল। সচরাচর অন্য পীরের ক্ষেত্রে যেমন দেখা যায়, তা থেকে আলাদা। চান্দু মৃধার স্ত্রী, আমাদের ফকির মা ছিলেন দেখতে খুব সুন্দরী, ফিটফাট। তাকে কখনো বোরকা পরে চলাফেরা করতে দেখিনি। তিনি লেখাপড়া জানতেন, আমাদের পড়ালেখায় ভীষণ উৎসাহ দিতেন। এমনকি মেয়েদের পড়ালেখার ব্যাপারেও তার উৎসাহের কোনো অভাব ছিল না। ফকির বাবা চান্দু মৃধা যে বোটে আসতেন, তাতে বোঝাই করে নিয়ে আসতেন সেই সব পণ্য, যা এলাকায় পাওয়া যায় না। এসব পণ্য সাপলেজা বাজারে পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রির ব্যবস্থা করে দিতেন আমার দাদা। আবার ফিরে যাবার সময় সেই সব কৃষিপণ্য, সুপারি, নারকেল ইত্যাদি তারা কিনে নিয়ে যেতেন, যা হয়তো তার নিজ গ্রামের এলাকায় পর্যাপ্ত পাওয়া যেত না। অর্থাৎ বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকা-ে লিপ্ত থেকে নিজেদের জীবিকা আহরণের এই রেওয়াজ ছিল ওই পীর বাবার। আমাদের পুরনো বাড়িতে বাৎসরিক ওরস হতো। সেখানে অনেক পীর ফকির এসে ২/৩ দিন গান বাজনা করতেন। মূলত মারফতি, আধ্যাত্মিক ও বাউল গান হতো । ওরসে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা থাকত।
দাদা ওসমান গণি প্রাইমারি স্কুলের শেষ পরীক্ষায় পাস দিয়ে যে বিদ্যা অর্জন করেছিলেন তা কাজে লাগিয়ে অত্যন্ত নিপুণভাবে, সৃজনশীল মেধা ও বুদ্ধি খাটিয়ে বাস্তব জীবন থেকে তিনি যে জ্ঞান আহরণ করেছিলেন তার পরিধি অনেকটাই বিস্তৃত ছিল। সে কারণে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সীমিত অর্জন সম্বল করেই তিনি একজন সফল, ব্যতিক্রমী মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন।
তরুণ বয়সে তিনি সচ্ছল কৃষক বাবার সঙ্গে সরাসরি কৃষি কাজে অংশ নিয়েছেন। আনুষ্ঠানিক অর্থে উচ্চশিক্ষিত না হয়েও পল্লী সমাজে শিক্ষানুরাগী, প্রখর ন্যায়বোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে কদর-সম্মান পেয়েছেন এবং সারা জীবন শিক্ষার প্রসারে ব্রতী ছিলেন। একপর্যায়ে পার্শ্ববর্তী গ্রামের জমিদার নিকেলেশ্বর রায় চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন একজন সৎ, বুদ্ধিমান, নির্ভরযোগ্য ও ভূমিসংক্রান্ত বিষয়ে জ্ঞানসম্পন্ন তরুণ হিসেবে। আর সে কারণেই জমিদার নিকেলেশ্বর বাবু আজ থেকে প্রায় ৯০ বছর আগে ভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ভুক্ত মুসলমান এক তরুণকে তার বিশ্বস্ত তহশিলদার বা নায়েব হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। আমার দাদা অনেক বছর এই দায়িত্ব নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে পালন করে তার যোগ্যতা ও বিশ্বস্ততার অকাট্য প্রমাণ রেখেছিলেন।
১৯৫০ সালে জমিদারি উচ্ছেদ হয়ে যাবার পর নিকেলেশ্বর বাবু ঝাটিবুনিয়া গ্রামে তার ১৫ বিঘার ওপর কাছারি বাড়িটি আমার দাদাকে উপহার হিসেবে দিয়ে কলকাতা চলে যান। পরবর্তী সময় দাদা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত সদস্য, চেয়ারম্যান হিসেবে একাধিকবার দায়িত্ব পালন করেছেন। তার সততা, জনপ্রিয়তা ও অসাম্প্রদায়িক নিরপেক্ষতা ছিল প্রবাদতুল্য। তার উদ্যোগে গ্রামে একাধিক স্কুল প্রতিষ্ঠিত কিংবা সম্প্রসারিত  হয়েছে সেই সময়।
আমার বাবা ছিলেন দাদার প্রথম সন্তান। তিনি গ্রামের স্কুলে লেখাপড়া করেছেন। মঠবাড়িয়া  কে এম লতিফ ইনস্টিটিউশন থেকে দ্বিতীয় বিভাগে এন্ট্রান্স পাস করে বরিশাল বিএম কলেজে পড়েছেন। কিন্তু ছাত্র অবস্থায় ভয়ানক গুটি বসন্তে আক্রান্ত হওয়ায় তিনি গ্রাজুয়েশন করতে পারেননি। বিএম কলেজে পড়ার সময় রাজনীতিবিদ মহিউদ্দিন আহমেদ তার সহপাঠী ছিলেন। সেই সময় তরুণ মুসলিম ছাত্রলীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গেও তার পরিচয় ছিল। মহিউদ্দিন চাচার সঙ্গে বাবার বন্ধুত্ব তাদের মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত অটুট ছিল।
আমার বাবা প্রথম জীবনে আমাদের এলাকার ইংরেজ জমিদার এডওয়ার্ড পেরি ক্যাসপারসের সহকারী বা সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করেছেন। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের পর তিনি এলাকার হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। অনেক বছর শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থাকার সুবাদে আমার বাবা জয়নাল মাস্টার হিসেবে সমধিক পরিচিত ছিলেন। আমাদের এলাকার পোস্ট অফিসের নাম শিলারগঞ্জ। শুনেছি ডাকঘরের নাম শিলারগঞ্জ হয়েছে জমিদার এডওয়ার্ড  ক্যাসপারস এর বাবা শিলার ক্যাসপারসের নামানুসারে।
বাবার শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হবার আগে থাকতেই দাদার আমল থেকেই আমাদের বাড়িতে অনেক দূরবর্তী গ্রামের শিক্ষার্থীরা লজিং থেকে সাপলেজা স্কুলে লেখাপড়া করত। আমার বাবা নিজে ওই স্কুলে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাবার পর বাড়িতে লজিং থাকা ছাত্রের সংখ্যা বাড়ল। প্রতিবছর একাধিক শিক্ষার্থী আমাদের বাড়িতে থেকে পড়াশুনা করার সুযোগ পেত।
সামাজিক-আর্থিক বিবেচনায় আমাদের পরিবারটি ছিল নেহাতই গ্রামীণ মধ্যবিত্ত পরিবার। আর্থিক সচ্ছলতার জন্য নয়, শিক্ষার প্রতি অনুরাগ বা ভালোবাসা থেকেই দাদা ও বাবা বাড়িতে শিক্ষার্থীদের লজিং থাকার ব্যবস্থা করতেন। আমার মা গ্রামের অতি সাধারণ মহিলা। কিন্তু নিজের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে যেমন তার উৎসাহ, আগ্রহ ছিল, তেমনি ভিন্ন গ্রামের অনাত্মীয় পরিবারের কোনো শিক্ষার্থীর বাড়িতে লজিং থেকে লেখাপড়া করার প্রশ্নেও তার একই রকম সহানুভূতি ও সমর্থন থাকত।
আমার বাবা-কাকারা ছিলেন ছয় ভাই। আগেই বলেছি, বাবা ছিলেন দাদার প্রথম সন্তান। বাবা ছাড়াও দাদার আরও ৫ পুত্র ও ৬ কন্যাসন্তান ছিলেন। এদের মধ্যে আমার পিতা জয়নাল আবেদিন, মেজ কাকা ডা. মতিয়ার রহমান ও সেজ কাকা মজিবর রহমান প্রয়াত। মেজ কাকা ছিলেন পেশায় চিকিৎসক। আমার বাবা ১৯৯৩ সালে ৭২ বছর বয়সে কয়েক মাস চিকিৎসাধীন থেকে আমাদের ছেড়ে একেবারে চলে যান। মেজো কাকা সম্প্রতি চলে গেলেন ৮৮ বছর বয়সে। সেজ কাকা মারা গিয়েছেন মাত্র ৬১ বছর বয়সে। আমার তিন চাচা হাবিবুর রহমান, মোখলেসুর রহমান ও আজিজুর রহমান ও চার ফুফু এখনো বেঁচে আছেন। সুস্থ আছেন।  দাদা মারা গিয়েছেন ৮৯ বছর বয়সে ১৯৮৯ সালে।
আমার দাদি মারা যান পরিণত বয়সে, দাদার কয়েক বছর আগে। দাদি খুবই সাদাসিধে, নিরহঙ্কার, পরোপকারী মহিলা ছিলেন। তিনি নিরক্ষর হয়েও দেশজ, ঐতিহ্যপূর্ণ, গাছগাছড়ার শেকড়, পাতা ইত্যাদির নির্যাস, রস দিয়ে কবিরাজি ওষুধ তৈরি করতেন। এ জ্ঞান তিনি পেয়েছিলেন তার শ্বশুর ও শাশুড়ির কাছ থেকে। প্রাচীন লোকজ সূত্র থেকে পাওয়া এই চিকিৎসা জ্ঞান কাজে লাগিয়ে দাদি গ্রামের সাধারণ নারী ও তার চেনাজানা পুরুষদের চিকিৎসা সহায়তা দিতেন মনের আনন্দে, নিখরচায়।
আমার মা ছিলেন আমার নানা-নানির দ্বিতীয় সন্তান। নানার নাম আবদুল গফুর। তিনিও সচ্ছল কৃষক ছিলেন। তার বাবার নাম ওয়াহেদ আলী। ওয়াহেদ আলী ১৭ বছর বয়সে হজব্রত পালন করেছিলেন। ওয়াহেদ আলীর বাবা অর্থাৎ আমার মায়ের প্রপিতামহ খোশাল ফরাজী হজব্রত পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা শরিফে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন। মনে করা হয়, তিনি সেখানেই পরলোকগমন করেন।
আমি বাবা-মায়ের জীবিত সন্তানদের মধ্যে প্রথম হলেও আসলে দ্বিতীয় সন্তান। আমার এক বোনের জন্ম হয়েছিল আমার জন্মের দুবছর আগে। সে চার বছর বয়সে মারা যায়, নাম ছিল পারুল। এরপর আমরা ৭ ভাই ও ১ বোন জন্মেছি। আমার অন্য ভাইরা হচ্ছেÑনূরুল হুদা মঞ্জু, সিরাজুল আলম ফেরদৌসী, নজমুল হুদা, আমিনুল হুদা, এমাদুল হুদা ও জহুরুল হুদা। বোন সবার ছোট, নাম নিলুফার ইয়াসমিন রুবি। ভাইদের মধ্যে নূরুল হুদা মঞ্জু ম্যাট্রিক পাস করে বাড়িতেই থাকত। ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। ’৭৬ সালে হঠাৎ করেই যেন অভিমান করে আমাদের ছেড়ে চলে গেল। পরের ভাই ফেরদৌসী পেশায় চিকিৎসক। তার পরের ভাই ডা. নজমুল হুদা, সরকারি মেডিকেল কলেজে ফরেনসিক বিভাগের অধ্যাপনায় নিয়োজিত। এর পরের দুই ভাইর মধ্যে আমিনুল গ্রামের হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক, আর এমাদুল ওই হাইস্কুলের শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। সর্বকনিষ্ঠ ভাই জহুরুল হুদা বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। বোন রুবি গৃহিণী ও দুুই সন্তানের জননী।

স্কুলের শুরু
জন্মেছিলাম এক সাধারণ পরিবারে। তাই বাল্যকাল ছিল আর্থিক প্রাচুর্য বা ভোগবিলাস উপকরণ প্রাপ্তির বিচারে বৈচিত্র্যহীন, সাদামাটা। তবে প্রকৃতির অপার বৈভব মনভুলানো সৌন্দর্য, শত শত পাখির, ওড়াওড়ি, সুবজ গাছপালার সমারোহ আর গ্রামের সাধারণ মানুষ, বন্ধু-বান্ধব, পাড়াপ্রতিবেশীদের সীমাহীন ভালোবাসার মধ্যে যে বেড়ে উঠেছিলাম, তা মনে হলেই বুকটা আনন্দের অনুভূতিতে ভরে যায়। আমার হাতেখড়ি হয়েছিল ঘটা করে, আমাদের তিন পুরুষের শিক্ষক বীরেন্দ্র কৃষ্ণ গুহর কাছে। এই প্রবীণ শিক্ষক বীরেন্দ্র মাস্টার ছিলেন আমার দাদা ও বাবা-কাকাদের প্রাইমারি স্কুলের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক। ওই শিক্ষকের বয়স যখন প্রায় ৯০ বছর, তার হাতেই আমার হাতেখড়ির ব্যবস্থা করেছিলেন আমার বাবা। তারপর গ্রামের প্রাইমারি স্কুলেই পড়েছি। লেখাপড়ায় ভালোই ছিলাম। তাই পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার জন্য মনোনীত হয়েছিলাম অনায়াসেই। পরীক্ষা দিলেও বৃত্তি আমি পাইনি। সেই বছর আমাদের স্কুল থেকে আমার দুই সহপাঠী বৃত্তি পেয়েছিল, একজন রাজেন রায়, অন্যজন প্রফুল্ল বিশ্বাস। ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পর ক্লাসে প্রথম স্থানটি আমার প্রায় পাকা হয়ে গিয়েছিল। এই সময় স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলাম। ‘দুই বিঘা জমি’র উপেনের সঙ্গে ওই যে আমার আত্মার যোগ ঘটে গিয়েছিল, সারা জীবনে তা আর ছিন্ন হয়নি। জীবনের বেশিরভাগ সময়ই উপেনদের খোঁজখবর করতেই কেটে গেল। ‘দুই বিঘা জমি’র দুটি লাইন যেন সারা জীবনের তিক্ত উপলব্ধির মর্মবেদনাকে মনের ভেতর গেঁথে দিয়েছিলÑ
‘এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি।
রাজার হস্ত, করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।’
খেলাধুলায় আমি কখনোই ভালো ছিলাম না। তবে ফুটবল, হাডুডু, ভলিবল ও দাঁড়িয়াবান্দা মাঝে মাঝে খেলেছি। বই পড়ায় আনন্দ পেতাম। স্কুলের পাঠাগার থেকে বাড়িতে বই নিয়ে পড়তাম প্রায় নিয়মিত। বাড়িতে বাবার সংগ্রহে একখানি সঞ্চয়িতা ছিল। তা থেকে রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়তাম। স্কুল লাইব্রেরি থেকে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার বই ‘অগ্নিবীণা’, ‘ব্যথার দান’সহ অন্য কয়েকটি বই এনে পড়েছি স্কুলের ছাত্রাবস্থায়। শরৎচন্দ্রের উপন্যাস ‘বড়দি’, ‘মেজদি’, ‘ছোড়দি’, ‘বিরাজ বউ’, ‘পরিণীতা’, ‘গৃহদাহ’, ‘দেবদাস’ সে সময়ই পড়েছি। প্রাতঃস্মরণীয় মানুষের জীবনী পড়ায় প্রচ- আগ্রহ ছিল। হাজী মুহম্মদ মুহসীন, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আল্লামা ইকবাল, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সংক্ষিপ্ত জীবন পরিচয় সংবলিত লেখা পড়ে তখন বেশ অনুপ্রাণিত হয়েছি। এক সময় নেতাজী সুভাষ বসু ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস সম্পর্কে কিছু জানার ও পড়ার সুযোগ হয়েছিল। সুভাষ বসুর জীবনী পড়ে বেশ রোমাঞ্চিত বোধ করেছি। তার ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ গঠনের বিষয়টি আমাকে এতই উদ্দীপ্ত ও প্রাণিত করেছিল যে, আরও বেশি জানার আগ্রহে বই পেতে তৎকালীন ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনের ঢাকা অফিসে একটি চিঠি লিখেছিলাম। আমি তখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। কিছুদিন পর আমাকে অবাক করে দিয়ে গ্রামের বাড়ির ঠিকানায় ডাকযোগে আমার কাছে সুভাষ বসু সম্পর্কিত ৩ খানা বই ২/৩ খানা ছবি পৌঁছে গেল। একখানা বইয়ের নাম ছিল ‘জয়তু নেতাজী’। ছবিগুলির মধ্যে একখানায় ছিল নেতাজী সুভাষ বসুকে দেখা যাচ্ছে ঘোড়ার পিঠে চড়ে কংগ্রেস স্বেচ্ছাসেবকদের অধিনায়কের দায়িত্ব পালনে রত।
স্কুলে পড়ার সময় আবৃত্তির প্রতি আগ্রহ থাকলেও তার চর্চার তেমন কোনো সুযোগ ছিল না। নাটকের প্রতিও আমার প্রবল আগ্রহ ছিল। কিন্তু বাবার অনুমতি না থাকায় নাটক থিয়েটার নিয়ে তেমন মাতামাতি করার অবকাশ মেলেনি। তবে স্কুলে পড়ার সময় এক-দু’বার নাটকে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছি। বলাই বাহুল্য, বাবার সতর্ক দৃষ্টি এড়িয়ে তা করতে হয়েছে। বাবার এক ছাত্র আনোয়ারুল কাদির তরুণদের এক ক্লাব গড়ে তুলেছিলেন। তারা মাঝে মাঝে খেলাধুলার প্রতিযোগিতা, নাটক মঞ্চায়নের ব্যবস্থা করত। এর জন্য গ্রামের বাজারে চাঁদা তোলা হতো। নাটকের দর্শক ভালোই হতো। একবার স্কুলে কী উপলক্ষে ‘বিরোধ’ নামের একটি নাটক মঞ্চস্থ হয়। এই নাটকে আমি গ্রাম্য মাতব্বরের ছেলের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলাম। আমার বিপরীতে দুই ক্লাস নিচের একটি ছেলে, নাম সম্ভবত শম্ভু, মেয়ে সেজে অভিনয় করেছিল। অভিনয় করার জন্য তখন মেয়ে পাওয়া যেত না। এমনকি পেশাদার যাত্রার দলেও ছেলেদের দিয়ে মেয়েদের অভিনয় করানো হতো। ওই নাটকে আমার সহপাঠী জয়নাল, বারেক, আউয়াল, রমেশসহ কয়েকজন অভিনয় করেছিল। এর নির্দেশনায় ছিলেন ওই অঞ্চলের একমাত্র নাট্যগুরু নগেন সাধু। তাকে আমি নগেন কাকা বলতাম। কারণ, তিনি ছিলেন আমার সহপাঠী নৃপেন হালদারের বাবা। 
মাধ্যমিক শিক্ষার শুরু সাপলেজা হাইস্কুলে। এই স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন বাংলার মজিবর রহমান, আশুতোষ রায়, গোপাল কৃষ্ণ গুহ প্রমুখ। এরপর মঠবাড়িয়া কে এম লতিফ ইনস্টিটিউশনে পড়েছি। হেড মাস্টার ছিলেন স্বনামধন্য ইমাদুল হক স্যার। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক সৈয়দ নাজমুল হকের পিতা। এছাড়া ছিলেন ইয়াকুব আলী স্যার, মোখলেসুর রহমান, নূর মোহাম্মদ, মণীন্দ্র বাবু, অঙ্কের সামসুল হক স্যার এবং বাংলার কবি স্যার আহম্মদ আলী মল্লিক। এরপর কুমিল্লার (এখন চাঁদপুর জেলা) মতলবগঞ্জ জেবি মল্টিলেটেরাল হাইস্কুলে পড়াশুনা করেছি। ১৯৬৩ সালে এই মতলব হাইস্কুল থেকেই প্রথম বিভাগে পাস করেছিলাম। ওই বছর আমাদের স্কুল থেকে আমার দুই সহপাঠী বোর্ডে দ্বিতীয় ও অষ্টম স্থান অধিকার করেছিল। একজন জগদ্বন্ধু কুণ্ডুু, সে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছিল। অন্যজন আফতাব, সে হয়েছিল অষ্টম ।

ছাত্র আন্দোলনে সম্পৃক্ততা
আমাদের প্রিটেস্ট পরীক্ষা শুরু হওয়ার কদিন পরই ১৯৬২ সালের আইয়ুববিরোধী শিক্ষা আন্দোলন শুরু হয়। ঢাকায় সেপ্টেম্বর মাসে আন্দোলনে ওয়াজিউল্লাহসহ কয়েকজন ছাত্র গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। এই খবরে দেশব্যাপী তুমুল ছাত্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মতলব স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও এই বিক্ষোভে শামিল হলো। আমিও সেই আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করি। আমাদের স্কুলে এই আন্দোলনের পুরোভাগে যে কয়জন ছাত্র ছিল, তাদের মধ্যে মফিজ ও খালেকুজ্জামানের কথা বেশ মনে পড়ছে। খালেকুজ্জামান পরবর্তী সময় সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে যায়। খালেকুজ্জামান এখন বাসদ ও বাম আন্দোলনের একজন নেতা। ওই সময় আমাদের আন্দোলনে কয়েকজন শিক্ষকেরও সক্রিয় সমর্থন ছিল। তাদের মধ্যে মোসলেম স্যারের কথা বেশ মনে পড়ছে। মতলব স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে প্রধান শিক্ষক ওয়ালি উল্লাহ পাটোয়ারী স্যার, প্রসন্ন স্যার, যিনি ইংরেজি পড়াতেন, বাংলার শিক্ষক রঙ্গলাল স্যার, অঙ্কের শিক্ষক মোহাম্মদ আলী স্যার, চাঁদ মিয়া স্যার, হোস্টেল সুপার সিরাজ স্যারের কথা বেশ মনে আছে। শিক্ষক ও মানুষ হিসেবে এরা প্রত্যেকেই ছিলেন অতুলনীয়।
    মতলবগঞ্জ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক বা এসএসসি পাস করার পর ঢাকা কলেজে ভর্তি হলাম। কৃতী ছাত্রদের ঢাকার সুখ্যাত দুই কলেজে ভর্তি হবার সময় এলেন স্বয়ং আমাদের শ্রদ্ধেয় প্রধান শিক্ষক ওয়ালি উল্লাহ পাটোয়ারী। পাটোয়ারী স্যার শুধু প্রধান শিক্ষক হিসেবেই সুফল ও সুখ্যাত ছিলেন তা নয়, ঢাকা কলেজ, নটর ডেম কলেজসহ ঢাকার উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অধ্যক্ষ-অধ্যাপকদের সঙ্গে তার নিবিড় যোগাযোগ ছিল। এদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন তার প্রাক্তন ছাত্র।
   ঢাকা কলেজে ভর্তিপ্রক্রিয়া শেষে তিনি আমাদের নিয়ে গেলেন কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ জালাল উদ্দিন স্যারের কক্ষে পরিচয় করিয়ে দিতে। তার পরে আরও কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষকের সঙ্গেও পরিচয় করিয়েছিলেন। ঢাকা কলেজে এসে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক আরও নিবিড় হলো। ঢাকা কলেজে তখন ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগের নামে কোনো সাংগঠনিক তৎপরতা চালানো ছিল নিষিদ্ধ। তবে কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচন হতো। ‘অগ্রদূত’ ‘অগ্রগামী’ ইত্যাদি নামে ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা নির্বাচনী প্যানেল বানিয়ে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হতো। মুন্সীগঞ্জে আজিজুর রহমানকে ভিপি প্রার্থী করে আমরা সম্ভবত ‘অগ্রগামী’ নাম দিয়ে ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচনী প্যানেল তৈরি করেছিলাম। সেবার ছাত্র সংসদ নির্বাচনে আজিজ ভাই (ভিপি প্রার্থী) সহ অধিকাংশ আসনে ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থীরা এবং সাধারণ সম্পাদক পদে ছাত্রলীগের প্রার্থী জয়ী হয়েছিল। আমাদের প্যানেলের পক্ষে প্রচার অভিযান চালিয়ে ঢাকা কলেজের ছাত্র ভোটারদের মন জয় করতে একটি শক্তিশালী প্রচার টিম গঠিত হয়েছিল। আমি এই টিমে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছিলাম।
   ঢাকা কলেজে আইএসসিতে ভর্তি হয়েছিলাম, কিন্তু অতিমাত্রায় আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ায় নিয়মিত ক্লাস, প্র্যাকটিক্যাল কার্যত  ডকে উঠল। এর ওপর পরীক্ষার ঠিক মাস খানেক আগে জলবসন্তে আক্রান্ত হয়ে হোস্টেল ছেড়ে বাড়িতে চলে গেলাম। শেষ পর্যন্ত ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা আর দেয়া হলো না। পরে আইএসসি ছেড়ে আইএ পরীক্ষা দিলাম। স্বল্প প্রস্তুতিতে পরীক্ষা দিতে হয়েছিল, তবু ভালোভাবেই দ্বিতীয় বিভাগে পাস করলাম।
ঢাকা কলেজে যাদের শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম তাদের মধ্যে বাংলা বিভাগে হিশামুদ্দিন স্যার, আশরাফ সিদ্দিকী, রওশন আরা রহমান, নজিবর রহমান, কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমানের কথা বেশ মনে পড়ছে। ইংরেজি বিভাগে ছিলেন নোমান স্যার, মনজুরে মাওলা, বাহাউদ্দিন স্যার, রেজাউর রহমান প্রমুখ। 
গভীর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণেই আমার আনুষ্ঠানিক পড়াশুনা ব্যাহত হলো। ঢাকা কলেজ ছাড়ার পর থেকেই বাবার সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হতে লাগল। একপর্যায়ে যোগাযোগই প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। আমার বাবা ব্যক্তি হিসেবে সৎ ও ধার্মিক ছিলেন। তার ধর্মপরায়ণতা কখনো সম্প্রদায়িকতায় রূপ নেয়নি, তবে পারিবারিক অনুশাসনে তিনি ছিলেন একান্তই রক্ষণশীল ও একনায়কতান্ত্রিক। পরিবারে তার সিদ্ধান্তই ছিল শেষ কথা। প্রগতিশীল বাম রাজনীতির সঙ্গে আমার সাম্পৃক্ততা কোনোভাবেই তার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। আমিও আমার আদর্শিক অবস্থান ওই বয়সেও পরিত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিলাম না। ফলে যা হবার তা-ই হলো। পিতা-পুত্রের বিচ্ছেদ অনিবার্য হয়ে উঠল।
মার্ক্সীয় রাজনীতির চর্চা, অনুশীলন তেমন একটা ব্যাহত না হলেও উচ্চতর শিক্ষা কয়েক বছরের জন্য শিকেয় উঠল। অবশেষে কয়েক বছরের বিরতির পর আবদুল্লাহ-হীল-বাকীর (কানাডা-প্রবাসী) উৎসাহ ও সহযোগিতায় স্বল্প প্রস্তুতিতে প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় বিভাগে বিএ পাস করলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সর্বোচ্চ নম্বর পেলাম ইংরেজিতে। তাই ঠিক করলাম, মাস্টার্স করার জন্য ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হব। কিন্তু কয়েক বছরের ব্রেক থাকায় মাস্টার্সে ভর্তি নিয়ে সন্দেহ ছিল। পার্টি নেতা মেনন ভাই শোনার পর আমাকে একদিন ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর বাসায় নিয়ে গেলেন। স্যারকে বললেন, আমি ইংরেজিতে ভর্তি হতে চাই, সমস্যাটিও বললেন। কবীর স্যার আমার ভর্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। ইংরেজি বিভাগে আমার শিক্ষকদের মধ্যে কয়েকজন স্বনামখ্যাত অধ্যাপক ছিলেনÑঅধ্যাপক কবীর চৌধুরী, ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক কে এম. মুনীম, রাজিয়া খান আমিন, নাদেরা বেগম, নিয়াজ জামান, ইনারী হোসেন প্রমুখ।

ফাতেমা জিন্নাহর নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণ
১৯৬৪ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী গণতন্ত্রের  আন্দোলন নতুন মাত্র পেল। তৎকালীন পাকিস্তানের বিরোধী দলগুলো সেনা শাসক জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুবের বিরুদ্ধে একক বিরোধীদলীয় প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর একমাত্র ভগ্নি ফাতেমা জিন্নাহকে মনোনীত করল। সম্মিলিত বিরোধী জোট (ঈড়সনরহবফ ঙঢ়ঢ়ড়ংরঃরড়হ চধৎঃরবং) কপ-র শরিক দলগুলির মধ্যে ছিল আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), খাজা নাজিম উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কাউন্সিল মুসলিম লীগ, চৌধুরী মোহাম্মদ আলী-মৌলবী ফরিদ আহমেদের নেতৃত্বাধীন নেজামে ইসলাম ইত্যাদি। এই জোটে মওদুদীর জামায়াতে ইসলামীও ছিল।
আইয়ুববিরোধী প্রার্থী হিসেবে ফাতেমা জিন্নাহর জনপ্রিয়তা পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব বাংলায় বেশি ছিল। আইয়ুববিরোধী নির্বাচনী প্রচারে ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল। আর এক্ষেত্রে অবিভক্ত ছাত্র ইউনিয়ন ও পূর্ব পকিস্তান ছাত্রলীগই ছিল অগ্রভাগে। আমি ওই সময় পিরোজপুরে ছিলাম। নির্বাচনী প্রচার চলাকালে আমি পিরোজপুর মহকুমার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়ন সফরকারী টিমে ছিলাম। এ সময় মাসব্যাপী প্রায় প্রতিদিন দু-তিনটি সভায় আমাদের প্রচারমূলক বক্তৃতা দিতে হতো।
বলাই বাহুল্য, আইয়ুবের তথাকথিত মৌলিক গণতন্ত্রভিত্তিক এই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সাধারণ মানুষ সরাসরি ভোট দেবার অধিকারী ছিল না। সাধারণ ভোটারদের ভোটে নির্বাচিত পাকিস্তানের দুই অংশের (প্রদেশের) মোট ৮০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রী অর্থাৎ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরাই শুধু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৬২ সালে মিলিটারি ডিক্টেটর জেনারেল আইয়ুব সামরিক ফরমানবলে ১৯৫৬ সালের সংবিধান বাতিল করে যে ফরমায়েসি সংবিধান জারি করেছিলেন, তার অভিনব বিধান ছিল মৌলিক গণতন্ত্র।
অতএব আমরা আমাদের প্রচারে সাধারণ মানুষকে এভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিলাম, যেন তারা তাদের হারানো ভোটাধিকার ফিরে পেতে বিরোধী প্রার্থীর পক্ষে রায় দেন। আর এটাও আমরা নিশ্চিত করতে চেষ্টা করেছি যে, তারা যেন ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে প্রার্থীদের কাছ থেকে ভোটের আগেই এই মর্মে প্রতিশ্রুতি আদায় করেন যে, তারা নির্বাচিত হলে সম্মিলিত বিরোধী জোটের প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহকে  ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবেন। আমাদের এই প্রচারে বিপুল সাড়া পড়েছিল। অধিকাংশ প্রার্থীর ক্ষেত্রেই এই কৌশল কার্যকর হয়েছিল। যারা প্রকাশ্যে ফাতামো জিন্নাহকে নির্বাচনে সমর্থন করবেন বলে ওয়াদা করেছিলেন, তারাই নির্বাচিত হয়েছিলেন।
কিন্তু ১৯৬৫ সালের ২ জানুয়ারি যেদিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো, সেদিনই মানুষ স্পষ্ট দেখতে পেল এটা প্রহসনের নির্বাচন। ফলাফল থেকে আরও পরিষ্কার হয়ে গেল, এই মৌলিক গণতন্ত্রীদের রাতের অন্ধকারে আইয়ুব-মোনায়েমের লোকেরা অর্থ দিয়ে কিনে নিয়েছিল। তাই ওদের অধিকাংশই জনগণের সঙ্গে বেইমানি করেছে।
তা সত্ত্বেও পূর্ব বাংলার ৪০ হাজার ভোটের মধ্যে ফাতেমা জিন্নাহ পেয়েছিলেন যত দূর মনে পড়ছে ১৯ হাজার ভোট আর আইয়ুবের গোলাপ ফুল মার্কার পক্ষে পড়েছিল ২১ হাজার । অর্থাৎ মৌলিক গণতন্ত্রীদের মধ্যে প্রায় ৪৩ ভাগ নির্লোভ ও সৎ অবস্থানে থেকে সম্মিলিত বিরোধীদলীয় প্রার্থীকে ভোট প্রদান করেছিলেন। সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই সাফল্য খুব সামান্য ছিল না।
১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ৬ তারিখে কাশ্মীর বিরোধকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান-ভারতের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যায়। ১৭ দিন স্থায়ী এই যুদ্ধে পাকিস্তানের রাজনীতির দৃশ্যপটে বড় ধরনের ওলট-পালট ঘটে গেল। জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে ১৭ দিন পরে উভয় দেশ যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। এর পরে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী আলেক্সি কোসিগিনের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত হয় পাকিস্তান-ভারতের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের সমঝোতা বৈঠক। এই সমঝোতা বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দে। সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রীর সফল দূতিয়ালির মধ্য দিয়ে ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের মধ্যে আলোচনার পর স্বাক্ষরিত হলো শান্তিচুক্তি। শান্তিচুক্তির পরে উভয় দেশের সেনাবাহিনী যুদ্ধ-পূর্ববর্তী সীমান্তরেখা বরাবর সরে গেল। উভয় দেশই যুদ্ধবন্দীদের নিঃশর্ত মুক্তি দিল। ব্যবসা-বাণিজ্য, দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা হলো। তবে পাকিস্তানে যুদ্ধ শুরুর অজুহাতে যে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল, তা বলবৎ রাখা হলো। যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সরকার দেশরক্ষা আইনের জরুরি বিধির অধীনে যে শত্রু সম্পত্তি আইন কার্যকর করেছিল, যার আওতায় সংখ্যালঘুদের বিশেষত হিন্দু সম্প্রদায়ের নাগরিকদের বাড়ি-ঘর ও অন্যান্য সহায় সম্পদ ‘শত্রু সম্পত্তি’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার নিবর্তনমূলক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল এই প্রদেশে অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানে, তাও অব্যাহত থাকল।
উপমহাদেশের এমনতর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ১৯৬৬ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ তার ৬-দফা দাবি উত্থাপন করে। ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার তাসখন্দ চুক্তি স্বাক্ষরিত হবার পর লাহোরে কপভুক্ত পাকিস্তানের  তৎকালীন প্রধান বিরোধী দলগুলোর এক যৌথ সভা বসল। এই সভায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাজউদ্দীন আহমদ যোগদান করেন। সেখানে শেখ সাহেব পূর্ব বাংলার জন্য ৬-দফা সম্বলিত স্বায়ত্তশাসনের দাবি উত্থাপন করেন। স্বভাবতই পশ্চিম পাকিস্তানের সামন্ত প্রভু ও একচেটিয়া পুঁজিপতিদের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দ এই ৬-দফা স্বায়ত্তশাসনের দাবির প্রতি গুরুত্ব দিতে অস্বীকার করলেন।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের কাছে ৬-দফার ব্যাপারে পশ্চিম পাকিস্তানিদের এই প্রতিক্রিয়া যে অপ্রত্যাশিত ছিল, তা নয়। লাহোরের সম্মেলন থেকে ফিরে এসে আওয়ামী লীগ এককভাবেই ৬-দফা দাবির প্রতি ব্যাপক জনমত গঠনের জন্য মাঠে নেমে পড়ে। তার আগে ঢাকার মতিঝিলে ইডেন হোটেল প্রাঙ্গণে প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিল সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। সেখান থেকে ৬-দফা দাবিতে ব্যাপক প্রচারাভিযানের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হলো।
 সম্মেলন পরবর্তী সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা সফরের মাধ্যমে বিশাল বিশাল জনসভা করে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুমোদিত ৬-দফার পক্ষে জনসমর্থন প্রদর্শনের ব্যাপক আয়োজন চলতে লাগল। এর পাশাপাশি চলল ৬-দফার অনুকূলে জনপ্রিয় দৈনিক ইত্তেফাকের প্রচার। ইত্তেফাক সম্পাদক মানিক মিয়ার মোসাফির ছদ্মনামে লেখা রাজনৈতিক কলামে ৬-দফা দাবির সপক্ষে দেয়া যৌক্তিক ও জোরাল ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দ্রুত দেশের সচেতন জনগণের ব্যাপক থেকে  ব্যাপকতর অংশকে ৬ দফার অনুকূলে উদ্বুদ্ধ করতে লাগল। ফলে ৬ দফা মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত বাঙালিদের সর্বাধিক জনপ্রিয় দাবিতে পরিণত হলো। 
কিছুদিনের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ আওয়ামী লীগের প্রথম সারির অধিকাংশ নেতাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে রাজনৈতিক নিরাপত্তা আইনে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারারুদ্ধ করে। গভর্নর মোনেম খানের প্রাদেশিক সরকার ক্রমাগত হার্ড লাইন নেবার পথে ধাবিত হতে থাকে । ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান পূর্ব বাংলা সফরে এসে যুক্তির ভাষার পরিবর্তে অস্ত্রের ভাষা প্রয়োগের হুমকি দিলেন।
‘৬৬ সালের ৭ জুন আওয়ামী লীগ ৬-দফার সপক্ষে সমর্থন এবং রাজবন্দীদের মুক্তির দাবিতে সর্বাত্মক হরতালের ডাক দেয়। স্বতঃস্ফূর্তভাবে  জনগণ এই হরতাল পালন করে। পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ হয় ঢাকার তেজগাঁও, নারায়ণগঞ্জ, খুলনার খালিশপুরসহ অনেক স্থানে। পুলিশের গুলিতে শহীদ হন আনোয়ারা বেগম, মনু মিয়াসহ কয়েকজন। ৭ জুনের পরে মিজানুর রহমান চৌধুরীসহ বাইরে থাকা দলের অনেক নেতা-কর্মী কারারুদ্ধ হলেন। তার কিছুদিন পর গভর্নর মোনেম খানের প্রাদেশিক সরকার  এক নির্বাহী আদেশে সম্পূর্ণ বেআইনি পন্থায় সে সময়ের সর্বাধিক জনপ্রিয় ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এর প্রকাশনা বন্ধ এবং এর প্রেসের দরজায় তালা লাগিয়ে দেয়। এতেও সন্তুষ্ট থাকতে পারল না তারা। গভীর রাতে ‘ইত্তেফাক’  সম্পাদক, জনপ্রিয় মোসাফির কলামের লেখক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে নিরাপত্তা আইনে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারাবন্দী করা হলো। ৭ জুন, ১৯৬৬ আওয়ামী লীগের ডাকা হরতালে ব্যাপক জনগণ বিশেষভাবে নগর ও শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা অভূতপূর্ব সংগ্রামী উদ্দীপনা নিয়ে সাড়া দিয়েছিলেন। তবে ৭ জুনের পর ব্যাপক দমনপীড়নের কারণে এই আন্দোলন অনেকটা স্তিমিত হয়ে পড়ে।
একই সময় মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাপ, শ্রমিক এলাকাগুলোতে শ্রমিক নেতৃবৃন্দ এবং ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন), ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) প্রভৃতি সংগঠন রাজবন্দীদের মুক্তি, খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর উচ্চমূল্য প্রতিরোধ, গণমুখী শিক্ষা প্রভৃতি দাবিতে কখনো একক, কখনো সম্মিলিত আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচি  ঘোষণা ও পালন করে চলেছিল। এ সময় উভয় ন্যাপ, ছাত্র ইউনিয়ন, কমিউনিস্ট পার্টির অনেক নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন। অনেক বাম ও কমিউনিস্ট নেতা বহু বছর ধরে কারারুদ্ধ ছিলেন রাজবন্দী হিসেবে। এদের মধ্যে যাদের কথা মনে পড়ছে তারা হচ্ছেন যশোরের অমল সেন, খুলনার বিষ্ণু চ্যাটার্জী, রতন সেন, মাদারীপুরের সন্তোষ ব্যানার্জী, রাজবাড়ীর সমর সিং, আশু ভরদ্বাজ, রংপুরের মনি কৃষ্ণ সেন এবং আরও অনেকে। সাংবাদিক সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্তসহ অনেক বাম বুদ্ধিজীবীও দীর্ঘ সময় কারারুদ্ধ ছিলেন।

শ্রমিক আন্দোলনের কাজে খুলনায়
১৯৬৬ সালের শেষার্ধে আমি খুলনা চলে আসি। তার আগে আমি পিরোজপুরে সংগঠনের কাজ করেছি। আসার মূল কারণ ছিল খুলনার শিল্পাঞ্চলসমূহ অর্থাৎ খালিশপুর, দৌলতপুর এলাকার পাটকল, বিভিন্ন ম্যাচ ফ্যাক্টরি, নিউজপ্রিন্ট মিল ইত্যাদিতে কর্মরত শিল্প শ্রমিকদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং সেখানে সংগঠন-আন্দোলনের ক্ষেত্র খুঁজে তার সঙ্গে নিজকে যুক্ত করা। ইতিমধ্যে মার্ক্সবাদী সাহিত্যের যে সব বই পড়তে পেরেছি (গোপন  ছাপাখানায় মুদ্রিত), তাতে খুব উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত ছিলাম। সেই প্রেরণা নিয়েই কত দ্রুত শ্রমিক শ্রেণির সংগঠনে কাজ করার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারব, তা নিয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনার অন্ত ছিল না। খুলনায় এই সুযোগ হবে, এমন ভাবনা থেকে সেখানে চলে যাবার সিদ্ধান্ত। কিন্তু যাবার পরে অনুভব করলাম প্রথমেই আমার দরকার একটি চাকরি। নিজেকে টিকিয়ে রাখতে ন্যূনতম রোজগারের একটি ভিত্তি থাকা চাই। তার জন্য চাকরি খুঁজতে লাগলাম।
আমার কয়েকজন বন্ধু মিলে আমার জন্য দুটি প্রাইভেট টিউশনি জোগাড় করে দিল। অন্যতম বন্ধু শহীদুল আলম নিরু খুলনায় ছাত্র ইউনিয়ন  মেননের নেতা। সে একটি মেসে থাকার ব্যবস্থাও করে দিল। এভাবেই শুরু হলো খুলনার রাজনৈতিক জীবন। কয়েক সপ্তাহ পর স্থানীয় একটি পত্রিকায় রিপোর্টার নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেখে সেখানে হাজির হলাম। খুলনার ডাকবাংলার পাশেই ফাতেমা বিল্ডিংয়ে অবস্থিত সাপ্তাহিক ‘দেশের ডাক’ পত্রিকার অফিস। দরখাস্ত নিয়ে ব্যবস্থাপনা সম্পাদক রফিজার রহমানের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি যথারীতি ইন্টারভিউ নিয়ে অস্থায়ী ভিত্তিতে পরের দিন থেকেই কাজে যোগদানের ব্যবস্থা করে দিলেন। সম্পাদক লুৎফর রহমান জাহাঙ্গীরের (লুরজা) সঙ্গে পরিচয় হলো। আমার কাজ তারও পছন্দ হলো। প্রায় দুবছর সেখানে কাজ করেছি। বলা যায়, কাজ শিখেছি। জাহাঙ্গীর ভাই আমাকে সস্নেহে কাজ শিখিয়েছেন, করিয়েছেন এবং যথেষ্ট ভালোবাসা দিয়েছেন। তিনি ছিলেন তৎকালীন ‘পাকিস্তান অবজারভার’-এর খুলনা ব্যুরো চিফ। আর রফিজার রহমান তারই সহোদর, ছিলেন ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এর খুলনা ব্যুরো চিফ। দুজনই খুলনার সাংবাদিক মহলে পরিচিত ছিলেন, প্রভাবও ছিল। উভয়ই আমাকে স্নেহ-সহানুভূতি-ভালোবাসা দিয়ে সাংবাদিকতায় পেশাগত দক্ষতা অর্জনে নানাভাবে সাহায্য করেছেন। আজ তারা দুজনই প্রয়াত, কিন্তু তাদের ঋণ ভোলার নয়। কাজ করার সুবাদে জাহাঙ্গীর ভাইর পরিবারের সঙ্গেও অনেক ঘনিষ্ঠ হয়েছিলাম। তাদের সর্বকনিষ্ঠ দুভাই মঞ্জি, মনি ছিল আমার পরম স্নেহের পাত্র।
সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের প্রধান দুই পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও গণচীনের কমিউনিস্ট নেতৃত্বের মধ্যকার আদর্শিক বিরোধগুলো ষাটের দশকের শুরু থেকেই প্রকাশ্যে চলে আসতে শুরু করে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে তৃতীয় বিশ্বের কমিউনিস্ট পার্টি ও তাদের আদর্শিক অনুসারী গণসংগঠনগুলোতে। দ্রুত ভাগ হয়ে যেতে থাকে অনেক দিনের ঐতিহ্যবাহী সংগঠনগুলো। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির বিভক্তির কারণে ১৯৬৪ সালেই গঠিত হলো ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী)। কমরেড মুজাফ্ফর আহমদ, বিটি রনদিভে, ইএমএস না¤ু^দিরিপাদ, পি সুন্দারাইয়া, এ কে গোপালন, জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্ত, বাসবপুন্নাইয়া, হরে কৃষ্ণ কোঙার, আব্দুল্লা রসুল প্রমুখের নেতৃত্বে। সি পি আইয়ের সঙ্গে থেকে গেলেন এস এ ডাঙ্গে, রাজ্যেশ্বর রাও, বিশ্বনাথ মুখার্জী, ড. রণেন সেন, অধ্যাপক হীরেন মুখার্জী, ইলা মিত্র, ভূপেশ গুপ্ত প্রমুখ।
পূর্ব বাংলার আন্ডার গ্রাউন্ড কমিউনিস্ট পার্টি দ্রুত ভাঙনের পথে ধাবিত হলো। তাত্ত্বিক বিরোধ-বিতর্ক চলতে লাগল। প্রথম ভাঙল ছাত্র আন্দোলনের প্রধান দুর্গ পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন। গঠিত হলো ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন), ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) নামের দুটি সংগঠন।
আমি খুলনার উভয় গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে সখ্য, বন্ধুত্বের সম্পর্ক রক্ষা করে চলার পথ নিলাম। ছাত্র সংগঠনে আবেগতাড়িত তাত্ত্বিক বিতর্কের ঝড় ছিল সবচেয়ে প্রবল। আমি ছাত্র সংগঠনের কাজের সঙ্গে ততটা নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়া থেকে বিরত থাকলাম। পত্রিকায় কাজ করার পাশাপাশি রাজনৈতিক-সাংগঠনিক কাজের সময় বের করে ছুটে যেতাম শ্রমিক এলাকায়।
ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন)-এর নেতা শহিদুল আলম নিরু ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়ে সার্বক্ষণিক সংগঠক হিসেবে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে সম্পৃক্ত হবার সিদ্ধান্ত নিল। সে বেশিরভাগ সময় আফিল জুট মিল ও তার পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চলে পড়ে থাকত। আমি সময় পেলে তার সঙ্গে ওই এলাকায় যেতাম। শ্রমিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা লাভ ও বাস্তব ক্ষেত্রে দক্ষ শ্রমিক আন্দোলনের কর্মী-সংগঠক হয়ে ওঠাই ছিল আমার এই যাওয়া-আসার মূল লক্ষ্য।
এর মধ্যে একদিন পাবনার ঈশ্বরদীর প্রখ্যাত রেল শ্রমিকনেতা জসীম ম-ল ও ফরিদপুরের কমিউনিস্ট নেতা মোখলেসুর রহমান এলেন খুলনায় এক রেলের সভা উপলক্ষে। তারা সরাসরি আমার আস্তানায় এসে হাজির হলেন। আমি তখন ফেরদৌস ভাইয়ের ছোট ভাই আমজাদ ভাইর কেডি ঘোষ রোডে ইস্টার্ন প্রেসের ওপর এক কামরার একটি ঘরে থাকি। জসীম ভাই-মোখলেস ভাই আমাকে  পাকড়াও করে নিয়ে গেলেন রেল শ্রমিকদের ওই সভায়। তারা রেল শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন ইপরেল (ঊচজঊখ)-এ আমাকে সম্পৃক্ত করার যাবতীয় ব্যবস্থা করলেন। আমাকে এ কাজে যুক্ত করতে যা করা প্রয়োজন, সবই করলেন। এর পর থেকে আমার শ্রমিক আন্দোলনের কাজের আর একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠল রেল শ্রমিকদের এলাকা। খুলনা, বাগেরহাট, ঈশ্বরদী, পোড়াদহ, রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া ইত্যাদি নানা স্থানে বৈঠকে এ সময় যোগদান করেছি ও কিছু নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করেছি। 

কমিউনিস্ট পার্টিতে বিভক্তি
১৯৬৬ সালে আত্মগোপনে থাকা (ঁহফবৎ মৎড়ঁহফ) পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি আনুষ্ঠানিক বিভক্ত হয়ে যায়। আদর্শিক নানা ইস্যুতে তাত্ত্বিক বিতর্ক চলেছে বেশ কিছুদিন। গোপনে সেই সব বিতর্কের তাত্ত্বিক দলিল নিয়ে পার্টির সদস্যদের নানা সভা হতো। আমি তখনও পার্টির পূর্ণ সদস্যপদ পাইনি। তা সত্ত্বেও একাধিক গোপন বৈঠকে আমার উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টির উভয় অংশের শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতা এসব সভায় উপস্থিত থাকতেন। এদের মধ্যে ছিলেন সুখেন্দু দস্তিদার, খোকা রায়, আবদুল হক প্রমুখ। কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার সদস্যদের কাছে বশীর ভাই বলে পরিচিত ছিলেন। এটি ছিল তার আত্মগোপনের টেক নাম।
কমিউনিস্ট পার্টির ভাঙন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-এর ভাঙনকে ত্বরান্বিত করল। ন্যাপের সৃষ্টি থেকেই কমিউনিস্ট কর্মীরা তাদের প্রকাশ্য রাজনৈতিক প্লাটফরম হিসেবে একে ব্যবহার করে এসেছেন। কমিউনিস্ট পার্টি পাকিস্তানে বেআইনি ঘোষিত হবার পর প্রথমে আওয়ামী লীগ এবং ’৫৭ সাল থেকে ন্যাপ ছিল কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক ফ্রন্ট। তাই প্রগতিশীল কর্মীদের মধ্যে মস্কো-পিকিং আদর্শগত লাইনের বিরোধকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা চলেছিল, তাতে সবাই ভাবছিলেন ন্যাপের ভাঙন অনিবার্য। বিষয়টি ছিল সময়ের ব্যাপার। তবে ন্যাপের ঘোষিত রাজনৈতিক বিতর্কে কমিউনিস্ট পার্টির তাত্ত্বিক আদর্শগত বিষয়গুলো মুখ্য ইস্যু হিসেবে সামনে আসার পরিবর্তে বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল চলমান জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যুগুলো। বিশেষভাবে সামনে চলে এল পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি, আওয়ামী লীগ ঘোষিত ৬-দফার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব ও তার বশংবদ মোনেম সরকারের বিরোধিতা কতটা কঠোর বা নমনীয় হবে, এসব বিষয়। গণতন্ত্রের দাবি, রাজবন্দীদের মুক্তি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য রোধ, পাট-আখের ন্যায্যমূল্যসহ কৃষকদের অন্যান্য দাবি, গ্রাম-নগরের দরিদ্রদের জন্য পূর্ণ রেশন চালুর দাবি ইত্যাদিও ছিল। এর সঙ্গে ছিল কার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতর আদর্শগত নৈকট্য গুরুত্ব পাবেÑসোভিয়েত ইউনিয়ন না গণচীন, এই প্রশ্নটি।
ন্যাপের একাংশ  আওয়ামী লীগের ৬-দফা দাবিকে সমর্থন করে বিবৃতি প্রদান করল এবং প্রকাশ্যে এর সপক্ষে তাদের অবস্থান ঘোষণা করল। তবে তারা বললেন, ৬-দফা স্বায়ত্তশাসনের দাবি হলেও তা অসম্পূর্ণ। এর সঙ্গে কৃষক-শ্রমিক-মেহনতী মানুষের অন্যান্য মৌলিক ন্যায্য দাবিগুলো যুক্ত হলে তা পূর্ণতা পাবে। ন্যাপের অপর অংশ আওয়ামী লীগের ৬-দফা সমর্থন করতে সম্মত তো হলোই না, বরং প্রকাশ্যে তার বিরোধিতার পথ নিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ৬-দফা দাবি প্রণয়নের পেছনে সিআইএর হাত থাকতে পারে বলেও সন্দেহ প্রকাশ করলেন।
প্রথমোক্ত মতটি ছিল ন্যাপের সোভিয়েতপন্থিদের। দ্বিতীয়োক্ত মতটি চীনপন্থি বলে পরিচিত অংশের। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ১৯৬৩ সালে গণচীন সফর করেন। তিনি চীনের বিশেষ বন্ধু বলে জনগণের কাছে পরিচিত ছিলেন। চীন সফরের মধ্য দিয়ে চীনের শীর্ষ কমিউনিস্ট নেতা চেয়ারম্যান মাও সেতুং এবং চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ-এনলাইয়ের সঙ্গে দৃশ্যত তার ব্যক্তিগত সখ্য গড়ে উঠেছিল। তিনি ন্যাপের চীনপন্থিদেরই সমর্থন করলেন। তার সঙ্গে ছিলেন মোহাম্মদ তোয়াহা, রংপুরের মশিউর রহমান যাদু মিয়া, হাজী মোহাম্মদ দানেশ, খুলনার অ্যাডভোকেট আবদুল জব্বার, নূরুল হুদা কাদের বখ্শ, আনোয়ার জাহিদ, দিনাজপুরের বরদা চক্রবর্তী প্রমুখ। খুলনায় এদের অন্য নেতাদের মধ্যে ছিলেন অ্যাডভোকেট শেখ রাজ্জাক আলী (সাবেক স্পিকার), অ্যাডভোকেট তৈয়েবুর রহমান (সাবেক মেয়র), বাগেরহাটের গোরাইদা, কমরেড নজরুল ইসলাম প্রমুখ। অন্যদিকে সোভিয়েতপন্থিদের নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ, অবিভক্ত ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আলতাফ হোসেন, মহিউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ। 
আমি খুবই নবীন একজন পার্টি কর্মী, অভিজ্ঞতা পড়াশুনা ইত্যাদির জ্ঞানও খুব সীমিত। তবু শুরু থেকেই আমি আওয়ামী লীগের ৬-দফা দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলাম। তাই ন্যাপের রাজনৈতিক দাবি ও কৌশল নির্ধারণের প্রশ্নে ৬-দফার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি যখন অন্যতম মুখ্য বিষয় হয়ে উঠল তখন সংগত কারণে কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়াই আমি সোভিয়েতপন্থিদের অবস্থানকে সমর্থন জানালাম। ৬-দফাকে জাতীয় দাবি হিসেবে স্বীকৃতি দেবার পক্ষেও মত প্রকাশ করলাম। এ সময়ই আমি কমিউনিস্ট পাটি অর্থাৎ আত্মগোপনে থাকা পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি, খুলনা জেলার সদস্য হলাম।
ইতিমধ্যে ন্যাপের ভাঙনপ্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেল। রংপুরে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক ন্যাপের রিকুইজিশন কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হলো। মওলানা ভাসানী এই কাউন্সিলে যোগদান করেন। নতুন কমিটি গঠিত হলো মওলানা সাহেবকে সভাপতি ও প্রখ্যাত বাম নেতা মোহাম্মদ তোয়াহাকে সাধারণ সম্পাদক করে। মওলানা ভাসানী অবিভক্ত ন্যাপেরও সভাপতি ছিলেন।
    তার মাসখানেক পরই ঢাকায় হোটেল ইডেন মাঠে আয়োজন করা হলো ন্যাপের মূল কাউন্সিল অধিবেশন। মস্কোপন্থি বলে পরিচিত কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থনপুষ্ট এই কাউন্সিলে খুলনার একজন প্রতিনিধি বা ডেলিগেট হিসেবে আমি অংশগ্রহণ করেছিলাম। খুলনা থেকে অন্য যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের মধ্যে আবু মুহাম্মদ ফেরদৌস, আবদুল গফুর, সামসুদ্দিন আহমেদ (শুনু ভাই) খুলনা শহরের রিকশা শ্রমিকনেতা আবদুর রব, বাগেরহাটের অমূল্য দা, সাবেক এমএলএ দেবেন দাস প্রমুখের নাম মনে পড়ছে। কেন্দ্রীয় ও পশ্চিম পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির নেতৃবৃন্দের মধ্যে আবদুল ওয়ালী খান, মাহমুদুল হক উসমানী, মাহমুদ আলী কাসুরী, গাউস বক্স বেজেঞ্জো, আজমল খটক এই কাউন্সিলে যোগদান করেছিলেন।
এই কাউন্সিলে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদকে সভাপতি ও সৈয়দ আলতাফ হোসেনকে সাধারণ সম্পাদক করে প্রাদেশিক ন্যাপের কমিটি পুনর্গঠিত হলো। ন্যাপের নেতৃত্বে অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন মহিউদ্দিন আহমেদ, দেওয়ান মাহবুব আলী, কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিস, পীর হাবিবুর রহমান, আহমদুল কবির, রংপুরের মনি কৃষ্ণ সেন, ময়মনসিংহের আলতাব আলী, চট্টগ্রামের পূর্ণেন্দু দস্তিদার, মওলানা আজমী,  ঢাকার আবদুল হালিম, রাজশাহীর আতাউর রহমান, যশোরের আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ।
ন্যাপের এই কাউন্সিল থেকেই আওয়ামী লীগ ঘোষিত ৬-দফার প্রতি দ্ব্যর্থহীন সমর্থন প্রদানের প্রস্তাব পাস হয়। তবে আগের মতোই বলা হলো যে, ৬-দফায় পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের রাজনৈতিক দাবি অন্তর্ভুক্ত হলেও জনগণের বিশেষত মেহনতী মানুষের মৌলিক অর্থনৈতিক-সামাজিক দাবি প্রতিফলিত হয়নি।
১৯৬৭ সালেই সম্ভবত আইয়ুবের উর্দুভাষী তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন প্রথমে রবীন্দ্রনাথের গান ও সাহিত্যের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে বক্তব্য দিয়েছিলেন। এর সঙ্গে গলা মিলিয়েছিলেন পাকিস্তানের আর এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী খুলনার খান এ সবুর। এর পরই সরকারি রেডিও ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়। এর বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার বুদ্ধিজীবী সমাজ, লেখক, শিল্পী, শিক্ষক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিসেবী ও ছাত্ররা প্রতিবাদে গর্জে ওঠে। প্রথমে ঢাকায় এবং তারপর সারা পূর্ব বাংলার জেলা শহরে সাম্প্রদায়িক আইয়ুব সরকারের রবীন্দ্রবিরোধী বিষোদগার, অপপ্রচার ও মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা, মিছিল ইত্যাদি চলতে থাকে। ‘দৈনিক ইত্তেফাক’, ‘সংবাদ’, ‘পাকিস্তান অবজারভার’সহ বিভিন্ন পত্রিকায় এসব খবর প্রকাশিত হচ্ছিল । এর পাশাপাশি খুলনা, চট্টগ্রাম প্রভৃতি শহর থেকে প্রকাশিত আঞ্চলিক পত্রিকাগুলোও এই রবীন্দ্রবিরোধী, সাম্প্রদায়িক-বিষোদগার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। খুলনায় সাপ্তাহিক ‘দেশের ডাক’, ইংরেজি সাপ্তাহিক ‘দি ওয়েভ’ রবীন্দ্রবিরোধীদের মুখোশ উন্মোচনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিল। আমি এ সময় ‘দেশের ডাকে’ কর্মরত থাকায় সবুর খানের একাধিক রবীন্দ্রবিরোধী বক্তব্য নিয়ে রিপোর্ট করেছিলাম। এর প্রতিবাদে সন্দীপন ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠন যে বলিষ্ঠ কর্মসূচি পালন করেছে, সে সবও যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে কভার করেছি।
এ রকম উত্তাল, উত্তেজনাপূর্ণ সময় যখন আমরা পার হচ্ছিলাম, তখন রাজনৈতিক আবেগ-উত্তেজনা আমাদের মনে কতটা অস্থিরতা সৃষ্টি করত কিংবা কীভাবে অসহিষ্ণু হবার দিকে ঠেলে দিয়েছে, তা আজ ভাবলে অবাকই হতে হয়। এমনই একটি ঘটনা মনে পড়ছে। কী উপলক্ষে, মনে নেই। একদিন ঠিক হলো, পোস্টারিং করব। শহিদুল আলম নিরু, ন্যাপ কর্মী রশিদ ও আমি মধ্যরাত অবধি পার্টি অফিসে বসে পোস্টার লিখলাম। তারপর শহরের প্রধান প্রধান রাস্তার দুপাশের দেয়ালে সেই পোস্টার লাগানো হলো। পোস্টারে রাজবন্দীদের মুক্তির দাবি, জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার, খাদ্যের দাবি, শ্রমিক-কৃষকের দাবির পাশাপাশি ছিল পূর্ব বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন শুধু নয়, স্বাধীনতার দাবি। পোস্টারে লেখা ছিল, ‘কৃষক শ্রমিক অস্ত্র ধর, পূর্ব বাংলা স্বাধীন কর’।
পরের কয়েক দিন এ নিয়ে খুলনার পুলিশ মহলে তোলপাড় চলেছিল। সে সময় খুলনার এসপি ছিলেন মামুন মাহমুদ, যিনি ডিআইজি হিসেবে কর্মরত অবস্থায় ১৯৭১ সালে রাজশাহীতে হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হন। মামুন মাহমুদের সঙ্গে আমার সাংবাদিক হিসেবে খুলনায় কয়েকবার দেখা হয়েছিল। উনি আমাকে পছন্দ করতেন। পরে জেনেছি পোস্টারে ওই স্লোগান থাকায় আমাদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছিল। মামুন মাহমুদের প্রবল বিরোধিতায় সেটা হয়নি। আমার বিশ্বাস, আমার প্রতি তার একান্ত সহানুভূতি কিংবা ওই দাবির প্রতি নীরব সমর্থন থাকাতেই সে যাত্রা আমরা রক্ষা পেয়েছিলাম।
১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে পাকিস্তান সরকারের এক প্রেসনোটে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সম্পর্কে জানান দেওয়া হয়। প্রথমে এই মামলায় পাকিস্তান প্রতিরক্ষা বাহিনীর কয়েকজন জুনিয়র কর্মকর্তা জড়িত রয়েছেন বলে বলা হয়েছিল। এর পর দ্বিতীয় প্রেসনোটে বলা হয়, এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানও জড়িত এবং তিনি প্রধান আসামি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা রুজু হবার পর থেকেই আমার মনে দারুণ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। যেদিন দ্বিতীয় প্রেসনোটে শেখ সাহেবকে প্রধান আসামি হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হলো এবং বলা হলো তাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেদিন পত্রিকা পড়ার পর থেকে আমি এতই বিচলিত ছিলাম যে, রাতে ঠিকমতো খেতে পারিনি, ঘুমও হয়নি। আমি আজও ভেবে পাইনে, আমি কেন এতটা বিষণœ ছিলাম। আমি তো আওয়ামী লীগের কর্মী ছিলাম না, শেখ পরিবারের রক্তের কোনো আত্মীয়ও আমি নই। তা হলে? কারণ ছিল সম্ভবত এই যে, সেদিন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা শুধু কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা বা আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে রুজু করা হয়েছিল তা নয়, এই মামলাটি আসলে পূর্ব বাংলার ৭ কোটি মানুষের বিরুদ্ধে রুজু হয়েছিল। এটাই ছিল সে সময় সাধারণ ও সচেতন মানুষের মানসিক প্রতিক্রিয়া। এই মামলার মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে উঠেছিলেন বাংলার মানুষের মুক্তির সংগ্রামের অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতীক। আমার হৃদয়াবেগের অ্যান্টেনায় সেটাই হয়তো ধরা পড়েছিল।
আগেই উল্লেখ করেছি, ১৯৬৬ সালের জুলাইর শেষে অথবা আগস্টের শুরুর দিকে খুলনায় চলে আসি। বন্ধুদের সহযোগিতায় ২/৩টি টিউশনি দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজকে যুক্ত রাখতে শহীদুল আলম নিরুর সঙ্গে শিল্পাঞ্চলে যাতায়াত ও কাজ শুরু করি। সাংবাদিকতা ও শ্রমিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার কঠিন সংগ্রাম দুইই চলল বিরতিহীনভাবে। রাত জেগে পড়াশুনা, বিশেষত রাজনৈতিক বইপত্র, ইতিহাস, দর্শন, মার্ক্সীয় অর্থনীতি, অন্যান্য মার্ক্সবাদী বইপত্র, যা হাতের কাছে পাই, পড়ে চলেছি। নিজ উদ্যোগে সংগ্রহ করে বই পড়াও অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। কাজের চাপে অনেক সময় রাত জেগে বই পড়তাম। এ সময় পড়া বইয়ের মধ্যে দেবী প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের ‘যে গল্পের শেষ নেই’, ‘লোকায়ত দর্শন’, ‘নরহরি কবিরাজের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলা’ প্রভৃতির কথা বেশ মনে আছে। ব্রিটিশ দার্শনিক অধ্যাপক হ্যারল্ড লাস্কির ‘গ্রামার অব পলিটিকস’ বইটি পড়তে মাঝে মাঝেই বয়রায় স্থাপিত খুলনা পাবলিক লাইব্রেরিতে যেতাম। ফরিদপুরের কমিউনিস্ট নেতা মোখলেসুর রহমান (মোখলেস ভাই) আমার আগ্রহের কারণেই সম্ভবত ’৬৭ সালে প্রখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক-লেখক এডগার স্নোর লেখা ‘রেড স্টার ওভার চায়না’ বইখানি তার কোনো বন্ধুর সহায়তায় আমাকে কলকাতা থেকে আনিয়ে দিয়েছিলেন।
আগ্রহ ও আবেগের আতিশয্যে বিপ্লবী কাজে আরও বেশি মনোযোগ নিবদ্ধ করতে আমি সার্বক্ষণিক কর্মী হবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। খুলনার পার্টি অর্থাৎ মস্কোপন্থি কমিউনিস্ট পার্টি তখন সাংগঠনিকভাবে বেশ দুর্দিনের মধ্যে ছিল। নেতাদের অনেকেই জেলে-বিষ্ণু দা (বিষ্ণু চ্যাটার্জী), রতন দা (কমরেড রতন সেন)। অবিভক্ত পার্টিকে যারা অর্থ সহায়তা করতেন, তাদের অধিকাংশই খুলনায় পিকিংপন্থি পার্টির সমর্থক। ফলে পার্টি তহবিলের অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। তারপরও ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি সৈয়দ মতিউর রহমান এবং মস্কোপন্থি ন্যাপের সভাপতি ফেরদৌস ভাই (আবু মুহাম্মদ ফেরদৌস)-এর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম, সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘দেশের ডাকের’ স্থায়ী চাকরিতে ইস্তফা দেব, হোল টাইমার বা সার্বক্ষণিক বিপ্লবী হিসেবে শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করব।
পত্রিকার সম্পাদক জাহাঙ্গীর ভাইয়ের হাতে পদত্যাগপত্র দিতেই তিনি আকাশ থেকে পড়লেন। আমার রাজনৈতিক বিশ্বাস বা কমিটমেন্টের প্রতি তিনি যথেষ্ট সহানুভূতিশীল ছিলেন। আমাকে অনেক বোঝালেন, চাকরিতে বহাল থেকে রাজনৈতিক কর্মকা- চালিয়ে যেতে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। বিপ্লবী আবেগ, বন্ধুদের পরামর্শ আর পার্টির দুর্বল সাংগঠনিক অবস্থায় বাড়তি কাজের দাবি এই তিন চাপে পদত্যাগের সিদ্ধান্তে অটল থাকলাম। কয়েক মাস এভাবেই চলল। অবশেষে আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়তেই হলো। ঘর ভাড়া, যাতায়ত খরচ, খাবার ব্যয় ইত্যাদি পার্টি বহন করবে বলে যে সিদ্ধান্ত ছিল, দেখলাম তা বাস্তবায়নের সামর্থ্য তার নেই। আবার দু-একটি টিউশনি জোগাড় করতে চেষ্টা করলাম, পেলামও। চেষ্টা করলে পুরনো চাকরিতে ফিরে যাওয়া যেত। কিন্তু আত্মসম্মান বোধের কারণে জাহাঙ্গীর ভাইকে গিয়ে বলতে পারলাম না, আমি পত্রিকায় ফিরে আসতে চাই। আরও ভাবলাম তিনি অনেক বুঝিয়েছিলেন পত্রিকা না ছাড়তে। তার কথায় কর্ণপাত করিনি, এখন কোন মুখে তার কাছে যাব। সাত-পাঁচ ভেবে চাকরিতে ফিরে যাবার আশা ছেড়ে দিলাম। ফরিদপুরের মোখলেস ভাইকে চিঠি লিখলাম সব ঘটনা জানিয়ে। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দিলেন। কিছু দিনের মধ্যেই ঢাকায় ইপরেলের একটা সভা ছিল। সেই সভায় তিনি যোগদান করবেন, আমাকেও ঢাকায় যেতে বললেন।
ইতোমধ্যে খুলনার এক সাংবাদিক বন্ধুর সঙ্গে আলোচনা হলো। তার নাম আজিজুল আলম। ঢাকা থেকে প্রকাশিত মোনায়েম খানের ছেলের পত্রিকা ‘দৈনিক পয়গামে’র তিনি খুলনা ব্যুরো চিফ ছিলেন। ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করে আলম ভাই আমাকে পরামর্শ দিলেন পয়গামের বার্তা সম্পাদক বাচ্চু ভাইর সঙ্গে দেখা করতে। একটি চিঠিও লিখে দিলেন।
ঢাকায় গেলাম, আলম ভাইয়ের চিঠি নিয়ে পয়গাম বার্তা সম্পাদকের সঙ্গে ওয়ারীর অফিসে দেখাও করলাম। তিনি সব শুনে অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজের একটা সুযোগ করে দেবার আশ্বাস দিলেন। ২/৪ দিনের মধ্যে কাজে যোগদান করতে হবে। মোখলেস ভাই ফরিদপুর থেকে এলেন। কথা হলো। তিনি পয়গামে চাকরি নেবার পক্ষে খুব একটা সায় দিলেন না। আবার নিষেধও করলেন না। মিটিং শেষ করে আমরা গেলাম ন্যাপ নেতা সৈয়দ আলতাফ হোসেন (আলতাফ ভাই)-এর সঙ্গে তার গোপীবাগের বাসায় দেখা করতে। তার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা হলো। একপর্যায়ে আমি খুলনা ছেড়ে ঢাকা চলে আসছি বলে জানালাম। মোখলেস ভাই আমার পয়গামের চাকরিতে যোগদানের সিদ্ধান্তের কথাও বললেন। আলতাফ ভাই কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, তুমি পয়গামে কাজ করবে? কেন? তুমি বরং কুষ্টিয়া চলো। কুষ্টিয়া পার্টির সংগঠনটা বেশ দুর্বল, রওশন ভাই আছেন, কিন্তু তার বয়স হয়েছে। তোমার মতো উৎসাহিত, বুদ্ধিমান কর্মী পেলে পার্টির কাজ তিনি দ্রুত এগিয়ে নিতে পারেন।
কুষ্টিয়ায় মোহিনী মিল ও একে ঘিরে শ্রমিক আন্দোলনের কিছু কিছু ঘটনার কথা আগেই শুনেছি। তাই এটা ভালোভাবে জানার কৌতূহল তো ছিলই। এ ছাড়া আর একটি বড় আকর্ষণের ব্যাপার ছিল কুষ্টিয়ার অদূরেই শিলাইদহ। কুষ্টিয়া জেলার এই শিলাইদহ, পাবনার (সিরাজগঞ্জ জেলা) শাহজাদপুর, আর রাজশাহীর (নওগাঁ জেলা) পতিসর আমার কাছে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য তীর্থস্থানতুল্য। কবির অমর রচনাবলী, গান, গল্প, কবিতা, মূল্যবান নানা প্রবন্ধ, ব্যক্তিগত চিঠিপত্রের বিভিন্ন উপাদান এখনো এসব স্থানে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে ছড়িয়ে আছে। শুধু তা-ই নয়, এই তিন এলাকার প্রকৃতি, গাছপালা, নদ-নদী, সাধারণ কৃষিজীবী মানুষ, তাদের জীবনযাত্রা, ধর্ম-কর্ম-সংস্কৃতি সবই ছিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের মহৎ সাহিত্য, কাব্য, সংগীত ও জীবনচর্চার অফুরন্ত প্রেরণার উৎস। তাই শিলাইদহের কাছাকাছি কুষ্টিয়া শহরে থেকে ওই জেলার পার্টিকে নতুনভাবে সংগঠিত করতে সহায়তা করার সুযোগ আমার কাছে রবীন্দ্র স্মৃতির সান্নিধ্য উপভোগের একটি বাড়তি প্রাপ্তি বলেই তাৎক্ষণিকভাবে মনে হয়েছিল। তাই বোধ হয় নতুন কর্মস্থলের সম্ভাব্য বাধা-বিপত্তি, অপরিচয়ের চ্যালেঞ্জ ইত্যাদি আমলে না নিয়েই আলতাফ ভাইর প্রস্তাবে সাগ্রহে রাজি হয়ে গেলাম।

কুষ্টিয়ায় এলাম
কুষ্টিয়ায় এসে বুঝতে পরলাম কুষ্টিয়া জেলার পার্টি নেতা ও কর্মীদের কাছে আমার আসার খবরটি আগেই আলতাফ ভাই পৌঁছে দিয়েছিলেন। প্রথমে ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া)-র নেতা সৈয়দ মতিউর রাহমানদের পরিবারের সঙ্গে কয়েক দিন কাটিয়েছিলাম। মতি ভাইর সঙ্গে পরিচয় ঘনিষ্ঠতা খুলনায় থাকার সময় থেকেই। তার পরিবার থাকত দর্শনায় । বাবা, মা, ছোট ভাইয়েরা (মজনু ,হাসমত, হাবু) এবং একমাত্র ছোট বোনকে (রানী) নিয়ে তাদের একটি মধ্যবিত্ত পরিবার। রাজনীতিসচেতন। ভাই-বোন সবাই ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় কর্মী। ওখানে থাকতেই আরও অনেকের সঙ্গে পরিচয় হলো- ন্যাপ কর্মী, ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী, কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী। কুষ্টিয়া জেলার প্রধান আকর্ষণ প্রবীণ কমিউনিস্ট ও শ্রমিকনেতা শেখ রওশন আলী। আরও ছিলেন সুধীর পাল, জালাল উদ্দিন (জালাল ভাই) ছাত্রনেতা শহিদুল ইসলাম, জাহেদ রুমী, ওয়াপদার শ্রমিকনেতা কালু মোল্লা প্রমুখ। সবাই খুব আন্তরিকভাবে আমাকে স্বাগত জানালেন। পরে আরও অনেক নেতা, কর্মী, সমর্থকের সঙ্গে পরিচয় হলো। প্রায় সপ্তাহ দুয়েক রওশন ভাই আমাকে সবার সঙ্গে পরিচয় করাতে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে গেলেন। বিভিন্ন বৈঠক, সভা, সমাবেশে গিয়ে পরিচিত হলাম কুষ্টিয়ার বাম আন্দোলন সংশ্লিষ্ট অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতা, কর্মী, বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, অধ্যাপক, শিক্ষক, শ্রমিক, ছাত্র, সাংবাদিকের সঙ্গে।
এদের মধ্যে প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রেজোয়ান আলী খান চৌধুরী, আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান আক্কাস, ভাসানী ন্যাপের অ্যাডভোকেট লুৎফর রহমান, অ্যাডভোকেট বদরুদ্দোজা, অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাসুদ রুমী, অ্যাডভোকেট আসগর আলী, অ্যাডভোকেট জিল্লুর রহমান, অ্যাডভোকেট অপূর্ব নন্দী, অ্যাডভোকেট আমিরুল ইসলাম, বি এম এ কুষ্টিয়ার সভাপতি ডা. আবুল কাশেম, ডা. সৈয়দ ফজলে রব, ডা. টি হক, ডা. নিত্য গোপাল পাল, ডা. সিরাজুল ইসলামের কথা বেশ মনে পড়ছে।     
ব্রিটিশ ভারতে শ্রমিক আন্দোলনের যে ঐতিহ্য তাতে উপনিবেশিক শাসনের অধীনে রেল শ্রমিকদের আন্দোলনের পাশাপাশি বস্ত্রকল শ্রমিকদের আন্দোলনের ভূমিকা ও গুরুত্ব খুবই উজ্জ্বল। আর ত্রিশ ও চল্লিশের দশকের বস্ত্রকল শ্রমিক সংগ্রামের ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল নাম হচ্ছে কুষ্টিয়ায় মোহনী মিলের আন্দোলন। এই মোহিনী মিলের শ্রমিকদের আন্দোলন ও তাদের নানা সুখ-দুঃখের সঙ্গে আমার কেটেছে বেশ অনেক বছর, এ কথা মনে হলে গর্বে আমার বুক সত্যিই ভরে ওঠে।
এই কুষ্টিয়ার মোহিনী মিলের শ্রমিক আন্দোলনকে ঘিরে ত্রিশ ও চল্লিশের দশকের গোড়ায় উপমহাদেশের অনেক বিখ্যাত শ্রমিক ও কমিউনিস্ট নেতা এখানে এসেছেন, অবস্থান করেছেন,  আন্দোলন-সংগ্রাম এগিয়ে নিতে অবদান রেখেছেন। এদের মধ্যে ছিলেন উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মুজাফ্ফর আহমদ (কাকাবাবু), জ্যোতি বসু, সোমনাথ লাহিড়ী, অমৃতেন্দু মুখার্জী, কমরেড মোহাম্মদ ইসমাইল প্রমুখ। এ ছাড়া এখানে সরাসরি কাজ করে গেছেন শিবেন রায়, নন্দ সান্যাল, নেপাল নাগ প্রমুখ। কমরেড শেখ রওশন আলি (রওশন ভাই) এদের সঙ্গেই কাজ করেছেন। কমরেড শেখ রওশন আলির জন্ম ও কর্মএলাকা কুষ্টিয়া হলেও তার পরিচিতি, সুনাম, খ্যাতি ছিল দেশজোড়া। এমনকি দেশের বাইরে, ভারতে ও পাকিস্তানে একজন ত্যাগী শ্রমিকনেতা ও কমিউনিস্ট কর্মী হিসেবে তার পরিচিতি ছিল।
কুষ্টিয়া উপজেলার পার্শ্ববর্তী কুমারখালী উপজেলার অন্তর্গত কয়া ইউনিয়নের একটি বিখ্যাত গ্রাম কয়া, সেখান থেকে কয়েকজন ন্যাপ কর্মী আমার সঙ্গে এসে পরিচিত হলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ব্রজেন বিশ্বাস, জালাল উদ্দিন, অনিল ঘোষ প্রমুখ। এই গ্রামেই ছিল ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের এক জ্যোতিষ্ক বিপ্লবী বাঘা যতীনের মামার বাড়ি। আর এই বাড়িতে এসে বাঘা যতীন তার বিপ্লবী জীবনের অনেক সময় কাটিয়েছেন। আত্মগোপনে থাকার  সময়ও একাধিকবার এখানে এসেছেন।
কিছুদিন বাদে ওই গ্রামে যাবার আমন্ত্রণ নিয়ে অনিল ঘোষ একদিন এলেন। গ্রামটি বেশ সরগরম, অনেক রাজনীতিসচেতন মানুষের বাস এখানে।  অনিল দার বাড়িতেই থাকলাম। রাতে কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক হলো। পরের দিনও ব্যস্ত কাটল। তার পরের দিন আমি স্থির করলাম শিলাইদহে যাব। কয়া থেকে শিলাইদহের দূরত্ব জ্জ মাইল। শিলাইদহ যতবারই গেছি, এক ধরনের শিহরণ মনকে আচ্ছন্ন করে রাখত, যা ভাষায় বর্ণনা করা প্রায় অসম্ভব।
ইতিহাসের সাক্ষী কুঠিবাড়ি। অদূরেই পদ্মার সেই অবলুপ্ত ঘাট, যেখানে এসে রবীন্দ্রনাথের বোট ভিড়ত। কাছে গেলেই মনে পড়বে রবীন্দ্রনাথেরই গানের অবিস্মরণীয় গানের কথাÑ
‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,
আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে,
চুকিয়ে দেব বেচা-কেনা, মিটিয়ে দেব লেনা দেনা,
বন্ধ হবে আনা গোনা এই হাটে-
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে।’

গণআন্দোলনের সূচনা
’৬৭,’৬৮ সালজুড়ে দেশেবিরোধী দলগুলি বিশেষত ন্যাপ (ভাসানী), ন্যাপ (মোজাফ্ফর) খাদ্যের দাবি, রাজবন্দীদের মুক্তি অথবা অন্য কোনো ইস্যুকে সামনে রেখে বিভিন্ন সভা সমাবেশ, মিছিল এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দিবস পালন করেছিল। এছাড়া ছাত্র সংগঠনগুলি বিশেষত দুই ছাত্র ইউনিয়ন বিভিন্ন শিক্ষাকেন্দ্রিক এবং সাধারণ গণতান্ত্রিক অধিকার, স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ছাত্র ধর্মঘট, মিছিল, সমাবেশ ইত্যাদি একের পর এক সংঘটিত করতে তৎপর ছিল। এছাড়া সা¤্রাজ্যবাদবিরোধী বিশেষত ভিয়েতনামে মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও বোমা বর্ষণের বিরুদ্ধে অসংখ্য সভা, সমাবেশ এ সময় দুই ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপের উদ্যোগে সংঘটিত হয়েছিল। সাধারণ ছাত্ররাও সেই সময় ছিল আন্দোলনমুখী, প্রতিবাদবমুখর এবং বিশেষভাবে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের প্রতি সহানুভূতিশীল। এসব আন্দোলনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবিটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে চলে এলো, আগরতলা মামলা দায়ের এবং আদালতে শুনানি শুরুর পর থেকেই।
এর পাশাপাশি ছিল ক্রমাগ্রসরমাণ শ্রমিক আন্দোলন। রেল শ্রমিকদের আন্দোলনও তখন বেশ জোরদার ছিল। আমি পূর্ব পাকিস্তÍান রেলওয়ে এমপ্লায়িজ লীগ- ইপরেল (ঊচজঊখ)-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। ইপরেলের প্রধান নেতা ছিলেন মাহবুবুল হক। তিনি সে সময় পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য ছিলেন। তিনি ছিলেন ‘পাকিস্তান অবজারভার’-এরও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক। তার অফিস ছিল অবজারভার ভবনে মতিঝিলে। সেই সময় চীনাপন্থি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকনেতাদের উদ্যোগে আর একটি রেল শ্রমিক সংগঠন গড়ে ওঠে, নাম পারওয়েল বা বারওয়েল। এই সময় পূর্ব পাকিস্তানের পাটকলগুলির শ্রমিক আন্দোলন ছিল খুবই শক্তিশালী। এদের মধ্যে খুলনা ও চট্টগ্রামের পাটকলগুলিতে বাম শ্রমিকনেতাদের প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতো। টঙ্গির শ্রমিক আন্দোলনে একচেটিয়া প্রভাব ছিল জাফর-মেনন-রনোর নেতৃত্বাধীন বাম কর্মীদের হাতে। 
পাকিস্তানের অপর অংশে ব্যাপক কোনো আন্দোলন ষাটের দশক পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি।  প্রধান  রাজনৈতিক দলগুলিতে ভূস্বামীদের প্রাধান্য ও প্রচ-প্রভাবই এর অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে হয়। পাঞ্জাবের ক্ষেত্রে এই কথাটি প্রযোজ্য, তবে সংখ্যালঘু  উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, বেলুচিস্তান ও সিন্ধু প্রদেশের বেলা এটা পুরো সত্য নয়। ওইসব প্রদেশে অসংখ্য আঞ্চলিক বিদ্রোহ ও দমনপীড়নবিরোধী আন্দোলন ওই সময় গড়ে উঠেছে। অনেক সময় তা দমন করতে পাকিস্তানি সামরিক শাসকেরা নির্মম শক্তি প্রয়োগ করতেও দ্বিধা করেনি। একবার বেলুচিস্তানে ধর্মপরায়ণ মুসলমানদের ঈদের জামাতে বোমা বর্ষণ করেছিল আইয়ুবের সেনাবাহিনী।
ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ১৯৬৬ সালের তাসখন্দ চুক্তিকে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর জেনারেলদের একাংশ এবং ভূস্বামীদের স্বার্থ রক্ষাকারী সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক মহল স্বীয় শ্রেণি স্বার্থে মেনে নিতে পারল না। এই পটভূমিতে সামরিক ডিক্টেটর আইয়ুবের এক দশক কালের বিশ্বস্ত সহযোগী ও সেবক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো তাসখন্দ থেকে ফিরে আসার পর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। পাকিস্তানের রাজনৈতিক হাওয়া উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। এর বহিঃপ্রকাশ ঘটল করাচিসহ পাকিস্তানের কয়েকটি শহরে আইয়ুববিরোধী সমাবেশ, তাসখন্দ চুক্তিবিরোধী ছাত্র বিক্ষোভ ও আন্দোলন শুরুর ভেতর দিয়ে। এই আন্দোলনের রাজনৈতিক মুখপাত্র হিসেবে জুলফিকার আলী ভুট্টো রাতারাতি হিরো বনে গেলেন। পরবর্তীকালে তার দল পিপলস পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়।
‘৬৯-এর জানুয়ারি মাসে তৎকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পটভূমি ও শিক্ষাঙ্গনের বাস্তবতা সামনে রেখে দেশের প্রধান তিনটি ছাত্র সংগঠন  পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন), পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন এবং আন্দোলনের ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। এই ১১ দফার মধ্যে ছিল ছাত্র সমাজের বিভিন্ন ন্যায্য গণতান্ত্রিক দাবি। শিক্ষাসংক্রান্ত যে সব বিষয়ে প্রগতিশীল ছাত্রসমাজ এত দিন সংগ্রাম করে এসেছে, সেই সব দাবি। ১১ দফার প্রথম দফার ১৭টি উপধারায় এই দাবিগুলি বিবৃত হয়। ’৬৬ সালে উত্থাপিত আওয়ামী লীগের স্বায়ত্তশাসনের যে ৬-দফা দাবি ব্যাপক গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণপরিচিতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফার ভেতরে ২ ও ৩ নং দফায় প্রধানত সেই দাবিগুলিই হুবহু অন্তর্র্ভুক্ত করা হয়। এ ছাড়া অন্য দাবিগুলির মধ্যে ছিল তৎকালীন পাকিস্তানের সংখ্যালঘু প্রদেশসমূহ যথা-বেলুচিস্তান, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও সিন্ধুসহ সবার আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি, কৃষক, শ্রমিকদের বিভিন্ন ন্যায্য গণতান্ত্রিক দাবি। এর মধ্যে শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরির বিষয় যেমন ছিল, তেমনি ছিল কৃষকদের বকেয়া খাজনা ও ঋণ মওকুফ, খাজনা ট্যাক্সের হার হ্রাস, পাটের নিম্নতম মূল্য নির্ধারণের দাবি, কৃষকদের ওপর নির্যাতন বন্ধ, অর্থকরী ফসলের ন্যায্য মূল্যের নিশ্চয়তার দাবি। আরও ছিল জরুরি আইন প্রত্যাহার, রাজবন্দীদের মুক্তি, সিয়াটো, সেন্টো নামে পরিচিত পাকিস্তানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চুক্তি বাতিল এবং সর্বোপরি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার এবং ওই মামলায় আটক সব রাজবন্দীর শর্তহীন মুক্তির দাবি।

এই ১১ দফা ঘোষণার মধ্য দিয়ে তৎকালীন পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে দ্রুত এক গুণগত রূপান্তরের সূচনা হলো। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ঢাকাসহ সব জেলা শহর আন্দোলনের জোয়ারে যেন ভাসতে শুরু করলো । এই আন্দোলনের জন্য ক্ষেত্র  আগেই প্রস্তুত হয়েছিল। ১১ দফা ঘোষণা এবং সংগ্রামী ছাত্র সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনের মধ্য দিয়ে সেই ক্ষেত্রটিই যেন অবিশ্বাস্য দ্রুততায় দৃশ্যমান হয়ে উঠল।
এর আগে ১৯৬৮-এর ৬ ডিসেম্বর মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী শ্রমিক-কৃষক জনতার খাদ্য ও গণতন্ত্রের দাবিতে লাট ভবন অর্থাৎ তখনকার ‘গভর্নর হাউস’ ঘেরাওয়ের এক কর্মসূচি দিয়েছিলেন। সেই কর্মসূচি সফলভাবে পালিত হয়েছিল। পুলিশ সেই ঘেরাওয়ে অংশগ্রহণকারী নিরস্ত্র সাধারণ কৃষক জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে কয়েকজনকে হত্যা করেছিল। তার প্রতিবাদে সারা দেশে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয় এবং এক দিনের হরতালও পালিত হয়েছিল। আর ঠিক তার কয়েক দিনের মাথায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন ও তাদের ১১ দফা দাবির ঐতিহাসিক ঘোষণা।
আন্দোলন দাবানলের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ২০ জানুয়ারি ঢাকায় এক ছাত্র মিছিলে নেতৃত্ব দেবার সময় ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) নেতা আসাদুজ্জামান পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। এতে আন্দোলন অবদমিত না হয়ে বরং আরও ব্যাপকতা লাভ করে। মানুষের বিক্ষোভ আরও  তীব্র হয়ে ওঠে।
২০ জানুয়ারি আসাদ হত্যার পর এক রাত প্রায় নির্ঘুম কাটিয়ে পরের দিন সিদ্ধান্ত নিলাম, আমাদের কাজ শুধু শহরে নয়, গ্রামে বিস্তৃত করতে হবে। এর আগে যে গ্রামগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে, পালা করে ওই সব গ্রামে গিয়ে পার্টির কর্মী-সমর্থকদের সহায়তায় গ্রামের সাধারণ কৃষক-ছাত্র-যুবকদের সঙ্গে বৈঠক করে দেশে যে গণআন্দোলন শুরু হয়েছে, তার লক্ষ্য ও তাৎপর্য তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা ব্যাখ্যা করে তাতে যে সব দাবি আছে, তা-ও বুঝিয়ে বলতে চেষ্টা করলাম। এভাবে তাদের উদ্বুদ্ধ করতাম। গ্রামে গ্রামে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে উঠতে লাগল ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে। আমি একা নই, পার্টির সহকর্মী বন্ধুরা নানাভাবে আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন, কুষ্টিয়া ও কুমারখালী থানার কমলাপুর, কয়া, সদরপুরসহ বেশকিছু গ্রামে। জগতি সুগার মিলের পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে কৃষকরা ’৬৯-এর আন্দোলনের সময় মিছিল করে কুষ্টিয়া শহরে এসেছেন। এভাবেই শহর ও গ্রামের মধ্যে গণআন্দোলনের একটি রাখীবন্ধন সৃষ্টি হয়েছিল ওই ছোট জেলা শহরটিতে।
আন্দোলন ক্রমাগত বিস্তৃত ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠতে লাগল। বিভিন্ন শিল্প এলাকায় মওলানা ভাসানীর আহ্বানে ঘেরাও আন্দোলন শুরু হলো। এসব আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল মূলত দুটি-একটি নিজ নিজ এলাকার শ্রমিকদের না মেটানো দাবিগুলো এই সুযোগে আদায় করার চেষ্টা, দ্বিতীয়ত, সামরিক ডিক্টেটর আইয়ুবের দুঃশাসনের আবসান ঘটাতে তার সরকারের পতন ত্বরান্বিত করা।
ফেব্রুয়ারির ১৮ তারিখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক শামসুজ্জোহা পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। গোটা রাজশাহীসহ সারা দেশ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এরই মধ্যে একদিন হরতাল চলাকালে এক মিছিলে অংশগ্রহণ করে ফেরার পথে সাদা পোশাকের পুলিশের হাতে ধরা পড়ে গেলাম। এক রাত থানায় রেখে আমাকে কুষ্টিয়া কোর্টে হাজির করা হলো। আন্দোলন যত এগিয়ে চলল, গ্রেফতার, নির্যাতন, পুলিশি হয়রানিও ততই বাড়তে লাগল। ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন শহরে পুলিশের সঙ্গে ছাত্র-জনতার সংঘর্ষের ঘটনা প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ঘটতে থাকল। কুষ্টিয়ায় পুলিশের গুলিতে সম্ভবত ফেব্রুয়ারি মাসেই এক অথবা দুজন শহীদ হয়েছিলেন। ইতিমধ্যে আমি কোর্ট থেকে জামিনে মুক্ত হলাম।
আন্দোলন শুরুর পর থেকেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবিটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রিয় দাবি হিসেবে সামনে এসেছিল। ২৪ জানুয়ারি, ১৯৬৯ গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই দাবি নতুন মাত্রা পেল। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচারকের বাসভবন বিক্ষুব্ধ জনতা পুড়িয়ে দিল। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯, সম্ভবত প্রেসিডেন্ট  আইয়ুব জাতির উদ্দেশে এক বেতার ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই বেতার ভাষণে তিনি সারা দেশে উত্তাল গণআন্দোলনের জন্য বিরোধী দলগুলোকে দোষারোপ করার পাশাপাশি পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আর প্রার্থী হবেন না বলে ঘোষণা দেন। এসব কথা বলে আসলে তিনি আন্দোলনের তীব্রতা ও জনরোষের প্রচ-তা প্রশমিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাতে খুব একটা ফল হলো না।
সারা দেশের মতো কুষ্টিয়ায় এ সময় বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হয়েছিল। এদের মধ্যে অনেকেই আদালতের নির্দেশে জামিনে ছাড়া পেয়েছিলেন। তবে আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সহকর্মী ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন) নেতা আনিসুর রহমান মল্লিকের জন্য (এখন ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা) একাধিকবার চেষ্টা করেও জামিন মিলল না। আওয়ামী লীগ নেতা আইনজীবী শাহ আজিজুর রহমান তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে বিরোধী দলের উপনেতা ছিলেন। তিনি সে সময় কুষ্টিয়া আসেন। রওশন ভাই আমাকে সঙ্গে নিয়ে শাহ সাহেবের কুষ্টিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা করলেন। রওশন ভাইকে শাহ আজিজ খুব সম্মান করতেন। তাই রওশন ভাই তাকে আনিসের জামিনের জন্য আদালতে দাঁড়ানোর অনুরোধ করতেই তিনি সানন্দে রাজি হলেন। আদালতে তার সঙ্গে আইনজীবী হিসেবে ছিলেন আসগর ভাই, জিল্লুর ভাই, দোজা ভাই, লুৎফর ভাইসহ অনেকে। 

গোলটেবিল আলোচনা
গণআন্দোলনের উত্তাপে দিশেহারা সামরিক স্বৈরশাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব এবার শেষ রক্ষার আশায় দেশের রাজনৈতিক নেতাদের এক গোলটেবিল বৈঠকে আমন্ত্রণ জানালেন। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী এই গোলটেবিল আলোচনা বর্জনের ঘোষণা দিলেন।
আওয়ামী  লীগের তথা পূর্ব বাংলার অবিসংবাদী নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তখনো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি হিসেবে কারাবন্দী। তাকে কারাগার থেকে প্যারোলে মুক্ত করে গোলটেবিল আলোচনায় নিয়ে যাবার একটি প্রচেষ্টা আইয়ুব-মোনেম সরকারের লোকেরা চালাচ্ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি। পরে জানা গেল এমনকি শেখ সাহেবের স্ত্রী বেগম ফজিলাতুননেসা মুজিবও, যিনি প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কর্মকা-ে যুক্ত ছিলেন না, প্যারোলে গোলটেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণের প্রস্তাব গ্রহণ না করতে শেখ সাহেবকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। মওলানা ভাসানীও পল্টনের এক বিশাল সভা থেকে শেখ মুজিবর রহমানকে এই ঘৃণ্য প্রস্তাব গ্রহণ না করার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এই পর্যায়ে ২২ ফেব্রুয়ারি নিঃশর্তভাবে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়া হলো এবং  জনগণের অবিসংবাদী নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বীরের বেশে কারাগার থেকে মুক্ত হলেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে শেখ মুজিবুর রহমানকে এক ঐতিহাসিক গণসংবর্ধনা দেয়া হয়। এই সুবিশাল ছাত্র-গণসমাবেশ থেকে তাকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করলেন। এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আইয়ুব আহুত গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিতে ইসলামাবাদ যান।
কিন্তু এতেও আন্দোলন থামল না, বরং ক্রমাগত এর ব্যাপ্তি ও তীব্রতা বেড়েই চলল। এমন অবস্থা পাকিস্তানি শাসকদের মোটেই কাম্য ছিল না। ক্রমাগত বেশি বেশি সংখ্যায় সাধারণ নর-নারী, কৃষক, শ্রমিক নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারী, শ্রমজীবী মানুষ এবং ছাত্র-তরুণরা আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে লাগল। সামরিক শাসকরা এই আন্দোলনকে আর বেশি দূর অগ্রসর হতে দিতে চাইল না। ফিল্ড মার্শল আইয়ুব তার এক দশকের দুঃশাসনের অবসান ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করলেন। এই পদত্যাগকে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের আন্দোলনের বিজয় হিসেবে দেখলেও, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সব ঘটল না। সামরিক বাহিনী ক্ষমতার মসনদটি আবার দখল করে নিল। দেশে জারি হলো নতুন করে সামরিক শাসন, ২৫ মার্চ ১৯৬৯। সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে এলেন। তিনি এখন অবির্ভূত হলেন প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত হলেন নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল আহসান। এ ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেলেন লে. জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খান। সামরিক শাসন জারির পর থেকে প্রতিদিনই নতুন নতুন সামরিক বিধি-নিষেধের ঘোষণা শুরু হয়ে গেল। রাজনৈতিক সভা, সমাবেশ, মিছিল, বিক্ষোভ, ধর্মঘট, ঘেরাও ইত্যাদি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হয়ে গেল। তবে ঘরোয়া রাজনীতি বেআইনি বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো না।
কারাগার থেকে মুক্তির  পর বঙ্গবন্ধুর সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভা হলো। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা চলল। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের বক্তব্য প্রকাশ করা হলো।  মওলানা ভাসানী গভর্নর অ্যাডমিরাল আহসানের কাছে তার বার্তা পাঠিয়ে দেশের কৃষক সমাজের নানা সমস্যা উত্থাপন করলেন এবং তাদের অভাব অভিযোগ আলোচনা করতেই কৃষক সমাবেশ আয়োজন করবেন বলে জানালেন। কিছু দিন পর মওলানা ভাসানীর আহ্বানে অবিভক্ত কৃষক সমিতি কয়েকটি বড় কৃষক সমাবেশ অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নিল। প্রথমটি পাবনার পাকশীর কাছে শাহপুর গ্রামে। এ ছাড়া  টাঙ্গাইলের সন্তোষে এবং বগুড়ার পাঁচবিবিতে বিশাল সমাবেশের আয়োজন করা হলো। পাবনার শাহপুরে অনুষ্ঠিত মহাসমাবেশের মূল সংগঠক ছিলেন কৃষক নেতা আব্দুল মতিন (ভাষা সংগ্রামী) এবং সহযোগী আলাউদ্দিন আহমেদ (আলাউদ্দিন ভাই)। বৃহত্তর পাবনার অর্থাৎ পাবনা, সিরাজগঞ্জ, খুলনা, যশোর, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গাসহ ১৪/১৫টি জেলা থেকে হাজার হাজার কৃষক এই সমাবেশে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগদান করেছিলেন।
আমি বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলার কর্মীদের সঙ্গে এই সমাবেশে যোগদান করলাম। বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলা কৃষক সমিতির নেতৃত্বে প্রায় ১০/১২ হাজার কৃষক ও ছাত্র-রাজনৈতিক কর্মী এই সমাবেশে যোগদান করেছিলেন। সমাবেশে মওলানা ভাসানী বক্তৃতা দিতে গিয়ে যথারীতি সামরিক শাসনের বিধিনিষেধ সত্ত্বেও এই সমাবেশ অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবে করতে দেয়ায় গভর্নর আহসান এবং তার সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন। এরপর কৃষকদের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরে বললেন, এসব দাবি অবশ্যই পূরণ করতে হবে। তিনি কৃষকদের দাবি পূরণে সবার সহযোগিতা কামনা করলেন।

মোহিনী মিলে শ্রমিক অসন্তোষ
এই রকম অবস্থার মধ্যেই কুষ্টিয়ার মোহিনী মিলের শ্রমিকদের মধ্য থেকে ঈদ বোনাসের দাবি উঠল। সামরিক শাসন জারির আগ থেকেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও বৈঠক চলছিল। আগের বছরও মিল কর্তৃপক্ষ বোনাসের দাবি পূরণে অনীহা দেখিয়েছিল। কিন্তু চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত ৫০% বোনাস দিতে বাধ্য হয়েছিল। এবারও সেই খেলা তারা শুরু করল। শ্রমিকরা প্রকাশ্যে সভা, সমাবেশ, মিছিল, গেট মিটিং এমনকি লিফলেট ছেপে প্রচার চালাতে পারবে না, সামরিক আইনের বিধিনিষেধের কারণে। এটা কর্তৃপক্ষ জানত। তাই তারা অনেকটা ড্যাম কেয়ার ভাব নিয়ে বসেছিল।
ম্যানেজার ছিলেন আবদুর রাজ্জাক। শ্রমিকদের ক্ষোভ ক্রমাগত বাড়তে লাগল। আমরা ইউনিয়নের পক্ষ থেকে মিল কর্তৃৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে ঈদ বোনাসের দাবিটি আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের আহ্বান জানালাম। কোনো সদুত্তর  পাওয়া গেল না। শ্রমিকদের রোষ-ক্ষোভ আরও তীব্র হতে লাগল। আনুষ্ঠানিক সভা নিষিদ্ধ থাকায় গোপনে ইউনিয়ন নেতাদের বৈঠকে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হলো। এসব বৈঠকে রওশন ভাই, কফিল উদ্দিন, বারিক জোয়ারদার, শুকুর মাহমুদ, খন্দকার আবদুল ওয়াহেদ অ্যাডভোকেট এবং শামসুল হুদা (আমি) প্রমুখ উপস্থিত থাকতেন।
পরিস্থিতি বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে উঠল। সিদ্ধান্ত মাফিক ঘেরাও শুরু হলো। ম্যানেজার এবং কর্মকর্তাদের কাছে শুধু পানি ও ওষুধ ছাড়া আর কোনো কিছু যাতে না পৌঁছায় তার ব্যবস্থা শ্রমিকরা নিশ্চিত করলেন। ঘেরাও একটানা প্রায় ২৮ ঘণ্টা চলল। নিরস্ত্র শ্রমিকদের ওপর পরের দিন পুলিশের হামলা, লাঠিপেটা চলল। অনেক শ্রমিক আহত হলেন। কয়েক দিন পর সামরিক আইন ভঙ্গ করার দায়ে আমাদের তিনজনকে গ্রেফতার করা হলো- শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আবদুল বারিক জোয়ারদার, অ্যাডভোকেট খন্দকার আবদুল ওয়াহেদ এবং আমাকে।  পুলিশ দ্রুত তদন্ত করে আমাদের তিনজনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত চার্জশিট দিয়েছিল।

সামরিক আদালতে বিচার
আমাদের গ্রেফতারের দুই দিনের মধ্যেই বিচার শুরু হলো। সামরিক আদালতের বিচার প্রহসন ছাড়া কিছু নয়। যে দিন বিচার শুরু হলো সেই দিন সকাল নয়টার মধ্যে জেলহাজত থেকে আমাদের সাকির্ট হাউসে স্থাপিত সামরিক আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। পাঞ্জাবি মেজর ফজল খান সংক্ষিপ্ত সামরিক আদালতের (ংঁসসধৎু সরষরঃধু পড়ঁৎঃ) বিচারক। বিচারকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো। বিচারের সময় এজলাসে থাকলেন মেজর ফজল খান। তার পাশে আইনি ব্যাখ্যা বা পরামর্শ দিতে একজন সিনিয়র ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। অভিযুক্তরা কোনো আইনজীবী নিয়োগ করতে পারবেন না।  অভিযোগপত্র বা চার্জশিট আমাদের পড়ে শোনানো হলো। সাহায্যকারী হিসেবে একজন করে আইনজীবী থাকতে পারবেন। তিনি অভিযুক্তকে আইনি পরামর্শ দিতে পারবেন, কিন্তু আসামির পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করতে পারবেন না। আমাদের তিনজনকে এক এক করে জিজ্ঞেস করা হলো, আমরা মঁরষঃু বা হড়ঃ মঁরষঃু. আমরা প্রত্যেকই বললাম, হড়ঃ মঁরষঃু বা নির্দোষ। এক এক করে সাক্ষী উপস্থাপন করা হলো। ৫/৭ জন সাক্ষ্য দিতে এসে প্রায় একই রকম কথা বলে গেল।
আদালতে আমাকে আইনি পরামর্শ দেবার জন্য কুষ্টিয়া জেলা ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ভাসানী) সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আসগর আলী ছিলেন। জেরার পর আমাদের প্রত্যেককে ১৫-২৫ মিনিট  করে যুক্তি উপস্থাপনের সময় দেয়া হলো। সেই সময় আমি সাক্ষীদের সাক্ষ্যের অসঙ্গতি, মিথ্যা, ভিত্তিহীন কথাবার্তার বিরুদ্ধে যুক্তি উপস্থাপন করলাম আসগর ভাইর পরামর্শে। মামলার শুনানি শেষ হলো। বিচারক ঘোষণা করলেন বিকেল চারটায় রায় প্রদান করা হবে।
ইতোমধ্যে আদালত কক্ষের বাইরের বড় হলঘরে কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ, ন্যাপ (ভাসানী), ন্যাপ (মোজাফ্ফর ) এবং বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের সব নেতা এসে হাজির হলেন। সে দিন সেখানে যারা হাজির ছিলেন তাদের মধ্যে বিশেষভাবে মনে পড়ছে ভাসানী ন্যাপ ও কৃষক সমিতির নেতা অ্যাডভোকেট লুৎফর রহমান, ভাসানী ন্যাপ নেতা অ্যাডভোকেট বদরুদ্দোজা, আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান আক্কাস প্রমুখের কথা। রওশন ভাই, আসগর ভাই তো ছিলেনই। এছাড়া ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া), ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) এবং ছাত্রলীগের নেতারাও অনেকে সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
রায় সংক্ষিপ্ত । রায়ে বলা হলো যে আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সবগুলিই সাক্ষীদের দেয়া তথ্য ও সাক্ষ্যে প্রমাণিত হয়েছে। তাই আদালত আমাদের দোষী সাব্যস্ত করেছে। আমাদের তিনজনকেই এক বছরের সশ্রম কারাদ- দেয়া হলো। তবে আমি মিলের অভ্যন্তরে ঢুকে শ্রমিকদের উত্তেজিত করতে সব থেকে সক্রিয় ছিলাম এবং সামরিক আইন লঙ্ঘন করতে উত্তেজনাকর বক্তব্য দিয়েছি। সে কারণে আমাকে বাড়তি ১৫ বেত্রাঘাতের দ- দেওয়া হলো।
আমি পাশে বসা আসগর ভাইর দিকে তাকিয়ে হতবাক হয়ে গেলাম। আসগর ভাইর দুই চোখ বেয়ে পানি ঝরছে। আদালতকক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে রওশন ভাইর হাত ধরে আসগর ভাই বললেন, ভাই, হুদাকে ১৫ বেত্রাঘাত করলে তো ও মরেই যাবে। আজ আসগর ভাই আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু সেদিনের সেই স্মৃতি মনে করলেই মনটা ভারী হয়ে ওঠে। বলাই বাহুল্য, আমি বেত্রাঘাতের দ-ে কিছুটা হলেও মনে মনে বিমর্ষ বোধ করিনি, তা নয়। তবে তা প্রকাশ না করে উল্টো আসগর ভাইকে সাহস দিয়ে বললাম, ভাই আমি মরব না। আপনি ভেঙে পড়বেন না।

আদালত থেকে আমাদের কাছে জানতে চাওয়া হলো, আমরা অনুকম্পা চেয়ে দরখাস্ত (গবৎপু ঢ়বঃরঃরড়হ) করব কি না। এক মুহূর্ত দেরি না করেই বললাম, গবৎপু ঢ়বঃরঃরড়হ?  প্রশ্নই ওঠে না। তবে আপিল করার কথা জিজ্ঞেসা করলে আমরা বললাম, আমরা বিধি মোতাবেক আপিল করব। ভাসানী ন্যাপের নেতা অ্যাডভোকেট বদরুদ্দোজা ওকালতনামায় আমাদের স্বাক্ষর নিলেন। দ্রুত একটি পিটিশনের খসড়া করলেন। এই মামলাটি কুষ্টিয়ায় তো বটেই, অন্য অনেক জেলায় বহুল আলোচিত ছিল। ইয়াহিয়ার সামরিক আদালতে এটি ছিল প্রথম দিকের অন্যতম রাজনৈতিক মামলা। সে সময় কুষ্টিয়ার এটিই একমাত্র রাজনৈতিক মামলা, যার বিচার হয়েছে সামরিক আদালতে।

কারা জীবন
সশ্রম কারাভোগের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। এবার সেই অভিজ্ঞতা লাভের পালা শুরু হলো। সশ্রম কারাদ- দেওয়া হয়েছে, তাই কায়িক শ্রমের কাজ করতে হবে। জেলের ভেতর সবজির আবাদ করার অনেক জমি আছে, আমাকে কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়ে শীতের সবজি লাগানোর জন্য মাঠ প্রস্তুত করার কাজ দেয়া হলো।
একদিন জেলে পরিদর্শক দলের লোকেরা জেল পরিদর্শনে এলেন। এটা জেল কোডের বিধান। ঘটনাচক্রে এই পরিদর্শক দলে আমার পূর্বপরিচিত লোক ছিলেন । স্থানীয় ‘মশাল’ পত্রিকার সম্পাদক ওয়ালিউল বারী চৌধুরী ও রমজান আলী মোক্তার। জেলখানার অভ্যন্তরীণ অবস্থা, সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে তারা জানতে চাইলেন। কর্তৃপক্ষ চাইছিল, আমরা বলব সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। কিন্তু আমি খাদ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন তুললাম। জেলে আসার আগে জেল কোড সম্পর্কে ধারণা ও পড়াশুনা ছিল।  জেল কর্তৃপক্ষের দুর্ব্যবহার নিয়েও কিছু কথা বললাম।
এতে ফল হলো, পরিদর্শক দল যাবার আগে তাদের পরিদর্শন বইয়ে কিছু মন্তব্য লিখে তাদের সুপারিশ দিয়ে গেলেন। কদিন পর ডেপুটি জেলার তার অফিসে ডেকে নিয়ে বললেন, জেলার সাহেব আপনার কথাবার্তায় একটু ক্ষুব্ধ হয়েছেন। আপনি যদি একবার জেলার সাহেবকে বলেন যে ওই সব কথার জন্য আপনি দুঃখিত তা হলে সব মিটে যাবে। আমি উত্তরে বললাম, কোনো মিথ্যা, অসত্য কিছু বলিনি। তাই দুঃখ প্রকাশের কোনো প্রশ্ন আসে না। কয়েক দিন গেল। ইতোমধ্যে জেলের অভ্যন্তরে খাবার মানের কিছুটা উন্নতি হলো। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও অসুস্থ আসামি, কয়েদিরা আগের চেয়ে উন্নততর সেবা পেতে শুরু করল। জেলের আাসামি, কয়েদিরা আমাকে ও খন্দকার ওয়াহেদ ভাইকে ধন্যবাদ জানাল। জেল কর্তৃপক্ষ আমাকে আর ঘাঁটাতে চাইল না। তাই বোধ হয় আমাকে জেলখানার স্কুলের শিক্ষকতার দায়িত্ব দেয়া হলো। এ সময় নিরক্ষর কয়েদিদের লেখাপড়া শেখানোর চেষ্টা করলাম আন্তরিকভাবেই। কয়েকজন কয়েদি বেশ যতেœর সঙ্গে লিখতে ও পড়তে শিখেছিল। এতে আমার যে আনন্দ হয়েছিল, তা ভোলার নয়।

আপিল খারিজ
ইতোমধ্যে আমাদের আপিল নিয়ে রওশন ভাই এবং আমাদের আইনজীবীরা যশোরে গিয়ে সাব জোনাল সামরিক আদালতে আপিল দায়ের করলেন। কিছুদিন পর  শুনানিও হলো। শেষে আবেদন খারিজ হলো।  অর্থাৎ সশ্রম কারাদ- এবং ১৫ বেত্রাঘাতের দ- দুটোই বহাল থাকল। পার্টি, রওশন ভাই, আসগর ভাই, দোজা ভাই শুধু মর্মাহত হলেন তা নয়, বেশ দুশ্চিন্তায় পড়লেন। বেত্রাঘাতের দ-টি তারা কেউই মেনে নিতে পারছিলেন না। যশোর সাব জোনাল আদালতে আপিল নামঞ্জুর হওয়ায় একমাত্র সুযোগ থাকল আঞ্চলিক সামরিক আইন প্রশাসকÑঅর্থাৎ তখনকার জেড-এমএল এ লে. জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুর খানের কাছে আপিল দায়েরের চেষ্টা। যথারীতি সেখানেও আপিল করা হলো। একই সঙ্গে বেত্রাঘাতের দ-াদেশ যাতে আপিল চলাকালে কার্যকর না হয়, তার স্থগিতাদেশের আবেদন করা হলো। সাময়িক স্থগিতের আবেদন মঞ্জুর হলো।
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ন্যাপের দুই অংশের নেতারা গভর্নর অ্যাডমিরাল আহসানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। এক অংশের নেতৃত্বে ছিলেন মওলানা ভাসানী, মোহাম্মদ তোয়াহা, মশিউর রহমান যাদু মিয়া প্রমুখ। অপর অংশের নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ, সৈয়দ আলতাফ হোসেন প্রমুখ। উভয় অংশের নেতারা রাজবন্দী, শ্রমিক ও ছাত্র নেতৃবৃন্দ যারা সামরিক আইনে কারারুদ্ধ ছিলেন, তাদের মুক্তির প্রসঙ্গটি জোরের সঙ্গে তুলেছিলেন। আমার কারাদ- ও বেত্রাঘাতের প্রসঙ্গও ওই সময় উঠেছিল বলে পরে শুনেছি। বিষয়টি রাজনৈতিক দাবির অন্তর্গত বিবেচনা করায় আঞ্চলিক মর্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটরের দপ্তর থেকে চিঠি দিয়ে জানানো হয় যে, আমার এক বছরের সশ্রম কারাদ- যথারীতি বহাল রয়েছে। তবে ১৫ বেত্রাঘাতের দ-াদেশটি আঞ্চলিক সামরিক আইন প্রশাসক স্বীয় ক্ষমতাবলে রহিত করেছেন।

মনের ভেতর নানা প্রশ্ন
কারাবাসের এক বছর সময়ের হিসাবে কোনো দীর্ঘ সময় নয়। আমার কাছেও কোনো দুর্বিষহ সময় মনে হয়নি। তার কারণ দুটি। এক, সব সময় সংগ্রামী মুডে থাকার চেষ্টা করেছি। সহ-কারাবন্দীদের সম্মিলিত স্বার্থে কিছু না কিছু করতে সচেষ্ট হয়েছি। দুই, এই স্বল্প সময়ে পড়াশুনা ও আত্মানুসন্ধানে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি।
কারাগারে শাস্তি ভোগের শুরুতেই রওশন ভাই এবং পার্টির অন্য সহকর্মীদের সহযোগিতায় পড়ার বই, খাতা, কলম আনিয়ে নিলাম। সন্ধ্যা নামার আগেই কারাবন্দীদের লক-আপে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন পড়াশুনা, গল্প-গুজব ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। আমি তখন পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত হতাম। এ বাদে কিছু দিন অতিবাহিত হবার পর নির্দিষ্ট কয়েকজন কারারক্ষী যারা আমার বা পার্টির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, তাদের সাহায্যে অনিয়মিতভাবে দৈনিক সংবাদ ও পার্টির গোপন পত্রিকা ‘শিখা’ এবং অন্যান্য কিছু বইও আনিয়ে নিলাম। মাঝে মাঝে  রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য আলাপ আলোচনা ও মতের আদান-প্রদান করতাম সহ-বন্দীদের সঙ্গে। এ ক্ষেত্রে সব সময় সাহস জুুগিয়েছেন সহ-বন্দী খোন্দকার ওয়াহেদ ভাই। বিভিন্ন সময় রাজবন্দী হিসেবে এর আগেও অনেক বারের কারাবাসের অভিজ্ঞতা তার ছিল। তিনি ছিলেন আশাবাদী মানুষ, আমার ভালো বন্ধু ও কমরেড।
রাতে শুয়ে শুয়ে অনেক কিছু নিয়ে ভাববার চেষ্টা করতাম। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিধারা এবং আমাদের করণীয়। এভাবে নিজের মনের ভেতরেই এক ধরনের আত্মানুসন্ধানের প্রক্রিয়া চলছিল। যা করেছি, তার মূল্য কতটুক, ভবিষ্যতে কী করব, কী করতে পারব, কীভাবে করব? ইত্যাদি নানা প্রশ্ন মনকে আচ্ছন্ন করে রাখত। পার্টির যে সব সিদ্ধান্ত, কার্যক্রম জেলের ভেতরে থেকে জানতে পারছিলাম, তা পর্যালোচনা করে দেখার চেষ্টা করছিলাম। পার্টি কি সব ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে? সিদ্ধান্ত ও বাস্তব কাজে কোথায় কোন ক্ষেত্রে ফাঁক থেকে গেল। এ থেকে উত্তরণের পথ কী? সারাক্ষণ তা-ই ভাবতাম। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার নানা ঘটনাও মনকে নাড়া দিত। চীন-সোভিয়েত আদর্শিক বিতর্ক এ সময় তুঙ্গে উঠেছে। জেলখানায় বসে গোপন পত্রিকা পড়ে জেনেছিলাম, পার্টি আসন্ন মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য পার্টির কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছে। অথচ আমি নিজে ’৬৯-এর গণআন্দোলনের অভিজ্ঞতায় উপলব্ধি করেছি, জনগণ আইয়ুবের মৌলিক গণতন্ত্র নামক নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র ঈড়হঃৎড়ষষবফ উবসড়পৎধপু-র ধারণা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই আমার অভিমত ছিল, ওই ধরনের নির্বাচন করার উদ্যোগ নিলে তার বিরোধিতা করা এবং চূড়ান্ত পর্বে তা বয়কট করা। এ সময় এ-ও জানতে পেরেছিলাম, অনুরূপ মত পোষণ করায় ঢাকা জেলার পার্টি সদস্য কমরেড নাসিম আলীসহ কয়েকজনকে পার্টি থেকে অব্যাহতি প্রদান কিংবা বহিষ্কার করা হয়েছে। এটা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। এ ছাড়া ’৬৯-এর গণআন্দোলন যে আরও বড় কোনো জনবিস্ফোরণের আগাম ঘোষণা দিয়েছে, তা-ও আমার সামান্য অভিজ্ঞতায় উপলব্ধি করতে চেষ্টা করছিলাম। সে কারণে আমার কাজের লক্ষ্য ছিল শহরে শুধু শ্রমজীবী-মধ্যবিত্তদের মধ্যে নয়, গ্রামে ব্যাপক কৃষকদের মধ্যে কাজ ও সংগঠন দ্রুত ছড়িয়ে দেয়া। কিন্তু পার্টির নীতি ও কৌশল আমার এই প্রয়াসকে কোনোভাবে তৃপ্ত করতে পারছিল না। 
বলাই বাহুল্য, বছর দেড়েক আগে ভারতের পশ্চিমবাংলার নকশাল বাড়িতে যে কৃষক বিদ্রোহ ঘটেছিল কানু সান্যাল, জঙ্গল সাঁওতাল ও চারু মজুমদারের নেতৃত্বে, তার প্রভাবও আমার মনে কম-বেশি ছায়া ফেলতে শুরু করেছিল। এ সময় ভিয়েতনামের জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম এগিয়ে নিতে মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদ ও তার সেবাদাসদের বিরুদ্ধে সে  দেশের পার্টি হো চি মিনের নেতৃত্বে সব রাজনৈতিক-সামাজিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। এমনকি বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও সক্রিয়ভাবে এই যুদ্ধে সহায়তা দিয়েছেন, অংশ নিয়েছেন। এটা সম্ভব হয়েছিল তৎকালীন ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট (ওয়ার্কার্স) পার্টির অত্যন্ত বিচক্ষণ সময়োপযোগী, রণনীতি, রণকৌশল এবং বাস্তবসম্মত, সৃজনশীল কর্মপন্থা অনুসরণের ফলে। হো চি মিনের মৃত্যুর পরপরই তার লেখা উইল বা ইচ্ছাপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে হ্যানয় সরকার বিশ্বের সংবাদমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করে। হো চি মিনের এই উইল বা ইচ্ছাপত্রে তিনি চীন-সোভিয়েত উভয় দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে বাস্তব বিশ্ব পরিস্থিতির আলোকে বিপ্লবী আবেগ ও যুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে নিজদের মধ্যে সমঝোতা ও ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছিলেন।  হো চি মিনের এই শেষ ইচ্ছা সারা বিশ্বের বিপ্লবীদের দারুণভাবে নাড়া দিয়েছিল। আমার মনে হতে লাগল, দেশের ব্যাপকতম সংখ্যার মানুষ গ্রামের সাধারণ দরিদ্র, কৃষক ও গ্রামীণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বিপ্লবী কার্যক্রমের মূলধারায় যুক্ত করার জন্য পার্টির তরফ থেকে তেমন কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। সে সময় বেশ কয়েকখানা দীর্ঘ চিঠি আমি রওশন ভাইকে লিখেছিলাম। জেল গেটে যদিও রওশন ভাইর সঙ্গে প্রতি মাসেই একবার দেখা হতো। কিন্তু সেই সাক্ষাতের সময় রাজনৈতিক আলোচনা, বিতর্কমূলক কথাবার্তা সঙ্গত কারণেই হতো না। তাই রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ বা পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিগুলি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করার জন্য চিঠি লেখাই ছিল একমাত্র উপায়। বলাই বাহুল্য, এ সব চিঠি কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পাঠানো হতো না। এর জন্য বিকল্প পথ ব্যবহার করতাম। কারাবাসের মেয়াদ যখন ফুরিয়ে এলো, আমি নিশ্চিতই বুঝতে পারছিলাম আমি হয়তো পার্টির হয়ে আর কাজ করতে পারব না। কারণ পার্টির কাজের ধারার ওপর আমরা যথেষ্ট আস্থা রাখতে পারছিলাম না। আমার যুক্তি ছিল এই, ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে যে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ও শক্তি বৃদ্ধি ঘটেছে, তার সঙ্গে একাত্ম হতে হবে। পাশাপাশি গ্রামের শতকরা ৭০-৮০ ভাগ দরিদ্র কৃষক, ভূমিহীন ক্ষেতমজুর ও প্রান্তিক মানুষকে এই সংগ্রামে সর্বাগ্রে সক্রিয়, সচেতন, নেতৃত্বের অংশীদার করতে না পারলে দেশ থেকে পাকিস্তানি শাসন-শোষণ হয়তো চলে যাবে, কিন্তু শোষণ ব্যবস্থাটি অক্ষত থেকে যাবে। পাকিস্তানি শোষণ  ও শাসনের জায়গাটি নেবে বাঙালি জাতীয়তাবাদী লুটেরা ধনিক শ্রেণি। দরিদ্র, নিষ্পেষিতরা যে তিমিরে আছে, সে তিমিরেই রয়ে যাবে। সে দিনের আমার অপরিপক্ব ভাবনাচিন্তার মধ্যে যে আশঙ্কাটি প্রকাশ পেয়েছিল, স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরে বাস্তবে সেটি ফলতে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই।

কারাগার থেকে মুক্তি
১৯৭০ সালের আগস্ট মাসের শেষ দিকে সম্ভবত সামরিক আদালতের সশ্রম কারাদ-ের মেয়াদ শেষে আমরা কুষ্টিয়া জেলা কারাগার থেকে তিনজনই মুক্তি পেলাম। আমি, খন্দকার আবদুল ওয়াহেদ এবং মোহিনী মিল সুতাকল শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আবদুল বারিক জোয়ারদার। মুক্তি আমরা কবে পাচ্ছি, তা কয়েক দিন আগেই পার্টি ও মোহিনী মিলের বন্ধুরা জেনে গিয়েছিলেন ।
কারামুক্তির দিন সকাল নয়টা থেকেই মোহিনী মিলের শ্রমিকরা জেলের গেটে এসে জমায়েত হতে থাকলেন আমাদের বরণ করে নেবার জন্য। জেলে লৌহকপাট অতিক্রম করে বাইরে পা রেখেই দেখলাম রওশন ভাইসহ শত শত শ্রমিক, কম পক্ষে ৭/৮শ হবে, ফুলের মালা নিয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। প্রথমেই রওশন ভাই এবং তারপর আরও অনেকে এসে আমাদের জড়িয়ে ধরলেন। অনেক শ্রমিক বন্ধুর চোখে ছিল আনন্দের অশ্রু। আমি হাসিমুখে তাদের এই ভালোবাসা  গ্রহণ করে ধন্য হলাম।
এরপর শুরু হলো মিছিল। মিছিলের সামনে আমরা সবাই। হঠাৎ কয়েকজন শ্রমিক কর্মী আমাকে তাদের কাঁধে তুলে নিল। বুঝলাম, আমি তাদের জন্য নিঃস্বার্থভাবে লড়াই করেছি, এ তারই স্বীকৃতির অকৃত্রিম প্রকাশ। জেল থেকে বেরিয়ে বুঝেছিলাম, আমার ওপর শ্রমিকদের আস্থা অতীতের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

মানুষ-দেশ-পরিবার
আগেই বলেছি, আমার কলেজ জীবন থেকেই রাজনৈতিক ভাবনা, আদর্শিক অবস্থান, মুক্তচিন্তার প্রতি অদম্য আকর্ষণÑএসবের প্রতি আমার রক্ষণশীল বাবার কোনো সমর্থন ছিল না। সে কারণে আমার আদির্শক, রাজনৈতিক কাজের প্রতি আমার পরিবার থেকে তেমন কোনো সমর্থন আমি পাইনি। এটা আমার দুর্ভাগ্য। পক্ষান্তরে আমার পরিবারের পাশে নানা সমস্যা-সংকটের সময় যেভাবে দাঁড়ানো প্রয়োজন ছিল, সেভাবে দাঁড়াতে পারিনি। আমার একান্ত নিজের ভাবনার জগৎ, বৃহত্তর সামাজিক রূপান্তরের স্বপ্ন এবং পরিবারে বাস্তব চাহিদা ও প্রত্যাশার মধ্যে দূরত্ব তাই থেকেই গেছে। তবে বাবা-মার প্রতি কর্তব্য পালনে বিলম্বে হলেও যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। নিতান্তই সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থে অন্ধ হয়ে পারিবারিক দায়িত্বের প্রতি অবহেলা করিনি। তবে রাজনৈতিক ও আদর্শিক দায় বোধ থেকে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মঙ্গলের কথা ভেবে নিজকে নানা কাজে যুক্ত রাখার কারণে পরিবারের প্রতি কিছু কর্তব্য উপেক্ষিত হয়েছে। দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থ ও মঙ্গলের জন্য মনপ্রাণ ঢেলে সব শ্রম, মেধা, সময় ব্যয় করার ফলে নিজ পরিবারের প্রতি অবহেলার অভিযোগটি ইতিহাসে অনেক মহৎ ব্যক্তির বিরুদ্ধেও উঠতে পারে। কিন্তু তাদের মহৎ অবদানের বিশালতার আড়ালে তা হয়তো চাপা পড়ে যায়। যখন কারাবাসে ছিলাম কুষ্টিয়ায়, তখন আমার ছোট ভাই ফেরদৌস এসে এক-দুবার দেখা করে গেছে জেল গেটে। তার কাছ থেকে মায়ের ও পরিবারের  আর সবার খোঁজখবর পেয়েছি। জেল থেকে মুক্তি পাবার কিছুদিন পর দেশের বাড়ি গিয়ে সবার সঙ্গে দেখাও করে এসেছিলাম।
জেল থেকে ছাড়া পাবার পরপরই পার্টির জেলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হলো। এই বৈঠকে অনেক আলোচনা হলো। রওশন ভাই আমার উত্থাপিত অনেক প্রশ্নের জবাব তার মতো করে দিতে চেষ্টা করলেন। আমি  খুব একটা সন্তুষ্ট হতে পারলাম না। আমি অকপটে তা বলেও দিলাম। রওশন ভাইর প্রতি অসীম শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এসবের কোনো ঘাটতিই আমার ছিল না। পার্টির অন্য কমরেড, সহযোদ্ধাদের কাছে ভালোবাসার ঋণও কখনোই ভোলার নয়। আমি আমার মনের কিছু মৌলিক প্রশ্নের সদুত্তর সেদিন পাইনি। তার জন্য পার্টি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। তবে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেও আমার ওপর অর্পিত দায়িত্বগুলি রাতারাতি অস্বীকার করে বা ছেড়ে দিয়ে চলে যাব, এমন দায়িত্বহীন আমি নই। আমার এই কথায় সহকর্মীরা মর্মাহত হলেও কিছুটা আশ্বস্ত বোধ করলেন। আমি এটাও পরিষ্কার করে জানিয়ে দিলাম, কোনো কারণেই আমি কুষ্টিয়া ছাড়ছি না, শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ তো করবই না, বরং তা আগের মতোই অটুট থাকবে। আর সে ক্ষেত্রে রওশন ভাইর নেতৃত্বের ওপর আমার আস্থা বরাবরের মতো শতকরা ১০০ ভাগই বজায় থাকবে।
 
সত্তরের ঘূর্ণিঝড়
ইতিহাসের এক মহাপ্রলয় ঘটে গেল বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে ১৯৭০-এর ১২ নভেম্বর। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কবলে পড়ে ভোলা, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, কক্সবাজারসহ উপকূলের জেলাগুলোতে প্রায়  দুই লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। এর সঙ্গে ঘরবাড়ি, ফসল, গাছপালা, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, স্কুল, কলেজ, হাটবাজার, মাদ্রাসা, মসজিদ-মন্দির ও অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যে ক্ষতি হয়, তা ছিল অবর্ণনীয়।
মহাদুর্যোগের পরের দিন ‘ইত্তেফাক’, ‘সংবাদ’, ‘দৈনিক পাকিস্তান’, ‘পূর্বদেশ’, ‘অবজারভার’সহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ বর্ণনা ও প্রতিবেদন ছাপা হলো। গোটা জাতি স্তম্ভিত, মর্মাহত, শোকাহত হয়ে পড়ল। যারা নিহত হয়েছে তাদের লাশ উদ্ধার, যারা বেঁচে ছিলেন তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্য, পানীয়, চিকিৎসাসহ পুনরুদ্ধারের অত্যাবশ্যকীয় সহায়তার জন্য উদ্যোগ ছিল সেই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারের বিষয়।
পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় জেলাসমূহে ইতিহাসের এই নজিরবিহীন ধ্বংসাত্মক ঘূর্ণিঝড়ে ও  ক্ষতিগ্রস্ত লাখ লাখ পরিবার, তাদের কষ্ট, দুর্ভোগ স্বচক্ষে দেখতে সফরে আসেননি সে সময়ের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান বা তার সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। এটা নিয়ে তৎকালীন গণমাধ্যম ও জনগণের মনে প্রচণ্ড ক্ষোভ দানা বেঁধেছিল। দুর্যোগকবলিত উপকূলের ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখে এসে দুঃসহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে তাই মওলানা ভাসানী পল্টন ময়দানের বিশাল জনসমাবেশে হাত উঁচিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, ‘ওরা আসে নাই।’ পল্টন ময়দানের লাখো জনতা ‘শেম’ ‘শেম’  বলে চিৎকার দিয়ে গগনবিদারী সেøাগাানে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তুলেছিল।
ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মহাধ্বংস স্বচক্ষে দেখতে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ভাসানী ন্যাপের নেতৃবৃন্দ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদল এবং মোজাফ্ফর ন্যাপের প্রতিনিধিরা দুর্যোগকবলিত উপকূলীয় জেলাগুলো সফর করেন। অন্য দলের মতো ন্যাপের (মোজাফ্ফর) কর্মীরাও এই সময় ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহ করে দুর্যোগকবলিত অঞ্চলে আর্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান। সে সময় ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রুপ, বিভিন্ন শ্রমিক ও অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা-কর্মী ও প্রতিনিধিরা দ্রুত এই ত্রাণ অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্যের এক নিদর্শন হয়ে আছে।
সে সময় ঢাকা থেকে একটি টেলিগ্রাম গেল রওশন ভাইর কাছে। পাঠিয়েছিলেন ন্যাপ নেতা সৈয়দ আলতাফ হোসেন (আলতাফ ভাই)। আলতাফ ভাই আমাদের অবিলম্বে ত্রাণসমাগ্রী সংগ্রহের পরিকল্পনা গ্রহণ ও রাস্তায় বেরিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তারই পরামর্শে রিলিফ সংগ্রহের জন্য কবি আবু জাফরকে গিয়ে একটি গান রচনার অনুরোধ জানিয়েছিলাম। ‘এই পদ্মা, এই মেঘনা, এই যমুনা সুরমা নদী তটে, আমার রাখাল মন গান গেয়ে যায়’ কিংবা ‘তোমরা ভুলেই গেছো মল্লিকাদির নাম, সে এখন ঘোমটা পরা কাজলবধূ দূরের কোন গাঁয়’। এসব কালজয়ী গানের স্রষ্টা-গীতিকার ও সুরকার আবু জাফর তখন কুষ্টিয়ার একটি কলেজের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের তরুণ শিক্ষক। আলতাফ ভাই তাকে ভীষণ স্নেহ করতেন। আবু জাফরও তাকে যথেষ্ট সমীহ ও শ্রদ্ধা করতেন। আবু জাফর অসাধারণ আবেদনময় একটি গান রাতারাতি রচনা করে তাতে সুরারোপ করেছিলেন। ছাত্র ইউনিয়নের ২/৩ জন ছেলেকে শিখিয়েও দিয়েছিলেন। সেই গান গেয়ে কুষ্টিয়া শহরের রাস্তায় রাস্তায় আলতাফ ভাইর নেতৃত্বে আমরা জলোচ্ছ্বাসদুর্গত মানুষের জন্য সাহায্য সামগ্রী সংগ্রহ করেছিলাম। পরে তা ন্যাপের পক্ষ থেকে মনপুরায় বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

নির্বাচনের প্রস্তুতি
ইতিমধ্যে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকার জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করল। ১২ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানার আগেই এই তারিখ ঘোষিত হয়েছিল। প্রায় একই সময় জেনারেল ইয়াহিয়া এক সামরিক ফরমান বলে (খবমধষ ঋৎধসবড়িৎশ ঙৎফবৎ) সংক্ষেপে এলএফও ঘোষণা করে সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলের ওপর সামরিক আইনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা বহাল রাখার কথা কার্যত আনুষ্ঠানিক জানিয়ে দিলেন।
রাজনৈতিক মহলে এবং গণমাধ্যমে এটা নিয়ে বেশ কিছু বিতর্ক, লেখালেখি হলো। পূর্ব বাংলার অবিসংবাদী নেতা আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রকাশ্যে এলএফওর সমালোচনা করলেও এলএফও প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন না, এমন ঘোষণা থেকে বিরত থাকলেন। ফলে দৃশ্যত তিনি বুঝিয়ে দিলেন, সঠিক সময় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ওপরই তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। এলএফওর বাধাকে তিনি আপাতত বড় বাধা হিসেবে গণ্য করতে চাননি। হয়তো কৌশলগত কারণেই।
ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মহাদুর্যোগ নেমে আসার পর জনগণের মধ্য থেকে কয়েকটি রাজনৈতিক দলও দাবি তুলল যে, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ব্যাপকতা ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজ যাতে কার্যকরভাবে সম্পন্ন হতে পারে, সে জন্য নির্বাচনের তারিখ এক-দেড় মাস পিছিয়ে দেয়া হোক।
এ ক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তার স্পষ্ট অবস্থান জানিয়ে দিল। কোনো অজুহাতেই নির্বাচনের তারিখ পেছানো চলবে না। বঙ্গবন্ধু সংবাদ সম্মেলন করে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের তথা দেশবাসীকে যে বার্তাটি দিলেন তা হচ্ছে, জলোচ্ছ্বাস-ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত এলাকায় ত্রাণ পুনর্বাসনের কাজ যেমন চলবে, নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং নির্বাচনী সিডিউলও পূর্ব ঘোষণা মতো বহাল রাখতে হবে। এটা হতে পারে যে, বঙ্গবন্ধু এবং তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের মনে সংগত কারণেই এ রকম আশঙ্কা ছিল,  যেকোনো অছিলায় ইয়াহিয়ার সামরিক সরকার তথা জেনারেলরা একবার নির্বাচন পিছিয়ে দিতে পারলে আবার নতুন কোনো ষড়যন্ত্র করে নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে দেবার ছুতো খুঁজবে, শেষ পর্যন্ত নির্বাচনই দেবে না। পাকিস্তানি সামরিক সরকারগুলোর পূর্বাপর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এই আশঙ্কা অমূলক ছিল না। তাই শেষাবধি নির্ধারিত তারিখেই পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন হয়েছিল।

ঐতিহাসিক নির্বাচন
আগেই উল্লেখ করেছি, নির্বাচনের তারিখ, নির্বাচনী তফসিল ঘূর্ণিঝড় দুর্যোগের পূর্বেই ঘোষণা করা হয়েছিল। একথাও ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, এই নির্বাচন হবে এলএফও বা সামরিক আইনের বেঁধে দেয়া ৫টি শর্তের অধীনে। আওয়ামী লীগ, উভয় ন্যাপসহ পূর্ব বাংলার প্রধান গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো নীতিগতভাবে এই এলএফওর বেঁধে দেয়া শর্তাবলির বিরোধিতা করেছিল। তার পরও যেহেতু প্রধান ও বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল আওয়ামী লীগ তথা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এলএফওর শর্তাবলি বাহ্যত আমলে না নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেহেতু ন্যাপসহ অন্যান্য প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক ধারার রাজনৈতিক দলগুলোও নির্বাচনে অংশগ্রহণের পক্ষে অবস্থান নিয়ছিল, নিতে বাধ্য হয়েছিল।
পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ওয়ালী-মোজাফ্ফর) সাধারণ নির্বাচনে সব গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যের আহ্বান জানাল। আসলে ন্যাপ (মোজাফ্ফর) চেয়েছিল আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সব গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অবতীর্ণ হোক। কিন্তু আওয়ামী লীগের এ ব্যাপারে কোনো আগ্রহ ছিল না।  ৬-দফা আন্দোলনের সময় অর্থাৎ ’৬৬ সালের ৭ জুনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ ও ন্যাপের (মোজাফ্ফর) একটি ঐক্য গড়ে উঠেছিল। পরে ’৬৮ সালে ডাক  (উবসড়পৎধঃরপ অপঃরড়হ ঈড়সসরঃঃবব) নামে  আইয়ুববিরোধী একটি বৃহৎ জোট গড়ে উঠেছিল। নির্বাচনের সময় এসব জোটের আর কোনো অস্তিত্বই রইল না।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই সময় গোটা দেশে জননেতা হিসেবে আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তা ছিল গগনচুম্বী এবং জনগণের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নাতীত। তাই আওয়ামী লীগ এককভাবে নির্বাচন করলেও যে তার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া অতি স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত, সে বিষয়ে কারোরই তেমন সংশয় ছিল না। কিন্তু ঐক্যের কথা যারা বলেছিলেন সেটা শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা বা না করার কথা ভেবে নয়, ভবিষ্যতের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার স্বার্থে। মনে রাখা দরকার, এই সময়টা ছিল ইতিহাসের এক পরম সন্ধিক্ষণ। গণতন্ত্র ও মুক্তিকামী সব স্তরের মানুষের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ঐক্যের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। সাধারণ নির্বাচনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই ঐক্যের প্রতিফলন ঘটলে তার প্রভাব হতে পারত অনেক সুদূরপ্রসারী। কিন্তু আওয়ামী লীগের একলা চলো দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সেটা হলো না।
অন্যদিকে তৎকালীন অখণ্ড পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগের পর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) উভয় গ্রুপের মিলিত সাংগঠনিক শক্তি ও জনসমর্থন ছিল যথেষ্ট উল্লেখ করার মতো। তাই আওয়ামী লীগ যখন ঐক্যের প্রশ্নে কোনো আগ্রহ দেখাল না, তখন বিকল্প  হতে পারত মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে উভয় ন্যাপের সম্মিলিত শক্তিতে নির্বাচনী লড়াইয়ের জোট। কিন্তু সে রকম কোনো জোট হবার পথে বড় বাধা ছিল কমিউনিস্ট শিবিরের মস্কোপন্থি ও পিকিংপন্থিদের আদর্শিক দ্বন্দ্ব-বিরোধ।
মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাপের পিকিংপন্থি অংশের সাংগঠনিক শক্তি এবং জননেতা মওলানা ভাসানীর জনপ্রিয়তা সারা দেশেই একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আবির্ভূত হতে পারত। কিন্তু পিকিংপন্থি কমিউনিস্ট পার্টি তখন কয়েকটি উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ার ফলে ন্যাপ ভাসানী কার্যত নানা বিভ্রান্তিকর ও পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্তের এক জটিল চক্রের ভেতরে নিক্ষিপ্ত হলো। পিকিংপন্থি মূল কমিউনিস্ট পার্টি তখন প্রধানত কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার, মোহাম্মদ তোয়াহা, আবদুল হকের নেতৃত্বে চলছিল। অপর একটি অংশ কমরেড দেবেন শিকদার, আবদুল মতিন, আবুল বাশার, কমরেড আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে কাজ করে যাচ্ছিল। উদীয়মান তরুণদের নেতৃত্বে আর একটি অংশ ছাত্র ও শ্রমিকদের মধ্যে বেশ সক্রিয় ছিল। এর নেতৃত্বে ছিলেন কাজী জাফর আহমেদ, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো প্রমুখ।
পিকিংপন্থি এই তিন দলই তখন ন্যাপের (ভাসানী) মধ্যে সমান সক্রিয়। অর্থাৎ মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বের ওপর তারা সবাই আস্থাশীল এবং মওলানা সাহেবও এই তিন দলের মধ্যকার ও আদর্শিক দ্বন্দ্ববিরোধ সম্পর্কেও কম-বেশি যেমন অবহিত ছিলেন, তেমনি এরা সবাই আদর্শিকভাবে অত্যন্ত নিবেদিত প্রাণ এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ, সেটিও আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতেন। তাই সবার প্রতিই তার এক ধরনের সহানুভূতি ও প্রশ্রয়ের সমর্থন ছিল। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে এর ফলাফল দাঁড়াল এই যে, সাধারণ নির্বাচনের মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও কার্যক্রম, যার সঙ্গে দেশের সব স্তরের আপামর জনসাধারণ কম-বেশি সম্পৃক্ত হয়ে আছেন এবং থাকবেন তার নীতি ও কৌশল নির্ধারণের প্রশ্নে এই সব দলের আদর্শিক বিরোধ ও সিদ্ধান্তগুলো শেষ পর্যন্ত বড় বাধা হয়ে দাঁড়াল।
মওলানা ভাসানীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি, গ্রহণযোগ্যতা এবং গ্রাম-শহরের ব্যাপক খেটে খাওয়া শ্রমজীবী ও প্রগতিশীল মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে জনপ্রিয়তার বিচারে ৭০-এর প্রেক্ষাপটে একমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাদ দিলে ছিল অদ্বিতীয়। তিনি বা তার দল ’৭০-এর নির্বাচনে কার্যকরভাবে অংশ নিলে নির্বাচনের মানচিত্রে তা ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করত, এতে কোনো সন্দেহ ছিল না। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে পিকিংপন্থি বামরা ‘ভোটের আগে ভাত চাই’ অতিবাম সেøাগান তুলে প্রথমে রাজনৈতিক মহলে নানা গুঞ্জন, বিভ্রান্তির জন্ম দিলেন, তারপর এক সময় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন। সবই ঘটল মওলানা ভাসানীকে সামনে রেখে। এটা কি আওয়ামী লীগকে পরিপূর্ণ ওয়াকওভার দিতে, না বাম শক্তিগুলোকে নির্বাচনবিরোধী লড়াইয়ের দিকে চলে যেতে উৎসাহিত করতে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। ইতিহাস কোনো একদিন এর উত্তর হয়তো খুঁজে পাবে।
তবে আমার ধারণা সেদিন যদি আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ উভয় গ্রুপ ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারত এবং সে ক্ষেত্রে শতকরা ৮৫টি আসন এমন কি শতকরা ৯০ ভাগ আসনও আওয়ামী লীগের হতো এবং বাকি ১০ ভাগ কিংবা তারও কম আসনে সম্মিলিত ন্যাপ নির্বাচনে জিতে আসত। তার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে ’৭১-এর ইতিহাস হয়তো ভিন্নভাবে লেখা হতো।
তবে বলাই বাহুল্য যে, আমরা ন্যাপ বা  কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত থেকে যারা কাজ করছিলাম, তাদের এক ব্যাপক অংশের মধ্যে এ রকম প্রত্যাশাই ছিল। বিদ্যমান বাস্তবতায় তা ঘটল না।  ন্যাপ (ওয়ালী-মোজাফ্ফর) তাই এককভাবে কুঁড়েঘর প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিল। সৈয়দ আলতাফ হোসেন ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক এবং তিনিও নির্বাচনী প্রার্থী হলেন। কুষ্টিয়া জেলার দুটি আসন থেকে একটি কুষ্টিয়া (সদর), অন্যটি কুমারখালী-খোকসা উপজেলা। কুষ্টিয়া সদর থেকে প্রাদেশিক পরিষদের আসনে প্রার্থী হবার জন্য পার্টি থেকে রওশন ভাইকে মনোনয়ন দেয়া হলো।
আলতাফ ভাই ন্যাপ পার্লামেন্টারি পার্টির সভা শেষ করেই কুষ্টিয়া এলেন। পার্টির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে বসে সার্বিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করলেন, নির্বচনে করণীয় আলোচনা করলেন। ঢাকায় থাকলেও তিনি আমার সঙ্গে রাজনৈতিক মতভেদের খবর রাখতেন। আলতাফ ভাই আমার আদর্শিক অবস্থান নিয়ে তেমন কোনো প্রশ্ন করলেন না। তবে আমি নির্বচনে সার্বক্ষণিক তার সঙ্গে আছি জেনে খুশিই হলেন।
সিদ্ধান্ত হলো, রওশন ভাইকে আহ্বায়ক করে একটি নির্বাচন পরিচালনা কমিটি এবং তার অধীনে নির্বাচনী প্রচারের জন্য একটি সাব-কমিটি গঠনের। এই সাব-কমিটির সমন্বয়ক করা হলো আমাকে। আলতাফ ভাই ও রওশন ভাই উভয় প্রার্থীর জন্যই এই কমিটি কাজ করবে। কমিটিতে অন্যদের মধ্যে ছিলেন খোকন ভাই, জালাল ভাই, কালু মোল্লা, ব্রজেন বিশ্বাস, সুধীর পাল, শহিদুল ইসলাম, জাহেদ রুমী, জাফরুল্লাহ খান চৌধুরী, ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী কাজী রাইসুল হক মাশুক, বাবলু, সুনীল, গোবিন্দ, অনুপ নন্দী এবং আরও কয়েকজন।
‘কুঁড়েঘর’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী প্রচারে নামলাম। সভা, সমাবেশ, ঘরোয়া বৈঠক এবং পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে-গ্রামে অনেক প্রচারও চলল। পোস্টার লিফলেট ইত্যাদির খসড়া করা, দ্রুত ছেপে বিলি করার ব্যবস্থা ইত্যাদির সার্বিক সমন্বয়ের দায়িত্বে আমিই ছিলাম। অনেক সভায় অংশ নিতে হয়েছে। ছাত্র ইউনিয়নের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ফজলে আজিম ওয়ারা মোটরসাইকেলে আলতাফ ভাইকে নিয়ে তার নির্বাচনী এলাকার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যেভাবে ছুটে গেছে, দিন-রাত সন্ধ্যা উপেক্ষা করে তা এখনো মনে পড়ে।
কিন্তু এসব সভা সমাবেশ থেকে জনমতের যে আভাস স্পষ্ট হয়ে আসছিল, তাতে আমরা বুঝতেই পারছিলাম যে নির্বাচনে আমাদের জয়ের আশা খুব একটা নেই। যদিও প্রার্থী হিসেবে আলতাফ ভাই, রওশন ভাই উভয়ই ছিলেন সৎ, জনস্বার্থে নিবেদিতপ্রাণ ও ত্যাগী মানুষ হিসেবে অদ্বিতীয়। ভোটাররাও তা স্বীকার করতেন। তাদের কথা ছিল, মুজিবের প্রার্থী হয়ে কেন নির্বাচন করলাম না? তা হলেই সবচেয়ে ভালো হতো। অনেকে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, সৈয়দ আলতাফ হোসেন ও শেখ রওশন আলীর মতো পরীক্ষিত, ত্যাগী ও যোগ্যতম প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও তারা ভোট দিতে পারছেন না, এটা তাদের জন্য আক্ষেপের। তারা বঙ্গবন্ধুর প্রার্থীকেই জেতাবেন বলে স্থির  করেছিলেন। সে প্রার্থী যদি কলাগাছ হয়, তা হলেও।

নির্বাচনের পর    
নির্বাচনের অভাবনীয় সাফল্যে শুধু আওয়ামী লীগ নয়, গোটা দেশ আনন্দ উচ্ছ্বাসের জোয়ারে ভাসতে লাগল। ১৯৭১-এর ৩ জানুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে আওয়ামী লীগ নির্বাচনী বিজয়ের উৎসব উপলক্ষে এক মহাসমাবেশের আয়োজন করে। এখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশবাসীকে আওয়ামী লীগের পক্ষে রায় দেবার জন্য অভিনন্দন জ্ঞাপনের পাশাপাশি তার দলের বিজয়ী প্রার্থীদের জনগণের অধিকার, পূর্ব বাংলার স্বাধিকার অর্জনের সংগ্রামে অনড় অটল থাকার শপথবাক্য পাঠ করান। যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কেউ যদি জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার দুঃসাহস দেখায় তার বিরুদ্ধেও কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেন।
জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি এই দুমাস ঢাকা এবং বিশেষ করে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বঙ্গবন্ধুর বাড়িটি সমগ্র পাকিস্তানের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এ সময় পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ছোট-বড় সব রাজনৈতিক দলের নেতারা (একমাত্র ভুট্টোর পিপলস পার্টি ছাড়া) ঢাকায় আসেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মতবিনিময় ও আলোচনার জন্য। বঙ্গবন্ধু নির্বাচনের পরপরই ঘোষণা দিয়েছিলেন জনগণ নির্বাচনী রায়ের ভেতর দিয়ে তার ৬-দফার পক্ষে ম্যান্ডেট দিয়েছে। অতএব ভবিষ্যতে সংবিধান রচিত হবে ৬-দফার নির্দেশনা অনুসরণ করে। এ কথার মধ্য দিয়ে তিনি পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন যে, পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সংবিধানে বাংলাদেশ এবং পশ্চিম পাকিস্তানের সব কয়টি প্রদেশের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি যথাযথভাবে স্বীকৃত হবে।
এর মধ্যে একবার ইয়াহিয়া ঢাকা সফরে আসেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী বলে অভিহিত করেন। জাতীয় পরিষদের অধিবেশনও আহ্বান করা হলো। অধিবেশনের তারিখ স্থির হলো ১ মার্চ, ১৯৭১। প্রথম অধিবেশন ঢাকায় বসবে, এ-ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়েছিল।
পক্ষান্তরে পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে নানা কৌশল ও ছলাকলার আশ্রয় নিলেন। তার দল পশ্চিম পাকিস্তানে সর্বমোট ৮৮টি আসন নিয়ে ঐ অঞ্চলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আবির্র্ভূত হলো। অথচ আওয়ামী লীগ জিতেছিল ১৬০টি আসনে। পিপলস পার্টি তাই বলীয়ান ছিল নির্বাচিত সদস্য সংখ্যায় নয়, তার আসল শক্তি ছিল সামরিক বাহিনী। সামরিক বাহিনীর জেনারেলদের সঙ্গে তার গভীর ও নিবিড় যোগাযোগ ছিল। বস্তুত তাকে বলা হতো সিভিলিয়ান ফেস অব আর্মি ।
পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশের মধ্যে দুটিতে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল ন্যাপ (ওয়ালি-মোজাফ্ফর)। এই দুটি প্রদেশ হচ্ছে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তান। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসের নেতৃবৃন্দের বৈঠক ও নানা আলাপ আলোচনার ভেতর দিয়ে এটা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছিল যে, সামনের দিনগুলোতে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়বে বৈ কমবে না।

আমার নিঃসঙ্গ অবস্থান
রাজনৈতিক অবস্থানের দিক থেকে আমি তখন অনেকটা নিঃসঙ্গ। নির্বাচনের পর কমিউনিস্ট পার্টির জেলা কমিটি থেকে পদত্যাগ করলাম। পার্টির আশ্রয়ও ছেড়ে দিলাম। কুষ্টিয়ার বন্ধু মতিউর রহমানের সহায়তায় শ্রমিক পাড়ায় একটি ছোট কামরা ভাড়া করে সেখানে থাকতে লাগলাম। মতিভাই সিপিইইপি (এমএল)-এর জেলা কমিটির একজন নেতা। এই পার্টির নেতৃত্বে রয়েছেন সুখেন্দু দস্তিদার, কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহা, কমরেড আবদুল হক প্রমুখ। আমি এই পার্টির সদস্যপদ নেবার প্রশ্নে দ্বিধান্বিত ছিলাম। তাদের তাত্ত্বিক অবস্থানের সঙ্গে আমার স্পষ্ট কিছু মতবিরোধ ছিল। তবে গ্রামে গিয়ে কৃষকদের ও শহরে শ্রমিকদের সংগঠন গড়ে তোলার ব্যাপারে তাদের সহযোগিতা নিতে প্রচণ্ড আগ্রহী ছিলাম। সেভাবেই কাজ শুরু করি, বাইরে নতুন রাজনৈতিক ঝড়ের আভাস স্পষ্ট, মনের ভেতরও ঝড়। কোথায় কীভাবে ভবিষ্যৎ সংগ্রামে অংশ নেব, তার হিসাব-নিকাশ করতে চেষ্টা করছিলাম। আগেই জেনেছিলাম, কমরেড অমল সেন (বাসু দা) যদিও পিকিংপন্থি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গেই ছিলেন-শ্রেণি শত্রু খতমের লাইনের শুরু থেকেই বিরোধিতা করে এসেছেন। কৃষকদের সংগঠন গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে দেবার ব্যাপারেও তার চেষ্টা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। তিনি যশোর-নড়াইল অঞ্চলের তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম নায়ক। ভাবলাম, নড়াইল গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি আরও বিশদে বোঝার চেষ্টা করব, হয়তো আমার ধারণাগত স্পষ্টতা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং একই সঙ্গে অন্য জেলায় যারা এই কাজ করছেন, তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ ঘটবে। কিন্তু তিনি ’৬৯-এর গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে কারামুক্ত হওয়ার কিছু দিন পরই সামরিক সরকারের রোষানলে পড়লেন। আবার কারারুদ্ধ হলেন। ফলে তার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ আর  হলো না।
 
অসহযোগ 
পাকিস্তানি সেনা শাসকরা বুঝতে পারল ২৪ বছর পাকিস্তানি শাসকরা যেভাবে পূর্ব বাংলাকে পদানত রেখে দমনপীড়ন চালিয়ে শোষণ করতে পেরেছে, তেমনটি আর চলবে না। আর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার ফলে পাকিস্তানের সংবিধানও পূর্ব বাংলার স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে  প্রণয়ন করা সম্ভব হবে না, ফলে স্বমূর্তিতে তারা আবির্ভূত হলো। অকস্মাৎ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করলেন, ১ মার্চ ঢাকায় নবনির্বাচিত জাতীয় পরিষদের যে অধিবেশন বসার কথা ছিল অনির্দিষ্টকালের জন্য তা স্থগিত করা হলো।
গর্জে উঠল বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু তার ঘনিষ্ঠ সহচরদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করলেন এবং সংবাদ সম্মেলনে লাগাতার তিন দিনের হরতালসহ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন। বঙ্গবন্ধুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার আগেই ঢাকার রাস্তায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে নেমে আসে হাজার হাজার মানুষ, ছাত্র-যুবক-শ্রমিক-পেশাজীবী-নারী-পুরুষ সবাই। দোকানপাট, অফিস আদালত সব বন্ধ হয়ে যায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে, হরতাল পালন শুরু হয়ে যায়। ঢাকায় তো বটেই, সেই সঙ্গে সব জেলা ও মফস্বল শহরগুলোতে।
 শহর থেকে গ্রামে সংগ্রামের আবেগ ও তেজ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে লাগল। অসহযোগ আন্দোলন আওয়ামী লীগের হাইকম্যান্ড তথা বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা অনুযায়ী, শান্তিপূর্ণ ধারায় চলার কথা থাকলেও কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্নভাবে কিছু সহিংস ঘটনা সে সময় ঘটেছে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মধ্যেও মার্চ মাসে পুলিশ- সেনাবাহিনীর গুলিতে বেশ কিছু রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষ ঢাকা ও অন্যান্য স্থানে নিহত হন। এর ফলে বিক্ষোভ হ্রাস পাবার বদলে আরও বেড়ে যায়। অন্যদিকে দেশের অবাঙালি অধ্যুষিত কিছু এলাকায় এক ধরনের উত্তেজনা বিরাজ করতে থাকে। কোথাও কোথাও কিছু সহিংস ঘটনাও ঘটেছিল। ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে যারা নিহত বা শহীদ হন, তার প্রতিবাদে সারা দেশে স্বতঃস্ফূর্ত সভা, প্রতিবাদ মিছিল চলতে থাকে। এসব মিছিল বেশিরভাগই আওয়ামী লীগের ব্যানারে হলেও ন্যাপ (মোজাফ্ফর), ছাত্র ইউনিয়ন উভয় গ্রুপ, শ্রমিক সংগঠনগুলো, অন্যান্য গণ সংগঠন, পেশাজীবী, নারীরা এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরাও রাস্তায় নেমে আসেন প্রতিবাদে শামিল হবার জন্য। তারা ঢাকাসহ নানা স্থানে সভা মিছিল, পোস্টার, লিফলেট বিলির মাধ্যমে প্রতিবাদ চালিয়ে যেতে লাগলেন। এর অংশ হিসেবে একাধিক প্রতিবাদ সভা, মিছিল সংগঠিত করতে এ সময় আমি কুষ্টিয়া ছাড়াও চুয়াডাঙ্গা, দর্শনা, কুমারখালী প্রভৃতি স্থানে সফর করি।
এ রকম পরিস্থিতিতে জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন এবং জাতীয় পরিষদের অধিবেশন পুনরায় আহ্বান করার কথা বললেন। তারিখ স্থির হলো ২৫ মার্চ। ইয়াহিয়া  খানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন পুনরায় ডাকার এই ঘোষণা যে প্রধানত পূর্ব বাংলার প্রচণ্ড রুদ্র রোষে ফেটে পড়া জনগণের অপ্রতিরোধ্য বিস্ফোরণকে কিছুটা প্রশমিত বা বিভ্রান্ত করার প্রয়াস ছাড়া কিছু নয়, তা জনগণের বুঝতে কোনো অসুবিধা হয়নি।

৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ

৭ মার্চ, ১৯৭১ ঢাকার রেসকোর্সের বিশাল ময়দানে লাখ লাখ প্রতিবাদী মানুষের ঢল নামল আওয়ামী লীগের ডাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেখানে তার ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন। এখানে তিনি সুস্পষ্ট ও বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ করলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়ে দিলেন ঢাকাসহ দেশের নানা স্থানে সরকারের পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী অসহযোগ আন্দোলনের সময় যাদের হত্যা করেছে, তাদের রক্তের ওপর দিয়ে তিনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করতে যাবেন না। তিনি এসব হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি দাবি করলেন। তিনি আরও বললেন, অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্যাহার করতে হবে। অনতিবিলম্বে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তিনি মানুষকে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানালেন। যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে জালেম, সামরিক সরকার ও শত্রুদের মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হতে বললেন। তিনি জেলা, থানা, ইউনিয়ন, পড়া-মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম কমিটি করার কথাও বললেন।

সাজানো আলোচনা
এমন প্রচণ্ড জনরোষ ও জনবিস্ফোরণের উত্তপ্ত পরিস্থিতির পটভূমিতে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৫ মার্চ কড়া নিরাপত্তার মধ্যে ঢাকা আসেন। উদ্দেশ্য, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। আলোচনার বিষয়বস্তু এবং পরিবেশ ইত্যাদি নিয়ে কিছু মতানৈক্য থাকলেও শেষ পর্যন্ত ঢাকায় জেনারেল ইয়াহিয়ার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর গোলটেবিল আলোচনা শুরু হয়। এখানে জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং ভবিষ্যৎ সংবিধানের কাঠামো ও রূপ কী হবে, মূলত সেই বিষয়কে সামনে রেখে উভয় পক্ষ তাদের আলোচনার বিষয়াদি এবং কৌশল ঠিক করে অগ্রসর হতে লাগলেন।
এই আলোচনায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ, অন্যান্য নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, এম মনসুর আলী, ড. কামাল হোসেন প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গণমাধ্যমে আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে এ রকম ধারণা প্রচার সত্ত্বেও মানুষের মনে কিন্তু সামরিক সরকারের উদ্দেশ্য ও দুরভিসন্ধি সম্পর্কে শুরু থেকেই সংশয় ও শঙ্কা  বিরাজ করছিল।
২১ মার্চ জুলফিকার আলী ভুট্টো এই গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিতে ঢাকায় আসেন। এটা ছিল গোলটেবিল আলোচনা নামের প্রহসন নাটকের শেষ অঙ্ক। শেষ পর্যন্ত আলোচনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ২৩ মার্চ ছিল পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবস। ওই দিন ঢাকায় ছাত্র-জনতার সমাবেশ থেকে আনুষ্ঠানিক পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে দিয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়। সে সময় ইয়াহিয়া খান এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো দুজনই ঢাকায় অবস্থান করছিলেন।
ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসেছিলেন প্রধানত গোলটেবিল আলোচনা চালানোর নামে সময়ক্ষেপণ করতে। এই সময় তারা তাদের পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বাংলাদেশের জনগণের ওপর সর্বাত্মক আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আর সামরিক বাহিনীর এই ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা প্রণীত হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর পূর্ণ সম্মতি ও অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে।
২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা শুরু হবার আগেই দুই প্রধান খলনায়ক জেনারেল ইয়াহিয়া ও জুলফিকার আলী ভুট্টো দ্রুত পিআইএর বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকা ত্যাগ করেন। এর সপ্তাহ দুই আগে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে বেলুচিস্তানের কসাই বলে পরিচিত জেনারেল টিক্কা খানকে নিয়োগ দেয়া হয়।  গভর্নর হিসেবে  শপথ নেবার রেওয়াজ ছিল। কিন্তু সেই শপথ পাঠের অনুষ্ঠান সম্ভব হয়নি। প্রথা অনুযায়ী এই শপথ বাক্য পাঠ করানোর কথা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির। প্রচণ্ড গণবিক্ষোভ ও জনরোষের পরিস্থিতিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি বি এ সিদ্দিকী টিক্কা খানকে শপথ পড়াতে অপারগতা প্রকাশ করলেন। এটা ছিল নজিরবিহীন। 

৭ মার্চের পর
মার্চের ভাষণ রেডিও, টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের কথা ছিল। সামরিক সরকার সেটা হতে দেয়নি। পরে অবশ্য রেডিওতে প্রচার করা হয়েছিল। জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোতে বক্তৃতার পূর্ণ বয়ান প্রকাশিত হয়। 
ভাষণের প্রতিক্রিয়া সব স্তর ও শ্রেণির মানুষের মধ্যে ছিল অভূতপূর্ব ও সাহসসঞ্চারী। বোঝার চেষ্টা করছিলাম পরিস্থিতি চরম বিস্ফোরণের দিকে যেতে কত সময় নেবে। আর বিস্ফোরণের রূপটাই বা কী হতে পারে। আসলে অতীতে কখনোই আমরা কেউই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হইনি। তাই কারও অভিজ্ঞতায় এমন কিছু ছিল না যা দিয়ে যথার্থ অর্থে সঠিকভাবে অনুমান করা সম্ভব ছিল আমরা সামনের দিনগুলোতে কোন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে চলেছি। তবে একটি কথার সার বুঝেছিলাম, পরিস্থিতির অবনতি এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকবে যে অবস্থাটি অতীতে আমরা কখনো দেখিনি, কল্পনাও করিনি।
কুষ্টিয়া কুমারখালীর কয়েকটি গ্রামে যেখানে কিছু সংগঠন বা যোগাযোগ ছিল, সেখানে চলে যাবার একটি ব্যবস্থা করলাম। মুক্তির সংগ্রাম কেমন হয়, তার কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা ১৯৭১-এর মার্চ মাসে ছিল না, এ কথা ঠিক। তবে তাত্ত্বিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে সংঘটিত হয়, কীভাবে গেরিলা কায়দায় যুদ্ধ চলে, বিপ্লবীরা কীভাবে মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়ে তাদের সঙ্গে থেকে সংগঠিত করে, তাদের বিপ্লবী যোদ্ধায় পরিণত করে, তার কিছু ইতিহাস তো পড়া ছিলই। যেমন সোভিয়েত বিপ্লবের ইতিহাস, গণচীন, ভিয়েতনাম, কিউবা প্রভৃতি দেশের বিপ্লবী যুদ্ধ, যুদ্ধের কৌশল সম্পর্কে কেতাবী ধারণা ছিল। মাও সেতুং-এর চীনের দীর্ঘস্থায়ী গেরিলাযুদ্ধের কৌশল সম্পর্কিত বই ঙহ চৎড়ঃৎধপঃবফ ডধৎ, ভিয়েতনামের গেরিলাযুদ্ধের অন্যতম নায়ক জেনারেল নগুয়েন গিয়াপের লেখা, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির লংমার্চের ইতিহাস, জন রিডের ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’, চে গুয়েভারার ডায়েরি প্রভৃতি গভীর আবেগ ও নিষ্ঠা নিয়ে পাঠ করার জ্ঞান কাজে লাগাতে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। এ সময় কয়ার ব্রজেন বিশ্বাস, অনিল ঘোষ, তার ছোট ভাই আশুতোষ ঘোষ, জালাল ভাই, জলিল, নাসির এরা আমাকে নানাভাবে সাহায্য করেছেন বহু স্থানে আমার সঙ্গী হয়েছেন। উল্লেখ্য, ব্রজেন বিশ্বাস ওই এলাকার একজন বাম নেতা হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। তিনি নিজেও আমার সঙ্গে পরামর্শ করে অনেকে গ্রামে গিয়েছেন সাধারণ মানুষকে বিশেষত তরুণদের উদ্বুদ্ধ ও সংগঠিত করতে। 
ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর গোলটেবিল আলোচনা শুরু হবার পর দেশের পত্রপত্রিকা, বিদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো এবং বিশেষ করে বিবিসি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণধর্মী মতামত ও ভবিষ্যদ্বাণী করে যাচ্ছিল। মার্ক টালির প্রতিদিনের রিপোর্ট ছিল খুবই জনপ্রিয়। সাপ্তাহিক গণশক্তিও তার মতো করে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং গোলটেবিল আলোচনার পরিণতি সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী দিয়ে যাচ্ছিল। সম্ভবত ২৩ মার্চ সংখ্যায় গণশক্তি জানাল ইয়াহিয়ার সঙ্গে মুজিবের আপসরফা হয়ে যাচ্ছে। এখানে বলা প্রয়োজন, গণশক্তি ছিল পিকিংপন্থি আন্ডারগ্রাউন্ড কমিউনিস্ট পার্টি সিপিইপির (এমএল) মুখপত্র। এর প্রকাশক ছিলেন ভাসানী ন্যাপের কোষাধ্যক্ষ সাইদুল হাসান, সম্পাদক প্রখ্যাত লেখক, গবেষক বদরুদ্দীন উমর। দেশের অন্যান্য দৈনিকগুলোতে কিছু আশাবাদের খবর দিয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশ পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ ইয়াহিয়া-মুজিব সমঝোতার ব্যাপারে শেষ পর্যন্ত সন্দেহের আভাস দিয়েই যাচ্ছিল। এরই মধ্যে জয়দেবপুরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পাঞ্জাবি অফিসারদের সঙ্গে বাঙালি সেনা সদস্যদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে যায়। তার ফলে পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল।

গণহত্যা শুরু
ভয়াবহ রকমের থমথমে অবস্থা ও চাপা উত্তেজনার ভেতরই ২৫ মার্চ রাতেই শুরু হলো পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নিষ্ঠুর, কাপুরুষোচিত গণহত্যার অভিযান। ঢাকা  মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলসমূহ, শিক্ষকদের আবাসিক এলাকা, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ইপিআরের সদর দপ্তর ও ব্যারাক ছিল তাদের আক্রমণের প্রথম লক্ষ্যবস্তু। শত শত শিক্ষক, ছাত্র, পুলিশ, ইপিআরসহ হাজার হাজার সাধারণ নিরীহ মানুষ, নারী ও শিশু বর্বর পাকিস্তানি হানাদারদের গুলিতে, শেলের আঘাতে, ট্যাংকের বর্বর হামলায় প্রাণ দিয়েছিলেন ওই এক রাতের অভিযানেই। 
এসব বর্বরতার কোনো খবরই আমরা ঢাকার বাইরে থেকে সে সময় পাইনি। পরের দিন ২৬ মার্চ যখন সব জেলা শহরে সামরিক বাহিনী তার বুটের তলায় সমস্ত কিছু মিশিয়ে দিতে একের পর এক বিধিনিষেধের ঘোষণা দিল, আঘাত হানতে শুরু করল, তখন বুঝলাম, ঢাকায় ভয়াবহ কিছু ঘটে গেছে। তথ্য-যোগাযোগের জন্য আমরা নির্ভর করতাম বিবিসি বেতারের ওপর। বিবিসি প্রচারিত সংবাদ থেকে জানা গিয়েছিল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঢাকায় সামরিক অভিযানে নেমেছে। আর এ-ও জানা গেল, অসহযোগ আন্দোলনের তথা বাংলাদেশের অবিসংবাদী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে তার ৩২ নং রোডের বাসা থেকে ২৫ মার্চ মধ্য রাতে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
আমি ২৫ মার্চ রাতে কুষ্টিয়ায় বন্ধু অনিল ঘোষের সঙ্গে ছিলাম। অনিল ঘোষ একটি  কোম্পানিতে ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিলেন। এই কোম্পানির প্রধান দুই কর্ণধার কর্নেল নাজমুল হুদা এবং ব্রিগেডিয়ার নরুজ্জামান (ক্যাপটেন অব.) সে সময় কুষ্টিয়ায় ছিলেন। তারা দুজনেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি ছিলেন। সেই সুবাদে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা ছিল। তারা রাতে ইয়াহিয়া খানের ভাষণ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝেছিলেন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। খুব ভোরেই তারা কুষ্টিয়া ছেড়ে গেলেন। এ সময় জানলাম কুষ্টিয়া নবাব সিরাজউদ্দৌলা রোডের এক বাড়ির ছাদে রনি নামের একটি ছেলে টহলরত সেনা সদস্যের গুলিতে নিহত হয়েছে। রনিই বলতে গেলে কুষ্টিয়া শহরে ১৯৭১-এর প্রথম শহীদ। পরে শুনেছিলাম রনি  প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মী, কুষ্টিয়ার ছেলে নয়, সে বেড়াতে এসেছিল আত্মীয়ের বাসায়। তার আসল বাড়ি রংপুর শহরে।

স্বাধীনতার ঘোষণা
আমি ২৬ মার্চ সন্ধ্যার আগেই সন্তর্পণে কুষ্টিয়া শহর থেকে বেরিয়ে গ্রামে চলে গেলাম। পালা করে প্রতি রাতেই কোথাও না কোথাও বৈঠক করতে লাগলাম, ভয়াবহ যুদ্ধের যে ছিটেফোঁটা খবর পাচ্ছিলাম বিবিসি ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যম সূত্রে, তা পর্যালোচনা করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ছক কষতে চেষ্টা করছিলাম। বিবিসির খবর থেকে জানলাম, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। খবর আসতে লাগল, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালি অফিসার, সৈন্যরা, ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) ও পুলিশের সদস্যরা বিদ্রোহ করেছে। তারা মুক্তিযুদ্ধে যে যেভাবে পারছে সম্পৃক্ত হয়ে যাচ্ছে। যারা ছুটিতে ছিলেন কিংবা ওইসব সার্ভিস থেকে অবসর নিয়ে জীবন কাটাচ্ছিলেন, তারাও আর বসে থাকতে পারলেন না। ২৭ মার্চ রাতে অথবা তার একদিন পর জানলাম মেজর জিয়াউর রহমান নামের একজন বাঙালি চট্টগ্রাম বেতার থেকে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পক্ষে দেয়া তার ঘোষণাটি কয়েকবার নাকি ওই বেতারে প্রচার করা হয়েছে।
এ সব খবর ছিল বেশ উৎসাহব্যঞ্জক, অন্যদিকে হানাদার বাহিনীর বর্বরতা শুধু ঢাকায় নয়, জেলা শহরেও ছড়িয়ে পড়ছিল। প্রতিরোধও জেলা শহরগুলোতে দানা বাঁধছিল খুব দ্রুত। কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের  উদ্যোগে ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞ শুরুর পর পরই জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে দেখা করে তাদের জিম্মায় অস্ত্রাগারে যেসব অস্ত্র ছিল, তা জনগণের হাতে তুলে দেবার দাবি জানানো হয়। তারা সেই সব অস্ত্র আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন। কুষ্টিয়ায় হানাদারদের ওপর পাল্টা আক্রমণ শুরু হয়েছিল মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর নেতৃত্বে। কুষ্টিয়ায় দুটো জায়গায় প্রথম অবস্থায় হানাদারদের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা আঘাত হেনেছিল। একটি কুষ্টিয়া পুলিশ লাইন, অন্যটি মোহিনী মিল সংলগ্ন ওয়্যারলেস ভবন ও চত্বর।
মেজর আবু ওসমান চৌধুরী ২৫ মার্চ রাতে পারিবারিক কাজে কুষ্টিয়ায় ছিলেন এবং সপরিবারে সার্কিট হাউসে অবস্থান করেছিলেন। ইতিমধ্যে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর খবর পেয়ে তিনি দ্রুত চুয়াডাঙ্গা ফিরে যান এবং ইপিআরের পাঞ্জাবি অফিসারদের নিরস্ত্র করে ইপিআর সদস্যদের যুদ্ধে নেমে পড়ার নির্দেশ দেন। তারই নেতৃত্বে ১ এপ্রিল কুষ্টিয়া মোহিনী মিলের নিকটবর্তী ওয়্যারলেসটি হানাদারদের দখলমুক্ত হওয়ার ভেতর দিয়ে কুষ্টিয়া স্বাধীনতার স্বাদ পেল।

সাহায্যের সন্ধানে ভারতে
কুষ্টিয়া প্রথম দফায় হানাদারমুক্ত হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অর্থাৎ এপ্রিল মাসের ২ কিংবা ৩ তারিখ আমি ও সহকর্মী মতিউর রহমান ঠিক করলাম, সীমান্ত পার হয়ে ভারত যাব। সেখানে আমাদের সমমনা রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ করে মুক্তির সংগ্রামে সহায়তা চাইব। বলাই বাহুল্য, তখন প্রবাসী সরকার গঠনের কোনো ঘোষণা আসেনি। সরকার গঠনের প্রক্রিয়া কোথায়, কীভাবে চলছে, তা-ও জানি না। শুধু এটুকু জানি, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এ যুদ্ধ চলবে। আমাদের এককভাবে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাবার শক্তি, সামর্থ্য, অভিজ্ঞতা নেই। তাই বন্ধুদের সাহায্য চাইতে হবে। অসহযোগ আন্দোলনের কারণে তখন বাস যোগাযোগ বন্ধ ছিল। সোলায়মান বলে পার্টির এক কর্মী ছিল পাহাড়পুরে বাড়ি। তার বড় একটা মোটরসাইকেল ছিল। এটি সে নিয়মিত চালাত। তাকে বলা হলো মতিভাই ও আমাকে নিয়ে সে মেহেরপুর বর্ডারে পৌঁছে দিয়ে আসবে। সেও সঙ্গে সঙ্গে রাজি হলো। কুষ্টিয়া থেকে মেহেরপুরের দূরত্ব প্রায় ৫৫/৫৬ কিলোমিটার। সোলায়মান সামনের সিটে হেলমেট পরা। আমরা দুজন তার পেছনে হেলমেট ছাড়াই রওনা হয়েছি, কলকাতা যাব। কুষ্টিয়া থেকে মেহেরপুরের কাছাকাছি যখন পৌঁছেছি, তখন দুপুর গড়িয়েছে।
মেহেরপুর শহরে ঢোকার রাস্তা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে বামুনদি মোড়ে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে একটি গরু রাস্তা পার হতে গিয়ে চলন্ত মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেয় । সঙ্গে সঙ্গে মোটর সাইকেল উল্টে গেল। ভাগ্যিস সেখানে কোনো গভীর খাদ ছিল না। ফসলবিহীন খোলা মাঠ। মোটরসাইকেলটাও গড়াতে গড়াতে অনেক দূরে গিয়ে কাত হয়ে পড়ল। আমরা তিনজনই অল্প বিস্তর আহত হলাম। তবে হাত-পা কারোরই ভাঙেনি।
কয়েকজন পথচারী দূর থেকে এই দুর্ঘটনার দৃশ্যটি দেখে দৌড়ে এসে আমাদের উদ্ধার করলেন। রক্তাক্ত অবস্থায় দুটো রিকশা নিয়ে আমরা ভাসানী ন্যাপ নেতা আহম্মদ ভাইর বাসায় গিয়ে উপস্থিত হলাম। তিনি আমাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন। 
দুদিন তার বাসায় থেকে চিকিৎসা নিয়ে আমরা সেরে উঠলাম। ওই অবস্থায় আমি আর মতিভাই বর্ডার পার হয়ে বাস ধরে কৃষ্ণনগর হয়ে টিটাগর পৌঁছলাম। সোলয়মানকে মেহেরপুরে রেখে গেলাম আর বলে গেলাম, আমরা ফিরে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। টিটাগর মতিভাইর এক চাচা থাকতেন, তার বাসায় এক রাত কাটিয়ে পরের দিন কলকাতা গেলাম।
কলকাতায় মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টির অফিসের ঠিকানা আমাদের কাছে ছিল। আমরা সিপিএমের সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘দেশ হিতৈষী’ এবং অন্যান্য বই-পুস্তক কলকাতা থেকে লোক মারফত সংগ্রহ করে পড়তাম। আমরা সিপিআই (এম) অফিসে পৌঁছে নিজেদের পরিচয় দেই ভাসানী ন্যাপের কর্মী হিসাবে। কুষ্টিয়া থেকে সরাসরি এসেছি এই কথাও জানাই। সবাই কৌতূহল ও উৎসাহ ভরে আমাদের কথা শুনতে এগিয়ে এলেন। পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা যতখানি জানতাম তা সবিস্তারে তাদের বললাম। আমরা কমরেড জ্যোতি বসুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাই বলে জানালাম। আমাদের জানানো হলো সিপিআইএম-এর পলিট ব্যুরোর বৈঠক শুরু হয়েছে। এ সময় কমরেড বসুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা সম্ভব নয়। তার সাক্ষাৎ পেতে পলিট ব্যুরোর সভা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আমরা নিরাশ হচ্ছি দেখে সিপিআই (এম) এর বন্ধুরা রাজ্য কমিটির অন্যতম শীর্ষ নেতা কমরেড কৃষ্ণপদ ঘোষের (যিনি কেষ্ট ঘোষ নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন) সঙ্গে  আমাদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করলেন। আমরা তার সঙ্গে আলাপকালে সিপিআই (এম)-এর কাছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের জন্য সব ধরনের সহায়তার আবেদন জানালাম। আমাদের সব কথা শুনে কমরেড কেষ্ট ঘোষ আমাদের যা বললেন সংক্ষেপে তা ছিল এ রকম, সিপিআইএম পশ্চিমবাংলায় বা কেন্দ্রে কোথাও সরকার নিয়ন্ত্রণ করছে না। ফলে সিপিএমএর পক্ষ থেকে অস্ত্র সহায়তা ছাড়া অন্য ধরনের সমর্থন কিংবা সহায়তা দেবার কথা ভাবা যেতে পারে। কিন্তু পরিস্থিতি এখনো পরিষ্কার নয়। অপেক্ষা করতে হবে। পার্টি এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে ।
আমরা দেশে ফিরে এলাম।  ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা ভারতের সীমান্ত পার হয়ে কলকাতা, আগরতলা প্রভৃতি শহরে অবস্থান নিয়েছেন। ভারত সরকারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়েছে বলে নানা সূত্রে জানা গেল। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের কী ব্যবস্থা হচ্ছে, তার কোনো খবর জানতাম না।  হাজার হাজার মানুষ অসহায়ের মতো ভারত সীমান্ত অভিমুখে ছুটে যাচ্ছিলেন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে।
আমার অতি ঘনিষ্ঠজনদের পরিবারও সীমান্ত অতিক্রমের প্রস্তুতি নিতে লাগল। তার মধ্যে আমার অন্যতম সহকর্মী কয়ার ব্রজেন বিশ্বাস, অনিল ঘোষের পরিবারও ছিল। কিন্তু কুষ্টিয়া বা তার নিকটবর্তী গ্রাম থেকে বর্ডারের দূরত্ব ৩০/ ৪০ মাইলের কম হবে না। কোনো যানবাহন গ্রামের মেঠো পথে চলত না। তাই প্রায় পুরো পথই হেঁটে শরণার্থীদের অতিক্রম করতে হতো। শরণার্থীদের সীমান্তমুখী পথে কোথাও কোথাও দুর্বৃত্তরা লুটতরাজের উদ্দেশ্যে শরণার্থীদের ওপর চড়াও হচ্ছে বলে খবর আসছিল।

জুন মাসে বর্ডার পার

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম কয়েক মাস শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে প্রতিদিন হাজার হাজার থেকে লাখে লাখে গিয়ে পৌঁছাল। জুন মাসের মাঝামাঝি বিবিসিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ভারতে বাংলাদেশের শরণার্থী সংখ্যা প্রায় কোটির কাছাকাছি পৌঁছে যায়। বিভিন্ন বর্ডারে শরণার্থীদের দীর্ঘ লাইন ক্রমাগত দীর্ঘতর হতে থাকে। এদের বেশিরভাগই অসহায় নিরীহ মানুষ নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ-নির্বিশেষে। প্রথম দিকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষই সংখ্যায় বেশি ছিলেন। কিন্তু দিন যত গড়াতে থাকে সংখ্যাগুরু মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যাও দ্রুত বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সচেতন নাগরিক, বুদ্ধিজীবী, লেখক, সাংবাদিক, শিল্পী, সাহিত্যিক, অধ্যাপক, শিক্ষক, চাকরিজীবী, আমলা ও অন্যান্য পেশাজীবীরা তো ছিলেনই, আরও ছিলেন সাধারণ নিরীহ, অসহায় মানুষের দল, যারা প্রথম থেকেই ভারতে আশ্রয়ের জন্য ছুটেছেন। শুধু পশ্চিম বাংলা বা কলকাতায় নয়, পার্শ¦বর্তী ভারতীয় অন্য রাজ্য যেমন ত্রিপুরা, মেঘালয়, আসাম প্রভৃতি রাজ্যেও অসংখ্য শরণার্থী গিয়েছিলেন আশ্রয়ের খোঁজে।
আমার ভাবনায় ছিল দেশের ভেতরে থেকেই মুক্তিযুদ্ধে শামিল হব। তাই অনেক পরিবারকে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে চলে যেতে সাধ্যমতো সাহায্য করলেও আমি নিজে যাবার ব্যাপারে জুনের আগ পর্যন্ত আগ্রহী হইনি। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলাম ভারতে চলে যাব। বন্ধু অনিল ঘোষের পরিবারের একটি অংশ আগেই চলে গিয়েছিল। শেষ পর্যায়ে অনিলদা, তার স্ত্রী, দুই শিশুসন্তান প্রতাপ, প্রদীপ, তিন ছোট ভাই ও অন্য কয়েকজন আত্মীয়স্বজনসহ আমরা রওনা হলাম। কিন্তু পিসীমা অর্থাৎ অনিলদার পিসীমা কিছুতেই দেশ ছাড়তে রাজি হলেন না। বয়স্ক বিধবা মানুষ। ভাইয়ের সংসারে ছিলেন সবাইকে আগলে রাখতেন। আমাকেও ভীষণ আদর করতেন।
শিকারপুর বর্ডার পার হতে প্রায় ৩০/৩৫ মাইল পথ আমাদের হেঁটে যেতে হয়েছে। ভোর পাঁচটায় রওনা হয়ে কুষ্টিয়া শহরের ঠিক বাইরে হরিশংকরপুরের কাঁচা রাস্তা ধরে অসংখ্য শরণার্থী পরিবারের সঙ্গে আমরা হেঁটে যাচ্ছিলাম। সঙ্গে অনিলদার দুই শিশু পুত্রসহ ৮/১০ জনের পরিবার। সন্ধ্যা সাতটার পরে আমরা দৌলতপুরের তারাগুনিয়া গ্রামে পৌঁছালাম। জানতাম এই গ্রামে অ্যাড. লুৎফর ভাইর বাড়ি। এক গ্রামবাসীকে তার বাড়ির খোঁজ জানতে চাইতেই অদূরের একটি বাড়ি দেখিয়ে বললেন, ওই তো। বাড়িতে ঢুকে বাড়ির মালিকের মুখোমুখি হতেই বুঝলাম, উনি ভাসানী ন্যাপ নেতা লুৎফর ভাই নন। আমি সামনে গিয়ে বিব্রত ভঙ্গিতে যখন বললাম আমরা ভাসানী ন্যাপ নেতা অ্যাড. লুৎফর রহমানের বাড়ির খোঁজ করছি। উনি আমাদের ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার সঙ্গে আপনাদের পরিচয় ছিল না, এখন হলো। আপনারা তো সকালেই সীমান্ত পার হবেন। এই রাতটুকু এই বাড়িতেই কাটাবেন। কোনো অসুবিধা হবে না।
তিনি ৮/১০ জন মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করলেন। বাড়ির ভেতরের ঘরে মেয়েদের বিশ্রাম নেবার ব্যবস্থা করে দিলেন। আমরা পুরুষ ছেলেরা বাইরের ঘরে ঢালাও বিছানায় রাত কাটিয়ে পরের দিন ভোরে শিকারপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করলাম। করিমপুরে হয়ে রানাঘাট।
রানাঘাটে অনিলদাদের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় চিন্তাহরণ ঘোষ সপরিবারে থাকতেন। ভদ্রলোক তার বাড়িতেই আপাতত থাকার ব্যবস্থা করলেন। দুদিনের মধ্যে ওই পাড়াতেই দুই কামরার একটি ঘর ভাড়া করে দিলেন অনিলদার পরিবারের জন্য। দুই দিন বিশ্রাম নিয়ে আমি ছুটলাম কলকাতা রাজনৈতিক বন্ধুদের খোঁজে।
শিয়ালদা স্টেশন থেকে বেরিয়ে যখন সিপিআই (এম)-এর অফিসে যাব বলে হাঁটতে শুরু করেছি, তখনই পেছন থেকে একজন আমার নাম ধরে ডেকে উঠলেন। তাকিয়ে দেখি দৈনিক আজাদের স্টাফ রিপোর্টার হামিদুর রহমান। দিনাজপুরের লোক, ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন)-এর সক্রিয়, নেতৃস্থানীয় কর্মী ছিলেন। হামিদুর রহমান জানালেন, কলকাতায় ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন বাম নেতা এসে পৌঁছেছেন। তাদের খোঁজ সিপিআই(এম) অফিসে গেলে পাওয়া যাবে। আরও জানালেন, মেনন ভাই, অর্থাৎ রাশেদ খান মেনন কলকাতায় আছেন। হামিদুর ভাই আমাকে সঙ্গে নিয়ে, মেনন ভাই পার্ক সার্কাস এলাকায় যেখানে থাকতেন সেই বাসায় উপস্থিত হলেন। ছোট্ট সেই বাসাটিতে মেনন ভাইর সঙ্গে তার স্ত্রী লুৎফুন্নেছা বিউটিও ছিলেন। কয়েক মাস বয়সী একমাত্র কন্যা সুবর্ণাকে মায়ের কাছে রেখে তিনিও এসেছেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেবেন বলে। ওই বাসায় রনো ভাইও ছিলেন। মেনন ভাই ও রনো ভাই দুজনকে একসঙ্গে পেয়ে আমি সরাসরি যুদ্ধ পরিস্থিতি ও আমাদের করণীয় বিষয়ে জানতে চাইলাম।
তাদের কাছেই প্রথম জানতে পারি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে (তার অনুপস্থিতিতে ) জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি গঠিত হয়েছে। একটি লিখিত বক্তব্য লিফলেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। আমি বাম শক্তিগুলোর ঐক্যের ব্যাপারে আমার আগ্রহের কথা জানাতেই তিনি বললেন, চেষ্টা চলছে। মেনন ভাইকে অনুরোধ জানাই ঐক্যের প্রক্রিয়া জোরদার করতে উদ্যোগ নেবার। মেনন ভাই তখন কমরেড অমল সেন (বসুদা), নজরুল ভাই, কমরেড দেবেন শিকদারসহ অন্য কয়েকজন বাম নেতার কলকাতায় উপস্থিতি এবং তাদের মধ্যে প্রাথমিক যোগাযোগ, আলোচনা হয়েছে বলে জানালেন।
আমি কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে সেখান থেকে সরাসরি সিপিআই (এম)-এর অফিসে চলে গেলাম বাসুদা অথবা নজরুল ভাইর খোঁজে। সিপিআই (এম) অফিসে কমরেড নজরুল ইসলামের দেখা পেলাম পরের দিন। তার কাছ থেকে জানলাম বাসুদা (কমরেড অমল সেন) আছেন মধ্যম গ্রামে। নজরুল ভাইর সঙ্গে শিয়ালদা থেকে ট্রেন ধরে আমরা মধ্যম গ্রাম গেলাম বাসুদার সঙ্গে দেখা করতে। আসার আগে সিপিআই (এম) অফিসে প্রখ্যাত কৃষক নেতা হাজি মোহাম্মদ দানেশ, বিশিষ্ট বাম কমিউনিস্ট নেতা দেবেন শিকদারের সঙ্গেও দেখা হয়েছিল।
মধ্যম গ্রামে বাসুদা এবং খুলনার প্রবীণ বাম কমিউনিস্ট নেতা শচীন বসু (খোকা দা)-এর সঙ্গেও দেখা হলো। গভীর রাত পর্যন্ত দেশের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আমাদের করণীয় বিষয়ে আলোচনা চলল। পরের দিন সকালেও সে আলোচনা চলতে লাগল। কমিউনিস্ট সংহতি কেন্দ্রের বক্তব্য সংবলিত একটি বুকলেটের খসড়া চূড়ান্ত করার ভেতর দিয়ে বৈঠক শেষ করে সন্ধ্যায় আমরা যার যার গন্তব্যে ফিরে গেলাম।
Bookmark and Share প্রিন্ট প্রিভিও | পিছনে 
প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
  • সৌদি আরব-ইরান : যুদ্ধ কি আসন্ন? -শুভ কিবরিয়া
  • দর কষাকষির মিশনে ট্রাম্প -আনিস রায়হান
  •  মতামত সমূহ
    Author : LarCubswads
    Propecia Overstock Viagra Fa Male viagra Amoxicillin Viral Infection Cialis Without A Doctor Methocarbamol Over The Counter
    Author : LarCubswads
    Viagra Trotz Herzinfarkt buy viagra online Viagra Ou Generique accutane online buy Buy Cheap Amoxil Without Prescription
    Author : LarCubswads
    Suhagra 100 Mg Precio Del Kamagra Nolvadex Pas Cher buy viagra Clarina Keflex Used For Pierced Ear Infection Zithromax Without Prescription Price
    Author : LarCubswads
    Zentel Quick Shipping Robaxin No Prescription Accutane Discount Card buy viagra Viagra Genericum Kaufen Lactamase Resistant Abx
    Author : LarCubswads
    Wii Amoxicillin Clear Up My Gingervitis cialis buy online Propecia Generica Italia
    Author : KelJeltjefs
    Comprar Cialis En Zaragoza generic cialis Mexico Amoxicillin On Line
    Author : Chastoca
    Amoxicillin Acid Reflux viagra Levitra Generika Schweiz
    Author : Davedugh
    Cephalexin Liquid For Toddlers cialis online Doxycycline Skin Health On Line
    Author : KelJeltjefs
    Cialis Equivalent Viagra buy cialis Alcohol Stopping Keflex
    Author : Davedugh
    Keflex Shortage viagra How To Get Cialis
    Author : Kennnencywen
    Online Pharmacy'S viagra Propecia Menopause
    Author : Chastoca
    Commander Baclofene En Ligne viagra Cialis O Viagra Effetti Collaterali
    Author : Davedugh
    Viagra Extra Dose generic cialis Cialis Active Over The Counter
    Author : Davedugh
    Kamagra En Neonatos viagra Viagra Kaufen Deutschland
    Author : Davedugh
    Propecia Pack cialis buy online Wath Is The Store To Buy Viagra
    Author : Kennnencywen
    My Cat Ate My Amoxicillin buy viagra Acheter Viagra Pas Cher Paris
    Author : Chastoca
    Comprar Viagra Espana viagra Letrozole Without Prescription
    Author : KelJeltjefs
    Vent Kamagra cialis Cytotec Et Ivg Aidez Moi
    Author : Davedugh
    Pregnancy Category And Cephalexin cheap cialis On Line Pharm
    Author : Chastoca
    Propecia Covered By Health Insurance cialis Propecia Caracteristicas
    Author : Kennnencywen
    Dove Trovare Dapoxetina cialis Viagra Con Hipertension
    Author : KelJeltjefs
    Where Can You Buy Generic Viagra buy cialis Cialis Super Active Generique
    Author : KelJeltjefs
    Cialis Tiempo De Accion viagra online pharmacy Lioresal 10 Mg
    Author : KelJeltjefs
    Viagra Super Active 150mg Generic Levitra Pill Maxium Pediatric Amoxil Dose
    Author : KelJeltjefs
    Real Elocon In Internet Visa Accepted Next Day Delivery Levitra Brand Name Kamagra Jelly 100 Mg Strasbourg Real Doxycycline online pharmacy order accutane online australia Mail Order Fedex Shipping Worldwide Fluoxetine Adofen Price Viagra Online Cheap Buy Online Viagra Where Priligy Se Vende En Argentina Tadalafil Generic Cialis 20 Mg Compra Acne Amoxicillin Cialis Price Isotretinoin Izotek From Canada Direct Low Price Overseas Tadalafil Dosage levitra online best price Vendita Viagra Generico Zithromax Liver Damage Viagra Prices Dosage For Cephalexin Propecia Generic United States Priligy 100mg Magic Pharmacy Online Usa 67 Vendita Viagra Spedizione Veloce levitra non prescription Forum Cialis Effet Cyklokapron No Prescription Viagra Tarifas De La Propecia Buy Valtrex Hong Kong Order Cialis Online Usa Viagra Levitra Sale Tadalis Sx Viagra France Livraison Rapide Accutane Costs Zenegra 100 Mg Tablets Vendo Propecia Cheap Kamagra Usa Cheap Zentel Tablets In Australia Kjop Lasix Levitra Online Forum Augmentin Or Amoxicillin For Flu Cialis Online Kaufen Deutschland Generic Propecia Cost Viagra Levitra Cialis Comparison Pastilla Cialis Efectos cialis Viagra Jelly For Sale Uk 123 Discount Isotretinoin In Usa Drugs With Free Shipping viagra online prescription Buy Kamagra Europe Cheap Viagra Online Canada Pharmacy Generic Viagra Cheap Cheap Kamagra Bangkok Dr Reddy Finasteride Buy Levitra 20mg Online Viagra Postlagernd Bestellen Cialis Interdit Belgique Order Cheap Viagra Amoxicillin Side Effects In Infants Allergic Reactions To Amoxil generic cialis Gb Finoecia Prescription Viagra Pille Mann Cheap Viagra Sales Where Can I Buy Lasix Without A Prescription Acquisto Finasteride Propecia brand cialis and levitra Viagra Pas Cher Au Canada Cialis Gunstig Mit Rezept Buy Generic Levitra Generic Levaquin Tavanic Tablet Venta Cialis En Farmacias Viagra Discount Sales Prix Cialis Au Maroc
    Author : KelJeltjefs
    Genericos De Cialis Cheap Cialis No Rx Cialis Bestellen Zonder Recept In Nederland Usa No Subscription Pharmacy Dapoxetine Priligy Penicillin Keflex Allergy Bracelets 24 Hour Shipping Viagra Viagra Online Online Fedex Shipping Zentel Direct Amex Amoxicillin Canine Dosage generic viagra Propecia Mental Side Effects Noticed Cephalexin 93 3147 Where To Order Kamagra Shop Prednisone Online
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.
    বর্তমান সংথ্যা
    পুরানো সংথ্যা
    Click to see Archive
    Doshdik
     
     
     
    Home | About Us | Advertisement | Feedback | Contact Us | Archive